স্যার, আগের মতোই দেব?


লন্ডনের সকালগুলো যেন প্রতিদিন নতুন কোনো নাটকের প্রথম দৃশ্য।

টান টান উত্তেজনা, অদৃশ্য প্রত্যাশার মৃদু কম্পন আর ছন্দময় ব্যস্ততার ঢেউ একসঙ্গে শহরটিকে জাগিয়ে তোলে। কাঁচের দেয়ালে আটকে থাকা রোদ, দ্রুত পায়ে রাস্তা পার হওয়া মানুষ, দূর থেকে ভেসে আসা আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনের গর্জন, সব মিলিয়ে শুরু হয় জীবনের এক অনবদ্য মঞ্চায়ন। কখনও কনকনে ঠাণ্ডা আর ঝড় বৃষ্টিতে বিষণ্ণ লাগে শহরটাকে। আবার কখনও নরম রৌদ্র আর হালকা বাতাসে মনে হয় পৃথিবী এখনো নিঃশব্দে সুন্দর হয়ে ওঠার শিল্প জানে।

এই ধরনের সকালগুলো খুবই প্রিয় শুভংকরের। বিশেষ করে যেদিন তার ক্লাস থাকে। হ্যারো-অন-দ্য-হিল স্টেশন থেকে হলবর্ন পর্যন্ত যাত্রাটা তার কাছে শুধু পথ পাড়ি দেওয়া নয়। এই যেন চির চেনা শহরটাকে নতুন করে দেখার এক চমৎকার অভ্যাস।

ঘর থেকে বেরিয়ে পার্কের ভেতর দিয়ে স্টেশনে পৌঁছতে তার প্রায় বিশ মিনিট লাগে। দিনের সবচেয়ে শান্ত সময় যেন এটাই। শহরের কোলাহল তখন একটু দূরে সরে দাঁড়ায়। শিশির ভেজা ঘাস, উঁচু গাছের ফাঁক দিয়ে নেমে আসা আলো, দূরে টেনিস বলের টুপটাপ শব্দ, সব মিলিয়ে জায়গাটা অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে থাকে।

পার্কের এক দিকে ছোট্ট  শিশু পার্কে রঙিন দোলনায় বাচ্চাদের হাসির শব্দ বাতাসে ভেসে বেড়ায়। চারদিক সবুজ গাছ-গাছালি, নাম না-জানা ঝোপ, আর ঋতুভেদে ফোটা নানা রঙের ফুলে পার্কটা যেন এক টুকরো স্বপ্নরাজ্য। কোথাও গোলাপের গাঢ় লাল, কোথাও ল্যাভেন্ডারের মিষ্টি গন্ধ, কোথাও আবার হলুদ ড্যাফোডিল মাথা দোলায় বাতাসে।

অন্যদিকে পাখিদের কিচিরমিচির ডাক যেন অদৃশ্য কোনো অর্কেস্ট্রার সুর তোলে। কাঠবিড়ালিরা এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফিয়ে বেড়ায়। মাঝে মাঝে পথের ধারে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী চোখে মানুষের দিকে তাকায়। ঠাণ্ডা বাতাসে ভেজা পাতার গন্ধ আর দূরের ঘাস কাটার মৃদু শব্দ মিলেমিশে এমন এক আবহ তৈরি করে। এসব শুভংকরের মনকে অদ্ভুত শান্তিতে ভরিয়ে দেয়।

স্টেশনে পৌঁছতেই আবার বদলে যায় দৃশ্য। সকালের ভিড়ে প্ল্যাটফর্ম গমগম করে। ট্রেন এসে থামলে মুহূর্তের মধ্যে মানুষ নেমে যায়, উঠে পড়ে, ছুটতে থাকে নিজেদের গন্তব্যের দিকে। শুভংকর চুপচাপ দাঁড়িয়ে মানুষের মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। ক্লান্ত চোখ, কানে হেড ফোন গুঁজে বসে থাকা তরুণ-তরুণী, তাড়াহুড়োয় হাঁটা অফিসগামী মানুষ। প্রতিটি মুখ যেন আলাদা এক জীবনের গল্প বয়ে বেড়াচ্ছে।

এক সময় ট্রেনটা ধীরে ধীরে শহরের গভীরে ঢুকে যেতে থাকে। এ যেন ইস্পাতের এক দীর্ঘশ্বাস অন্ধকারের ভেতর গড়িয়ে চলেছে। জানালার কাঁচে আলো-ছায়ার দাগ লেগে থাকে। একটার পর একটা স্টেশন পিছিয়ে যায়, যেন সময় নিজেই নীরবে সরে যাচ্ছে।

জানালার ধূসর কাঁচে নিজের অস্পষ্ট প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে শুভংকরের হঠাৎ মনে হয়, এই শহরের ভেতর দিয়েই তো সে কত বছর ধরে বয়ে চলেছে। একই স্টেশন, একই ভিড়, একই তাড়াহুড়োর পায়ের শব্দ। প্রতিদিন যেন একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। তবু দিন শেষে বাসার দরজা খুললে এখনো তাকে স্বাগত জানায় এক চেনা মিষ্টি মুখ, ছোট্ট উষ্ণ একটা ঘর, যেখানে ফিরে এসে মনে হয় পৃথিবীটা পুরোপুরি নির্দয় হয়ে যায়নি।

 

কখনো কখনো শুভংকরের মনে হয়, লন্ডন মানুষকে খুব ধীরে, খুব অদৃশ্যভাবে নীরব করে দেয়। এখানে চারপাশে অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য আলো, অসংখ্য শব্দ। তবু নিজের ভেতরের ক্লান্তিটুকু খুলে বলার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। যেন এই শহরে সবাই পাশাপাশি হাঁটে, কিন্তু কেউ কারও ভেতরে পৌঁছায় না।

তাই হয়তো সে ট্রেনের ভিড়ে মানুষের মুখের দিকে এত তাকিয়ে থাকে। যেন অচেনা জীবনের ভেতর নিজের এক টুকরো সঙ্গ খুঁজে বেড়ায়।

সপ্তাহে দুদিন তাকে হলবর্ন ক্যাম্পাসে যেতে হয়। কিংস ক্রস হয়ে পিকাডেলি লাইন ধরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তার মনে হয়, লন্ডন আসলে শুধু ইট-কাঠের শহর নয়। এটি হাজারো অচেনা মানুষের নীরব সংগ্রাম আর স্বপ্নের সমষ্টি।

 

কিংস ক্রসে নামলেই যেন অন্য এক পৃথিবী শুরু হয়। চারদিক থেকে মানুষের ঢল নেমে আসে। কেউ দৌড়ে এসকেলেটরে উঠছে। কেউ মোবাইলে কথা বলতে বলতে তাড়াহুড়ো করে পথ কেটে এগিয়ে যাচ্ছে।  আবার কেউ হঠাৎ থেমে ম্যাপ দেখে বিভ্রান্ত চোখে চারপাশ খুঁজছে। ভিড়ের সেই অস্থির স্রোতে শুভংকরও গা ভাসিয়ে হাঁটে দ্রুত পায়ে। মাঝে মাঝেই অনিচ্ছায় কারো কাঁধে ধাক্কা লাগে। কেউ বিরক্ত চোখে তাকায়, কেউ ঠোঁট বাঁকিয়ে নিচু স্বরে কিছু বলে ওঠে। আবার কখনো ক্লান্ত কোনো বৃদ্ধ ভদ্রলোকের অনুতপ্ত কণ্ঠে ভেসে আসা “সরি মেট” শুনে শুভংকরের ঠোঁটেও অজান্তেই এক টুকরো মৃদু হাসি ফুটে ওঠে।

প্ল্যাটফর্ম বদলানোর সেই ছোট্ট পথটুকুতেই যেন প্রতিদিন অসংখ্য জীবনের সঙ্গে ক্ষণিকের দেখা হয়ে যায়। কোথাও এক শিশু মায়ের হাত ধরে কান্না জুড়ে দিয়েছে। কোথাও এক তরুণী কফির কাপ সামলে বন্ধুকে বলছে রাতভর কাজের গল্প। আবার কোনো কোণে গিটার হাতে এক পথশিল্পী ভাঙা গলায় গান গেয়ে চলেছে। এই অগোছালো ভিড়, ধাক্কাধাক্কি আর ছুটে চলার মাঝেও শুভংকরের বেশ ভালো লাগে।

হলবর্ন স্টেশনে নামলেই লন্ডনের আরেকটি রূপ চোখে পড়ে। জায়গাটা যেন একই সঙ্গে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশ্রণ। পুরনো স্থাপত্যের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা আধুনিক অফিস ভবন, রাস্তার পাশে ছোট ক্যাফে, ব্যস্ত ছাত্রছাত্রী, স্যুট পরা কর্মজীবী মানুষ। সব মিলিয়ে হলবর্নের এক আলাদা প্রাণ আছে।

 

হাঁটতে হাঁটতে ক্যাম্পাসের দিকে গেলে রাস্তার এক পাশে ওয়াটার স্টোন বিশাল বইয়ের দোকানটি চোখে পড়ে। কোথাও কেউ গিটার বাজাচ্ছে, কেউ একজন “দা বিগ ইস্যু” সাপ্তাহিকীটি হাতে নিয়ে অনবরত `গুড মর্নিং` বলে যাচ্ছে, কোথাও আবার মানুষ কফির কাপ হাতে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। এই ব্যস্ত শহরের মাঝেও হলবর্নের মধ্যে এক ধরনের মানবিক উষ্ণতা আছে, যা শুভংকরকে বারবার টানে।

 

ক্যাম্পাসের পাশের ছোট্ট তুর্কি রেস্টুরেন্টটা বাইরে থেকে খুব সাধারণ। কাঁচের জানালা, সাদামাটা সাইনবোর্ড, দরজার সামনে দু-একটা ছোট টেবিল। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই অন্যরকম এক উষ্ণতা টের পাওয়া যায়। নরম গরম রুটির গন্ধ, কাবাবের ধোঁয়া, কফি মেশিনের শব্দ আর মানুষের কথাবার্তার গুঞ্জনে জায়গাটা সবসময় জীবন্ত হয়ে থাকে।

দেয়ালে ঝুলে থাকা ইস্তান্বুলের কয়েকটি ছবি আর কোণের পুরনো স্পিকারে বাজতে থাকা মৃদু তুর্কি সুর জায়গাটাকে আরও আপন করে তোলে। দুপুরের দিকে প্রায়ই ভিড় লেগে থাকে। বাবুর্চিরা ওপেন কিচেনে দ্রুত হাতে কাজ করে যায়, আর লোকজনের ব্যস্ততার মাঝেও রেস্টুরেন্টটার ভেতরে অদ্ভুত এক মানবিক উষ্ণতার টের পাওয়া যায়

শুভংকর প্রায়ই সেখানে যায়। কখনো কফি, কখনো কাবাব। তবে খাবারের চেয়ে জায়গাটার আবহই তাকে বেশি টানে। সেখানেই একদিন পরিচয় হয় আরেফিনের সঙ্গে।

সেদিন রেস্টুরেন্টে বেশ ভিড় ছিল। শুভংকর বাংলায় কথা বলছিল তার এক সহকর্মীর সঙ্গে। হঠাৎ পাশের টেবিল থেকে এক যুবক দ্বিধাভরা মুখে এগিয়ে এসে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল—

— “স্যার, আপনি কি বাংলাদেশের?”

বিদেশের শহরে হঠাৎ নিজের দেশের নাম শুনলে বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা টান লাগে। শুভংকর তাকিয়ে রইল ছেলেটার দিকে। তারপর ধীরে মাথা নাড়ল।

— “হ্যাঁ… আমি বাংলাদেশি। আপনি?”

ছেলেটার মুখে তখন ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠছিল।

তার নাম আরেফিন। কুমিল্লার দাউদকান্দির ছেলে।

 

কথাটা শোনার পর শুভংকরের বুকের ভেতর যেন হঠাৎ অদ্ভুত এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। কারণ সেও তো একই জেলার মানুষ। হাজার মাইল দূরে, লন্ডনের ব্যস্ত আর নির্লিপ্ত শহরে, হঠাৎ নিজের জেলার কাউকে খুঁজে পাওয়া যেন আচমকা বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া কোনো গন্ধ ফিরে পাওয়ার মতো।

প্রথম দিন রেস্টুরেন্টে ঢোকার পর থেকেই ছেলেটিকে শুভংকরের চোখে আলাদা লেগেছিল। খুব ভদ্র আর নরম স্বরে সে জিজ্ঞেস করেছিল—

— “স্যার, কি দেব আপনাকে?”

তার কণ্ঠে ছিল এক ধরনের সহজ মায়া, চোখে আন্তরিকতার স্বচ্ছ আলো। মাঝারি গড়নের শ্যামলা চেহারা, মুখে সবসময় শান্ত আর বিনয়ী এক হাসি লেগে থাকে। পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে, যাদের উপস্থিতিতেই অকারণে মন শান্ত হয়ে আসে। আরেফিন ঠিক তেমনই একজন।

সেদিনের সেই ছোট্ট আলাপ যেন অদৃশ্যভাবে দূরত্বগুলো কমিয়ে দিয়েছিল।

তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই শুভংকর রেস্টুরেন্টে এলে আরেফিন আগের মতোই হাসিমুখে এগিয়ে আসত।

— “স্যার, আজকে কি খাবেন?”

কখনো আবার কফি দিতে দিতে বলত—

— “স্যার, আগের মতোই বানাই?”

এই সাধারণ প্রশ্নগুলোর ভেতরেও যে এতখানি আন্তরিকতা লুকিয়ে থাকতে পারে, তা আরেফিনকে না দেখলে বোঝা কঠিন। তার “স্যার, আজকে কি খাবেন?” কিংবা “আগের মতোই দেব?” কথাগুলো শুধু সৌজন্য ছিল না। এই যেন দূরদেশে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে একটু আপন করে ডাকার চেষ্টা।

একদিন দরজার পাশেই একটি টেবিল নিয়ে বসে শূভংকর।

এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই আরেফিন তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল। হাতে থাকা ট্রেটা কাউন্টারে রেখে চেয়ার টেনে দিল তার জন্য।

— “আস্তে স্যার… এখানে বসেন।”

ভদ্রলোক কোট খুলতে একটু হিমশিম খাচ্ছিলেন। আরেফিন কিছু না বলেই সাহায্য করল। তারপর টেবিলে পানি রেখে আগের মতোই হাসল।

শুভংকর লক্ষ্য করল, এত ভিড়ের মাঝেও ছেলেটার মুখে বিরক্তির ছায়া নেই।

 

শুভংকরের মাঝে মাঝে মনে হতো, জীবনের কষ্ট মানুষটাকে কঠিন করেনি। বরং আরও নরম, আরও মানবিক করে তুলেছে।

একদিন কফি খেতে খেতে শুভংকর হেসে জিজ্ঞেস করেছিল—

— তুমি সবসময় এত হাসিখুশি থাকো কীভাবে?

আরেফিন একটু চুপ করেছিল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলেছিল—

— স্যার, মানুষকে হাসিমুখে সেবা দিলে নিজের মনও ভালো থাকে।

কথাটা শুনে শুভংকর কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। কথাটা খুব সাধারণ, অথচ কোথায় যেন গভীর এক সত্য লুকিয়ে ছিল। এই শহরে প্রতিদিন কত মানুষ শুধু নিজের জন্য বাঁচতে বাঁচতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আর সেখানে দাঁড়িয়ে এক সাধারণ রেস্টুরেন্ট কর্মী জীবনের এত বড় দর্শন কত সহজে বলে ফেলল!

ধীরে ধীরে শুভংকর জানতে পারল আরেফিনের জীবনের গল্প। সে নিজের কষ্টের কথা খুব একটা বলত না। বরং পরিবারের কথা উঠলেই তার কণ্ঠ বদলে যেত। বিশেষ করে স্ত্রী আর সন্তানের কথা বলতে গেলে তার চোখে অদ্ভুত এক আলো জ্বলে উঠত। যে আলো কোনো ধনী মানুষের নয়, বরং গভীর ভালোবাসায় বেঁচে থাকা মানুষের।

একদিন খুব স্বাভাবিকভাবেই বলেছিল, তার স্ত্রী পিএইচডি শেষ করেছে।

কথাটা বলার সময় তার মুখে গর্ব ছিল, কিন্তু সেই গর্বের ভেতরে লুকিয়ে ছিল দীর্ঘ সংগ্রামের ছাপ। দিনের পর দিন এই রেস্টুরেন্টে কাজ করে, নিজের ক্লান্তি আর স্বপ্নগুলো একটু পাশে সরিয়ে রেখে সে স্ত্রীর পড়াশোনার খরচ চালিয়েছে। হয়তো গভীর রাতে বাসায় ফিরেছে, আবার ভোরে উঠে কাজে এসেছে। কিন্তু প্রিয় মানুষটার স্বপ্ন যেন থেমে না যায়, সেটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় চিন্তা।

তারপর যখন তাদের প্রথম কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। তার স্ত্রী চাকরি ছেড়ে পুরো সময় সন্তানকে বড় করার সিদ্ধান্ত নেয়।

আরেফিন সেদিন ধীরে ধীরে বলেছিল—

— স্যার, বাচ্চার ছোটবেলার সময়টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাইছিলাম, ও মানুষ হোক ঠিকভাবে।

“মানুষ হোক” এই দুটো শব্দ বলার সময় তার চোখের ভেতরে যে মায়া আর দায়িত্ববোধ দেখা গিয়েছিল, সেটা শুভংকর আজও ভুলতে পারেনি।

এখন তাদের মেয়ে খুব মেধাবী। মেয়ের গল্প বলতে শুরু করলে আরেফিনের মুখের হাসিটা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত পরিশ্রম, সমস্ত অপূর্ণতা, সমস্ত ক্লান্তি যেন সেই ছোট্ট শিশুর হাসির মধ্যেই গলে গেছে।

শুভংকর প্রায়ই ভাবত, লন্ডনের ব্যস্ত হলবর্ন এলাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ হাঁটে। কেউ বড় অফিসে কাজ করে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করে, কেউ ব্যবসার পেছনে ছুটে বেড়ায়। এই শহর বাইরে থেকে ঝলমলে, দ্রুত, নির্লিপ্ত।

কিন্তু শহরের আসল সৌন্দর্য হয়তো লুকিয়ে আছে আরেফিনের মতো মানুষদের ভেতরে।

যারা নিঃশব্দে ভালোবাসার দায়িত্ব পালন করে যায়। যারা নিজের স্বপ্নকে একটু আড়ালে রেখে প্রিয় মানুষের স্বপ্ন পূরণ হতে দেখে সুখ খুঁজে নেয়। যারা কঠিন জীবনকেও মুখের এক টুকরো হাসি দিয়ে নরম করে ফেলতে জানে।

আজও যখন শুভংকর হারো-অন-দ্য-হিল থেকে ট্রেনে করে হোবর্নে আসে, মাঝে মাঝে তার মনে হয়, এই বিশাল শহরের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর একটি হয়তো সেই ছোট্ট তুর্কি রেস্টুরেন্ট, যেখানে কুমিল্লার দাউদকান্দির এক সাধারণ মানুষ প্রতিদিন নিঃশব্দে অসাধারণ মানবিকতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে।

 

ধীরে ধীরে ওদের মধ্যে পরিচয় বাড়তে লাগল। শুভংকর যখনই যেতো, সে সময় বের করে দু-এক মিনিট গল্প করত। তার কথাবার্তায় কখনও অভিযোগ ছিল না। বরং ছিল কৃতজ্ঞতা আর পরিবারের প্রতি গভীর ভালোবাসা।

একদিন রেস্টুরেন্টে ভিড় একটু কম ছিল। বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছিল। জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা জমে ছোট ছোট রেখা তৈরি করছিল। শুভংকর কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল। তখনই আরেফিন পাশে এসে দাঁড়াল। সেদিনই প্রথম সে নিজের জীবনের গল্প খুলে বলল।

সে বলল, স্যার, আমি বেশি পড়াশোনা করতে পারিনি। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম আমার স্ত্রী যেন বড় কিছু করতে পারে।

তার স্ত্রী উচ্চশিক্ষা নিতে চেয়েছিল। পিএইচডি করার স্বপ্ন ছিল তার। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য আরেফিন নিজের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিল। দিনের পর দিন দীর্ঘ সময় কাজ করেছে। কখনও ডাবল শিফট করেছে, কখনও নিজের প্রয়োজনকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।

সে হাসতে হাসতে বলল,

“অনেক সময় নিজের জন্য কিছু কিনিনি। কিন্তু যখন দেখতাম আমার স্ত্রী পড়াশোনায় এগিয়ে যাচ্ছে, তখন মনে হতো আমি জিতে যাচ্ছি।”

তার চোখে তখন অদ্ভুত এক গর্ব ছিল।

শুভংকর তখন জানতে চেয়েছিল তার স্ত্রী কাজ করছে কিনা।

“আগে করতো। মেয়েটা জন্ম নেওয়ার পর নিজেই ছেড়ে দিয়েছে”

-কেন?-শুভংকর জানতে চায়

-টাকা আবার আয় করা যায় স্যার। কিন্তু সন্তানের শৈশব একবারই আসে। সন্তানকে ঠিক ভাবে মানুষ না করতে পারলে টাকা-পয়সা দিয়ে কি হবে স্যার?

কথাটা শুনে শুভংকর কিছুক্ষণ চুপ হয়ে ছিল।

একদিন সে মোবাইলে মেয়ের ছবি দেখাচ্ছিল। ছবির দিকে তাকিয়ে তার চোখ ভরে উঠছিল গর্বে। সে বলল,

“স্যার, আমি চাই আমার মেয়ে মানুষের মতো মানুষ হোক। বড় ডিগ্রি নিলেই বড় মানুষ হওয়া যায় না।”

তার এই সাধারণ কথার ভেতরে গভীর জীবনদর্শন লুকিয়ে ছিল।

শুভংকরের মনে হলো, হলবর্নের সেই ছোট্ট তুর্কি রেস্টুরেন্টে বসেই যেন জীবনের সবচেয়ে বড়ো  শিক্ষাটি পেয়েছে। সে নতুন করে অনুধাবন করলো, মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব তার পদবি বা সম্পদে নয়, বরং তার দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা আর ত্যাগের মধ্যে।

আরেফিন নিজের স্বপ্নগুলো খুব নিঃশব্দে পাশে সরিয়ে রেখেছিল। দিনের পর দিন এই রেস্টুরেন্টে দাঁড়িয়ে কাজ করেছে। রাত গভীর করে বাসায় ফিরেছে, আবার ভোরে বেরিয়েছে। মানুষের টেবিলে গরম রুটি আর কাবাব পৌঁছে দিতে দিতে সে আসলে গড়ে তুলছিল আরেকটি জীবনের ভিত। তার স্ত্রীর পিএইচডি শেষ হওয়ার পেছনে ছিল এই মানুষটার অদৃশ্য ত্যাগ, অবিরাম পরিশ্রম আর নীরব ভালোবাসা।

প্রায় সব মানুষই নিজের স্বপ্ন পূরণে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু আরেফিন প্রিয় মানুষটার স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন বানিয়ে নিয়েছিল।

সন্তান জন্মের পর তার স্ত্রী চাকরি ছেড়ে পুরো সময় সন্তানকে বড় করার সিদ্ধান্ত নেয়। কথাটা বলতে গিয়ে আরেফিনের কণ্ঠে কখনও আফসোস ছিল না। বরং এক ধরনের গর্ব মিশে থাকত।

সে ধীরে ধীরে বলেছিল—

— আমার স্ত্রী আমাদের সন্তানের জন্য নিজের সময় দিচ্ছে… এটাই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ, স্যার।

সেদিন কথাটা শুনে শুভংকর দীর্ঘক্ষণ চুপ করে ছিল। কারণ এই শহরে সে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে দেখেছে। কেউ অর্থের পেছনে ছুটছে, কেউ সাফল্যের পেছনে, কেউ পরিচিতির পেছনে। কিন্তু খুব কম মানুষই আছে, যারা ভালোবাসাকে এত নিঃস্বার্থভাবে বাঁচতে পারে।

মেয়ে এখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। তার ছোট ছোট অর্জনের গল্প বলতে গেলেই আরেফিনের চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তখন তাকে আর সাধারণ কোনো রেস্টুরেন্ট কর্মী মনে হয় না। মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু জিনিস হয়তো সে ঠিকই অর্জন করেছে।

একদিন কফির কাপ নামিয়ে খুব শান্ত গলায় সে বলেছিল—

— “স্যার, বড় মানুষ হওয়া আর বড় ডিগ্রি নেওয়া এক জিনিস না।”

কথাটা বলে সে আবার কাজে ফিরে গিয়েছিল। যেন খুব সাধারণ কিছু বলেছে।

রেস্টুরেন্টের কাঁচে তখন বৃষ্টির ফোঁটা জমছিল। ভেতরে কাবাবের ধোঁয়া, মানুষের কথাবার্তা আর কাপের টুংটাং শব্দ মিলেমিশে এক ধরনের উষ্ণতা তৈরি করছিল। আর সেই ভিড়ের মাঝখানে আরেফিন আগের মতোই হাসিমুখে টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।

হলবর্ন থেকে ফেরার পথে ট্রেনের জানালায় নিজের অস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখতে দেখতে শুভংকরের হঠাৎ মনে হলো, এই শহরটা হয়তো পুরোপুরি নির্লিপ্ত নয়।

কারণ এখনো কিছু মানুষ আছে, যারা নিঃশব্দে অন্য মানুষের স্বপ্ন বয়ে নিয়ে চলে। আর হয়তো এই কারণেই পৃথিবী এখনো পুরোপুরি নিষ্ঠুর হয়ে যায়নি।

পরের সপ্তাহে আবার রেস্টুরেন্টে ঢুকতেই দূর থেকে আরেফিনের পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো—

— “স্যার, আগের মতোই দেব?”