ঈশিতা মারা যায়নি- পর্ব ১


ঢাকার আকাশে তখন সন্ধ্যার আলো।

গতকাল সারা রাত বৃষ্টি ছিল। শহরের গাছ-গাছালি ধ্যান মগ্ন।

গুলশান লেকের জলে শহরের হাজারো আলোর প্রতিফলন কাঁপছে। লেকের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা কাঁচ ও মার্বেলে মোড়া বিশাল প্রাসাদটি দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন আলোর তৈরি কোনো স্বপ্নরাজ্য। প্রাসাদের দ্বিতীয় তলার বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে ছিল অরিন্দম সেন।

মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষ করে দেশে ফিরেছে সে। শীতল বাতাস মুখে এসে লাগছিল, কিন্তু তার মন অদ্ভুত এক অস্থিরতায় ভরা।

নিচে লেকের কালো জলের বুকে কয়েকটি হাঁস মেতে উঠেছে জলকেলিতে। দূরে শহরের কোলাহল। অথচ তার মনে হচ্ছিল, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথচলা যেন এখনই শুরু হতে যাচ্ছে। হার্ভার্ডে কাটানো পাঁচটি বছর তাকে ব্যবসা, অর্থনীতি আর নেতৃত্বের পাঠ শিখিয়েছে। কিন্তু দেশে ফিরে সে বারবার নিজেকে একটি প্রশ্নই করছে: শুধু ব্যবসা বাড়ানোর জন্যই কি আমি ফিরেছি?

পেছন থেকে বাবার কণ্ঠ ভেসে এলো, "কি ভাবছো?"

অরিন্দম ঘুরে দাঁড়াল। দেবাশিস সেন ধীরে ধীরে এসে ছেলের পাশে দাঁড়ালেন।

এই সাম্রাজ্য একদিন তোমাকেই সামলাতে হবে।

অরিন্দম মৃদু হাসল।

সাম্রাজ্য?”

দেবাশিসও হাসলেন।

হ্যাঁ, সাম্রাজ্যই তো।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি লেকের দিকে তাকালেন।

তোমার দাদা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তোমাকে দেখে গর্ব করতেন।

অরিন্দম বাবার দিকে তাকাল। শৈশব থেকে বহুবার সে সেন পরিবারের গল্প শুনেছে।

নাটোরের দিঘাপতিয়ার সেই প্রাচীন জমিদারবাড়ি। ব্রিটিশ আমলে যার নাম উচ্চারিত হতো সম্মান আর বিস্ময়ের সঙ্গে। সময়ের সঙ্গে জমিদারি হারিয়েছে, সম্পদ কমেছে, প্রাসাদ ভেঙেছে।

কিন্তু সেন পরিবারের মানুষেরা হার মানেনি। তার দাদা শূন্য থেকে আবার ব্যবসা শুরু করেছিলেন। শিপিং, বস্ত্রশিল্প, হোটেল, রপ্তানি। একের পর এক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন নিজের পরিশ্রমে। আজ সেই ব্যবসা দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।

দেবাশিস ধীরে বললেন, “টাকা বানানো সহজ। মানুষের বিশ্বাস অর্জন করা কঠিন।"

অরিন্দম শান্ত গলায় উত্তর দিল:

আমি চাই মানুষ আমাকে মালিক হিসেবে না, বিশ্বস্ত মানুষ হিসেবে মনে রাখুক।

দেবাশিস কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখে গর্বের ঝিলিক। ঠিক তখনই ঘরে প্রবেশ করলেন সুলেখা সেন।

তিনি এগিয়ে এসে ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।

তোর চোখে আমি একটা স্বপ্ন দেখি।

কি স্বপ্ন মা?”

মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন।

অরিন্দম মৃদু হেসে মায়ের হাত ধরল। কিন্তু সেই মুহূর্তে তার মনের গভীরে অন্য একটি মুখও ভেসে উঠছিল। হার্ভার্ডের বিশাল গ্রন্থাগার। সোনালি বিকেল। বইয়ের তাকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক মেয়ে। সাধারণ শাড়ি। শান্ত চোখ। আর এক মায়াময় হাসি।

নন্দিতা রায়।

অরিন্দম জানত না, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি আর সবচেয়ে বড় বেদনা, দুটোর সঙ্গেই জড়িয়ে থাকবে এই নামটি।

হার্ভার্ডের বিশাল গ্রন্থাগারে প্রথম দেখা। বইয়ের সারি, কাঠের টেবিল, জানালা ভরা সোনালি বিকেল। নন্দিতা দাঁড়িয়ে ছিল এক কোণে। হাতে বই, চোখে মনোযোগের দীপ্তি। পড়নে সাধারণ শাড়ি, অনাড়ম্বর উপস্থিতি। তবু যেন চারপাশের আলো তার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। শাড়ি পড়া এখানে আগে অরিন্দম কাউকে দেখেনি। কিছুক্ষণ দূর থেকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে এগিয়ে গিয়ে বলেছিল

মাফ করবেন আপনি কি বাংলা বলেন?”

নন্দিতা মুখ তুলে তাকিয়েছিল। চোখে ছিল বিস্ময়, ঠোঁটে মৃদু হাসি।

ঠিক ধরেছেন। আমার শাড়ি পড়া দেখেই নিশ্চয়ই বুঝেছেন? আমি একজন খাটি বাঙ্গালি

কথাটা বলার ভঙ্গিতে এমন কোমল দৃঢ়তা ছিল, যেন নিজের শিকড়কে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে সে। অরিন্দম একটু কাছে এসে বলেছিল: “তাহলে আজ থেকে আমার দিন শুরু হবে বাংলায়।

নন্দিতা ভুরু তুলে তাকিয়েছিল। ঠোঁটে খেলা করছিল লাজুক রসিকতা।

বিদেশে এসে কেউ এমন ভাবে কথা বলে না।

অরিন্দমের চোখে তখন এক অদ্ভুত নিশ্চয়তা।

আমি বিদেশে আছি ঠিক,” সে ধীরে বলেছিল, “কিন্তু আমার মনটা এখনো বাংলাদেশে।

এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গিয়েছিল সেই গ্রন্থাগারে ।

 

দূরে ঘড়ির কাঁটা চলছিল, কিন্তু তাদের দুজনের মাঝে তৈরি হচ্ছিল এক নতুন অধ্যায়।  নন্দিতা চোখ নামিয়ে ফেলেছিল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে ছিল এক অস্ফুট হাসি। সেটি ছিল তার ভবিষ্যতের প্রথম সূর্যোদয়।

সেই কিছুক্ষণের দাঁড়ানো ধীরে ধীরে পাশাপাশি হাঁটায় বদলে গিয়েছিল। চার্লস নদীর ধারে এক সন্ধ্যায় অরিন্দম বলেছিল, “তুমি কি আমার জীবনের স্থায়ী ঠিকানা হবে?”

নন্দিতা চোখে জল নিয়ে বলেছিল, “তুমি যদি কখনো ভেঙে পড়ো, আমাকে দূরে সরিয়ে দেবে না তো?”

অরিন্দম তার হাত ধরে বলেছিল, “আমি যদি ভাঙি, তোমার কাঁধেই ভাঙব।

 

দেশে ফিরে অরিন্দম কোম্পানির এম ডি হিসেবে দায়িত্ব নেয়। কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলত নাম ধরে। গাজীপুর কারখানায় গিয়ে বলেছিল, “আপনাদের হাসিই আমার সবচে বড়ো পাওয়া।

সবকিছু যেন এক নিখুঁত ছকে এগোচ্ছিল।

দেশে ফেরার পর অরিন্দম সেন দ্রুতই বোর্ড রুমের আস্থা জিতে নেয়। চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ইয়ার্ডে গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে। গাজীপুরের টেক্সটাইল মিলে রাত অবধি দাঁড়িয়ে নতুন অটোমেশন লাইনের ত্রুটি খুঁজে দেখে। তার সিদ্ধান্তে ছিল যুক্তি, কিন্তু ভাষায় ছিল মমতা। কর্মচারীরা বলত, “ছেলেটা আলাদা।

সেদিন ছিল বুধবার। ঢাকার আকাশ যেন সেদিন বুকভরা কান্না চেপে রেখেছিল। বর্ষার কালো মেঘ শহরটাকে ঢেকে দিয়েছিল ঘন আবরণে। মুষল ধারে বৃষ্টি হয়। ঝড়ো হাওয়ায় এদিক সেদিক গাছের ডাল পড়ে আছে। এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে বিষণ্ণতা চারদিকে ছড়িয়ে ছিল।

এমনই এক রাতে, গাজীপুর থেকে ঢাকায় ফেরার পথে অরিন্দমের জীবনে ঘটে যায় জীবন বদলে যাওয়ার সেই ঘটনাটি।

রাত তখন প্রায় নয়টা। মহাসড়কের ওপর প্রথমে টিপটিপ বৃষ্টি, যেন আকাশের সতর্ক সংকেত। তারপর আচমকা মুষলধারে বর্ষণ শুরু হয়। ট্রাকের সারি সামনে এগিয়ে চলেছে ভারী শরীর নিয়ে। হেডলাইটের তীব্র আলো বৃষ্টির ফোঁটায় ভেঙে গিয়ে কাঁচের ওপর ছড়িয়ে পড়ছে অস্পষ্ট রেখায়। কাঁচে বৃষ্টির ছন্দ যেন অস্থির কোনো সঙ্গীত বাজাচ্ছে।

ড্রাইভার স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে বারবার বলছিল,

স্যার, রাস্তা খুব পিচ্ছিল গাড়ি সামলে চালাতে হবে।

অরিন্দম জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। গাছের ডাল-পাতাগুলো উন্মাদের মতো নাচছে। অন্ধকারে ডুবে থাকা গ্রামের বাড়িগুলো একেকটা যেন নিঃশব্দ ছায়া। মাঝে মাঝে চায়ের দোকানের ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠছে।

তার মনে তখন নানা চিন্তার ঢেউ। ব্যবসার হিসাব, মায়ের কথা, আর এক কোণে নন্দিতার হাসি। সব মিলিয়ে ভেতরে এক অদৃশ্য ঝড় বয়ে চলেছে।

হঠাৎ সামনে চলন্ত এক বিশাল ট্রাক আচমকা ব্রেক কষল।

কর্কশ শব্দ যেন রাতের নিস্তব্ধতা চিরে ছুরি চালাল।

ড্রাইভার চমকে উঠল। “হায় ঈশ্বর!”

স্টিয়ারিং ঘুরল, চাকা স্লিপ করল। ভেজা রাস্তায় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে গেল। মুহূর্তটি যেন দীর্ঘ হয়ে গেল। সময় থেমে গেল আচমকা। শুধু বৃষ্টির শব্দ আর ব্রেকের আর্তনাদ কানে বাজতে লাগল। হেডলাইটের আলো ঘুরে গিয়ে অন্ধকারে এক বিভ্রান্ত বৃত্ত আঁকল। গাড়ির শরীর কেঁপে উঠল প্রচণ্ড ধাক্কায়।

বৃষ্টি ভেজা সেই রাত। সেই সড়ক। সেই স্লিপ করা চাকা। সব মিলিয়ে যেন নিয়তি নিজের অদৃশ্য কলমে লিখে দিল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

তারপর

এক মুহূর্তে সবকিছু ভেঙে চুরমার। কাঁচ ভাঙার শব্দ। ধাতব দেহের বিকট সংঘর্ষ, শরীর ছিটকে পড়ার অনুভূতি। হেডলাইট নিভে যায়। চারপাশে শুধু বৃষ্টির শব্দ আর রক্তের গন্ধ। অন্ধকার যেন তাকে গিলে ফেলে।

পরদিন সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম “শিল্পপতি পরিবারের উত্তরাধিকারী ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় আশঙ্কাজনক। শহরের প্রাসাদ তখন নিস্তব্ধ। বোর্ড মিটিং স্থগিত। কর্মচারীদের চোখে আতঙ্ক।

হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে লড়াই।

ডাক্তাররা বলেন, মস্তিষ্কে আঘাত গুরুতর, অবস্থা সংকটাপন্ন। অরিন্দম কোমায় চলে যায়।

মাসের পর মাস। দেখতে দেখতে চারটি মাস চলে যায়।

হাসপাতালের করিডোরে প্রতিদিন একটি পরিচিত দৃশ্য। লাল পেড়ে শাড়ি পরা এক নারী। চোখ লাল, হাতে রুদ্রাক্ষের মালা। তিনি অরিন্দমের মা। প্রতিদিন একই চেয়ারে বসে থাকেন, একই প্রার্থনা উচ্চারণ করেন: “ঠাকুর, আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও। তার জীবনটা এখনও শুরুই হলো না।

রাত গভীর হলে তিনি ছেলের কেবিনের কাঁচের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। মনিটরের আলোতে অরিন্দমের নিস্তেজ মুখ দেখা যায়। যে ছেলেটি সদ্য ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে ফিরেছিল, সে এখন নিঃশব্দে শুয়ে আছে, জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে ঝুলে।

বাইরে বর্ষা শেষ হয়ে যায়। শরত আসে। তারপর হেমন্ত।

এক সকালে, হঠাৎ মনিটরের রেখা বদলে যায়। আঙুল সামান্য নড়ে ওঠে। মা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারলেন না। ডাক্তার ছুটে আসেন। অরিন্দমের চোখের পাতা কাঁপে।

দীর্ঘ অন্ধকারের পর, এক ফালি আলো ফিরে আসে।

কিন্তু সেই আলো কি আগের মতোই? নাকি এই মৃত্যু-স্পর্শ তাকে বদলে দিয়েছে চিরতরে?

চোখ খুলতেই অরিন্দম সাদা সিলিং দেখল। ডাক্তার ধীরে বললেন, “আপনার কোমরের নিচের অংশ স্থায়ীভাবে প্যারালাইজড।

অরিন্দম অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলেছিল, “তাহলে কি আমি আর কোনোদিন দাঁড়াতে পারব না?”

ডাক্তার নরম গলায় বললেন, “চিকিৎসা চলবে, কিন্তু সম্ভাবনা খুব কম।

 

অরিন্দম কোমা থেকে জেগে ওঠার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ নন্দিতা প্রায় প্রতিদিনই হাসপাতালে আসত। সকাল হোক কিংবা সন্ধ্যা, তাকে প্রায়ই দেখা যেত অরিন্দমের কেবিনের পাশে চুপচাপ বসে থাকতে। কখনো বই পড়ছে, কখনো অরিন্দমের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। অনেক সময় কিছুই বলত না। শুধু হাতটা ধরে বসে থাকত।

একদিন বিকেলে অরিন্দম জেগে ছিল। জানালার বাইরে হেমন্তের আকাশ। নীলের বিস্তারে সোনালি রোদের কোমল স্পর্শে শান্ত ও নির্মল সৌন্দর্যে ভরা।

 

নন্দিতা চুপচাপ বসেছিল পাশে। অরিন্দম মৃদু হেসে বলল,

তুমি এত চুপচাপ কেন?”

নন্দিতা উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ পরে বলল,

আমি ভাবতাম আমরা কত কিছু করব।

আমরা করব।

নন্দিতা মাথা নাড়ল।

সবকিছু কি আগের মতো থাকবে?”

অরিন্দম প্রশ্নটা বুঝেছিল। কিন্তু উত্তর খুঁজে পেল না। ঘরের ভেতর দীর্ঘ নীরবতা নেমে এলো। নন্দিতা হঠাৎ উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার কাঁধ কাঁপছিল। সে কাঁদছিল। খুব ধীরে। খুব নিঃশব্দে। সেদিন প্রথমবার অরিন্দম বুঝেছিল, শুধু সে নয়, নন্দিতাও ভেঙে পড়ছে।

 

সময় এগিয়ে চলল। অরিন্দম হুইলচেয়ারে বসতে শিখল। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে নন্দিতার চোখের নিচের কালো ছাপও গভীর হতে লাগল। এক সন্ধ্যায় অরিন্দম তাকে বলল,

"তুমি কি ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছ?"

নন্দিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ বলে উঠল,

 "আমি খারাপ মানুষ না অরিন্দম।"

অরিন্দম বিস্মিত হয়ে তাকাল।

"আমি কি বলেছি তুমি খারাপ?"

"না। কিন্তু সবাই হয়তো বলবে।"

তার গলা কেঁপে উঠল।

আমি প্রতিদিন নিজেকে বোঝাই যে আমি পারব। তোমার পাশে থাকব। কিন্তু রাতে বাসায় ফিরে আমি ভেঙে পড়ি। আমি ভয় পাই। খুব ভয় পাই।

অরিন্দম চুপ করে শুনছিল। নন্দিতা চোখ মুছল।

"আমি তোমাকে ভালোবাসি। এখনও ভালোবাসি। কিন্তু তোমাকে এই অবস্থায় দেখলে আমার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যায়।" তারপর হঠাৎ মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল।

"আমি এতটা শক্ত না, অরিন্দম। আমি পারছি না।"

অরিন্দমের বুকেও তখন অদ্ভুত যন্ত্রণা। সে হাত বাড়িয়ে নন্দিতার হাত ধরল। কিন্তু সেই হাতেও ছিল অসহায়ত্ব।

 

আরও কয়েক সপ্তাহ পরে। সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। হাসপাতালের কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছিল ধীরে ধীরে। নন্দিতা অনেকক্ষণ নীরব ছিল। তারপর বলল,

"আমার মনে হয় আমি হারিয়ে যাচ্ছি।"

অরিন্দম শান্ত গলায় বলল,

"তাহলে নিজেকে খুঁজে নাও।"

নন্দিতা চোখ তুলে তাকাল। তার চোখ লাল।

"তুমি রাগ করবে না?"

"কিসের জন্য?"

"যদি আমি আর না পারি?"

অরিন্দম অনেকক্ষণ কিছু বলল না। তারপর খুব ধীরে বলল,

"ভালোবাসা কখনো কারাগার না, নন্দিতা।"

কথাটা শুনেই নন্দিতা ভেঙে পড়ল। হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সে অরিন্দমের হাত দুটো নিজের কপালে চেপে ধরে বলল,

"আমাকে ক্ষমা করো। আমি সত্যিই চেষ্টা করছি। কিন্তু আমি মনে হয় আর পারছি না।"

অরিন্দমের চোখও ভিজে উঠেছিল। সে শুধু বলল,

"তুমি সুখে থেকো।"

সেদিন কেবিন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় নন্দিতা একবারও পেছনে তাকায়নি। কারণ সে জানত, একবার তাকালে আর চলে যেতে পারবে না।

 

সেদিনের পর অনেকদিন নন্দিতার কোনো খবর পায়নি অরিন্দম।

হাসপাতালের দিনগুলো ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছিল। শরীরের ব্যথার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখছিল সে। কিন্তু মনের ভেতরের শূন্যতাটা যেন আরও গভীর হয়ে উঠছিল।

প্রায় তিন মাস পর এক বিকেলে একটি খাম এসে পৌঁছায় সেন বাড়িতে। অরিন্দম অনেক আগেই হাসপাতাল থেকে বাসায় চলে এসেছে। বাসায়ই ফিজিও থেরাপি চলছে। চিঠিটা অরিন্দমকে দিয়ে যায় কাজের লোক।

 

খাম খুলতেই অরিন্দম থমকে গেল। সাদা মোটা কাগজের ওপর সোনালি অক্ষরে লেখা: “নন্দিতা রায় ও রাহুল মুখার্জি।

এক মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতরটা যেন শূন্য হয়ে গেল। কার্ডটা হাতে নিয়েই সে অনেকক্ষণ স্থির বসে রইল। আঙুলের ডগা সামান্য কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, কাগজের এই কয়েকটি শব্দ যেন তার জীবনের একটি অধ্যায়ের শেষ ঘোষণা করে দিল।

মা সুলেখা সেন পাশেই ছিল। কিছু বললেন না। শুধু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

অরিন্দম ধীরে ধীরে কার্ডটা বন্ধ করে নিজের ঘরে চলে গেল। ঘরটায় তখন সন্ধ্যার আলো। জানালার পাশে রাখা বুকশেলফের ওপর একটি ছোট কাঠের বাক্স ছিল। বহুদিন সে বাক্সটি খোলেনি। কি এক অদ্ভুত টানে সে বাক্সটি খুলল। ভেতরে সাজিয়ে রাখা কয়েকটি পুরনো ছবি। হার্ভার্ডের গ্রন্থাগারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নন্দিতা। চার্লস নদীর ধারে দুজনের হাসিমুখ। আরেকটি ছবিতে নন্দিতা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে দূরের আকাশের দিকে।

অরিন্দম ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।

প্রতিটি ছবির সঙ্গে যেন জেগে উঠছিল বহুদিন চাপা পড়ে থাকা স্মৃতি।

"তুমি কি আমার জীবনের স্থায়ী ঠিকানা হবে?"

"আমি যদি ভাঙি, তোমার কাঁধেই ভাঙব।"

কথাগুলো যেন আবার কানে ভেসে এলো।

অরিন্দম চোখ বন্ধ করল। হুইলচেয়ারের হাতলে তার আঙুল শক্ত হয়ে উঠল। বুকের ভেতর এমন এক ব্যথা জমছিল, যার কোনো চিকিৎসা নেই।

সেদিন রাতে তার ঘুম আসেনি। বারবার ঘড়ির কাঁটা দেখেছে। জানালার বাইরে তাকিয়েছে। কখনো বিছানায় শুয়েছে, কখনো হুইলচেয়ারে বসে থেকেছে। রাত যত গভীর হয়েছে, ততই মনে হয়েছে পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়েছে, শুধু তার ভেতরের স্মৃতিগুলো জেগে আছে। একসময় সে আবার সেই বিয়ের কার্ডটা হাতে নীল।

অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে খুব ধীরে বলল,

"তুমি সুখী হও, নন্দিতা। সত্যিই সুখী হও।"

কথাটা বলার সময় তার গলা কেঁপে উঠেছিল। চোখের কোণে জমে থাকা জল সে হাতের উল্টো পিঠে মুছে ফেলল।

তারপর ছবিগুলো আবার বাক্সে ভরে রাখল। একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।

মনে হলো, জীবনের সবচেয়ে প্রিয় স্বপ্নটাকে সে নিজের হাতেই বিদায় জানিয়ে দিল।

পরদিন সকালে যখন সূর্যের আলো জানালা ভেদ করে ঘরে ঢুকল, অরিন্দমের মুখে আগের মতোই শান্ত হাসি ছিল।

কিন্তু সেই রাতের পর সে আর আগের মানুষটি ছিল না।

 

পরদিন মা  মা সুলেখা সেন ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,

যাবি?”

অরিন্দম জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তবে আশীর্বাদ দিতে ভয় কিসের, মা?”

বিয়ের দিন সন্ধ্যায় সে হুইলচেয়ারে বসেই অনুষ্ঠানে গিয়েছিল। আলো ঝলমলে মঞ্চে নন্দিতাকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য হার্ভার্ডের সেই প্রথম বিকেলটা মনে পড়ে গেল। গ্রন্থাগারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লাজুক মেয়েটি আজ অন্য এক জীবনের দোরগোড়ায়।

নন্দিতা ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল। চোখ দুটো ভিজে ছিল।

তুমি আমাকে ক্ষমা করবে?”

অরিন্দম মৃদু হাসল।

ক্ষমা করার মতো কোনো অপরাধ তুমি করো নাই।

নন্দিতা চুপ করে রইল। অরিন্দম আবার বলল,

মানুষ সব সময় তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার সঙ্গে থাকতে পারে না। কিন্তু তাই বলে ভালোবাসাটা মিথ্যা হয়ে যায় না।

নন্দিতার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। অরিন্দম বলল,

তোমার হাসিটা যেন কোনোদিন ম্লান না হয়।

বিদায় নেওয়ার আগে নন্দিতা খুব আস্তে বলেছিল,

তুমি খুব ভালো মানুষ, অরিন্দম।

ফিরতি পথে পুরো রাস্তা জুড়ে অরিন্দম একটাও কথা বলেনি। সেদিন রাতে নিজের ঘরে ফিরে সে অনেকক্ষণ জানালার পাশে বসে ছিল। তারপর জীবনে প্রথমবারের মতো নন্দিতাকে ভুলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।

অরিন্দমের দেখ ভালের জন্য বাড়িতে চব্বিশ ঘণ্টার জন্য একজন পুরুষ নার্স নিয়োগ করা হলো।

পাশাপাশি একজন নারী কেয়ারগিভারের জন্যও বিজ্ঞাপন দেওয়া হলো।

কেউ জানত না,যে মেয়েটি কয়েক দিনের মধ্যে সেন বাড়িতে প্রবেশ করবে, সেই মেয়েই একদিন অরিন্দমের জীবন বদলে দেবে।