এই মাইয়াডারে কই যেন দেইখছি


আশ্বিন মাসের শেষ বিকেল।

সূর্যটা পশ্চিম আকাশে ঢলিয়া পড়িয়াছে। রোদ্দুরের শেষ সোনালি আঁচ পুকুরের জলে চিকচিক করিতেছে। উঠোনের এক কোণে শিউলি গাছের তলায় সাদা ফুল ঝরিয়া পড়িয়া আছে। পাশের বাড়ি হইতে ধূপের গন্ধ ভাসিয়া আসিতেছে।

এই গ্রামের নাম মধু বাড়িয়া। গ্রামটি ছোট, কিন্তু মানুষের বিচার বড়। এখানে মানুষের গায়ের রঙ অনেক সময় মানুষের মনের চেয়েও বেশি দামি। এই গ্রামেই থাকেন শ্রীমন্ত মাস্টার। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বাপ-দাদার রেখে যাওয়া কয়েক বিঘা আবাদি জমি, বাড়ির পাশে বড় পুকুর, কয়েকটি আম-কাঁঠালের গাছ আর একখানি ছোট্ট ভিটে,এই নিয়াই তাহার সংসার। অভাব নাই, আবার ঐশ্বর্যও নাই। সৎ পথে চলিয়া, সম্মান নিয়াই জীবন কাটাইবার চেষ্টা করিতেছেন।

শ্রীমন্ত মাস্টারের তিন কন্যা। বড় দুই মেয়ের বিয়ে নির্বিঘ্নেই হয়েছে। কিন্তু ছোট মেয়ে শ্যামলীর ভাগ্যে যেন শুরু থেকেই অন্যরকম পরীক্ষা লেখা ছিল। নামের সঙ্গে যেন ভগবান নিজেই তাহার রঙ মিলাইয়া দিয়াছেন। গায়ের রঙ চাপা শ্যামলা। কিন্তু চোখ...

সে চোখে যেন অদ্ভুত এক দীপ্তি। জন্মের সময় গ্রামের ধাইমা বলিয়াছিল,

"মাইয়াডার রং চাপা ঠিকই, কিন্তু চোখ দুইডা দেইখছেন? এই চোখে বড় কিছুর লেখা আছে।" কথাটা তখন কেহ মনেও রাখে নাই। শুধু আনন্দময়ী মনে রাখিয়াছিল। মা কখনো সন্তানের আলো ভুলে না।

 

একদিন দুপুরের শেষ রোদে আনন্দময়ী উঠোনে শিউলি কুড়াইতেছিলেন। ঠিক সেই সময় পাশের বাড়ির সরলা পিসি বেড়ার ধারে দাঁড়াইয়া ডাক দিলেন—

"ও আনন্দ, বাড়িত আছস নি?"

"আসি গো, আইসেন।"

সরলা পিসি উঠোনে ঢুকিয়া চারিদিক একবার দেখিলেন। তারপর শ্যামলীর দিকে চাহিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিলেন।

"মাইয়াডা তো বড় হইয়া গেল। পাত্র-পাত্রী কিছু দেখতাছ নাকি?"

আনন্দময়ী মৃদু হাসিলেন।

"চেষ্টা তো করতাছি। মা দূর্গার ভরসা।"

সরলা পিসি ঠোঁট কামড়াইয়া একটু ইতস্তত করিলেন। তারপর এমন ভঙ্গিতে বলিলেন, যেন বড় উপকারের কথা বলিতেছেন—

"মাইয়াডারে এত বই-টই পড়াইয়া লাভ কী? গান শিখাইতেছস, কলেজে পাঠাইতেছস... কিন্তু শেষ কথা তো রং। এই রং লইয়া পোলা পক্ষ কি আর এত কিছু দেখব?"

শ্যামলী তখন বারান্দার এক কোণে বসিয়া বই পড়িতেছিল। কথাগুলো তাহার কানে গেলেও সে মাথা তুলিল না। শুধু বইয়ের পাতার উপর রাখা আঙুলটা আস্তে আস্তে কাঁপিয়া উঠিল। আনন্দময়ী ধীরে ধীরে শিউলি ভরা ঝুড়িটা নামাইয়া রাখিলেন।

" পিসি, ফুলের রং সবসময় চোখে লাগে। কিন্তু ফুলের গন্ধটা মানুষ পরে বুঝে। আমার মাইয়াডার ভাগ্যে যদি সুখ লেখা থাকে, কেউ ঠেকাইতে পারব না।"

সরলা পিসি একটু হেসে উঠিলেন।

"তুই তো মায়ের চোখে দেখস। দুনিয়ার মানুষ কিন্তু এত দয়ালু না। পরে যেন কষ্ট না পাস।"

এই কথা বলিয়া তিনি হন হন করিয়া চলিয়া গেলেন।

অনেকক্ষণ উঠোনে আর কোন শব্দ ছিল না। শুধু শিউলি গাছের নিচে একটার পর একটা ফুল ঝরিয়া পড়িতেছিল।

 

ছোটবেলা হইতেই শ্যামলী ছিল আলাদা। অন্য মেয়েরা যখন উঠোন জুড়ে কিতকিত খেলিত, পুতুলের বিয়ে দিত, তখন শ্যামলী বই লইয়া বসিয়া থাকিত। গ্রামের লাইব্রেরির বুড়ো লাইব্রেরিয়ান হরিদাস কাকা প্রায়ই হাসিয়া বলিতেন,

"এরে শ্যামলী, আবার বই শেষ কইরা ফেললি?"

শ্যামলী লাজুক হাসি হাসিত। বই ছিল তাহার আর-এক পৃথিবী। মানুষ যেখানে তাহাকে রঙে বিচার করিত, বই সেখানে বিচার করিত মনের আলোয়।

আর গান...গান ছিল তাহার শ্বাসের মতো। দুপুরবেলা গ্রামের সবাই যখন বিশ্রাম লইত, শ্যামলী আস্তে করিয়া হারমোনিয়ামের ঢাকনা খুলিত। খুব আস্তে গাইত। কাহারও শোনানোর জন্য নয়। নিজের বুকের ভিতরে জমিয়া থাকা সমস্ত না-বলা কথা সুরের হাতে সমর্পণ করিবার জন্য। পূর্ণিমার রাত্রিতে সেই সুর উঠোন পার হইয়া পুকুরের জলে পড়িত, তারপর ভাসিয়া যাইত বাঁশঝাড়ের মাথা ছুঁইয়া পাশের বাড়ি পর্যন্ত।

একদিন রান্নাঘর হইতে হাঁড়ির ঢাকনা তুলিতে তুলিতে আনন্দময়ী ডাক দিল,

"হ্যাগো, শ্যামলীর বাপ, হুনছ নি? কাইল আবার নাকি পাত্রপক্ষ আইতাছে।"

দাওয়ার চৌকাঠে বসিয়া শ্রীমন্ত মাস্টার তখন হুকোয় টান দিতেছিলেন। ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশের দিকে উঠিতেছিল, কিন্তু তাহার বুকের ভিতরের দীর্ঘশ্বাস উঠিবার পথ পাইতেছিল না। তিনি ধীরে ধীরে কহিলেন,

"জানি। কিন্তু ভয়ও লাগে। যতবার মানুষ আইসে, ততবার আমার মাইয়ারে নতুন কইরা অপমান কইরা যায়।"

কথাগুলো বাতাসে মিলাইয়া গেল। ঠিক সেই সময় দূর ঘর হইতে ভেসে আসিল শ্যামলীর গলার সুর—

"আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে..."

শ্রীমন্ত মাথা তুলিলেন। মুহূর্তের জন্য তাঁহার বুকের সমস্ত দুঃখ যেন থমকাইয়া দাঁড়াইল। তিনি জানিতেন না, এই সুরই একদিন তাঁহার কন্যার ভাগ্যের ইতিহাস লিখিবে।

পরদিন সকাল হইতেই শ্রীমন্ত মাস্টারের বাড়িতে যেন এক অদৃশ্য ব্যস্ততা নামিয়া আসিল।

উঠোন ঝাড়ু দেওয়া হইল। আনন্দময়ী ভোর হইতেই রান্নাঘরে ব্যস্ত। চুলার ধোঁয়ার সঙ্গে ভাজা মুগডালের গন্ধ উঠোনময় ছড়াইয়া পড়িল। কলাপাতায় সন্দেশ সাজানো হইল। সব আয়োজন যেন অতিথির জন্য। তবু ঘরের ভেতর আনন্দের চেয়ে উৎকণ্ঠাই বেশি।

শ্যামলী খুব ভোরে উঠিয়াই পুকুর ঘাটে গিয়াছিল। জলের উপর নিজের মুখখানি কিছুক্ষণ নীরবে দেখিল। তারপর আঁচল ভিজাইয়া মুখ মুছিল। জানিত, আজও কেহ তাহার গান শুনিতে আসিবে না।  আসিবে কেবল তাহার গায়ের রং দেখিতে।

আনন্দময়ী ঘরে ঢুকিয়া দেখিল, মাইয়াডা আয়নার সামনে বসিয়া আছে। চুল আঁচড়াইতেছে। কিন্তু সাজিতেছে না। মা আসিয়া পেছনে দাঁড়াইল। ধীরে ধীরে মেয়ের মাথায় হাত রাখিয়া বলিল,

"মন খারাপ করছস?"

শ্যামলী মৃদু হাসিল।

"না গো মা।"

মায়ের চোখ ফাঁকি দেওয়া কি এত সহজ? আনন্দময়ী মেয়ের মুখ দুই হাতে ধরিয়া বলিল,

"শোন, মানুষরে খুশি করার দায় তোর না। তুই শুধু তোর মনডারে শান্ত রাখিস।"

শ্যামলী এবার মায়ের বুকের মধ্যে মুখ লুকাইল। এক ফোঁটা জল গড়াইয়া পড়িল। সে জল দুঃখের ছিল, না লজ্জার, কেহ জানিল না।

 

দুপুর গড়াইতে না গড়াইতেই পাত্রপক্ষ আসিল। চারজন মানুষ। পাত্রের বাবা, মা, পাত্র নিজে আর ঘটক। শ্রীমন্ত হাসিমুখে অভ্যর্থনা করিলেন। কুশল বিনিময় হইল। চা আসিল। মিষ্টি আসিল। কথাবার্তা চলিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পর ঘটক কহিল,

"মাইয়াডারে একবার ডাকেন।"

আনন্দময়ীর বুকটা হঠাৎ ধক্ করিয়া উঠিল। সে আস্তে করিয়া বলিল,

"শ্যামলী, আয় মা।"

শ্যামলী ধীর পায়ে আসিল। পরনে নীল পাড় শাড়ি। মুখে কোনো প্রসাধন নাই। শুধু কপালে ছোট্ট লাল টিপ। সে মাথা নিচু করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। ঘরখানায় কেমন অস্বস্তিকর নীরবতা নামিয়া আসিল। পাত্রের মা একবার মাথা হইতে পা পর্যন্ত তাকাইলেন। আর কিছু বলিলেন না। পাত্রের বাবা কেবল জিজ্ঞেস করিলেন,

"লেখাপড়া কতদূর?"

"অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ি।"

"গান জানো নাকি?"

শ্যামলী লাজুক গলায় কহিল,

"একটু গাই।"

পাত্রের মা ঠোঁট বাঁকাইলেন।

"গান দিয়া তো আর সংসার চলে না।"

কথাটা খুব আস্তে বলা হইলেও শ্যামলীর কানে যেন বজ্রপাতের মতো লাগিল। শ্রীমন্ত মাথা নিচু করিয়া বসিয়া রহিলেন। আনন্দময়ীর আঙুল শক্ত হইয়া উঠিল। তবু তিনি চুপ থাকিলেন।

 

পাত্রপক্ষ বিদায় লইল। যাওয়ার সময় সৌজন্যের হাসি ছিল। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে উত্তরটাও যেন লুকানো ছিল। দুই দিন পরে ঘটক আবার আসিল। শ্রীমন্ত তখন স্কুল হইতে ফিরিয়াছেন। ঘটকের মুখ দেখিয়াই তিনি বুঝিলেন। ভালো খবর নহে।

ঘটক কাশিয়া গলা পরিষ্কার করিল। তারপর ধীরে বলিল,

"মাস্টার, কিছু মনে কইরেন না। পোলার মা কইছে... মাইয়াডা নাকি খুব কালা। পোলার লগে মানাইব না।"

আর কিছু শুনিবার শক্তি শ্রীমন্তের রইল না। মনে হইল, বুকের মধ্যে কেহ যেন ধারালো কোদাল বসাইয়া দিল। ঘটক চলে গেল।

দাওয়ায় বসিয়া শ্রীমন্ত অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকাইয়া রহিলেন। তারপর নিজের মনেই বলিলেন,

"ভগবান, মাইয়াডারে যদি রূপ না-ই দিলা, এই মনের সৌন্দর্যডাও কি কেউ দেখব না?"

ঠিক সেই সময় ঘরের ভিতর হইতে ভেসে আসিল হারমোনিয়ামের সুর। খুব আস্তে। মনে হইল, কেহ কান্দিতেছে। কিন্তু চোখের জল দিয়া নয়, সুর দিয়া।

আনন্দময়ী দরজার কাছে দাঁড়াইয়া শুনিতেছিল। তার বুকের মধ্যে হঠাৎ এক অদ্ভুত শক্তি জাগিয়া উঠিল। সে ধীরে ধীরে দাওয়ায় আসিয়া শ্রীমন্তের পাশে দাঁড়াইল। কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া বলিল,

"শ্যামলীর বাপ..."

শ্রীমন্ত মুখ তুলিলেন না।

আনন্দময়ীর কণ্ঠ তখন শান্ত, অথচ অটল—

"আজ মানুষ আমার মাইয়ার রং দেইখা ফিরা গেছে। একদিন এই মানুষই ওর গলার সুর শুনবার লাইগা দরজার বাইরে দাঁড়াইয়া থাকব।"

তিনি আকাশের দিকে চাহিলেন। সন্ধ্যার প্রথম তারা তখন জ্বলিয়া উঠিয়াছে। মৃদুস্বরে বলিলেন—

"ভগবান কাহারে কাহারে ফুলের রং দিয়া সাজান, আবার কাহারে কাহারে সুর দিয়া। আমার বিশ্বাস, আমার শ্যামলীর কপালে তিনি সুর লিখিয়াই পাঠাইছেন।" দূরে বাঁশ ঝাড়ে বাতাস দুলিয়া উঠিল। ঘরের ভেতর শ্যামলীর গান আরও স্পষ্ট হইয়া বাজিতে লাগিল।

ঘরের দরজাটা ভেজাইয়া শ্যামলী আয়নার সামনে দাঁড়াইয়া ধীরে ধীরে নিজের মুখখানির দিকে চাহিল। মনে মনে প্রশ্ন করিল—

"আমি কি সত্যিই এতটা অসুন্দর?"

 

গ্রামের ছোট্ট লাইব্রেরিটা ছিল শ্যামলীর বড় আপন জায়গা। দরজার উপরে টিনের বোর্ডে লেখা, "জনকল্যাণ পাঠাগার"।

বয়সে ন্যুব্জ হরিদাস বাবু প্রায়ই বলিতেন,"মা শ্যামলী, তোরে না দেইখলে লাইব্রেরিডা ফাঁকা লাগে।"

শ্যামলী মৃদু হাসিয়া বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়াইত।  হরিদাসবাবু একদিন জিজ্ঞাসা করিলেন,

"তুই এত বই পড়িস ক্যান রে মা?"

শ্যামলী একটু ভেবেই বলিল,

"বই মানুষরে কথা কইতে শেখায় কাকা। আর গান মানুষরে চুপ কইরা কাঁদতে শেখায়।"

বৃদ্ধ মানুষটি দীর্ঘক্ষণ তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন। তারপর শুধু বলিলেন—

"তোর বয়সের চাইতে তোর মনডা অনেক বড়।"

 

একদিন শ্রীমন্ত মাস্টারের স্কুলে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর আয়োজন হইল। অনুষ্ঠান উপলক্ষে স্কুল জুড়ে ব্যস্ততা। আনন্দময়ী টিফিন লইয়া শ্যামলীকে সঙ্গে করিয়া স্কুলে আসিয়াছিলেন। বারান্দার এক পাশে দাঁড়াইয়া থাকিতেই শ্যামলীর কানে শ্রীমন্ত মাস্টার ও সহকারী শিক্ষক আবদুল করিমের কথোপকথন ভাসিয়া আসিল।

আবদুল করিম বলিলেন,

"মাস্টার সাহেব, শ্যামলী যদি একটা গান গায়, অনুষ্ঠানের মান অনেক বাড়িবে।"

শ্রীমন্ত কিছুক্ষণ নীরব রহিলেন। তারপর ধীরে বলিলেন,

"মাইয়াডা বহুদিন মানুষের সামনে গান গায় না।"

কথাগুলি শুনিয়া শ্যামলী কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়াইয়া রহিল। তারপর ধীরে ধীরে বারান্দায় আসিয়া বাবার সামনে দাঁড়াইল। মৃদুস্বরে বলিল,

"যদি তুমি কও, বাবা... আমি গাইব।"

শ্রীমন্ত বিস্ময়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকাইয়া রহিলেন। বহুদিন পর সেই চোখে তিনি আবার এক নতুন আলো দেখিলেন। সে আলো ভয়ের নহে, সাহসের।

বারান্দার সিঁড়ির পাশে দাঁড়াইয়া আনন্দময়ী সব দেখিতেছিলেন। অজান্তেই তাঁহার দুই চোখ ভিজিয়া উঠিল। মনে মনে তিনি শুধু প্রার্থনা করিলেন—

"মা দুর্গা, এই গানডাই যেন আমার মাইয়ার পথের প্রথম প্রদীপ হয়।"

 

বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন। সকালের রোদ তখনও কোমল। স্কুলের মাঠে রঙিন কাগজের শিকলি দুলিতেছে। বাঁশের খুঁটি দিয়া ছোট্ট একখানা মঞ্চ বানানো হইয়াছে। চারিদিকে গ্রামের মানুষ। ছাত্রছাত্রীদের কোলাহলে মাঠ ভরিয়া উঠিয়াছে।

মঞ্চের একপাশে বসিয়া আছেন জেলার প্রবীণ সংগীত গুরু অমিয় ভূষণ চক্রবর্তী। শ্রীমন্ত মাস্টারের বিশেষ অনুরোধেই আজ তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত। অনুষ্ঠান চলিতেছিল।

কেউ আবৃত্তি করিল, কেউ নৃত্য পরিবেশন করিল। হাততালি উঠিল, আবার থামিল। শেষে ঘোষক বলিলেন—

"এবার রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করিবে—আমাদেরই গ্রামের মেয়ে, শ্যামলী।"

নামটা উচ্চারিত হইতেই মাঠের এক কোণে ফিসফাস শুরু হইল।

"ওই কালা মাইয়াডা?"

"ও আবার গানও গায় নাকি?"

শ্যামলী ধীর পায়ে মঞ্চে উঠিল। মুখে কোনো সাজসজ্জা নাই। কিন্তু চোখে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। হারমোনিয়ামের সামনে বসিয়া সে চোখ বুজিল। কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর গাইতে শুরু করিল, "আমার সকল দুখের প্রদীপ জ্বেলে..."

মাঠটা যেন হঠাৎ থমকাইয়া গেল। যারা একটু আগেও ফিসফিস করিতেছিল, তাহারাও নিঃশব্দে তাকাইয়া রহিল। মনে হইল, শ্যামলী গান গাইতেছে না। নিজের বুকের ভিতর জমিয়া থাকা সমস্ত অপমান, সমস্ত অশ্রু, সমস্ত স্বপ্ন সুরের হাতে সমর্পণ করিতেছে। শেষ কলিটি মিলাইয়া যাইতেই মাঠ জুড়ে গভীর নীরবতা। একটি দীর্ঘ মুহূর্ত। তারপর বজ্রধ্বনির মতো হাততালি।

অমিয়ভূষণ চক্রবর্তী ধীরে ধীরে আসন হইতে উঠিয়া দাঁড়াইলেন। তাঁহার চোখ দুটি ভিজিয়া উঠিয়াছে। তিনি মঞ্চের দিকে আগাইয়া গেলেন। শ্যামলীর মাথায় স্নেহ ভরা হাত রাখিয়া কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়াইয়া রহিলেন। তারপর দর্শকদের দিকে ফিরিয়া শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলিলেন:

" মাস্টারমশাই, এই মাইয়াডারে আর গ্রামের উঠোনে বাঁধিয়া রাইখেন না। এই কণ্ঠ অনেক দূর যাইব।“

সমস্ত মাঠ নিস্তব্ধ। শ্রীমন্ত মাস্টারের বুকের ভিতর কেমন জানি করিয়া উঠিল। তিনি কোনো কথা কইতে পারিলেন না। শুধু দুই হাত জোড় করিয়া মাথা নত করিলেন।

আনন্দময়ীর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়াইয়া পড়িল। আর শ্যামলী? সে নীরবে দাঁড়াইয়া রহিল।

সেদিন বাড়ি ফিরিবার পথে গ্রামের আকাশটা যেন অন্যরকম লাগিতেছিল। আনন্দময়ী আকাশের দিকে তাকাইয়া মনে মনে বলিল—

"দুর্গা মা, আলোটা তুমি জ্বালাইছো। এখন শুধু পথটা দেখাইয়া দিও।"

 

বিদ্যালয়ের সেই অনুষ্ঠানের পর গ্রামের বাতাস যেন অদৃশ্যভাবে বদলাইতে শুরু করিল। যে মানুষগুলো একদিন শ্যামলীকে দেখিয়া মুখ ফিরাইয়া লইত, তাহারাই এখন পথে ঘাটে থামাইয়া জিজ্ঞাসা করে:

"মা, আবার কবে গান শোনমু?"

অমিয়ভূষণ চক্রবর্তীর উৎসাহে শ্যামলীর সংগীতচর্চা আরও নিয়মিত হইল। সপ্তাহে একদিন তিনি নিজেই আসিয়া তাল-লয়, সুর আর উচ্চারণ শিখাইয়া যাইতেন। শ্যামলীও প্রাণ দিয়া শিখিত। উপজেলা সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় প্রথম হইল সে। তারপর জেলা পর্যায়ে।

প্রত্যেকটি সাফল্যের পর শ্রীমন্ত মাস্টার চুপচাপ বাড়ি ফিরিতেন। লোকের অভিনন্দনে তিনি হাসিতেন ঠিকই, কিন্তু মনে মনে ভাবিতেন, এ কি সেই মাইয়া, যাহার জন্য তিনি একদিন ভগবানের কাছে নীরবে অভিযোগ করিয়াছিলেন? সেই ছোট্ট  স্কুল মাঠের হাততালি যেন শ্যামলীর জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করিল।

দিন চলিতে লাগিল। এক দুপুরে ডাকপিয়ন উঠোনে দাঁড়াইয়া ডাক দিল—

"মাস্টারমশাই, ঢাকা থেইক্যা রেজিস্ট্রি চিঠি আইছে।"

শ্রীমন্ত ধীরে ধীরে বাহিরে আসিলেন। খামের উপর সরকারি সিলমোহর। কাঁপা হাতে খাম খুলিলেন। চিঠিটি বাংলাদেশ টেলিভিশন হইতে। আসন্ন শিল্পী বাছাইয়ের অডিশনে অংশগ্রহণের জন্য শ্যামলীকে সসম্মানে আমন্ত্রণ জানানো হইয়াছে। কিছুক্ষণ তিনি নিশ্চুপ দাঁড়াইয়া রহিলেন। মনে হইল, কত শত দীর্ঘশ্বাস, কত অপমান, কত নির্ঘুম রাত যেন এক মুহূর্তে বুকের ভিতর হইতে গলিয়া পড়িল।

আনন্দময়ী চিঠিখানা দুই হাতে বুকের সঙ্গে চেপে ধরিল। আকাশের দিকে চাহিয়া দুই হাত জোড় করিয়া বলিল—

"দুর্গা মা... তুমি আমার মাইয়ার মান রাইখছ।"

অডিশনের দিন। ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটে নাই। শ্যামলী শাড়ি পরিয়া বাবার পায়ে হাত রাখিল। শ্রীমন্ত কাঁপা হাতে মেয়ের মাথায় হাত রাখিয়া বলিলেন:

"গানডা মন দিয়া গাইস মা। জিতবি না হারবি, সেই চিন্তা করিস না। মানুষ হইয়া ফিরা আইস।"

আনন্দময়ী কপালে সিঁদুরের আঙুল ছুঁইয়া আশীর্বাদ করিল। ভোরের কুয়াশার ভিতর দিয়া বাসটা ধীরে ধীরে চলিয়া গেল। বাঁশবনের মাথায় তখন প্রথম সূর্যের আলো পড়িতেছে। মনে হইল, গ্রামটা যেন নিজেই তাহাকে আশীর্বাদ করিয়া বিদায় দিতেছে।

দুই সপ্তাহ পরে এক সন্ধ্যায়। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই টেলিভিশন খোলা। হঠাৎ পাশের বাড়ির রাখাল দৌড়াইয়া আসিল।

"মাস্টারমশাই! তাড়াতাড়ি আইসেন! টেলিভিশনে শ্যামলী দিদি!"

শ্রীমন্ত আর আনন্দময়ী ছুটিয়া গেলেন। শ্যামলীও আসিল। পর্দায় ঘোষকের কণ্ঠ ভাসিয়া উঠিল—

"এবার সংগীত পরিবেশন করিবেন কুমিল্লার নবীন শিল্পী, শ্যামলী।"

পরক্ষণেই পর্দায় ফুটিয়া উঠিল শ্যামলীর মুখ। সে গান ধরিল।

ঠিক সেই সময়, বহু দূরের আর-একটি বাড়িতে, এক বৃদ্ধা মহিলা টেলিভিশনের পর্দার দিকে চাহিয়া হঠাৎ থমকাইয়া গেলেন।

মৃদুস্বরে বলিলেন:

"এই মাইয়াডারে কই যেন দেইখছি..."

তাঁহার ছেলে একটু লজ্জিত মুখে উত্তর দিল:

"মা... মনে নাই? এইডাই সেই শ্যামলী... যারে একদিন আমরা ফিরাইয়া দিছিলাম।"

 

বৃদ্ধা ধীরে ধীরে টেলিভিশনের পর্দার কাছে আগাইয়া গেলেন। কাঁপা আঙুলে পর্দায় ভেসে থাকা শ্যামলীর মুখখানি ছুঁইতে গিয়া থমকাইয়া গেলেন।

"রং দেইখা মানুষ চিনতে গিয়া মানুষটাই চিনতে পারি নাই রে।"

বৃদ্ধা আর কোনো কথা কহিলেন না। ধীরে ধীরে মাথা নিচু করিলেন। কোনো কোনো অনুতাপের ভাষা হয় না। নীরবতাই তাহার একমাত্র স্বীকারোক্তি।

সেই রাত্রে পূর্ণিমার চাঁদ উঠিয়াছিল। উঠোন ভরিয়া জ্যোৎস্না পড়িয়াছে। শ্রীমন্ত অনেক দিন পরে দাওয়ার সেই পুরোনো পিঁড়িতে বসিয়া আছেন। হুকোটি পাশে পড়িয়া আছে। আজ আর তিনি তাহাতে আগুন ধরাইলেন না। দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকিয়া আস্তে বলিলেন—

"শ্যামলীর মা..."

"কও।"

"এতদিন আমি মাইয়ার গায়ের রং দেইখছি। ভগবান তো ওর ভিতরের আলো দেখাইতেছিলেন। আমি বুঝতে দেরি কইরা ফেলছি।"

আনন্দময়ী মৃদু হাসিল। চোখের কোণে জল চিকচিক করিতেছিল। সে শান্ত কণ্ঠে বলিল:

"আলো ফুটতে দেরি হয় শ্যামলীর বাপ। কিন্তু একবার ফুটলে সেই আলো আর ঢাকন যায় না।"

দূরের বাঁশবনে বাতাস আবারও দুলিয়া উঠিল। কোথাও যেন ভেসে আসিল এক চেনা স্বর—

"এই মাইয়াডারে কই যেন দেইখছি..."

এবার আর কথাটার মধ্যে অবহেলা ছিল না। ছিল শুধু নীরব অনুতাপ।