Summary:
প্রথম সপ্তাহের এক সকাল। ঈশিতা তখনও নতুন। চা নিয়ে অরিন্দমের ঘরে ঢুকছিল। বাইরে হালকা বৃষ্টি। মেঝেতে সামান্য পানি লেগে ছিল। হঠাৎ তার পা পিছলে যায়। "হায় ঠাকুর!"
ট্রেটা হাত থেকে ছিটকে মেঝেতে ধপাস করে পড়ে গেল। তারপর, ঝনঝন করে ভেঙে পড়ার শব্দ। চায়ের কাপটি অসংখ্য ধারালো টুকরোয় ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। ধোঁয়া ওঠা চা কার্পেটের উপর ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত বিশৃঙ্খলার ছবি আঁকল। শব্দটা মিলিয়ে যেতেই নেমে এলো ভারী নীরবতা। ঈশিতার মুখ মুহূর্তেই রক্তশূন্য হয়ে গেল। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা যেন সে নিজেই শুনতে পাচ্ছিল। ঈশিতার মুখটা বেশ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
— "আমি... আমি ইচ্ছা কইরা করি নাই স্যার!"
তার হাত কাঁপছে। চোখে ভয়। এত বড় বাড়ি। দামি জিনিস পত্র। চাকরির প্রথম সপ্তাহেই এমন ভুল! সে তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে ভাঙা কাচ কুড়াতে লাগল।
— "আমারে মাফ কইরা দেন স্যার। আর হইব না।"
কিন্তু কোনো উত্তর এলো না। ঈশিতা ভয়ে মাথা তুলে তাকাল। দেখল অরিন্দম তার দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর হঠাৎ...হেসে উঠল। দুর্ঘটনার পর এতদিনে এমন হাসি কেউ দেখেনি। ঈশিতা অবাক।— "হাসতাছেন ক্যান?"
অরিন্দম হাসতে হাসতেই বলল,
— "তুমি এমন মুখ বানাইছো, মনে হচ্ছে পুরো প্রাসাদটা ভেঙে ফেলেছো।"
ঈশিতা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজেও হেসে ফেলল। ঘরের ভারী পরিবেশটা যেন মুহূর্তেই হালকা হয়ে গেল।
সেদিন দুপুরে সুলেখা সেন ছেলের মুখে হাসির কথা শুনে অনেক দিন পর নীরবে চোখ মুছে ছিলেন।
প্রতিদিন সকালে ঈশিতা একই কথা বলত,“আইজ আরেকটু বেশি চেষ্টা করুম স্যার। আপনে পারবেন তো?”
অরিন্দম তিক্ত হেসে উত্তর দিত,“আমি তো অচল মানুষ, ঈশি।”
এই ছোট্ট নামটাতেই সে ডাকে ঈশিতাকে। প্রথম দিন নামটা শুনে ঈশিতা বুঝতেই পারেনি যে তাকে ডাকা হচ্ছে। পাশের ঘরে দাঁড়িয়ে ব্রেকফাস্ট তৈরি করছিল। শব্দটা কানে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু নিজের নাম বলে মনে হয়নি।
দ্বিতীয় বার যখন ডাক এল, তখন সে তাড়াতাড়ি অরিন্দমের ঘরে ঢুকল। -“ডাকছিলেন?”
অরিন্দম ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “কী হলো ঈশি? কথা বলছো না যে?”
সেদিন প্রথম বুঝেছিল, নতুন নামটা তাকে নিয়েই। অদ্ভুত ভাবে নামটা তার ভালোও লেগেছিল। ঈশিতা হেসে বলল,“অচল মানুষ আবার কথা কয় কেমনে? আপনে তো রোজ আমারে কথা দেন।”
অরিন্দম কিছু বলল না। শুধু ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল। এখন প্রায় প্রতিদিনই এমন হয়। সকালে ব্যায়াম শুরু করার আগে ঈশিতা বকবক করে, আর অরিন্দম শুনে। কখনো বিরক্ত হয়, কখনো উত্তর দেয়, আবার কখনো শুধু তাকিয়ে থাকে। মজার ব্যাপার হলো, যেদিন ঈশিতা একটু দেরি করে, সেদিন অরিন্দমের অস্থির লাগে।
নিজেকেই তখন ধমক দেয়। কেন লাগবে? মেয়েটা তো শুধু নিজের কাজটাই করছে। তবু দরজার দিকে তার চোখ চলে যায় বারবার।
সেই সকালটাও অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল।
ঈশিতা তাকে দাঁড়ানোর অনুশীলন করাচ্ছিল। দুই হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছে।
—“আরেক বার চেষ্টা করেন স্যার। একটু আর।”
অরিন্দম দাঁত চেপে ভর দিল পায়ের ওপর।
এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড।
তারপর হঠাৎ ব্যথার ঢেউ বুক থেকে পা পর্যন্ত ছড়িয়ে গেল।—“আহ!”
মুহূর্তেই শরীর কেঁপে উঠল তার।—“স্যার?”
“থামো!”অরিন্দম হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। “থামো! আমি পারব না। আর পারছি না!”
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ঈশিতার হাত দুটো এখনও তার বাহু আঁকড়ে আছে। অরিন্দম মাথা নিচু করে হাঁপাচ্ছে। চোখে রাগ, হতাশা আর অপমানের মিশ্র ছায়া। কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বলল না। তারপর খুব আস্তে করে ঈশিতা বলল, “ঠিক আছে। আইজ আর চেষ্টা করুম না।”
অরিন্দম কিছু বলল না। ঈশিতা একটু থেমে আবার বলল, “কিন্তু কাল করুম।”
অরিন্দম বিরক্ত হয়ে তাকাল। “তুমি হাল ছাড়তে জানো না?”
ঈশিতা মৃদু হেসে উত্তর দিল, “না স্যার। কারণ আমি জানি, আপনেও ছাড়েন নাই। শুধু একটু ক্লান্ত হইছেন।”
সেদিন প্রথম বারের মতো অরিন্দমের মনে হলো, মেয়েটা শুধু তাকে হাঁটতে শেখাচ্ছে না, তাকে ভেঙে পড়তেও দিচ্ছে না। আর সেই উপলব্ধিটাই তাকে অদ্ভুতভাবে নীরব করে দিল।
ঈশিতা চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল। অরিন্দম চোখ সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু পারল না। মেয়েটার চোখে করুণা নেই। দুঃখ নেই। আছে শুধু একরাশ জেদ আর অদ্ভুত এক বিশ্বাস।
ঈশিতা নরম গলায় বলল,“আপনে না পারলে আমি কার লাইগা লড়ুম কন?”
অরিন্দম ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “আমার জন্য কেন?”
প্রশ্নটা শুনে ঈশিতা একটু হাসল।
-এই কাজের লাইগ্যাইতই আমি এহানে আইছি। তাছাড়া আপনে আমারে সম্মান করেন। দয়া করেন না। এইডাই তো বড় কথা।”
কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল, “আর আপনার সেবা কইরা আমি তৃপ্তি পাই।”-কথাটা বলেই মাথাটা নীচু করে চুপ করে রইলো।
ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। অরিন্দম কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু অনেকদিন পর নিজের ভেতরের পরাজিত মানুষটার একটু হলেও যেন কিছুটা লজ্জা বোধ হলো। মেয়েটা তার জন্য এতখানি বিশ্বাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর সে নিজেই নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে বসে আছে। সেদিনের পর থেকে ফিজিওথেরাপির সময় অরিন্দম আর আগের মতো সহজে হাল ছাড়ত না। ব্যথা হলে দাঁত চেপে সহ্য করত। ঈশিতা সেটা লক্ষ্য করেছিল, কিন্তু কিছু বলত না। শুধু মাঝে মাঝে তার মুখে সেই ছোট্ট বিজয়ের হাসিটা ফুটে উঠত।
আর অরিন্দম, অজান্তেই, সেই হাসিটার অপেক্ষা করতে শুরু করেছিল।
সকালের সময়টা এখন অরিন্দমের কাছে অদ্ভুতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ সকাল মানেই ঈশিতার বকবকানি।
সেদিন সকালেও সে ঘড়ির দিকে তাকাল। আটটা। তারপর আটটা দশ। তারপর আটটা পনেরো। ঈশিতার কোনো খবর নেই। অরিন্দম বিরক্ত হয়ে বই খুলল। দুই মিনিট পরে আবার ঘড়ির দিকে তাকাল। বই বন্ধ করল। জানালার বাইরে তাকাল।
আবার দরজার দিকে। নিজের ওপরই বিরক্ত লাগছিল। সে নিজেকেই বলল,
"আমি এমন করছি কেন?"
ঠিক তখনই দরজা খুলে ঈশিতা ঢুকল। হাঁপাচ্ছে। চুল এলোমেলো।
"মাফ করেন স্যার। একটু দেরি অইয়া গেল"
অরিন্দম না চাইলেও কণ্ঠটা একটু কঠিন হয়ে গেল।
"এত দেরি হলো কেন ঈশি?"
ঈশিতা অবাক হয়ে তাকাল।
"এই প্রথম তো দেরি হইল!"
অরিন্দম কিছু বলল না। ঈশিতা হঠাৎ মুচকি হাসল।
"আরে! আমারে মিস করতাছিলেন নাকি?"
অরিন্দম সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিল।
"আজে বাজে কথা বলো না।"
কিন্তু ঈশিতা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও তার মুখে লুকানো হাসিটা অনেকক্ষণ রয়ে গেল।
কয়েকদিন পরের ঘটনা। সন্ধ্যা। হঠাৎ পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গেল। প্রাসাদের ঝাড় বাতিগুলো নিভে গেল একে একে। জেনারেটর চালু হতে কিছুটা সময় লাগবে। ঘর অন্ধকার। শুধু জানালার বাইরে বৃষ্টির শব্দ। ঈশিতা একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে অরিন্দমের পাশে বসে রইল। কিছুক্ষণ নীরবতার পর বলল,
"স্যার, আপনেরে একটা গল্প কই?"
অরিন্দম হালকা হাসল।
"তোমার গল্প কখনো শেষ হয়?"
"হয় না।" বলেই নিজেই হেসে উঠল। তারপর শুরু করল। শৈশবের গল্প। বর্ষাকালে গ্রামের মাঠে মাছ ধরার গল্প। পুকুরে পড়ে যাওয়ার গল্প। একবার গরুর পেছনে দৌড়াতে গিয়ে কাদায় গিয়ে পড়ার গল্প। কথা বলতে বলতে সে নিজেই হাসছে। অরিন্দমও হাসছে। অনেক দিন পর সে বুঝতে পারল, কারও সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে। সময় কখন কেটে গেল বুঝতেই পারল না। হঠাৎ জেনারেটরের আলো জ্বলে উঠল।
ঈশিতা বলল,
"আরে! এত তাড়াতাড়ি আইসা গেল?"
অরিন্দম মৃদু স্বরে বলল,
"আমার তো মনে হচ্ছিল আরও কিছুক্ষণ অন্ধকার থাকলে ভালো হতো।"
ঈশিতা অবাক হয়ে তাকাল। কিন্তু অরিন্দম তখন জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে ফেলেছে।
সেদিন সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। ফিজিওথেরাপিস্ট চলে গেছেন। অরিন্দম বিছানায় শুয়ে ছিল। ঈশিতা পাশে বসে মোবাইলে কারও সঙ্গে কথা বলছিল। হঠাৎ অরিন্দম বিরক্ত গলায় বলল,
"আর কতদিন এমন থাকব আমি?"
ঈশিতা ফোন নামিয়ে তার দিকে তাকাল।
"এইডা আবার কেমন প্রশ্ন?"
"আমার শরীরটা যেন আমার নিজের না।"
ঘরটা নীরব হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে ঈশিতা তার পায়ের কাছে গিয়ে বসল।
"এই যে, মন দিয়া চেষ্টা করেন।"
অরিন্দম তিক্ত হাসল।
"কী চেষ্টা করব?"
"ডান পায়ের বুড়া আঙুলটা নাড়ানোর চেষ্টা করেন।"
"হবে না।"
"চেষ্টা করেন।"
"পারব না।"
"পারবেন।"
ঈশিতা জেদ ধরল। মিনিট খানেক কেটে গেল। কিছুই হলো না। তারপর...হঠাৎ। খুব সামান্য। একটুখানি। ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা কেঁপে উঠল। এক সেকেন্ডেরও কম। অরিন্দম নিজেই প্রথমে বিশ্বাস করতে পারল না।
ঈশিতা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। তারপর চিৎকার করে উঠল,
"নড়ছে! স্যার! নড়ছে!"
অরিন্দম হতভম্ব।
"সত্যি?"
ঈশিতা আনন্দে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
"আমি মিথ্যা কইতেছি নাকি?"
সেদিন বহুদিন পর অরিন্দমের চোখেও জল এসেছিল। দীর্ঘ অন্ধকারের পরে সে যেন প্রথম বার আলোর একটুকরো রেখা দেখতে পেল। ঠিক তখনই রান্না ঘরের টেবিলে রাখা ঈশিতার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। দৌড়ে রান্না ঘরে যায়। স্ক্রিনে গ্রামের প্রতিবেশী মায়া কাকিমার নাম দেখে তাড়াতাড়ি ফোনটা কানে তুলল।
"ঈশি... তুই কই আছস মা? তাড়াতাড়ি আয়। তোর মায়ের শরীরটা খুব খারাপ। ডাক্তার কইছে আর দেরি করা ঠিক হইব না"
কথাগুলো শুনে ঈশিতার মুখের রং মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। হাত কাঁপতে লাগল। কয়েক সেকেন্ড সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে চুপচাপ বাথরুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। কলটা কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না আর আটকে রাখতে পারল না। মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কাঁদল কিছুক্ষণ। তারপর ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। জোর করে ঠোঁটে একটি হাসি ফুটিয়ে নিল।
কিছুক্ষণ পর অরিন্দমের ঘরে ঢুকতেই অরিন্দম তার দিকে তাকিয়ে বলল,
"ঈশি... তোমারে কেমন জানি লাগতেছে। সব ঠিক আছে তো?"
ঈশিতা চোখ নামিয়ে মৃদু হেসে বলল,
"হ, স্যার... সব ঠিক আছে।"
আরও কিছুদিন পরে। সেদিন রাতে অরিন্দমের ঘুম আসছিল না। মাথার যন্ত্রণা বেড়েছিল। ঈশিতা ওষুধ খাইয়ে দিয়ে পাশে বসেছিল। দেখল অরিন্দম বা রবার চোখ বন্ধ করছে, আবার খুলছে।
"ঘুম আইতাছে না?"
"না।"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঈশিতা বলল,
"আমি কবিতা পড়ি?"
অরিন্দম বিস্মিত হলো।
"তুমি কবিতা পড়ো?"
"স্কুলে পইড়তাম। এখনও মনে আছে কিছু কিছু।"
তারপর ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করল।
"আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে—
এই বাংলায়, হয়তো মানুষ নয়,
হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে..."
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ঈশিতার কণ্ঠে ছিল না কোনো আবৃত্তির আড়ম্বর। ছিল শুধু মায়া। গ্রামের মাটির গন্ধ। মানুষের উষ্ণতা। কবিতা শেষ হওয়ার আগেই অরিন্দমের চোখ ভারী হয়ে এলো। অনেক দিন পরে সে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল। ঈশিতা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তারপর খুব আস্তে করে কম্বলটা টেনে দিল। ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
"এহন একটু শান্তি পাইছেন মনে হয়।"
জানালার বাইরে তখন পূর্ণিমার আলো। আর অরিন্দমের অজান্তেই তার ভাঙা জীবনের চারপাশে ধীরে ধীরে নতুন এক আলো জন্ম নিতে শুরু করেছে।
একদিন দুপুরে রান্নাঘরে ঢুকে সুলেখা সেন দেখলেন ঈশিতা একা বসে ভাত খাচ্ছে। বাড়ির অন্য কর্মচারীরা খাওয়া শেষ করে চলে গেছে। ঈশিতা মাথা নিচু করে তাড়াতাড়ি খাচ্ছিল। সুলেখা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর বললেন,
"একা বসে খাচ্ছিস কেন?"
ঈশিতা তাড়াতাড়ি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
"না আন্টি, আমি ঠিক আছি।"
"বস।"
ঈশিতা আবার বসে পড়ল। সুলেখা তার সামনে চেয়ার টেনে বসলেন।
"তোর মায়ের শরীর এখন কেমন?"
ঈশিতা অবাক হয়ে তাকাল। এই বাড়িতে কেউ তার মায়ের খবর জিজ্ঞেস করে নাই এর আগে। সে মৃদু হেসে বলল,
"আগের চাইতে একটু ভালা।"
"ওষুধ ঠিক মতো খাওয়াতে পারছিস তো?"
ঈশিতা মাথা নাড়ল। তারপর হঠাৎ বলল,
"আমার মা আপনার মতোই কথা কয়।"
সুলেখা হেসে ফেললেন।
"তাই নাকি?"
"হ। সব সময় চিন্তা করে।"
দুজনেই হেসে উঠল। সেদিন প্রথমবার সুলেখার মনে হলো, মেয়েটাকে দেখলে তার অদ্ভুত ভালো লাগে। অনেকটা নিজের মেয়ের মতো।
তার কয়েক দিন পরের ঘটনা। একদিন ঈশিতাকে গ্রামের বাড়িতে যেতে হলো। মায়ের কিছু রিপোর্ট আনার জন্য। সকালে বেরিয়ে গেল। বাড়িটা একই রকম ছিল। একই ঝাড় বাতি। একই কর্মচারী। একই রুটিন। তবু কোথায় যেন কিছু কম। সকালের নাস্তা নীরবে শেষ হলো। কেউ গল্প করল না। কেউ অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন করল না। কেউ বলল না
"স্যার, এত ভাবেন ক্যান?"
দুপুরের দিকে অরিন্দম বই পড়তে চেষ্টা করল। মন বসল না। টেলিভিশন চালাল। ভালো লাগল না। শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে জানালার পাশে বসে রইল। সন্ধ্যার দিকে সুলেখা সেন ঘরে ঢুকে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন।
"কী হয়েছে?"
"কিছু না।"
"ঈশিতা আজ আসেনি, তাই না?"
অরিন্দম চমকে উঠল।
"মা!"
সুলেখা আরও হাসলেন।
"মায়েরা অনেক কিছু বুঝতে পারে।"
অরিন্দম আর কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু সেদিন রাতে সে প্রথমবার নিজের কাছে স্বীকার করল, ঈশিতা শুধু তার জীবনের একজন কর্মচারী নয়। তার উপস্থিতি এখন তার প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
সেদিন সেন পরিবারের একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রাসাদের বাগান জুড়ে আলো। শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, আত্মীয় স্বজন, পরিচিত মানুষে ভরে গেছে চারপাশ। অরিন্দম এখন অনেকটাই সুস্থ। ওয়াকারের সাহায্যে ধীরে ধীরে হাঁটতে পারে। সুলেখা সেনের অনুরোধে ঈশিতাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল।
সাধারণ একটি শাড়ি পরে সে দূরে দাঁড়িয়ে অতিথিদের দেখাশোনা করছিল।
ঠিক তখনই কয়েকজন আত্মীয়ের কথোপকথন কানে এলো।
"ওই মেয়েটাই না?”
“কোনটা?”
“অরিন্দমের কেয়ারগিভার”
“ওহ! শুনছি এখন নাকি খুব কাছের মানুষ”
আরেকজন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“সেন পরিবারের বউ হওয়ার স্বপ্নও দেখতেছে হয়তো”
“এই মেয়েগুলো সুযোগ পেলেই বাড়ির ছেলেদের মন জয় করে"
কথাটা শুনে সবাই মৃদু হেসে উঠল। ঈশিতা মাথা নিচু করে সরে যেতে চাইল। ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অরিন্দমের কানে কথাগুলো পৌঁছে গেল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। চারপাশে নীরবতা নেমে এলো।
একজন আত্মীয় বিব্রত হেসে বললেন,
“আমরা তো মজা করছিলাম”
অরিন্দম শান্ত গলায় বলল,
“মানুষের সম্মান নিয়ে মজা করা খুব সহজ”
কেউ কিছু বলল না। সে ঈশিতার দিকে তাকাল। তারপর উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলল,
“আমি যখন নিজের জীবন শেষ হয়ে গেছে বলে বিশ্বাস করতাম, তখন এই মেয়েটা আমাকে প্রতিদিন নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে”
চারপাশ নিস্তব্ধ।
“আপনারা ওর পরিবারের অবস্থা দেখেন। আমি ওর চরিত্র দেখেছি। আপনারা ওর অবস্থান দেখেন। আমি ওর সাহস দেখেছি। আপনারা ওর শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখেন। আমি ওর হৃদয় দেখেছি।“
কেউ আর চোখ তুলে তাকাতে পারছিল না। ঠিক তখন দেবাশিস সেন এগিয়ে এসে ছেলের পাশে দাঁড়ালেন।
"আমাদের পরিবারে মানুষের মর্যাদা পদবি দিয়ে মাপা হয় না”
তিনি ঈশিতার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
“আর যে মানুষ আমাদের ছেলেকে নতুন জীবন দিয়েছে, তাকে অসম্মান করার অধিকার কারও নেই”
ঈশিতার চোখ ভিজে উঠল।
সেদিন প্রথমবার সে বুঝেছিল, এই পরিবার তাকে শুধুমাত্র একজন কর্মচারী হিসেবে দেখে না।
একে একে সব অতিথি চলে গেছে। ঈশিতা একা দাঁড়িয়ে। হঠাৎ তার মোবাইলে ফোন। সে শুধু বলে—
"কি বললেন?... মা কোথায়?"
তার মুখ সাদা হয়ে যায়।
Read full book here: Click here to download the PDF file