রায়পুরে তিন দিন পর্ব ২- পথ যখন গল্প হয়ে ওঠে
Summary:
বিমান যখন রায়পুরের দিকে নামতে শুরু করল, জানালার বাইরে তাকালাম।
প্রতিটি নতুন শহরকে প্রথম দেখার মুহূর্তটি আমার খুব প্রিয়। কারণ তখনও শহরটি আমার কাছে কোনো স্মৃতি নয়। কোনো রাস্তার সঙ্গে আমার কোনো ঘটনা জড়িয়ে যায়নি। কোনো মুখ পরিচিত হয়ে উঠেনি। কোনো খাবারের স্বাদ নেওয়া হয়ে উঠেনি। কোনো গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আমি ছবি তোলেনি। শহরটি তখনও আমার কাছে একটি সাদা পৃষ্ঠা। আগামী কয়েকদিনে সেই পাতায় কি লেখা হবে, আমি জানেন না। মাত্র তিন দিনের সফর। তার মধ্যে একটি দিন আবার কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। পুরোটাই বুক অ্যাওয়ার্ড ইভেন্টের জন্য বরাদ্দ। সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে মূল আয়োজন। আর তারপর? তারপর শুরু হবে দিনের সবচেয়ে প্রাণবন্ত পর্ব। লেখকদের সঙ্গে জমজমাট আড্ডা। বই, গল্প, লেখালেখি আর কত না বলা কথায় কখন যে সন্ধ্যা গড়িয়ে যাবে, কে জানে!
আমার ভ্রমণের খাতায় রায়পুর তখনও অক্ষর হীন একটি পৃষ্ঠা।
একটি হোটেল কখন ঘর হয়ে ওঠে? আমার থাকার ব্যবস্থা Courtyard by Marriott-এ। আয়োজকেরা গাড়ি পাঠিয়েছেন। বিমানবন্দরের গেট পেরিয়ে বাইরে আসতেই নতুন এক শহরের বাতাস যেন প্রথমবারের মতো গায়ে এসে লাগল। চারপাশে ব্যস্ততা। কেউ অপেক্ষায়, কেউ ছুটছে গন্তব্যের দিকে। এর মধ্যেই চোখে পড়ল, একটু দূরে বেশ কিছু মানুষের জটলা। গানের তালে কয়েকজন নাচছেন, চারপাশে উৎসুক মানুষের ভিড়। প্রথমে ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না, কি হচ্ছে। পরে গাড়ির চালককে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, “মিউজিক শুটিং চলছে।” অচেনা শহরের সঙ্গে প্রথম পরিচয়টাই যেন হলো খানিকটা নাচে-গানে।
ভিড়ের মধ্যেই হঠাৎ চোখ আটকে গেল একটি কাগজে। সেখানে আমার নাম লেখা। কাগজটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণ। তার দিকে এগিয়ে যেতেই সে আমাকে চিনে নিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই উঠে বসলাম গাড়িতে।
হোটেল খুব দূরে নয়, মিনিট কুড়ির পথ। গাড়ি এগিয়ে চলল। তখন প্রায় সন্ধ্যা ৬টা বাজতে চলল। জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলাম। শহরের আলো, রাস্তায় ছুটে চলা গাড়ি, মানুষের ব্যস্ততা, দোকানপাট, অচেনা সব দৃশ্য। নতুন কোনো শহরে প্রথম পৌঁছানোর সময় আমার মধ্যে যে কৌতূহল কাজ করে, সেটিই যেন আমাকে জানালার সঙ্গে আটকে রাখল। মনে হচ্ছিল, এতদিন নামেই চেনা শহরটি ধীরে ধীরে নিজের চেহারা নিয়ে আমার সামনে খুলে যাচ্ছে। দেখতে দেখতেই এক সময় এসে পৌঁছালাম হোটেলে।
ভারতবর্ষ সত্যিই এক আশ্চর্য দেশ। আধুনিকতার কত ঢেউই তার গায়ে এসে লাগুক, হাজার বছরের সংস্কারের কিছু চিহ্ন এখনও তার দৈনন্দিন আচরণের গভীরে রয়ে গেছে। তারই একটি,‘অতিথি দেবো ভবঃ’। অতিথির মধ্যে দেবতাকে দেখার যে প্রাচীন ভারতীয় দর্শন, তার প্রকাশ শুধু ধর্মগ্রন্থে বা সংস্কৃত শ্লোকে নয়। কখনও কখনও একটি দরজা খুলে দেওয়ার ভঙ্গিতে, একটি নমস্কারে, কিংবা সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষের মুখের আন্তরিক হাসিতেও তার দেখা মেলে।
গাড়িটি হোটেলের প্রবেশদ্বারে থামতেই একজন হোটেল কর্মী এগিয়ে এসে দরজা খুলে দিলেন। আরেকজন ততক্ষণে লাগেজ নামানোর জন্য প্রস্তুত। আমাকে কিছু বলতেও হলো না। দু’হাত তুলে নমস্কার। মুখে স্বাগত জানানোর সহজ, উষ্ণ হাসি।
ছোট্ট ঘটনা। অথচ দীর্ঘ প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতায় এই ছোট ছোট আচরণই কখনও বড় হয়ে ধরা দেয়।
আমেরিকা ও ইউরোপের বহু ভালো হোটেলে থেকেছি। ম্যানহাটানে চারশো ডলার দিয়ে একটি রুম নিলেও কখনও রুমে এক বোতল পানীয় জল না-ও মিলতে পারে। অতিরিক্ত কিছু চাইলে তার মূল্যটিও বিলের অঙ্কে নিঃশব্দে যোগ হয়ে যায়। সেখানে আতিথেয়তা একটি অর্থনৈতিক সেবা ভারতে এসে কখনও কখনও মনে হয়, আতিথেয়তা এখনও শুধু পরিষেবা নয়। তার সঙ্গে মিশে আছে সম্ভ্রম, আন্তরিকতা এবং মানুষকে আপন করে নেওয়ার এক পুরোনো অভ্যাস।
অবশ্যই সব দেশ, সব হোটেল কিংবা সব মানুষের অভিজ্ঞতা এক নয়। তবু দীর্ঘদিন পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরে আমার মনে হয়েছে, ভারতীয় আতিথেয়তার একটি নিজস্ব ভাষা আছে। সেই ভাষার জন্য সব সময় শব্দেরও প্রয়োজন হয় না।
একটি খোলা দরজা।
দু’হাতের একটি নমস্কার। একটি হাসিমুখ।
সেই উষ্ণ অভ্যর্থনা সঙ্গে নিয়ে রিসেপশনের দিকে এগিয়ে গেলাম। আর ভেতরে ঢুকতেই চোখ আটকে গেল একটি বিশাল হরিণের মূর্তিতে। যেন হোটেলের আধুনিক অন্দর সজ্জার মাঝ খানে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে সে-ও আমাকে স্বাগত জানাচ্ছে।
রিসেপশনের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে হতে শরীর যেন মনে করিয়ে দিল দিনটা বেশ দীর্ঘ ছিল। হাতে রুমের কার্ডটি নিয়ে লিফটের দিকে এগোলাম। লিফট আমাকে নিয়ে উঠল দোতলায়। করিডোরটা শান্ত, প্রায় নিঃশব্দ। দুপাশে সারি সারি বন্ধ দরজা। প্রতিটি দরজার ওপাশে হয়তো একেকজন মানুষের একেকটি ভ্রমণ, একেকটি গল্প। চাকার মৃদু শব্দ তুলে আমার সুটকেসটিও সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে চলল।
নির্দিষ্ট দরজার সামনে এসে থামলাম। চাবি ছোঁয়াতেই ছোট্ট একটি শব্দ, তারপর দরজা খুলে গেল।
হোটেলের ঘরের দরজা খুলে প্রথমবার ভেতরে পা রাখার এই অনুভূতিটা পৃথিবীর প্রায় সব ভ্রমণকারীরই চেনা। কয়েক মুহূর্তের জন্য মানুষ যেন দরজার কাছেই একটু থমকে যায়। চোখ ঘুরে বেড়ায় ঘরের এদিক-ওদিক। সবকিছুই প্রস্তুত, পরিপাটি, অথচ কোনো কিছুতেই নিজের জীবনের চিহ্ন নেই।
ঘরটি আপনার নয়। বিছানাটি আপনার নয়। টেবিলের ওপর রাখা সুন্দর বাতিটিও নয়।
এমনকি জানালার ওপাশে যে শহর সন্ধ্যার আলোয় ধীরে ধীরে নিজেকে মেলে ধরছে, সেই শহরটিও আপনার নয়।
তবু কি আশ্চর্য, মানুষ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একটি অচেনা ঘরকে নিজের করে নিতে জানে।
সুটকেসটি এক কোণে রাখলাম। জুতো খুললাম। ফোন, মানিব্যাগ, চাবি এক এক করে টেবিলের ওপর জায়গা করে নিল। আর এই সামান্য কয়েকটি ব্যক্তিগত জিনিস ছড়িয়ে পড়তেই ঘরটির চেহারা যেন একটু বদলে গেল। কয়েক মিনিট আগেও যে ঘরটি ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত, সেটিই ধীরে ধীরে হয়ে উঠল আগামী কয়েক দিনের আমার সাময়িক ঠিকানা।
দরজার বাইরে রয়ে গেল করিডোর, লিফট, রিসেপশন, বিমানবন্দর, পথের ব্যস্ততা, সারাদিনের সমস্ত চলাচল। মনে হলো, সেদিনের মতো পথ বুঝি এখানেই এসে থামল।
আমি গিয়ে দাঁড়ালাম জানালার পাশে।
পর্দা সরাতেই সামনে খুলে গেল রায়পুরের আকাশ। সূর্য তখন দিনের শেষ আলোটুকু গুটিয়ে নেওয়ার আয়োজনে ব্যস্ত। আকাশ জুড়ে এক অদ্ভুত বিষণ্ণ সৌন্দর্য। দিন আর রাতের মাঝামাঝি সেই ক্ষণস্থায়ী সময়, যখন আলো চলে যাচ্ছে, অথচ অন্ধকারও পুরোপুরি এসে পৌঁছায়নি। দূরের বাড়িঘর, রাস্তা, গাছপালা সবকিছুর ওপর সন্ধ্যার নরম ছায়া নেমে আসছে। কোথাও কোথাও একটি-দুটি করে আলো জ্বলতে শুরু করেছে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম।
অচেনা শহরের জানালায় দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখার মধ্যে এক ধরনের নিঃসঙ্গ আনন্দ আছে। নিজের শহরে সূর্য ডুবে গেলে আমরা হয়তো খেয়ালও করি না। অথচ দূরের কোনো শহরে সেই একই সূর্যাস্ত হঠাৎ বড় ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে। মনে হয়, পরিচিত পৃথিবী থেকে এতটা পথ পেরিয়ে এসে দিনের শেষ আলোটুকু শুধু আমার জন্যই যেন এই অচেনা আকাশে অপেক্ষা করছিল।
রায়পুর তখনও আমার কাছে প্রায় অলিখিত একটি পৃষ্ঠা। শহরটির সঙ্গে আমার পরিচয় বলতে বিমানবন্দর থেকে হোটেল পর্যন্ত কুড়ি মিনিটের কিছু দৃশ্য। রাস্তার আলো, যানবাহন, মানুষের ব্যস্ততা, আর বিমানবন্দরের বাইরে হঠাৎ দেখা সেই মিউজিক শুটিংয়ের নাচ-গান। অথচ জানালার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, আগামী কয়েক দিনে এই সাদা পাতায় নিশ্চয়ই কিছু অক্ষর জমবে। কিছু মুখ, কিছু কথা, কিছু ঘটনা হয়তো ফিরে যাওয়ার পরও থেকে যাবে।
সূর্যের শেষ আভাটুকু মিলিয়ে আসছিল। পর্দা ছেড়ে এবার মন দিলাম আমার সাময়িক সংসারের দিকে।
ভ্রমণে হোটেলের ঘরে ঢুকে আমার আরেকটি ছোট্ট অভ্যাস আছে। ঘরটা একটু ঘুরে দেখা। যেন কয়েক দিনের জন্য পাওয়া নতুন ঠিকানাটির সঙ্গে পরিচিত হওয়া। বিছানা কেমন, বাথরুম কোথায়, আলমারিতে কি আছে, টেবিলের পাশে সকেট আছে কি না। এমন সব ছোটখাটো অনুসন্ধান। বিছানার ধারে বসে নরম গদিটা একবার পরখ করে নিলাম। তারপর চোখ গেল ছোট্ট ফ্রিজটার দিকে।
কৌতূহল বশত সেটাও খুললাম।
ভেতরের ঠাণ্ডা বাতাস মুখে এসে লাগল। কি আছে না আছে, একবার দেখে আবার দরজাটা বন্ধ করে দিলাম।
এবার সত্যিই মনে হলো—পৌঁছে গেছি। একটি শহরে পৌঁছানো আর সেই শহরে নিজের জন্য একটি ঘরের দরজা বন্ধ করার মধ্যে বোধহয় সূক্ষ্ম একটা পার্থক্য আছে। প্রথমটি কেবল গন্তব্যে পৌঁছানো; দ্বিতীয়টি সেখানে নিজের সামান্য একটি আশ্রয় খুঁজে পাওয়া।
রায়পুরের সেই অচেনা হোটেল ঘরটিও ততক্ষণে আর পুরোপুরি অচেনা রইল না।
পরদিন সকালে নাশতা করতে নিচে নেমে এলাম। আর সেখানেই, দিনের একেবারে শুরুতে, রায়পুর আমাকে দিল তার প্রথম ছোট্ট উপহার।
নাশতার আয়োজন বেশ ভালো। ভ্রমণের সকালে ভালো নাশতার মধ্যে একধরনের নির্ভার আনন্দ আছে। সামনে গোটা একটি দিন পড়ে থাকে। অথচ সেই দিনটি তখনও সম্পূর্ণ অজানা। কোথায় যাব, কি দেখব, কার সঙ্গে দেখা হবে, কোন ঘটনাটি দিনের শেষে স্মৃতি হয়ে সঙ্গে ফিরবে, কিছুই জানা নেই। এই অনিশ্চয়তাটুকুই বোধহয় ভ্রমণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
খাওয়া শেষ করে ভাবলাম, এবার ওঠা যাক। ঠিক সেই সময় এক তরুণী পরিবেশন কর্মী আমার টেবিলের দিকে এগিয়ে এলেন।
তাঁর হাতে ছোট্ট একটি কাচের পাত্র। তার মধ্যে সামান্য পানীয়।
আমি একটু অবাক হলাম। নাশতা তো শেষ! এ আবার কি?
তিনি মৃদু হেসে পাত্রটি আমার সামনে রাখলেন। তাঁর হাসিতে এমন একটা সহজ আন্তরিকতা ছিল যে আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। পাত্রটি হাতে নিয়ে একটু চেখে দেখলাম।
বাহ!
স্বাদটি চমৎকার। একেবারেই অপ্রত্যাশিত।
কি দিয়ে তৈরি, পানীয়টির নামই-বা কি, তখন আর জানা হলো না। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, তার স্বাদ যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি মনে থেকে গেল সেটি এগিয়ে দেওয়ার মুহূর্তটি।
ভ্রমণের স্মৃতির স্বভাবই বোধহয় এমন।
আমরা কত যত্ন করে বড় বড় স্থাপনার ছবি তুলে রাখি। বিখ্যাত সৌধের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ছবি বন্দি করি। দর্শনীয় স্থানের নাম লিখে রাখি ভ্রমণ দিনলিপিতে। ভাবি, এগুলোই বুঝি একদিন আমাদের ভ্রমণের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি হয়ে থাকবে।
কিন্তু বহু বছর পরে স্মৃতি যখন নিজের ইচ্ছেমতো পুরোনো দিনের পাতা ওলটায়, তখন তার আচরণ বড় অদ্ভুত। বিশাল প্রাসাদ কিংবা বিখ্যাত সৌধকে পাশ কাটিয়ে সে হঠাৎ তুলে আনে একেবারে সামান্য কোনো মুহূর্ত।
একটি হাসি। দু-একটি আন্তরিক কথা। পথ না-চেনা একজনকে কোনো অচেনা মানুষের এগিয়ে এসে সাহায্য করা। কিংবা নাশতা শেষ হয়ে যাওয়ার পর এক তরুণীর হাতে এগিয়ে দেওয়া ছোট্ট একটি কাচের পাত্র। তাঁর নাম আমি জানি না। সেই পানীয়টির নামও আজ আর বলতে পারব না। অথচ মুহূর্তটি থেকে গেল।
কেন? সম্ভবত আতিথেয়তার আসল অর্থ এখানেই।
আতিথেয়তা শুধু দামি আসবাব, ঝকঝকে মেঝে, সুসজ্জিত অভ্যর্থনা কক্ষ কিংবা নিখুঁত ব্যবস্থাপনার নাম নয়। আতিথেয়তা আসলে একটি অনুভূতি। যখন সম্পূর্ণ অচেনা কোনো মানুষ তাঁর সামান্য একটি আচরণ দিয়ে আপনাকে বুঝিয়ে দেন,
আপনি এখানে অতিথি, কিন্তু অপরিচিত নন।
রায়পুরে আমার প্রথম সকালটি আমাকে যেন সেই কথাটিই বলল। অথচ সামনে অপেক্ষা করছে আরও একটি বিশেষ দিন।‘লিটারেচার টাইম’-এর বই পুরস্কার অনুষ্ঠান। সেখানে আমাকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
আমন্ত্রণটি আমাকে আনন্দিত করেছে, সম্মানিতও করেছে। কিন্তু তার পাশাপাশি মনের মধ্যে একটি প্রশ্নও জাগিয়েছে, একজন লেখকের কাছে পুরস্কারের অর্থ আসলে কি? একটি স্মারক? একটি সনদ? মঞ্চের আলো? কয়েক মিনিটের করতালি?
আমার মনে হয়, পুরস্কার এর চেয়ে অনেক গভীর কিছু।
একজন লেখকের কাজের বড় অংশটাই ঘটে নিঃসঙ্গতায়। তিনি যখন লেখেন, তাঁর সামনে কোনো শ্রোতা থাকে না। কেউ করতালি দেয় না। একটি বাক্য মনের মতো হচ্ছে না বলে তিনি হয়তো দশবার লিখছেন, কাটছেন, আবার লিখছেন। একটি শব্দের জন্য থেমে থাকছেন। কখনো নিজের লেখা নিয়ে নিজেই সংশয়ে ভুগছেন। কখনো রাত গভীর হয়ে যাচ্ছে, অথচ একটি অনুচ্ছেদ তাঁকে ছাড়ছে না।
এই শ্রমের কোনো দর্শক নেই। তারপর একদিন সেই নিঃসঙ্গ ঘরে লেখা শব্দগুলো মলাটের ভেতর আশ্রয় নেয়। বই হয়ে পৌঁছে যায় অচেনা মানুষের হাতে।
কেউ পড়ে আনন্দ পান। কেউ দ্বিমত করেন। কেউ প্রশ্ন তোলেন। কেউ হয়তো একটি বাক্যের সামনে এসে দীর্ঘক্ষণ থেমে থাকেন। আবার কেউ সেই বইয়ের ভেতর দিয়ে নিজের জীবনকেই একটু অন্যভাবে দেখতে শেখেন।
লেখক হয়তো তার কিছুই জানতে পারেন না।
তারপর কোনো একদিন তাঁকে একটি মঞ্চে ডাকা হয়। আলো জ্বলে ওঠে। তাঁর হাতে একটি পুরস্কার তুলে দিয়ে যেন বলা হয়—আপনার লেখা আমরা পড়েছি। পুরস্কারের সবচেয়ে বড় অর্থ সম্ভবত এখানেই।
সেই কারণে রায়পুরে আমার এই সফর শুধু একটি নতুন শহর দেখার যাত্রা নয়। এ যেন বইয়ের আরও কাছে যাওয়ারও একটি যাত্রা। লেখক, পাঠক আর শব্দের মধ্যকার সেই অদৃশ্য সম্পর্ককে আরেকবার ছুঁয়ে দেখার সুযোগ।
নাশতার টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। বাইরে তখন রায়পুর অপেক্ষা করছে।
তার রাস্তা আছে, পুরোনো ইতিহাস আছে। নতুন শহরের ব্যস্ততা আছে। মন্দির আছে, জলাশয় আছে, বাজার আছে। পথের ধারের খাবারের গন্ধ আছে। আর আছে অসংখ্য মানুষের মুখ, যাদের প্রত্যেকের ভেতর হয়তো লুকিয়ে আছে একটি করে গল্প।
আমি তখনও তাদের প্রায় কিছুই দেখিনি। মনে হলো, ভালোই হয়েছে।
ভ্রমণের শুরুতেই যদি একটি শহর তার সমস্ত গল্প বলে দেয়, তাহলে ভ্রমণকারী বাকি পথটুকু যাবে কেন?
আমার হাতে কয়েকটি দিন। এই অল্প সময়ে আমি রায়পুরকে দেখব, যতটা দেখা যায়। কিন্তু শুধু দেখলেই কি একটি শহরকে জানা যায়? আমি বরং তাকে শোনারও চেষ্টা করব।
কারণ একটি শহরের ইতিহাস বইয়ে পাওয়া যায়, তার স্থাপত্য চোখে দেখা যায়, মানচিত্রে তার রাস্তা খুঁজে নেওয়া যায়। কিন্তু একটি শহরের আত্মাকে খুঁজতে হয় তার মানুষের কাছে। তাদের মুখে, কথায়, ব্যবহারে, খাবারে, হাসিতে, দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনায়।
আর রায়পুর? সে ইতিমধ্যেই তার গল্পের প্রথম বাক্যটি আমাকে শুনিয়ে দিয়েছে। কোনো ঐতিহাসিক সৌধের সামনে নয়।
কোনো বিখ্যাত স্থানে নয়। একটি হোটেলের নাশতার টেবিলে। এক অচেনা তরুণীর হাসিতে। আর ছোট্ট একটি কাচের পাত্রে রাখা অজানা এক স্বাদের ভেতর দিয়ে।
আমি তখনও জানি না, সামনের কয়েক দিনে এই শহর আমার জন্য আর কি কি গল্প জমিয়ে রেখেছে।
শুধু এটুকু মনে হচ্ছিল, রায়পুরের গল্প সবে শুরু হয়েছে।
আর বিলেত থেকে যে মানুষটি একটি অচেনা শহরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল, ফিরে যাওয়ার সময় সে হয়তো সঙ্গে শুধু কিছু ছবি, কয়েকটি বই কিংবা ভ্রমণের স্মৃতি নিয়ে ফিরবে না।
হয়তো রায়পুরের সামান্য কিছু অংশও তার সঙ্গে যাবে। আর নিজেরও সামান্য কিছু অংশ সে রেখে যাবে এই শহরে।
Read full book here: Click here to download the PDF file