অনির্বাণ


পরীক্ষার ফল বেড় হওয়ার দিনের সেই সকালটা আজও অনির্বাণ ভুলতে পারছে না।

ঝকঝকে উজ্জ্বল আগস্টের সকাল। সেদিন স্কুলের হল রুমটা অস্বাভাবিক নীরব লাগছিল। অথচ সকলেই আজ উপস্থিত। ভেতরে সারি সারি চেয়ার জুড়ে বসে আছে ছাত্র-ছাত্রীরা। সবার চোখে একই অনুভূতি। উদ্বেগ, আশা, আর অজানা এক ভয়।

আজ এ-লেভেল পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন।

অনির্বাণের হাত কাঁপছিল। নিজের দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরে বসেছিল। তার বুকের ভেতরটা জোরে কাঁপছিল। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা যেন অস্বাভাবিক জোরে ধুকপুক করছে। অনির্বাণের মনে হচ্ছিল আশেপাশের সবাই হয়তো সেই শব্দ শুনতে পাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হয়তো প্রমাণ হয়ে যাবে, সে সত্যিই অযোগ্য, নাকি এতদিন সবাই ভুল ছিল।

তার কানে তখনও ভেসে আসছিল সেই তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর:

“এডভান্স ম্যাথস তোমার জন্য নয়, অনির্বাণ। তুমি অন্যদের মতো মেধাবী নও। তুমি পারবে না”

মিসেস হার্ডিংয়ের কথাগুলো গত কয়েক মাস ধরে তার আত্মবিশ্বাসকে ধীরে ধীরে ভেঙে দিয়েছিল। একসময় যে ছেলেটি বড় বড় স্বপ্ন দেখত, সে-ই এখন নিজের ছায়াকেও ভয় পায়। আয়নার সামনে দাঁড়ালেও নিজেকে অসম্পূর্ণ মনে হয়।

কিন্তু আজকের সকালটা শুধু একটি ফলাফলের দিন ছিল না।

আজ ছিল নিজের বিরুদ্ধে নিজের যুদ্ধের শেষ দিন।

মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষকরা একে একে খামগুলো বিতরণ করছিলেন। প্রতিটি খামের ভেতরে লুকিয়ে ছিল কারও স্বপ্ন, কারও ভবিষ্যৎ। আবার কারও ভেঙে যাওয়া আত্মবিশ্বাসের গল্প। খাম খুলে কেউ কেউ আবার উল্লাসে লাফিয়ে উঠছে।

 

অনির্বাণের নাম ডাকা হলো।

কাঁপা হাতে খামটা নিলো অনির্বাণ। চারপাশের শব্দ যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। শুধু নিজের হৃৎস্পন্দনটাই শুনতে পাচ্ছিল সে।

খামটা হাতে নিয়েও অনির্বাণ সেটি খুলতে পারছিল না। ভয় পাচ্ছিল। হয়তো মিসেস হার্ডিং ঠিকই বলেছিলেন। খামের প্রান্তটা ছিঁড়তে গিয়ে তার আঙুল কেঁপে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে ভেতরের কাগজটা বের করল।

আর পরের মুহূর্তেই সময় যেন থেমে গেল।

Mathematics- A*

Physics - A*

English- A*

 

অনির্বাণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েক মুহূর্তের জন্য পৃথিবীটা যেন থেমে গেল। তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না। যে ছেলেটিকে একদিন বলা হয়েছিল সে পারবে না, সেই ছেলেই আজ অসম্ভবকে সম্ভব করেছে।

ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত, শান্ত একটি কণ্ঠ:

“আমি জানতাম তুমি পারবে।”

অনির্বাণ ধীরে ধীরে ফিরে তাকাল।

হল রুমের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন মিস্টার গ্রিফিন। তাঁর মুখে সেই পরিচিত মৃদু হাসি। কিন্তু চোখে ছিল এক অদ্ভুত গর্বের দীপ্তি।

আর সেই মুহূর্তে অনির্বাণ বুঝতে পারল:

কখনও কখনও একজন মানুষের বিশ্বাসই আরেকজন মানুষের পুরো জীবনটাকে বদলে দিতে পারে।

 

অনির্বাণ লন্ডনের এক শান্ত শহরতলিতে বড় হয়েছে। বাবা-মা দুজনেই শিক্ষক। বড় দাদা অনিরুদ্ধ তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ছোটবেলা থেকেই অনিরুদ্ধ তাকে শিখিয়েছিল, সফলতা প্রতিভা থেকে নয়, আসে কঠোর পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাস থেকে।

সেই বিশ্বাস নিয়েই অনির্বাণ কলেজ জীবন শুরু করেছিল। নিয়মিত ক্লাস, মনোযোগী পড়াশোনা আর বড় স্বপ্ন। সবকিছুই ঠিক পথে এগোচ্ছিল। কিন্তু প্রথম সেমিস্টারের কয়েক মাসের মধ্যেই তার জীবনে এমন কিছু ঘটল, যা ধীরে ধীরে তার সমস্ত আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিতে শুরু করল।

কলেজের প্রথম দিন অনির্বাণের মনে ছিল অদ্ভুত এক উত্তেজনা। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ। বড় বড় স্বপ্ন নিয়ে সে নিজের ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করেছিল। তার বিশ্বাস ছিল, কঠোর পরিশ্রম করলে একদিন সে অবশ্যই সফল হবে।

তার প্রথম দিনটি ছিল যেমন উত্তেজনায় ভরা, তেমনই স্বপ্নময়। চমৎকার কলেজের পরিবেশ। শিক্ষার মানও অত্যন্ত ভালো। সেই জায়গায় নিজেকে দেখতে পেয়ে অনির্বাণের মন ছিল আনন্দে ভরা। তার ভেতরে ছিল এক অদম্য আগ্রহ। নতুন কিছু শেখার, নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার। তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস ছিল পূর্ণ। কারণ সে জানত, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। কলেজের ক্যাম্পাসে প্রবেশের সময় তার মনে হয়েছিল, সে যেন এক নতুন জগতে প্রবেশ করছে। প্রতিটি মুহূর্তই যেন হবে শিক্ষার এবং নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার। সেই লক্ষ্যে সে প্রথম দিন থেকেই মনোযোগ দেয়। নতুন বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ জমায়।কলেজের প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিল।

 

কিন্তু হঠাৎ করেই অনির্বাণের উদ্দামতায় ভাটা আসতে থাকে।

পরের সেমিস্টার শুরু হওয়ার পরপরই অনির্বাণের গণিতের ক্লাসে নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হলো। গণিতের শিক্ষিকা মিসেস হার্ডিং ছিলেন অত্যন্ত কঠোর এবং নিয়মমাফিক চলা মানুষ। ক্লাসে তিনি কখনও অপ্রস্তুত উত্তর বা ভুল সহ্য করতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল, গণিতে সফল হতে হলে ছাত্রদের স্বাভাবিকভাবেই দ্রুত বুঝতে হবে।

একদিন ক্লাস শেষে অনির্বাণ সাহস করে তাঁর কাছে গিয়ে বলল,

“ম্যাডাম, আমি গণিতে আরও ভালো করতে চাই। আমার খুব ইচ্ছে এডভান্স ম্যাথস নেওয়ার।”

মিসেস হার্ডিং কিছুক্ষণ তার খাতা দেখলেন।

তারপর একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, "অনির্বাণ, আমি লক্ষ্য করেছি যে, তুমি বাকি ছাত্রদের মতো ততটা মেধাবী নও। এডভান্স ম্যাথস তোমার জন্য নয়। তুমি যে কনসেপ্টগুলো নিয়ে সমস্যায় আছ, তা খুবই সাধারণ। আমার মনে হয়, তোমার উচিত হবে সহজ বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়া।"

 

কথাগুলো হয়তো অপমান করার জন্য বলা হয়নি। কিন্তু অনির্বাণের কাছে সেগুলো ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেওয়ার মতোই মনে হয়েছিল। মনটা যেন ভেঙে গেল। সে নিজের প্রতি আস্থা হারাতে শুরু করল। মিসেস হার্ডিংয়ের কথা শুনে সে ভাবতে লাগল, হয়তো সে সত্যিই গণিতে ভালো নয়। ধীরে ধীরে, সে গণিতের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। তার মনোযোগ কমে গেল। ক্লাসের অন্য ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েও সে অস্বস্তি বোধ করত।

 

ইদানীং ম্যাথস ক্লাসে মিসেস হার্ডিং তাকে অন্যান্য ছাত্রদের সামনে অপমান করতেন। অন্যদের সাথে তুলনা করতেন।

 

রাতের পর রাত অনির্বাণ ডেস্কে বসে থাকত। বই খোলা থাকত, কিন্তু চোখের সামনে শুধু একটি বাক্য ভাসত, ‘তুমি ততটা মেধাবী নও।`

ক্লাসে প্রশ্ন করা হলে অনির্বাণ মাথা নিচু করে বসে থাকত।

আগে যে ছেলেটি বোর্ডে গিয়ে সমাধান করত, এখন সে চোখ তুলেও তাকায় না।

প্রথম সেমিস্টার শেষ হতেই যেন স্কুলের বাতাসে এক অদ্ভুত পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগল। করিডোর, ক্লাসরুম, এমনকি অনির্বাণের মনেও যেন নতুন কিছুর আগমনী বার্তা বাজতে শুরু করল। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে এলেন নতুন গণিত শিক্ষক। মিস্টার গ্রিফিন।

মধ্যবয়সী ইংরেজ মানুষটি প্রথম দিনেই সবার নজর কাড়লেন। সুঠাম লম্বা দেহ, পরিপাটি পোশাক, আর চশমার আড়ালে থাকা গভীর মায়াবী দুটি চোখ। দেখলেই মনে হয় অভিজ্ঞতা আর সহমর্মিতার এক অনন্য মিশেল। তাঁর কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাস। প্রথম ক্লাসেই অনির্বাণ বুঝে গিয়েছিল, এই মানুষটি অন্যরকম। খুবই অন্যরকম।

ক্লাস শেষ হওয়ার পর হঠাৎই মিস্টার গ্রিফিন ধীরে ধীরে অনির্বাণের বেঞ্চের দিকে এগিয়ে এলেন। চশমার ডান পাশে হাত দিয়ে সেটাকে একটু ঠিক করলেন। তারপর ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললেন,

“অনির্বাণ, তোমার আগের সেমিস্টার কেমন গেল? গণিতের কনসেপ্ট বুঝতে কোনও সমস্যা হচ্ছে কি? আর এডভান্স ম্যাথস নাওনি কেন?”

প্রশ্নটা শুনে অনির্বাণ যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। এ তো প্রথম ক্লাস! স্যার তার নাম জানলেন কীভাবে? বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠল। কিছুটা দ্বিধা, কিছুটা সংকোচ নিয়ে সে নিচু স্বরে বলল,

“স্যার… আমি জানি না আমি কতটা ভালো। আগের সেমিস্টারে আমি অনেক সমস্যায় ছিলাম। মিসেস হার্ডিং বলতেন, আমি নাকি ততটা মেধাবী নই। এডভান্স ম্যাথস চেয়েছিলাম। কিন্তু মিসেস বললেন এডভান্স ম্যাথস নাকি আমার দ্বারা হবে না”

কথাগুলো বলতে গিয়েও অনির্বাণের গলা ভারী হয়ে এলো। যেন এতদিনের জমে থাকা হতাশা অজান্তেই বেরিয়ে আসছিল।

মিস্টার গ্রিফিন কিছুক্ষণ তার দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে রইলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন,

“শোনো অনির্বাণ, সবাই একভাবে শেখে না। কেউ দ্রুত শেখে, কেউ সময় নিয়ে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে কেউ কম মেধাবী। অন্যের কথায় নিজের সম্ভাবনাকে ছোট করে দেখার কোনও কারণ নেই।”

তিনি একটু থামলেন। তারপর আরও দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,

“আমি তোমার চোখে ভয় দেখছি। কিন্তু ভয় মানেই তুমি দুর্বল নও। তাছাড়া আমি তোমার সব সাবজেক্টের রিপোর্ট দেখেছি। ইউ আর এ জিনিয়াস, অনির্বাণ। তোমার মধ্যে অসাধারণ সম্ভাবনা আছে। গণিতেও তুমি অনেক ভালো করতে পারবে। শুধু দরকার নিজের উপর বিশ্বাস রাখা আর মনোযোগ দিয়ে এগিয়ে চলা। আমি নিশ্চিত, তুমি একদিন এমন কিছু করবে, যা সবাইকে অবাক করে দেবে।”

কথাগুলো শুনে অনির্বাণ প্রথমে কিছুই বলতে পারল না। মনে হলো, সময় যেন হঠাৎ থেমে গেছে। তার বুকের ভেতরে এতদিন ধরে জমে থাকা অদৃশ্য একটা ভার ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। গত কয়েক মাসে সে অসংখ্যবার শুনেছে সে যথেষ্ট ভালো নয়। যথেষ্ট মেধাবী নয়। যথেষ্ট যোগ্য নয়।

কিন্তু আজ…

প্রথমবার কেউ তার ব্যর্থতাকে নয়, তার সম্ভাবনাকে দেখল। অনির্বাণ চোখ নামিয়ে ফেলল। সে বুঝতে পারছিল, তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। দ্রুত নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল সে। সে চাইছিল না কেউ তার দুর্বলতা দেখুক।

কিন্তু মিস্টার গ্রিফিন হয়তো বুঝে ফেলেছিলেন।

তিনি ধীরে ধীরে অনির্বাণের ডেস্কের পাশে বসে শান্ত গলায় বললেন,

“শোনো… পৃথিবীতে সবচেয়ে বিপদজনক ব্যাপার হলো, যখন একজন মেধাবী মানুষ নিজেকে বিশ্বাস করা বন্ধ করে দেয়।”

অনির্বাণ মাথা তুলে তাকাল।

মিস্টার গ্রিফিনের চোখে কোনও করুণা ছিল না। ছিল বিশ্বাস।

আর সেই মুহূর্তে অনির্বাণ অনুভব করল—

 

হয়তো সে সত্যিই ব্যর্থ নয়। হয়তো এতদিন সে শুধু ভুল মানুষদের কথা বিশ্বাস করে এসেছে।

 

স্যারের কথাগুলো যেন অনির্বাণের ভিতরে নিভে যেতে বসা প্রদীপে নতুন করে আলো জ্বেলে দিল। এতদিন যে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল, তা যেন ধীরে ধীরে ফিরে আসতে লাগল। প্রথমবারের মতো সে অনুভব করল, কেউ একজন সত্যিই তার উপর বিশ্বাস রাখে।

তারপর থেকে মিস্টার গ্রিফিন শুধু একজন শিক্ষকই ছিলেন না। তিনি হয়ে উঠলেন অনির্বাণের পথপ্রদর্শক। প্রতিটি ক্লাসে তিনি ধৈর্য নিয়ে অনির্বাণকে বোঝাতেন। নতুন নতুন সমস্যার সমাধান করতে উৎসাহ দিতেন। আরও কঠিন গণিতের চ্যালেঞ্জ নিতে অনুপ্রাণিত করতেন।

যদিও উন্নত গণিতের কোর্স নেওয়ার সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গিয়েছিল। তবুও মিস্টার গ্রিফিন এমন নিষ্ঠা আর আন্তরিকতায় তাকে শেখাতে লাগলেন। অনির্বাণ ধীরে ধীরে নিজের সব দুর্বলতাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করল।

সেদিন অনির্বাণ বুঝেছিল, জীবনে একজন মানুষের বিশ্বাস কখনও কখনও পুরো ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। একজন সত্যিকারের শিক্ষক শুধু পড়ান না, তিনি মানুষের ভিতরে লুকিয়ে থাকা শক্তিকেও জাগিয়ে তোলেন।

 

পরীক্ষার দিন যত ঘনিয়ে আসছিল, অনির্বাণের জীবন যেন এক নতুন ছন্দে বাঁধা পড়ছিল। চারপাশের পৃথিবী তখনও আগের মতোই চলছিল। স্কুলের ব্যস্ত করিডোর, লাইব্রেরির নিস্তব্ধতা, বন্ধুদের হাসি। কিন্তু অনির্বাণের ভেতরে চলছিল এক গভীর লড়াই। নিজেকে প্রমাণ করার লড়াই। নিজের সীমাকে ভেঙে বেরিয়ে আসার লড়াই।

সে এবার আর আগের মতো ভেঙে পড়া ছেলেটি ছিল না। প্রতিটি সকাল শুরু হতো নতুন উদ্যম নিয়ে, আর প্রতিটি রাত শেষ হতো অদম্য পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে। বইয়ের পাতায় পাতায়। সমীকরণের ভাঁজে ভাঁজে। অনির্বাণ যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাসকে খুঁজে ফিরছিল।

আর এই পুরো পথটিতে মিস্টার গ্রিফিন ছিলেন তার সবচেয়ে বড় শক্তি।

প্রতিদিন ক্লাস শেষে তিনি অনির্বাণকে নতুন নতুন সমস্যার সমাধান করতে দিতেন। কখনও কঠিন অ্যালজেব্রা, কখনও জটিল পদার্থবিজ্ঞানের থিওরি। কিন্তু প্রতিবারই তিনি এমনভাবে তাকে পথ দেখাতেন, যেন প্রতিটি সমস্যাই ছিল নতুন কিছু শেখার সুযোগ। ভয় পাওয়ার কারণ নয়।

কখনও অনির্বাণ কোনও প্রশ্নে আটকে গেলে মিস্টার গ্রিফিন মৃদু হেসে বলতেন,

“চেষ্টা চালিয়ে যাও। কঠিন সমস্যাগুলোই মানুষকে শক্তিশালী করে তোলে। তুমি পারবে, অনির্বাণ। আমি জানি তুমি পারবে।”

এই ছোট ছোট কথাগুলোই ধীরে ধীরে অনির্বাণের ভিতর এক বিশাল আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলেছিল। সে বুঝতে শিখেছিল, সফল মানুষরা কখনও ভয় পেয়ে থেমে যায় না। তারা বারবার চেষ্টা করে। যতক্ষণ না অসম্ভবটাকেও সম্ভব করে তোলে।

অবশেষে পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন এসে গেল। পরীক্ষায় খুব ভালো করলে টপ ইউনিভার্সটিতে চান্স পাবে।

সেদিন সকাল থেকেই অনির্বাণের বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কাঁপছিল। উত্তেজনা, ভয়, আশা। সব অনুভূতি যেন একসঙ্গে মিশে গিয়েছিল। স্কুলের পথে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটি হয়তো তার পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।

 

কাঁপা হাতে খামটি খুলল।

আর পরের মুহূর্তেই সে যেন বিশ্বাস করতে পারল না।

গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞানে সে তার এ-লেভেলে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে।

চারপাশের সব শব্দ যেন হঠাৎ থেমে গেল। অনির্বাণ শুধু ফলাফলের কাগজটির দিকে তাকিয়ে রইল। এতদিনের কষ্ট, অপমান, হতাশা সবকিছু যেন সেই একটি মুহূর্তে অর্থ খুঁজে পেল। সে পেরেছে। সত্যিই পেরেছে।

যে ছেলেটিকে একসময় বলা হয়েছিল সে যথেষ্ট মেধাবী নয়। সেই ছেলেই আজ নিজের যোগ্যতা দিয়ে সবাইকে উত্তর দিয়ে দিয়েছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে, পেছন দিক থেকে ভেসে আসা সেই চিরচেনা কণ্ঠস্বর অনির্বাণের হৃদয়ে এক অদ্ভুত মুগ্ধতার ঢেউ তুলেছিল।

“আমি জানতাম তুমি পারবে, অনির্বাণ।”

মিস্টার গ্রিফিন দাঁড়িয়ে ছিলেন মুখভরা গর্বের হাসি নিয়ে। তাঁর চোখেও যেন আনন্দের দীপ্তি ঝলমল করছিল। তিনি ধীরে ধীরে অনির্বাণের দিকে এগিয়ে এলেন।

অনির্বাণের কাঁধে হাত রেখে বললেন,

“তুমি তোমার সমস্ত পরিশ্রমের ফল পেয়েছ। এই সাফল্য শুধু নম্বরের নয়। এটা তোমার আত্মবিশ্বাসের জয়। তোমার অধ্যবসায়ের জয়।”

অনির্বাণের চোখ ভিজে উঠল। আনন্দে, কৃতজ্ঞতায়, আর এক অদ্ভুত তৃপ্তিতে তার বুকটা ভারী হয়ে এলো।

কাঁপা গলায় সে বলল,

“স্যার… আপনার বিশ্বাস আর উৎসাহ ছাড়া এটা কখনও সম্ভব হতো না। যখন সবাই আমার সীমাবদ্ধতা দেখেছিল, তখন আপনি আমার সম্ভাবনাটা দেখেছিলেন। আপনিই আমাকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন যে… আমিও পারি।”

সেদিন অনির্বাণ উপলব্ধি করেছিল, জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু প্রতিভা নয়। বরং এমন একজন মানুষ, যিনি কঠিন সময়েও আপনার উপর বিশ্বাস হারান না।

একজন সত্যিকারের শিক্ষক শুধু পড়ান না। তিনি মানুষের ভিতরে লুকিয়ে থাকা শক্তিকেও জাগিয়ে তোলেন।

 

সেই দিন হল রুমে দাঁড়িয়ে অনির্বাণ শুধু নিজের ফলাফল দেখেনি। সে দেখেছিল নিজের নতুন পরিচয়।

যে ছেলেটি একসময় নিজের সামর্থ্য নিয়েই সন্দেহ করত, সে-ই আজ বুঝতে পেরেছে। মানুষকে ভেঙে দেওয়ার জন্য একটি বাক্যই যথেষ্ট।

আবার কখনও কখনও… একটি বাক্যই একজন মানুষকে নতুন করে বাঁচিয়ে তুলতে পারে।

বিপদজনক ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অনির্বাণ শেষবারের মতো মিস্টার গ্রিফিনের দিকে তাকাল।

আর তার মনে হলো,

কিছু কিছু মানুষ জীবনে আসে শুধু শেখানোর জন্য নয়,

মানুষকে নিজের উপর বিশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।