তিন দিনের রায়পুর নামা /পর্ব ১: পথ যখন গল্প হয়ে ওঠে https://dailybanglapost.com/literature/58351
Summary:
ভ্রমণ কোথা থেকে শুরু হয়?
বিমান বন্দর থেকে? বিমানের আসন থেকে? নাকি তারও আগে, যখন ঘরের দরজাটা বন্ধ করে একবার পিছন ফিরে তাকাতে হয়? যে ঘরটিকে প্রতিদিন এত স্বাভাবিক বলে মনে হয়, ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে সেই ঘরটাই হঠাৎ বড় আপন হয়ে ওঠে।
ঘড়িতে ঠিক সাড়ে চারটা। ৮টায় ফ্লাইট। হিথ্রো টার্মিনাল ৩।
ছোট ছেলে আমার জন্য একটি ক্যাব বুক করে দিয়েছে। ব্যাগপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। স্ত্রী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। মুখে তেমন কিছু বলল না। কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হলো না, মনটা তার ভালো নেই। আমারও কোথায় যেন একটু খারাপ লাগছিল।
তবু মন খারাপের মধ্যেও তার প্রতিদিনের সেই পরিচিত যত্নটুকু ভুলল না।
“ঠিক ঠাক খাবার খেও কিন্তু। বাইরে বেরোলে সঙ্গে কিছু চকোলেট রেখো। সাবধানে থেকো। যেখানে-সেখানে কিছু খেয়ো না। আর ওষুধগুলো সময় মতো খেতে ভুলবে না। সাথে একটা জলের বোতল রাখবে। রাতে কেটলিতে সিদ্ধ করে রেখো। ইত্যাদি ইত্যাদি---”
আমি শুধু বললাম, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, সব মনে থাকবে।”
জানি না সত্যিই সব মনে থাকবে কি না। সম্ভবত সেও জানে, থাকবে না। তাই একটি কথা দুবার বলে, তার পর আরেকটি কথা মনে পড়লে সেটাও যোগ করে দেয়।
এত বছরের সংসারের পর ভালোবাসা বোধহয় আর সব সময় “ভালোবাসি” বলে প্রকাশ করতে হয় না। কখনও তা লুকিয়ে থাকে।“ওষুধটা সময়মতো খেয়ো”, “কিছু চকোলেট সঙ্গে রেখো”, কিংবা “বাইরে যা-তা খেয়ো না”, এই অতি সাধারণ কথাগুলোর মধ্যে।
ব্যাগ হাতে দরজার বাইরে পা রাখলাম। একবার পিছনে তাকালাম। সে তখনও দাঁড়িয়ে।
কয়েক দিনের জন্যই তো যাচ্ছি। তবু সেই মুহূর্তে মনে হলো, ভ্রমণে বেরোনোর সবচেয়ে কঠিন দূরত্বটি হয়তো হাজার হাজার মাইলের আকাশ পথ নয়।
সবচেয়ে কঠিন কয়েকটি পা। নিজের দরজা থেকে গাড়ি পর্যন্ত।
আমি ক্যাবে উঠে বসলাম। দরজা বন্ধ হলো। গাড়ি চলতে শুরু করল। জানালা দিয়ে একবার পিছনে তাকালাম। বাড়িটা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে গেল। তারপর চোখের আড়ালে।
আমার রায়পুর-যাত্রা বোধহয় ঠিক সেই মুহূর্তেই শুরু হলো। রায়পুরের পথে, আফগানিস্তানের গল্প।
গাড়ি কিছুদূর যেতেই চালক হঠাৎ বললেন,”সর স্যার। আমার একটু হে ফিভার হয়েছে।”
কথাটা শুনেই একটু ঘাবড়ে গেলাম। “এটা ছোঁয়াচে নয় তো? flu জাতীয়?”
তিনি হেসে আশ্বস্ত করলেন, “না, না। একেবারেই নয়। শুধু হে ফিভার।”
স্বস্তি পেলাম।
তারপর কথায় কথায় জানলাম, মানুষটি আফগানিস্তানের। প্রায় কুড়ি বছর আগে ব্রিটেনে এসেছেন।
একজন ভ্রমণ কারীর একটা সুবিধা আছে। পাশের মানুষটির সঙ্গে কথা বলতে জানলে পৃথিবী মাঝেমধ্যে নিজেই তার গল্পের দরজা খুলে দেয়। আমার চালকও খুলে দিলেন তাঁর জীবনের সেই দরজা।
কথা শুরু হয়েছিল হে ফিভার দিয়ে। কখন যে তা আফগানিস্তানে পৌঁছে গেল, টেরই পেলাম না।
তিনি বললেন তাঁর ফেলে আসা দেশের কথা। ড. নাজিবুল্লাহর সময়ের আফগানিস্তানের কথা তাঁর স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল। তারপর যুদ্ধ, বিদেশি শক্তির ভূমিকা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, তালেবানের উত্থান। একটির পর একটি প্রসঙ্গ আসতে লাগল। আমেরিকা ও ব্রিটেনের ভূমিকা নিয়ে তাঁর ক্ষোভও গোপন করলেন না। সেগুলো তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা, নিজের দেশের ইতিহাসকে দেখার তাঁর নিজস্ব দৃষ্টি।
কিন্তু একটি জায়গায় এসে তাঁর কণ্ঠস্বর যেন বদলে গেল। আফগানিস্তানের মেয়েদের কথা। তালেবান শাসনে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়ার কথা বলতে গিয়ে তাঁর মধ্যে ক্ষোভের চেয়ে দুঃখটাই যেন বেশি অনুভব করলাম।
আমি চুপ করে শুনছিলাম।
সামনের রাস্তা দিয়ে আমাদের গাড়ি বিমান বন্দরের দিকে ছুটছে, অথচ মনে হচ্ছিল আমি যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য অন্য একটি দেশ দিয়ে ভ্রমণ করছি। পাহাড় ঘেরা, যুদ্ধ বিধ্বস্ত, বহু ইতিহাসের সাক্ষী একটি আফগানিস্তান। লোকটির কথাবার্তা শুনে বেশ মুগ্ধ হলাম। সাধারণ একজন ক্যাব ড্রাইভার অথচ ইতিহাস, রাজনীতি এবং নিজের দেশের পরিবর্তন সম্পর্কে কি গভীর পর্যবেক্ষণ! তখনই আবার মনে হলো, মানুষকে আমরা কত সহজে তার পেশা দিয়ে চিনে ফেলি। ড্রাইভার, ওয়েটার, শিক্ষক, প্রফেসর, ডাক্তার, লেখক….
একটি শব্দের মধ্যে একটা গোটা মানুষকে আটকে ফেলি। অথচ একটু কথা বললেই দেখা যায়, প্রতিটি মানুষের ভেতরে আরেকটি দেশ আছে, আরেকটি ইতিহাস আছে, কখনও একটি গোটা উপন্যাস লুকিয়ে আছে।
বিমানবন্দর এসে গেল। ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিলাম। তিনি তাঁর গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন। আমি একটি ট্রলিতে সুইটকেস এবং ল্যাপটপের ব্যাগটি নিয়ে টার্মিনালের গেইট এর দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।
আমার সামনে দীর্ঘ পথ। বিলেত থেকে মুম্বাই। তারপর মুম্বাই থেকে রায়পুর। বহুবার ইন্ডিয়াতে গিয়েছি। প্রথম যাত্রা কলকাতায়। ১৯৮৭ সালে মস্কো যাওয়ার পথে।
আমার এবারের গন্তব্য রায়পুর, ছত্তিসগড়ের রাজধানী। কিন্তু রায়পুর এবার আমার কাছে ভারতের মানচিত্রে শুধু একটি শহরের নাম নয়। সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছে বই, লেখক, পাঠক এবং একটি বিশেষ উপলক্ষ। The Literature Times-এর আয়োজিত বই পুরস্কার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছি।
ভাবলাম, বইয়ের জন্য মানুষ কত পথই না যায়!
একসময় বই আমাকে নিয়ে গেছে এমন সব দেশে, যেখানে পৌঁছানোর জন্য পাসপোর্ট লাগেনি, ভিসা লাগেনি, বিমানের টিকেট-ও কাটতে হয়নি। ইমিগ্রাশন এর দীর্ঘ লাইন, সিকিউরিটির ঝামেলা কিংবা এক টার্মিনাল থেকে আরেক টার্মিনাল-এ ছুটে যাওয়ার তাড়া। শুধু একটি বই খুলেছি, আর মুহূর্তের মধ্যে আমার চারপাশের পরিচিত পৃথিবীটি সরে গিয়ে সামনে খুলে গেছে অন্য একটি দেশ, অন্য একটি শহর, অন্য একটি সময়, অন্য মানুষের জীবন।
বইয়ের হাত ধরেই প্রথম কত দেশ যে ঘুরেছি!
রাশিয়ায় পুশকিনের কবিতার জগৎ থেকে গোর্কির সাধারণ ও সংগ্রামী মানুষদের কাছে গিয়েছি। দস্তয়েভস্কির হাত ধরে নেমেছি মানুষের মনের এমন সব অন্ধকার গলিতে, যেখানে কোনো টুরিস্ট গাইড নিয়ে যেতে পারে না। তলস্তয়ের সঙ্গে কখনও পৌঁছে গেছি রাশিয়ার অভিজাত সমাজে, কখনও যুদ্ধক্ষেত্রে, আবার কখনও মানুষের জীবন, মৃত্যু, প্রেম আর নৈতিকতার গভীর প্রশ্নের সামনে।
ফ্রান্সকে চিনেছি ভিক্টর হুগো, বালজাক-র লেখায়। তাঁদের বইয়ের পাতায় কখনও প্যারিসের রাস্তায় হেঁটেছি, কখনও বিপ্লবের উত্তাপ অনুভব করেছি, কখনও মানুষের স্বাধীনতা, নিঃসঙ্গতা আর অস্তিত্বের প্রশ্ন নিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছি। জার্মানিতে পৌঁছেছি গ্যেটের হাত ধরে। তাঁদের লেখায় জার্মানি শুধু একটি ভূখণ্ড হয়ে থাকেনি। হয়ে উঠেছে মানুষের আত্ম-অনুসন্ধান, দর্শন, সংস্কৃতি এবং নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়ার এক বিশাল ক্ষেত্র।
ইংল্যান্ডকে তো কত ভাবেই দেখেছি! শেক্সপিয়র আমাকে রাজপ্রাসাদ থেকে যুদ্ধক্ষেত্র, প্রেম থেকে বিশ্বাসঘাতকতা, মানুষের মনের কত দরজাই না খুলে দিয়েছেন। চার্লস ডিকেন্সের সঙ্গে হেঁটেছি পুরনো লন্ডনের রাস্তায়। জেন অস্টিনের চোখ দিয়ে দেখেছি ইংরেজ সমাজের সম্পর্ক, শ্রেণি আর সূক্ষ্ম সামাজিক টানাপোড়েন।
আফ্রিকার পথও আমার কাছে প্রথম খুলেছে বইয়ের পাতায়। দক্ষিণ আফ্রিকাকে আরও গভীরভাবে অনুভব করেছি নেলসন ম্যান্ডেলার আত্মকথায়। কারাগারের অন্ধকারের মধ্যেও কীভাবে একজন মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে পারেন।
আর আমার নিজের ভারত?
ভারতকে চেনার জন্য তো কোনো একটি লেখক, একটি ভাষা কিংবা একটি বই যথেষ্ট নয়।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাংলার নদী, মাঠ, গ্রাম আর মানুষের কাছে গিয়েছি; শরৎচন্দ্রের চরিত্রদের মধ্যে খুঁজে পেয়েছি সমাজের বাঁধনের মধ্যে আটকে থাকা মানুষের প্রেম ও বেদনা। বিভূতিভূষণের সঙ্গে কখনও নিশ্চিন্দিপুরের পথ ধরে হেঁটেছি, কখনও অরণ্যের নিস্তব্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়ে গাছপালা, মাটি আর মানুষের সম্পর্ক নতুন করে অনুভব করেছি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে নদীর কাছে গিয়েছি, জেলেদের জীবন দেখেছি। আর সৈয়দ মুজতবা আলীর হাত ধরে বুঝেছি, ভ্রমণ মানে শুধু পাহাড়, নদী আর স্থাপত্য দেখা নয়, মানুষকে দেখা, তাদের কথা শোনা এবং হাসতে হাসতে একটি দেশের অন্তরে ঢুকে পড়া।
তাই আমার জীবনের প্রথম পৃথিবী-ভ্রমণ হয়েছিল বইয়ের পাতায়।
বই শুধু বলেছে:
“পাতাটি উল্টে দাও। এসো, এবার আরেকটি দেশ দেখা যাক।”
আজ ব্যাপারটা যেন উল্টো।
এতদিন বই আমাকে পৃথিবীর কাছে নিয়ে গেছে। আর এবার সেই বই-ই আমাকে সত্যিকারের সুইটকেস গুছিয়ে, পাসপোর্ট হাতে নিয়ে, হাজার হাজার মাইল আকাশ পেরিয়ে বিলেত থেকে রায়পুরে নিয়ে যাচ্ছে।
টার্মিনাল-এর দরজার সামনে এসে আর একবার পিছনে তাকালাম। সেই ক্যাব-টি তখন আর কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
সামনে এয়ারপোর্ট। তার ওপারে আকাশ। তারপর মুম্বাই। তারপর রায়পুর। তখনও জানতাম না, আমার রায়পুরের গল্প শুরু হওয়ার আগেই পথ আমাকে প্রথম গল্পটি দিয়ে দিয়েছে।
সেটি রায়পুরের গল্প নয়। সেটি একজন আফগান চালকের গল্প।
আর হয়তো ভ্রমণের আসল সৌন্দর্য এখানেই। আপনি একটি শহরের উদ্দেশে বের হন, কিন্তু পথ আপনাকে আরও কত মানুষের, কত দেশের, কত অজানা গল্পের কাছে নিয়ে যায়।
আকাশের কোনো দেশ নেই। দীর্ঘ বিমান যাত্রার একটি অদ্ভুত ব্যাপার আছে। বিমান যখন অনেক ওপরে উঠে যায়, তখন নিচের পৃথিবীর সীমারেখাগুলো আর দেখা যায় না। কোন খানে ইংল্যান্ড শেষ হলো, কোন খানে অন্য দেশ শুরু হলো আকাশ তার কোনো হিসাব রাখে না।
মানুষ নিচে নেমেই আবার পাসপোর্ট খোঁজে, ইমিগ্রাশনের-এর লাইনে দাঁড়ায়, ইমিগাশন ফরম পূরণ করে। আকাশ বোধহয় এসব দেখে মৃদু হাসে।
মেঘের ওপর দিয়ে উড়তে উড়তে ভাবছিলাম, আমি যাচ্ছি একটি সাহিত্য পুরস্কারের অনুষ্ঠানে। কত অদ্ভুত বস্তু এই বই! কয়েকশো কাগজের পাতা, কিছু কালো অক্ষর; অথচ সেই অক্ষরই কখনও একজন মানুষকে হাজার হাজার মাইল দূরে নিয়ে যায়। আমাকেও নিয়ে চলেছে।
মুম্বাই। গন্তব্য নয়, কিন্তু গল্পের অংশ ভারতের মাটিতে প্রথম বিরতি মুম্বাই। এই শহরে আগেও এসেছি বহুবার। তাই মুম্বাই আমার কাছে কেবল যাত্রাপথের একটি শহর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু স্মৃতি, বহু মুখ, বহু গল্প।
কতবার এসেছি আমার এক প্রিয় বন্ধু মার্ক থমাস জোনস-কে সাথে নিয়ে। আজ তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই। সময় মানুষকে নিয়ে যায়, কিন্তু কিছু মানুষ থেকে যান শহরের রাস্তায়, পরিচিত জায়গায়, পুরোনো কথোপকথনে। স্মৃতির ভেতর। মুম্বাইয়ে ফিরে এলে তাই কোথাও যেন তাঁর উপস্থিতিও অনুভব করি।
প্রতিটি সফরই মুম্বাইকে নতুন করে দেখিয়েছে। এখানে আসলেই প্রফেসর শ্রীনিভাসনের কথা মনে হয়। আসার পথে মুম্বাইতে এক রাত্র থাকবো। তখন ওকে হোটেলে আসতে বলবো।
আর মুম্বাইকে যতবার দেখি, ততবারই বিস্মিত হই এই শহরের প্রবল বৈপরীত্যে। একদিকে আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকা, বিপুল সম্পদ, চাকচিক্য ও স্বপ্নের দৌড়। অন্যদিকে তার প্রায় পাশেই বস্তির ঘিঞ্জি জীবন, প্রতিদিনের সংগ্রাম এবং বেঁচে থাকার নিরন্তর চেষ্টা। একই শহর। একই আকাশ। অথচ কত ভিন্ন জীবন।
হয়তো এই বৈপরীত্যের মধ্যেই মুম্বাইয়ের আসল স্পন্দন। সম্পদ ও সংগ্রাম, স্বপ্ন ও বাস্তবতা, প্রাপ্তি ও বঞ্চনা পাশাপাশি চলেছে অবিরাম।
এবারও মুম্বাই আমার গন্তব্য নয়। তবু গল্পের শুরুটা এখান থেকেই।
আন্তর্জাতিক বিমান যাত্রার দীর্ঘ পর্ব শেষ হয়েছে, কিন্তু আমার গন্তব্য রায়পুর তখনও বেশ কিছুটা দূরে। মুম্বাইয়ের মাটিতে পা রেখেছি ঠিকই, অথচ যাত্রার শেষ রেখা তখনও দিগন্তের ওপারে।
বিমান থেকে নেমে লাগেজ সংগ্রহ করলাম। সঙ্গে ছিল সুবাস, দীর্ঘ বিমান যাত্রায় পাশের আসনের সহযাত্রী, অথচ কয়েক ঘণ্টার আলাপচারিতায় সে আর একেবারে অপরিচিত নয়।
সুবাস যাচ্ছে তার বাড়ি, হায়দারাবাদে। সেখানে থাকবে প্রায় দেড় মাস। এখন তার বস বাস লন্ডনে। পড়াশোনা শেষ করে সেখানেই একটি চাকরিতে যোগ দিয়েছে। কথায় কথায় জানলাম, তার একমাত্র বোন থাকে আমেরিকায়। ভাইয়ের দেশে ফেরার সময়টুকুকে আরও আনন্দময় করে তুলতে সেও এসে পৌঁছেছে ভারতে। দীর্ঘ প্রবাসের পর পরিবারের কাছে ফেরার মধ্যে যে এক অদ্ভুত উষ্ণতা আছে, সুবাসের কথায় যেন তারই আভাস পাচ্ছিলাম।
লাগেজ হাতে এবার আমার পরবর্তী অভিযান টার্মিনাল ২ থেকে টার্মিনাল ১।
শুনতে ব্যাপারটা নিতান্তই সহজ।
টার্মিনাল ২ থেকে টার্মিনাল ১।
মাত্র দুটি শব্দ, দুটি সংখ্যা। কাগজে লিখলে কয়েক সেন্টিমিটারের দূরত্বও নয়। কিন্তু কাঁধে-হাতে লাগেজ, শরীরে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক উড়ানের ক্লান্তি, আর দেহের অদৃশ্য ঘড়িটি যখন তখনও বিলেতের সময়কে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে। তখন ওই ‘২’ আর ‘১’-এর মধ্যবর্তী দূরত্বটুকুও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
টার্মিনাল বদলাতে শাটল বাস ধরতে হলো।
ব্যাগপত্র সামলে বাসে উঠে বসলাম। চারদিকে নানা গন্তব্যের মানুষ। একটি ছোট্ট চলমান পৃথিবী যেন। কারও চোখে দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি, কারও চোখে পরবর্তী ফ্লাইট ধরার তাড়া। কেউ মোবাইল ফোনের পর্দায় ডুবে আছে, হয়তো বাড়িতে খবর দিচ্ছে, ‘পৌঁছে গেছি’, কেউ আবার নিশ্চিন্তে জানালার বাইরে তাকিয়ে।
প্রতিটি মুখের পেছনেই একটি করে অদৃশ্য গল্প।
কেউ ফিরছে ঘরে, কেউ ঘর ছেড়ে যাচ্ছে। কেউ প্রিয়জনের দিকে এগিয়ে চলেছে, কেউ হয়তো প্রিয়জনকে পেছনে ফেলে এসেছে।
আর আমি?
আমি চলেছি রায়পুরের দিকে।
টার্মিনাল-১-এ পৌঁছে আবার আনুষ্ঠানিকতা। আবার সিকিউরিটি, অপেক্ষা। ২৭নম্বর গেইট, বোর্ডিং তারপর IndiGo-র বিমান রায়পুরের দিকে। এবার যেন যাত্রার শেষ অধ্যায়।
অথচ পরে বুঝলাম, এটা শেষ অধ্যায় নয়। এখান থেকেই আসল গল্পের শুরু।
চলবে……
Read full book here: Click here to download the PDF file