Summary:
পর্ব ২: শিখাইয়া দিলেই পারমু
এদিকে আশুলিয়ার নয়ার হাটের পাল পাড়া।
এক সরু গলির শেষে টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট একটি ঘর। বৃষ্টির রাতে টিনের চালে টুপটাপ শব্দে কথার আওয়াজ শুনা যায় না। আর রোদ উঠলে ঘরটা চুল্লির মতো গরম হয়ে ওঠে। ঘরের এক কোণে পুরোনো সেলাই মেশিন, অন্য কোণে একটি পুরনো টেবিলের উপর ঈশিতার মায়ের ওষুধের শিশি।
এই পাল পাড়ার মানুষগুলো বাপ-দাদার আমল থেকেই মাটির হাঁড়ি, পাতিল আর নানা রকম মাটির জিনিস বানিয়ে আসছে। একসময় এই কাজ করেই তাদের সংসার চলত। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। মাটির জিনিস বিক্রি করে তেমন আয় হয় না। বাজার ভরে গেছে প্লাস্টিকের বাসন-কোসনে, তাই মাটির জিনিসের কদরও অনেক কমে গেছে।
তাই ঈশিতার বাবা হরিদাস পাল বহু বছর আগেই গার্মেন্টসে কাজ ধরেছেন। আজ তাও গেল। হঠাৎ ফ্যাক্টরি বন্ধ। বকেয়া বেতন আটকে গেছে। প্রতিদিন সকালে এখনও বের হন কাজের খোঁজে, কিন্তু বিকেলে ফিরেন শূন্য হাতে।
মা শিলা পাল দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। ডাক্তারের কাগজে ওষুধের তালিকা লম্বা, কিন্তু ফার্মেসির কাউন্টারে দাঁড়ালে টাকাটা ছোট হয়ে যায়।
সেদিন বিকেলে মায়ের ওষুধ কিনতে পাশের `বিকাশ ফার্মেসি`তে গিয়েছিল ঈশিতা। প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে দোকানদার ক্যালকুলেটরে হিসাব করে বলল,“সব মিলাইয়া এক হাজার একশো পঞ্চাশ টাকা।”
ঈশিতা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতে ছিল মাত্র আটশো টাকা। কিছুক্ষণ প্রেসক্রিপশনের দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে বলল,
“দাদা, সবচেয়ে জরুরি ওষুধডা দেন। বাকিগুলা পরে নিমু।”
দোকানদার অভ্যস্ত চোখে তার দিকে তাকাল। এমন দৃশ্য সে প্রায়ই দেখে। কয়েকটি ওষুধ এগিয়ে দিল।
ওষুধের ছোট প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ঈশিতার বুকটা ভারী হয়ে উঠল। কিন্তু মুখের হাসিটা সে হারাতে দিল না। ঘরে ঢুকেই দেখল বাবা বারান্দায় চুপচাপ বসে আছেন। সামনে ভাতের থালা, কিন্তু খাওয়া হয়নি। ভাত প্রায় ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।
“খাও নাই ক্যান বাবা?”
হরিদাস পাল মৃদু হেসে বললেন,
“ক্ষুধা নাই রে মা।”
ঈশিতা বুঝল, কথাটা সত্যি না। ঘরে চাল আছে অল্প, তরকারি প্রায় শেষ। বাবা হয়তো ভেবেছেন, তিনি খেলে কাল সকালের জন্য কম পড়ে যাবে।
সেদিন রাতে ঘুমাতে গিয়ে অনেকক্ষণ টিনের ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিল ঈশিতা। টিনের চালের ওপর টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ পড়ছিল। পাশের খাটে মা কাশছিলেন। বাবা এপাশ-ওপাশ নির্ঘুম মানুষের মতো।
ঈশিতা ধীরে চোখ বন্ধ করল। তারপর নিজের মনকেই বলল,
“না, আর বইসা থাইকলে চইলব না। যে কোনো কাজ আমার লাগব। এই সংসারডারে আমি ভাঙতে দিমু না।”সেই রাতেই সে সিদ্ধান্ত নিল। পরদিন থেকে নতুন করে কাজ খুঁজবে।
এই পরিবারের একমাত্র মেয়ে ঈশিতা পাল। গ্রামের বাতাসে বড় হওয়া এক চঞ্চল প্রাণ। মুখে সারাক্ষণ হাসি লেগে থাকে, যেন দুঃখ তার কাছে আসতে লজ্জা পায়। কথা বলতে শুরু করলে থামতে চায় না। নদীর জলের মতো টলমল করে তার কথা। আর সব কথাই আসে সরাসরি মন থেকে। সত্য ছাড় মিথ্যা সে বলতে পারে না। তার চোখে সরল স্বপ্ন, অথচ ভেতরে লুকিয়ে আছে অদম্য সাহস।
সদ্য এসএসসি পাস করেই বাবার কাঁধের ভার কমাতে সে গার্মেন্টসে কাজ নিয়েছিল। ভোর ছ’টায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাত ন’টায় ফেরা। দিনের পর দিন। ঘামে ভেজা শালোয়ার-কামিজ, ক্লান্ত শরীর, তবু চোখে আশার দীপ্তি। সহকর্মীরা যখন হাঁপিয়ে উঠত, ঈশিতা তখনও হেসে বলত,
“এই যে আমরা রোজ সুঁই-সুতা লইয়া কাপড় সেলাই করি, একদিন দেহো না, আমরাও নিজের স্বপ্নগুলান সেলাই করুম। ছিঁড়া আশা জোড়া লাগামু। মন খারাপের জায়গায় রঙিন সুখের প্যাচ বসামু। আইজ কষ্ট আছে বইলা কি হইছে? ভগবান চাইলে একদিন এই হাতেই নিজের ভাগ্যের জামাডা সেলাই কইরা পরমু।!”
কিন্তু ভাগ্য যেন হঠাৎ সূতো ছিঁড়ে দিল।
একদিন সুপারভাইজার ডেকে বলল, “অর্ডার কমেছে… আমাদের লোক কমাতে হবে।”
কথাটা ছিল ছোট, কিন্তু আঘাতটা বড়।
সেদিন বাড়ি ফিরে ঈশিতা চুপ ছিল অস্বাভাবিকভাবে। ঘরের নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। বাবা হরিদাস পালের কপালে চিন্তার ভাঁজ, আর মেয়ের মুখে জোর করে টানা হাসি।
কয়েকদিন পর এক সকালে পাড়ার দোকানে ঝোলানো পুরোনো সংবাদপত্রে তার চোখ আটকে গেল। একটি ছোট বিজ্ঞাপন।
“অসুস্থ ব্যক্তির সার্বক্ষণিক দেখাশোনার জন্য নারী কেয়ারগিভার/ব্যক্তিগত সহকারী প্রয়োজন। শিক্ষাগত যোগ্যতা ন্যূনতম এসএসসি হতে হবে। সততা, ধৈর্য, দায়িত্ববোধ ও আন্তরিকতা আবশ্যক। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।“
নিচে বড় অক্ষরে লেখা: সেন গ্রুপ, যোগাযোগের জন্য একটি ফোন নম্বর।
ঈশিতার চোখে যেন হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল। কাগজটা ছিঁড়ে নিয়ে সে দৌড়ে বাড়ি এলো।
“ বাবা, আমি চেষ্টা কইরা দেহি?
হরিদাস দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“ওরা বড়লোক মানুষ রে মা… আমাদের মতো মাইয়াকে নিবে?”
ঈশিতা একটু থামল। তার স্বভাবসুলভ চঞ্চলতা সেই মুহূর্তে স্থির হলো। শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
“ বাবা, আমার এই সৎ মনডাই আমার আসল পরিচয়। মানুষ বড় না ছোট, কামই মানুষরে চিনায়।”
ইন্টারভিউয়ের দিন সে তার সবচেয়ে প্রিয় সালোয়ার-কামিজটি পরল।পূজোর সময় কেনা। লম্বা কালো চুল খোঁপা করে বাঁধল। মুখে হালকা পাউডার। আয়নায় নিজেকে দেখে মুচকি হেসে বলল,” চল ঈশিতা, ডর পাইলে কি চলব?”
সকালে বের হওয়ার সময় আকাশ পরিষ্কার ছিল। কিন্তু ঢাকার পথে আসতেই হঠাৎ কালো মেঘ জমে গেল। কিছুদূর আসার পরই শুরু হলো ঝুপ বৃষ্টি। ঈশিতা বাসের জানালার পাশে বসে বারবার ঘড়ি দেখছিল।
"হায় ভগবান, দেরি হইয়া যাইব না তো?"
ঠিক তখনই বাসটা ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল। ড্রাইভার নেমে দেখে এসে ঘোষণা দিল,
"বাস আর যাইব না। ইঞ্জিনে সমস্যা।"
যাত্রীদের মধ্যে হইচই পড়ে গেল। ঈশিতার বুক ধক করে উঠল। সে ভিজতে ভিজতেই নেমে পড়ল। হাতে শুধু একটা ছোট ব্যাগ। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অনেক কষ্টে আরেকটা বাস পেল। ততক্ষণে সালোয়ার-কামিজের নিচের অংশ ভিজে গেছে।
গুলশানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে নির্ধারিত সময় প্রায় পেরিয়ে গেছে। সেন বাড়ির বিশাল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইল। এত বড় বাড়ি সে জীবনে দেখেনি।
মাথায় রাজকীয় টুপি আর ইউনিফর্ম পরা দারোয়ান তার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
"কোথায় যাবেন?"
"ইন্টারভিউ দিতে আইছি।"
দারোয়ান অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
"ইন্টারভিউ?"
তার দৃষ্টি একবার ঈশিতার ভেজা কাপড়ের দিকে গেল, একবার পায়ের স্যান্ডেলের দিকে।
"কোন ইন্টারভিউ?"
ঈশিতা ব্যাগ থেকে যত্ন করে ভাঁজ করা সংবাদপত্রের কাটিং বের করে দেখাল।
"এইডার জন্য।"
দারোয়ান কাগজটা দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
"আপনি নিশ্চিত?"
প্রশ্নটা শুনে ঈশিতার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, হয়তো সত্যিই এই জায়গাটা তার জন্য না।
কিন্তু পরীক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল।
মুখে ছোট্ট একটা হাসি এনে বলল,
“চেষ্টা করতে তো দোষ নাই, তাই না? চাকরিডা পাইমু কি না, হেইডা ভগবানই জানে। কিন্তু চেষ্টা না কইরা ফিরা আইলে নিজের কাছেই লজ্জা লাগব। মনে হইব, সুযোগ আছিল, তয় বুক কইরা একবারও আগাইয়া যাইতে পারলাম না। তাই একবার চেষ্টা কইরা দেহি, ভাগ্যে যা লিখা আছে, হেইডাই হইব।"
দারোয়ান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মুখ নরম হয়ে গেল।
"ঠিক আছে। ভেতরে যান। রিসেপশনে নাম বলবেন।"
ঈশিতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে মনে মনে বলল,
"ভগবান, এই পর্যন্ত আনছেন যখন, বাকিটাও তুমি দেখো।"
তারপর মাথা উঁচু করে সে এগিয়ে গেল সেই দরজার দিকে, যেটা হয়তো তার জীবনের গতিপথ বদলে দিতে চলেছে।
অন্যদিকে অরিন্দম। দুর্ঘটনার পর অনেকটাই সুস্থ হলেও এখনো স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে না। ঘাড় নাড়াতে পারে না। সারাক্ষণ বিছানায় ঘাড় উঁচু করে শুয়ে থাকতে হয়। খাওয়ানো থেকে শুরু করে দৈনন্দিন সব কাজেই অন্যের সাহায্য লাগে। হুইলচেয়ারে বসেও তাকে সোজা করে ধরে রাখতে হয়। মাঝে মাঝে তীব্র মাথাব্যথা, হঠাৎ রাগ, আবার হঠাৎ দীর্ঘ নীরবতা।
এক সময়ের দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী মানুষটি এখন নিজের ভেতরেই নতুন করে নিজেকে চিনতে শিখছে।
ইন্টারভিউ রুমে সে হুইল বেডে শুয়ে ছিল, ঘাড় উঁচু করে। পাশে মা সুলেখা সেন। শান্ত, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছেন।
ঈশিতা ঘরে ঢুকতেই তার স্বভাব সুলভ হাসি মুখে ফুটে উঠল। কিন্তু কেন জানি ইন্টারভিউ রুমে ঢোকার পর প্রথমবারের মতো ঈশিতার বুকটা সত্যিই কেঁপে উঠল। এত বড় ঘর, এত দামি আসবাব, এত গম্ভীর পরিবেশ, সব মিলিয়ে তার গলা শুকিয়ে আসছিল।হাতের আঙুলগুলো অজান্তেই একসঙ্গে চেপে ধরল সে।
সুলেখা সেন বিষয়টা লক্ষ করলেন। মৃদু হেসে বললেন,
"তুমি কি নার্ভাস?"
ঈশিতা প্রথমে একটু লজ্জা পেল। তারপর মাথা চুলকে হেসে বলল,
"সত্যি কইতে কি আন্টি, আমি খুব ভয় পাইতেছিলাম।"
সুলেখার চোখে মমতা ফুটে উঠল।
"তবু এসেছো?"
ঈশিতা এবার একটু জোরে হেসে ফেলল।
"ভয় পাইলে তো পেট ভরব না আন্টি।"
ঘরের কয়েকজনের মুখেই হাসি ফুটে উঠল।
ঈশিতা আবার বলল,
"গেইটের সামনে দাঁড়াইয়া তো মনে হইতাছিল, ভুল জায়গায় আইসা পড়ছি। তারপর ভাবলাম, সর্বোচ্চ কী হইব? চাকরি দিব না। তাই বইলা চেষ্টা না কইরা ফিরা গেলে পরে নিজের কাছেই খারাপ লাগব।"
কথাগুলো বলার সময় তার চোখে ভয় ছিল, কিন্তু সেই ভয়কে হার মানানো একরাশ সাহসও ছিল।
অরিন্দম প্রথমবারের মতো মেয়েটার দিকে একটু মন দিয়ে তাকাল।
অরিন্দম প্রথম প্রশ্ন করল:
“তুমি… এই কাজটা কেন চাও?”
ঈশিতা এক মুহূর্তও দেরি করল না। হালকা হেসে বলল:
“স্যার, টাহা তো লাগবই, পেট তো সবারই আছে। তয় শুধু টাহার লাইগা আমি এই কামে আই নাই। আমার মন চায় মানুষের উপকারে লাগতে। কারও বিপদের দিনে যদি দুইডা ভালো কথা কইতে পারি, কারও মুখে যদি একচিলতে হাসি আনতে পারি, তাইলেই মনে করমু জীবনডা বৃথা যায় নাই। মানুষ যদি ভরসা কইরা কইতে পারে, 'ঈশিতা আছে তো'—ওই ডাই আমার সবচেয়ে বড় সম্মান।”
তারপর একটু হেসে, একটানা বলে যায়—
“ওইডার দামের লগে কোনো কিছুর তুলনা হয় নাকি স্যার?”
তার গলাটা ছিল একেবারে পরিষ্কার নদীর জলের মতো, স্বচ্ছ, মায়া ভরা। কথাগুলো বেরোচ্ছিল একদম ভেতর থেকে, বানানো কিছু না। সেই সরল হাসিটা যেন চারপাশের ভারী পরিবেশটাকেও হালকা করে দিচ্ছিল।
অরিন্দম একটু গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তুমি জানো আমি কেমন অবস্থায় আছি?”
ঈশিতা এক সেকেন্ড চুপ করে রইল, তারপর চোখ টিপে হেসে বলল,
“ অবস্থা-টবস্থা এত বুঝি না স্যার। আমার কাছে মানুষডা কেমন, ওইডাই আসল কথা। মনডা ভালো থাকলে কুঁড়েঘরেও সুখ লাগে, আর মন খারাপ থাকলে বড় বড় বাড়িঘরও ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তাই না স্যার? আপনি এত ভাবেন ক্যান? বেশি ভাবতে গিয়া আবার ঠকা খাইয়া যাইবেন কিন্তু!"
অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, "এই কাজটা সহজ না।"
ঈশিতা মাথা নেড়ে বলল,"জানি স্যার।"
অরিন্দমের ঠোঁটের কোণে তিক্ত একটা হাসি ফুটে উঠল।
"না, তুমি জানো না।"
ঘরের পরিবেশ হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
"প্রথম কয়েকদিন সবারই অনেক উৎসাহ থাকে। সবাই ভাবে, পারবে। তারপর যখন বাস্তবতা সামনে আসে, তখন একে একে চলে যায়।"
ঈশিতা চুপ করে শুনছিল।
অরিন্দম আবার বলল,
"আমার খাওয়া থেকে শুরু করে ঘুম, ওষুধ, থেরাপি, সবকিছুর জন্য অন্যের সাহায্য লাগে। মাঝরাতে ডাকতে হতে পারে। কখনো আমি রেগে যাই। কখনো কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে না।"
সে এক মুহূর্ত থামল। তারপর ঈশিতার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
"দুদিন পর পালিয়ে যাবে না তো?"
প্রশ্নটা শুনে ঈশিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। প্রথমবারের মতো তার মুখের হাসিটা একটু ম্লান হলো। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
"পালাইয়া গেলে তো আইতামই না স্যার।"
ঘরে নীরবতা নেমে এলো। ঈশিতা ধীরে ধীরে বলতে লাগল,
"আমার মা অসুস্থ। ছোটবেলা থেইকা কত রাত জাইগা তার সেবা করছি, তার হিসাব নাই। জ্বর হইছে, হাসপাতালে নিছি। ওষুধ খাওয়াইছি। কষ্টের মানুষ দেইখা আমি ভয় পাই না স্যার।"
অরিন্দম স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। ঈশিতা এবার হালকা হেসে বলল,
"আর একটা কথা কই?"
"বলো।"
"মানুষ যখন খুব কষ্ট পায়, তখন রাগ করে। এইডা আমি বুঝি।"
সে একটু ইতস্তত করে যোগ করল,
"আপনে যদি রাগ করেন, আমি মনে করমু আপনের মনডা ব্যথা পাইছে। তাই বইলা আমি পালামু না।"
কথাগুলো বলার পর সে মাথা নিচু করে ফেলল। মনে হচ্ছিল, হয়তো বেশি কিছু বলে ফেলেছে।
কিন্তু অরিন্দমের ভেতরে যেন কোথাও একটা অদ্ভুত আলোড়ন উঠল। দুর্ঘটনার পর থেকে অনেক মানুষ তার শরীরের অবস্থা দেখেছে। অনেক মানুষ তার প্রতি করুণা দেখিয়েছে। কিন্তু এই মেয়েটা প্রথম মানুষ, যে তার রাগের পেছনের কষ্টটা দেখতে চেষ্টা করছে।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না। তারপর অরিন্দম খুব ধীরে বলল,
"তোমার সাহস আছে।"
ঈশিতা সঙ্গে সঙ্গে হেসে ফেলল।
"সাহস না স্যার। গরিব মানুষরে একটু সাহসী হইতেই হয়। ডর পাইলে তো সংসার চলে না।"
ঘরের ভারী পরিবেশে অজান্তেই একফোঁটা উষ্ণতা এসে পড়ল।
অরিন্দম প্রথম বার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল। সেখানে একটু ভয় ছিল। অচেনা জায়গা, অচেনা মানুষ। কিন্তু সেই ভয়কে ছাপিয়ে উঠেছিল একরাশ সাহস আর অদ্ভুত দৃঢ়তা। মেয়েটাকে অদ্ভুত মনে হলো।
অরিন্দমের মা ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমার পরিবার?”
ঈশিতা এক নিঃশ্বাসে সব বলতে শুরু করল।
"এহন সময়ডা ভালো যাইতাছে না আন্টি। বাবার কাম নাই, মাও অসুস্থ, আর আমার চাকরিডাও গেল। তয় এইডা লইয়া সারাদিন কান্দলে তো কিছু বদলাইব না। মনডারে শক্ত কইরা আবার শুরু করন লাগব। কষ্ট আইছে, একদিন চইলাও যাইব। তাই ভাবি, যতক্ষণ হাত-পা ভালো আছে, ততক্ষণ চেষ্টা ছাইড়া দিলে চলব ক্যান?"
তার গলায় অভিযোগ ছিল না, করুণাও না। শুধু সহজ স্বীকারোক্তি।শেষে হেসে বলল,
“ শিখাইয়া দিলেই পারমু। আমি কিন্তু খুব জলদি শিখা লই। আর হ, কথা একটু বেশি কই। এইডা আমার দোষ না, স্বভাব! এই লইয়া আমার হগল সময় বকা বাইদ্য করে। তাই আগে থেইকাই সাবধান কইরা দিলাম!"
সেদিন অরিন্দম হঠাৎ টের পেল, এতদিন তার চারপাশে যারা ছিল, তারা ছিল তার ক্ষমতা, তার অবস্থান, তার টাকার জন্য। এই মেয়েটি এসেছে প্রয়োজন নিয়ে ঠিকই, কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। তার চোখে ভিক্ষে নেই, আছে সম্মান।
ইন্টারভিউ শেষ হওয়ার পর বেরিয়ে এসে ঈশিতা মনে মনে ভাবছিল,
“হইব না বোধহয়... এত বড় বাড়ি, এত পড়ালেখা জানা মানুষজন। আমি তো গেরামের মাইয়া, এইহানে কেমনে মানামু?"
ঈশিতা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো। সুলেখা সেন মৃদু হাসলেন।
"মেয়েটা খুব সরল।"
অরিন্দম কোনো উত্তর দিল না। সে যেন এখনও ঈশিতার কথাগুলো ভাবছিল। ঠিক তখনই পাশে বসে থাকা অফিস ম্যানেজার মাহবুব রহমান ফাইলটা বন্ধ করে বললেন,
"স্যার, একটা কথা বলি?"
"বলুন।"
"মেয়েটা ভালো। কিন্তু এই পদের জন্য কি ও খুব বেশি অযোগ্য নয়?"
মাহবুব রহমান ফাইলটা টেবিলের ওপর রেখে একটু সামনের দিকে ঝুঁকলেন। "স্যার, আমি শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা বলছি না।"
অরিন্দম শান্ত চোখে তার দিকে তাকাল।
"তাহলে?"
"আপনার অবস্থা সাধারণ রোগীর মতো না।"
ঘরের পরিবেশ আবার গম্ভীর হয়ে উঠল। মাহবুব ধীরে ধীরে বললেন,
"মাঝরাতে আপনার মাথাব্যথা শুরু হতে পারে। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট হতে পারে। থেরাপির সময় বিশেষ সতর্কতা লাগে। ওষুধের সময়সূচি আছে। জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, সেটাও জানতে হয়।"
তিনি এক মুহূর্ত থামলেন।
"স্যার, ভুল হলে আপনার চিকিৎসার ঝুঁকি থাকবে।"
কথাটা শুনে ঘরে নীরবতা নেমে এলো। আরেকজন কর্মকর্তা বললেন,
"আমারও তাই মনে হচ্ছে। মেয়েটা ভালো। কিন্তু ভালো মানুষ হওয়া আর এই দায়িত্ব পালন করা এক জিনিস না।"
সুলেখা সেনও এবার চিন্তিত মুখে চুপ করে রইলেন।
অরিন্দম কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,
"আপনি ঠিকই বলেছেন, মিস্টার রহমান। আবেগ দিয়ে চিকিৎসা চলে না।"
মাহবুব যেন একটু স্বস্তি পেলেন। কিন্তু পরের কথাটা শুনে আবার চুপ হয়ে গেলেন।
"তবে মানুষকে বিশ্বাস করাও শেখানো যায় না।"
অরিন্দম ধীরে ধীরে তাদের সবার দিকে তাকাল।
"আপনারা কি খেয়াল করেছেন, মেয়েটা একবারও বলেনি যে সে সব পারে।"
কেউ উত্তর দিল না।
"সে শুধু বলেছে, শিখিয়ে দিলে শিখে নেবে।"
অরিন্দমের কণ্ঠে দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
"যে মানুষ নিজের অযোগ্যতা স্বীকার করতে পারে, তাকে আমি বেশি বিশ্বাস করি। কারণ সে শেখার চেষ্টা করবে।"
মাহবুব রহমান বললেন,
"তবু ঝুঁকি তো থেকেই যায় স্যার।"
অরিন্দম মৃদু হাসল।
"ঝুঁকি তো জীবনেই ছিল, মিস্টার রহমান। একদিন সুস্থ শরীরে গাড়িতে উঠেছিলাম। তারপর কী হয়েছিল, আপনি জানেন।"
ঘরে আবার নীরবতা।
"এই মেয়েটা হয়তো সব জানে না। কিন্তু তার চোখে আমি একটা জিনিস দেখেছি। দায়িত্ববোধ।"
সে ফাইলটা নিজের দিকে টেনে নিল। তারপর কলম তুলে নামের পাশে সই করে দিল।
"ঈশিতা পাল। আগামী সোমবার থেকে যোগদান করবে।"
কলম নামিয়ে রাখার সময় তার ঠোঁটের কোণে অচেনা এক হাসি ফুটে উঠল।
হয়তো সে তখনও জানত না,তার এই সিদ্ধান্ত শুধু একজন কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নয়। এটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের আগমনের প্রথম দরজা খুলে দেওয়া।
সেদিন বিকেলে মোবাইলে কল এলো। ওপাশ থেকে ভেসে এলো, “আপনি আগামী সোমবার থেকে কাজে যোগ দেবেন।”
ঈশিতা কয়েক সেকেন্ড কিছুই বলতে পারল না। মনে হলো, কথাগুলো যেন ঠিকমতো কানে পোঁছাচ্ছে না।
“হ্যালো? শুনতে পাচ্ছেন?”
ঈশিতা হকচকিয়ে বলল,
“জি... জি, পাইতাছি।”
ফোন রাখার পর সে ধীরে বাবার দিকে তাকাল। হরিদাস পালের চোখ ভিজে উঠেছে।
“চাকরিডা হইছে বাবা...”
কথাটা শেষ করার আগেই শিলা পালের চোখেও জল এসে গেল। টিনের ছোট্ট ঘরটায় বহুদিন পর একটুখানি স্বস্তি নেমে এলো। অনেকদিন পরে সেদিন রাতে ঈশিতা শান্ত মনে ঘুমাতে গেল।
আর শহরের অন্য প্রান্তে, গুলশানের সেই বিশাল প্রাসাদে রাত নেমেছে। অরিন্দম নিজের ঘরে শুয়ে ছিল। হঠাৎ মাথার ভেতর তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলো। মনে হলো কেউ যেন খুলির ভেতরে অদৃশ্য হাতুড়ি চালাচ্ছে।
“মা...”
তার কণ্ঠে যন্ত্রণার চাপা শব্দ। মুহূর্তেই ঘরে ছুটে এলেন সুলেখা সেন। নার্সকে ডাকা হলো।ডাক্তারকে ফোন করা হলো।
ঘরের ভেতর ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। কেউ রক্তচাপ মাপছে, কেউ ওষুধ আনছে। অরিন্দম চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। অসহ্য ব্যথার মাঝেও তার মনে হঠাৎ একটি মুখ ভেসে উঠল।
একটি সরল মুখ।
একটি প্রাণখোলা হাসি।
আর সেই পরিচিত কণ্ঠ—
"শিখাইয়া দিলেই পারমু।"
অরিন্দম চোখ বন্ধ করল।
কেন জানি না, বহুদিন পর প্রথমবারের মতো তার মনে হলো, হয়তো সবকিছু এখনো শেষ হয়ে যায়নি। হয়তো জীবনের কাছে তার পাওনা এখনও বাকি আছে।
হয়তো আগামীকালটার জন্য অপেক্ষা করা যায়।
Read full book here: Click here to download the PDF file