Episode 3


Author: ড. পল্টু দত্ত

বগার বউ সব জানে পর্ব-৩

Summary:

গত রাইতটা কি মায়াবী লাগতাছিল। ফকফইক্যা আকাশটাতে বলের লাহান, গোল-গাল চান্দ মামা ঝুইল্যা ছিল এক্কেবারে টু শব্দহীন। চান্দের আলো গলগল কইরা ঝইরা পড়তাছিল বগাদের মাঠের মতো বিশাল উঠানটাতে। রুপালি ধোয়া লাইগ্যা ছিল গাছের পাতায় পাতায় আর শুকনা মাটিতে। ঝিনুক পোকারা ঘুইরা-ঘুইরা তিড়িং-বিড়িং কইরা চান্দের জ্যোতি গায়ে মাইখ্যা খেলতাছিল মনের উল্লাসে। পোকাদের তির-তির ডানা ঝাপটানোর নরম শব্দে রাইতটা যেন আরও বেশি কইরা মাতাল হইয়া গেছিল।

 

এমন তর রাইত পাইলে বগার আবার মাথা খারাপ হইয়া যায়। চোখ বন্ধ হইয়া আসে। ঘুম পাইয়া যায় অতি তাড়াতাড়ি। গ্রামের মানুষজনও দিনের হাড়-ভাঙা কাজ কইরা সন্ধ্যা লাগতে না লাগতেই হাপুস-হুপুস কইরা কিছু খাইয়া-দাইয়া ঘুমাইয়া পড়ে।

খুব তাড়াতাড়িই ঘুমাইতে চইল্যা যায় বগা আর লক্ষ্মী।

 

ঘুম নামার লগে-লগেই বগার নিঃশ্বাস ভারী হইতে থাকে। প্রথমে আস্তে আস্তে, তারপর আরও গম্ভীর। একসময় সেই নিঃশ্বাসই উন্মত্ত গর্জনে রূপ নেয়, যেন রাতের নীরবতাকে খানখান কইরা ভাইঙ্গা দিবে। লক্ষ্মীর তখনো ঘুম আসে নাই। বিরক্ত হইয়া দু-একবার বগাকে আস্তে কইরা ঠেলা দেয়, কাজ হইল না কিছু। শেষমেশ পাশ ফিরাইয়া মুখ ঘুরাইয়া বাঁকা হইয়া শুইয়া পড়ে, একগাদা বিরক্তি বুকের ভেতর চাইপ্যা থুইয়া। পা দিয়া বগারে একটা লাথিও মারে। তখন বগার নাক পুরনো বাসের মতো তর্জন-গর্জনের মাতম শুরু কইরা দেয়।

 

টেরও পায় নাই, ঠিক কখন যে লক্ষ্মীর চোখের পাতা লাইগ্যা গেছে। চান্দের আলো, ঝিনুক পোকার নাচ আর নাসিকা গর্জনের সব শব্দ মিইল্যা একসময় বগার বউ-ও হারাইয়া যায় ঘুমের অতল সমুদ্রে।

 

ভোরবেলাটা শুরু হইলো অলস আলোর হাত ধইরা। সূর্য তখনো ঠিকঠাক মতো চোখ মেলে নাই। পূর্ব আকাশে হালকা লালচে আভা খুব সুন্দর লাগতাছিল, যেন ঘুম ভাঙার আগের একটুখানি লজ্জা। পুকুরের জল হাই তুলতাছিল। ভোরের কুয়াশার লগে বাতাস মিইশ্যা গেছে, আর সেই বাতাসে ভাইস্যা বেড়াইতেছিল ভোরের ঘুমঘুম গন্ধ। চারদিক জুঁইরা তখনো আধো-নিদ্রার রাজত্ব। পাখিরা ডালে বইসা গলা খাঁকারি দিতাছিল, ডানার ভাঁজে ভাঁজে জমা থাকা ঘুম ঝরাইয়া নিতেছিল আস্তে আস্তে।

 

ঠিক এমন সময় বগার বউ লক্ষ্মী চোখ কচলাইতে-কচলাইতে উঠানে ধপাস কইরা পা রাখে। রাতের ঘুমটা এখনো চোখে লাইগ্যা আছে। লম্বা কালা চুলগুলা এলোমেলো। শরীরে সকালের শীত-শীত ভাব। বাইরে পা দিয়াই সে থইমকা দাঁড়ায়। দেখে, বগা পুকুরপাড়ে বইসা আছে। বইসা বললে কম বলা অইব। মুখে এমন গম্ভীর ভাব, যেন এই ভোরবেলাতেই সে বিশ্বসংসার উদ্ধার করার গোপন ফন্দি কষতাছে। এক হাতে কলম, সামনে খোলা খাতা। কখনো কলম চালায় দ্রুত, কখনো হঠাৎ থামাইয়া আকাশের পানে তাকাইয়া যেন দীর্ঘশ্বাস ফালাইতেছিল। ঠিক যেন মেঘের কাছ থেইক্যা কোনো জটিল উত্তরের অপেক্ষায়।

দৃশ্যটা দেইখ্যা লক্ষ্মীর ভেতরে একসঙ্গে দুইটা জিনিস তরতর কইরা জাইগ্যা ওঠে: কৌতূহল আর সন্দেহ।

এত ভোরে, এত মনোযোগ! ব্যাপারটা কি? বগার এই নতুন আবির্ভাব তো এক্কেবারে অচেনা। লক্ষ্মী একটুখানি আগায়। চোখ দুইটা খাড়া কইরা, ঘাড়টা একটু উঁচা কইরা বগারে ভালো কইরা দেখে। তারপর কোমরে হাত ঠাইসা সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া, গলার মধ্যে অর্ধেক বিস্ময় আর অর্ধেক খোঁচা মিশাইয়া কয়—

“এই যে! এত্তো সক্কালে উইঠ্যা কি লিখতাছেন? পরীক্ষায় তো পাস করার মুরোদ দেখাইলা না, প্রত্যেকটা বছর ডাউব্যা মারছ। এখন দেখি লেখক হইবার ভূত চাইপছে! কিতা অইছে তমার?”

বগা তখনো খাতা থেইক্যা চোখ না তুইল্যা গম্ভীর গলায় কয়—

“বউ, তুমি এইডা বুঝবা না। বাজারের অবস্থা দিন দিন খারাপ হইতাছে। সবজির দাম হুনলে হার্ট অ্যাটাক হইবার জোগাড়। তাই কলম দিয়া একটু হিসাব মিলাইতাছি, কোথায় কত কাটছাঁট করা যায়।”

লক্ষ্মী প্রথমে একটু হকচকাইয়া যায়, তারপর ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের বক্র হাসি টানিয়া কয়—

“হিসাব তোমার মাথায় ঢুকলো কেমন কইরা? যে নিজের জামার পকেটে কয়ডা টাকা আছে, সেইডাই মনে রাখতে পারে না—সে আবার বাজারের হিসাব লইয়া বইছে! যাও বাজারে যাও। গিয়া দামদর কইরা সবজি আর ভালো দেইখ্যা একটা লাউ কিন্যা আন।”

বগা খাতা বন্ধ কইরা ভারী মুখটা ঝাইড়া ফালায়। কণ্ঠে সামান্য অভিমান মিশাইয়া কয়—

“ঠিক আছে বউ। এবার থেইক্যা বাজারের হিসাবও তোমার। আমি তো দেহি, তুমি আমার চাইতেও সব বেশি জানো।”

লক্ষ্মী ঝাড়ে—

“ওই জন্যই তো আমি বগার বউ। যাও বাজারে যাও। কাঁচা পণ্য হাতে ধইরা বোঝা যায় দাম ঠিক আছে কিনা। হাওয়ায় বসে হিসাব কইর না। ওতে পেট ভরে না।”

 

আর কথা না বাড়াইয়া বগা উঠে। ঘরে আইসা পকেটে টাকা গুঁজে। ঘরে আসার সময় একবার পুকুরের জলে নিজের মুখটা ভাল কইরা দেইখ্যা নেয়। তারপর বাজারের পথে রওনা দেয়। কিন্তু বাজারে গিয়া নিজের আদার বুদ্ধি খাটাইতে গিয়া বগা এমন দরদাম শুরু কইরা দিল যে দোকানদার প্রথমে হাঁ কইরা তাকাইয়া থাকে অনেকক্ষন বগার দিকে। কিছুর ঠাহর করতে পারল না। মনে মনে ভাবে-“এইডা কিতা কয় বগা? পাগলামী করে নাকি?” শেষে দেয় একটা ধমক। তারপর একে একে লোক জড়ো হয়। কেউ হাসে, কেউ ঠাট্টা করে, কেউ আবার হাত চাপড়াইয়া কইয়া ওঠে, “এই বগা কিতা অইছে তর। আবার নতুন কোনো হিসাব বই খুলল্যা বইসছ নাকি!”

দেখতে দেখতে পুরো বাজারটাই হাসিতে ফাইট্যা পড়ে। বগা তখনো গম্ভীর মুখে হিসাব কইষতে থাকে। কখনো দামের সঙ্গে, কখনো নিজের বুদ্ধির সঙ্গে।

 

বগা সবজী বাজারে ঢুকার লগে লগেই মুখে বির বির কইরা নিজের মনে হিসাব কষতে শুরু কইরা দেয়।

“লাউ কিইন্যা নিয়া না গেলে বউ খুব রাগ কইরবো। কিন্তু লাউ নিয়া গেলে আজ আর  পোলাও রান্না অইব না,” বগা মনে মনে ভাবল। “কিন্তু এই লাউগুলা এমন বড় বড় কেন? একটারে দেখলেই মনে হয় সংসারের অর্ধেক শেষ। আর দাম জিগাইলেই লোকজন এমন চোখ করে, যেন আমি ধার চাইতাছি। এখন আমি কি করুম?”

এদিক–ওদিক ঘুইরা বগা শেষমেশ এক সবজি বিক্রেতার সামনে দাঁড়াইল। ঝকঝকে কাঁচা তরকারি, চোখ ধাঁধানো সবুজ। সাহস সঞ্চয় কইরা বুক ফুলাইয়া একটা নিঃশ্বাস নিয়া বগা জিজ্ঞাস করল,

“ভাই, এইটার দাম কতো নিবা?”

বিক্রেতা নির্লিপ্ত গলায় বলল, “কেজি ১০০ টাকা।”

বগার মাথার ভেতর যেন বাজ পইড়া গেল। কিতা কয় বেডায়? এত দাম ক্যান? সে মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে, গলাটা  নামাইয়া কয়, “এতো দাম! ৫০ টাকা দিলে অইবো না? বউ শুনলে ত আমারে জীবিত ছাইড়বে না।”

বিক্রেতা ফিক কইরা হাইসা দিল। আশপাশের লোকজনেরও কান পাতলা। “বগা ভাই,” একজন পান চিবাইতে চিবাইতে মজা কইরা বলল, “এইটা হাট। এখানে বউয়ের পাস মার্কে কোনো ডিসকাউন্ট নাই।” লোকজন খিক খিক কইরা হাইসতে শুরু করল। বগা বুইঝা গেল, আজ আর সবজি কেনা সহজ অইব না। সম্মান বাঁচাইতে সে ধীরে ধীরে পিছু হটল। কিন্তু খালি হাতে বাড়ি ফিরলে লক্ষ্মীর মুখোমুখি হওয়াটা আরও ভয়ংকর অইব।

 

ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল আরেকটি দোকান। সামনে সারি সারি বড়ো বড়ো কুমড়ো। বগা সুন্দর সুন্দর কুমড়া দেইখ্যা লোভ আর সামলাইতে পরল না।

 

“লাউ না হোক,” সে ভাবল, “কিছু একটা নিয়া গেলে অন্তত বলা যাইব, বাজারে গেছিলাম।”

দোকানদারের সঙ্গে অদ্ভুত এক দরদাম শেষে বগা মাত্র চল্লিশ টাকায় একটা বড় সাইজের কুমড়া কিনল। মনটা খুব খুশি খুশি।

 

বাড়ি ফিইরা উঠান পেরোনোর আগেই লক্ষ্মীর গলা ভাইস্যা আইল

“এই যে, লাউ আইনছো?” বগার হাতে চোখ পড়তেই বড় বড় চোখ কইরা লক্ষী কয়-

“এইডা কিতা আনছ?”

বগা মাথা নিচু কইরা, গলার স্বর ছোট কইরা মুখ বাঁকাইয়া কইতে লাগে-

“লাউ আনতে পারি নাই। বাজারে আমারে লইয়া এমন হাসাহাসি শুরু হইছিলো যে সবাই বেচাকেনা থামাইয়া ফালাইছিলো। শেষে এইটা কিনে আনছি… অন্তত খালি হাতে তো আই নাই।”

এই কথা শুইন্যা লক্ষ্মী একেবারে গর্জে উঠল।

“তুমি বাজারের গিয়া কিতা কও মানুষরে। তুমারে নিয়ে হাসে ক্যা। তুমি আসলে একটা ব্যাপতার। আস্তা একটা বলদ! সংসার চালাইতে হইলে বাজার করতে হয়, সার্কাস না!”

একটু থাইম্যা সে দাঁত কামড়াইয়া আবার কয়: “এইসব চিন্তা ছাইড়া দাও। কাইল আমি তোমার লগে বাজারে যাইমু। তখন দেখবা, লাউ কেমন কইরা কিনতে হয়, আর বাজার কারে কয়!”

বগা কিছু বলল না। শুধু কুমড়া ডার দিকে হা কইরা তাকাইয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

 

পরের দিন আর বগাকে একা ছাড়ে না লক্ষ্মী। ভোরের কাজ সাইরা সে নিজেই বাজারে যায়। চোখে দৃঢ়তা, হাঁটায় আত্মবিশ্বাস। বাজারে ঢুইক্যাই সোজা এক দোকানদারের সামনে গিয়া দাঁড়ায়। কোমরে হাত ঠাইসা, ঠান্ডা গলায় বলে,

“শোনেন হে, আমি লক্ষ্মী। আমারে ঠকাইলে কিন্তু এই বাজারের আসল বাতাসই বদলাইয়া দিমু।”

লক্ষ্মীর কথা কথা শুইন্যা দোকানদার প্রথমে একটু থমকাইয়া যায়। চারদিক চুপচাপ। তারপর সে মুখে বিনয়ের হাসি টেনে বলে,

“আপা, আপনার চাইতে চালাক মানুষ এই বাজারে আর নাই। এই দেখেন, একেবারে তাজা টমেটো, আর ধইন্যাপাতা তো এখনই ক্ষেত থিইক্যা উইঠ্যা আইছে। আপনার জন্য দাম একদম কম।”

লক্ষ্মী হাইসা ওঠে:“তোমার মুখে এত মধু ক্যা?  “এবার আসল কথায় আসো। দাম আরেকটু কমাও। কাল বগারে কি দামে ঠকাইছো, আগে সেই হিসাব দাও। বিশ টেকার কুমড়া চল্লিশ টেকা নিছিলা ক্যান”

চারপাশে লোকজন জড়ো হইয়া যায়। কেউ মুচকি হাসে, কেউ প্রকাশ্যেই খিলখিল কইরা ওঠে। বাজারের চা-দোকানের বেঞ্চে বসে থাকা সেন্টু কাকা ফিসফিস কইরা পাশের জনকে বলে,

“বগা কইছিল ঠিকই। বগার বউ সব জানে, এই বাজারে কোনো হিসাব তার চোখ এড়ায় না।”

বগা পাশে চুপ চাপ দাঁড়াইয়া থাকে। কিচ্ছু কয় না।

 

বাজার থেইক্যা ফিইরা বগা কয়, "বউ, তুমি সবজির মধ্যে রাজনীতি খুঁইজ্যা বার কইরল্যা কেমনে?" লক্ষ্মী বলে, "রাজনীতি না, বুদ্ধি লাগে"

 

বগার লগে লক্ষ্মীর জীবনটা একেবারে যুদ্ধের মতো। লক্ষী সারাক্ষণ বগারে শুধরানোর ফন্দি আঁটে, কিন্তু বগার মাথায় যেন গোবর ভইরা আছে, তাও আবার টাটকা না, একদম পচা গোবর! কোন কথাই তার মাথায় ঢোকে না, ঢুকলেও পাঁচ মিনিট টেকে না। বাজারে গিয়ে দামাদামি করার মুরোদ নাই, দোকানদার যা কয় তাই মাথা নেড়ে নেয়, যেন বগা বাজারে না, ইমামতিতে গেছে।

 

আগে এই সংসারে বগার বাবা সারাক্ষণ খিটখিট করতো। এখন বাবার জায়গাটা পাকাপাকি ভাবে দখল নিছে লক্ষী। জ্বালার সব ভার তার ঘাড়ে। গত হপ্তায় বগা বাজার থেইক্যা নিয়া আইছে একখান গন্ধ ওলা, আধা-পচা কাতলা মাছ। মাছের চাইতে গন্ধটাই যেন বেশি ওজনদার।

লক্ষ্মীর মাথা তখন একেবারে প্রেশার কুকার। চোখ দুইডা বড় বড় কইরা, ঝাঁঝালো স্বরে কইলো: “তোমার মাথায় কি একফোঁটা বুদ্ধি-শুদ্ধিও নাই? চোখ দুইডা কি সাজাইয়া রাইখছো? বুঝো না মাছটা পইচা গেছে? ভর ভর কইরা গন্ধ বাইর হইতাছে! বাজারে গিয়া করোটা কি? দোকানদার যা কয় তাই শুইনা থাকো। একবারও জিগাইতে পারো না? তোমার মতো মানুষ লইয়া সংসার চালানো মানে আগুনে পানি ঢালা। বিয়া করার আগে একবারও ভাবলা না, বউডার কষ্ট অইবো কিনা?”

 

বগা একটু গলা নামাইয়া, যেন নিজেও কিছুটা আহত, কইলো—

“এইবার আবার শুরু করলা! বাজারে সবকিছুর দাম এমন বাইরা গেছে যে একটা জিনিস কিনতে গেলেই বুক কাঁইপ্যা উডে। সব দোষ কি আর আমার? সরকারেরে গালি দিতে পারো না? আর হ, আমারও দোষ আছে, সেইডা তো তুমি বিয়ের আগেই জানতা!”

-আমি সরকারডে গালি গালাজ করতাম? বেপতারের মত কথা কইতে তমার খারাপ লাগে না?

বগা একটু জোর গলায় কয়, "তা হইলে আমি কিতা করতাম?"

লক্ষ্মী পান মুখে দিয়া গম্ভীর মুখে বকতে লাগল, "সরকাররে একবার জিজ্ঞাসা কইরো। সব নিয়ম-কানুন তো পাবলিকের লাইগ্যা। আমাদের গলার উপর ছুরি বসাইয়া কইব, 'এই কর দাও, ঐ বিল জমা দাও।' আর আমাদের কোন খবর রাখে না আমাদের কষ্টরে কেউ দেখে? বাজারে সবজির দাম শুইন্যাত শ্বাস বন্ধ অইয়া যায়। আবার যদি কিছু বলো, সরকার বলে, 'এইতো উন্নয়ন!' উন্নয়ন মানে কি জানো? সবুজ লাউয়ের দাম কিলো প্রতি একশ টকা! উন্নয়ন কইতে ওরা কয়, মানুষ মরুক, দাম বাড়ুক!"

বগা মাথা চুলকাইয়া কয়, "আচ্ছা, দাম কমলে কিতা অইব?"

লক্ষ্মী হাসতে হাসতে কইলো, "তখন মানুষ কইম্যা যাইব। কারণ ততদিনে গরীব মানুষগুলা চিপায় পইরা মইরা যাইব। আর এইসব বড়লোকেরা গরীবরে চায়ের দুধ বানাইবো। এই দেশের সিস্টেম দেইখ্যা আমাগো মাথা খারাপ হইয়া যায়। একদিন বাজারে গেলাম, বললাম ৫ কেজি আলু দাও। দোকানদার আমার দিকে তাকাইয়া কয়, 'আপা, ৫ কেজি আলু কিনলে আপনারে আমরা কিস্তি দিয়া দিমু!'"

বগা হাইস্যা উঠে। "তুমি বাজে কথা বানাও! আলু আবার কিস্তিতে দেয় কেমনে?"

লক্ষ্মী গম্ভীর স্বরে কয়, "কেন? সত্যি কথা শুনতে পছন্দ কর না? তোমরা ত বড়লোকের বাচ্চা। তমার বাবার অনেক জমি-জমা। আর তুমি তার এক মাত্র ছাওয়াল। যারা দিন আনি দিন খায়, তাদের কি দশা, এইডা কি কেউ জানে?"

বগা একটু সিরিয়াস হইয়া কইলো, "তাইলে গরীব মানুষেরা কিতা করত?"

লক্ষ্মী পানের রস একটু গলা দিয়ে নামাইয়া কইল, "কিতা করার আছে? সরকাররে কিছু বললে ওরা কয়, ‘আপনাদের কষ্ট বুঝি।’ বুঝে কিতা করে? তাদের তো গরম পানির বাথরুম, আমাদের তো এক বালতি ঠান্ডা পানি। ওরা জানেই না জীবন কি!"

এই বলে লক্ষ্মী আরও একবার পান মুখে ঢুকাইল। বগা একদম চুপ।

 

সারা গ্রাম জানে , "লক্ষ্মী না থাইকলে বগার জীবনটা বাজারের টমেটোর মতো থেঁতলাইয়া যাইত।“



Read full book here: Click here to download the PDF file