ডাল মে কুছ কালা হ্যায়: বুদ্ধিবৃত্তির রমরমা ব্যবসা


আমাদের উপমহাদেশে ডাল খুবই সাধারণ একটি খাদ্য। গরিবের পাতেও থাকে, ধনীর বুফেতেও থাকে। ডাল নিয়ে সাধারণত কোনো ষড়যন্ত্র কিংবা তর্ক-বিতর্ক হয় না। আন্তর্জাতিক সম্মেলনও বসে না। টেলিভিশনের টকশোতেও দুই পক্ষ চোখ রাঙিয়ে হাতাহাতি করে না। কিন্তু সেই সাধারণ ডালের মধ্যে যদি হঠাৎ কালো কিছু দেখা যায় তখন সন্দেহ জাগে। হিন্দিতে বহুল প্রচলিত কথাটি তখন বেশ মানিয়ে যায়, “ডাল মে কুছ কালা হ্যায়।” অর্থাৎ কোথাও কিছু একটা গোলমাল আছে। আমাদের রাজনীতি, সমাজ এবং বুদ্ধিবৃত্তির হাঁড়ির অবস্থাও আজ অনেকটা তেমন। ডাল আছে, হলুদ আছে, লবণ আছে, গণতন্ত্র আছে, সংবিধান আছে, বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সংবাদ মাধ্যম আছে, বুদ্ধিজীবী আছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো আছেই। তাছাড়া মানুষের মতো দেখতে কোটি কোটি মানুষত আছেই। তারপরও কোথা থেকে যেন একটা পোড়া গন্ধ আসে। নাকে-মুখে এসে লাগে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সেই গন্ধ সব সময় বন্দুকের বারুদ থেকে আসে না। কখনো আসে শব্দ থেকে। কখনো বক্তৃতা থেকে, কখনো টেলিভিশন স্টুডিও থেকে। কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার থেকে, কখনো ধর্মীয় মঞ্চ থেকে। কখনোবা রাজনৈতিক সভা থেকে। আর এখন সবচেয়ে বেশি আসে আমাদের হাতের ছোট্ট মোবাইল ফোনটি থেকে। কারো কারো গল্প-কবিতা আর সাহিত্যে রচনার মধ্যে। সবাই যেন ডুগডুগি বাজানোর অপেক্ষায় আছে। দেখলে মনে হবে সমাজের সভ্য মানুষ প্রজাতি। অথচ ভিতরে সয়তানের নাচা-নাচি, ভণ্ডামির উদ্যামতা।  আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, যিনি আগুন ধরাচ্ছেন তাঁর হাতে অনেক সময় দেশলাইও নেই। আছে মাইক্রোফোন, ক্যামেরা কিংবা কয়েক লাখ অনুসারীর একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট।

ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ভাষ্যে “দেমাগি নকশাল” ধরনের একটি শব্দ আলোচনায় এসেছে। প্রধান মন্ত্রী এই শব্দ দুইটি ব্যবহার করেছেন এমন মানুষদের বোঝাতে, যারা নিজেরা হয়তো অস্ত্র হাতে নেন না, কিন্তু, তাঁদের বুদ্ধি-বৃত্তিক অবস্থান, বক্তব্য বা প্রচার এমন মতাদর্শকে পুষ্ট করে যা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। শব্দটি নিজেই বিতর্কিত। কারণ কে “দেমাগি নকশাল”, কে রাষ্ট্রের বৈধ সমালোচক, কে প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবী আর কে সত্যিই সহিংস বা ধ্বংসাত্মক মতাদর্শের বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগী, এই সীমারেখা টানা মোটেই সহজ নয়। রাজনৈতিক ক্ষমতা যদি সেই সংজ্ঞা নিজের সুবিধামতো নির্ধারণ করে, তবে একদিন দেখা যাবে, সরকারের সমালোচনা করাটাই অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ভারতীয় শব্দটি বাংলাদেশে হুবহু আমদানি করার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু শব্দটির পেছনে যে প্রশ্নটি আছে, সেটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: বুদ্ধিমান মানুষ কি সমাজের জন্য বিপজ্জনক হতে পারেন? উত্তরটি অস্বস্তিকর হলেও সহজ, অবশ্যই পারেন। শুধু বিপজ্জনকই নয়, এই সব মানুষ প্রজাতির জানোয়ারেরা সুস্থ সমাজের জন্য মহা কুলাঙ্গার। নিজের সুবিধার জন্য এরা নিজের বউকে বিক্রি করে দেয়, মাকেও খুন করতে দ্বিধা করেনা। নিজের বাবাকেও অস্বীকার করে। সুযোগ বুঝে নিজের দেশটাকেও বিক্রি করে দেওয়ার পায়তারি করে।

মূর্খ মানুষের হাতে একটি মিথ্যা থাকলে তিনি হয়তো দশ জনকে বিভ্রান্ত করবেন। কিন্তু অসাধারণ মেধাবী, শিক্ষিত, বাকপটু এবং সামাজিকভাবে প্রভাবশালী একজন মানুষের হাতে একটি অর্ধ-সত্য তুলে দিন, তিনি দশ লাখ মানুষকে বোঝাতে পারেন যে সেটিই পূর্ণ সত্য। কারণ তিনি জানেন কোন ইতিহাসটি বলতে হবে এবং কোন অংশটি বাদ দিতে হবে। কোন পরিসংখ্যানটি দেখাতে হবে এবং কোন সংখ্যাটি টেবিলের নিচে রাখতে হবে। কোন মানুষের কান্না ক্যামেরায় আনতে হবে এবং কার কান্নার সময় ক্যামেরা বন্ধ রাখতে হবে। এখানেই জন্ম নেয় এমন এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাস, যাকে আমি আইনগত অর্থে টেররিজম বলছি না। বরং একটি সামাজিক ও নৈতিক রূপক হিসেবে বলছি, বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসবাদ। অর্থাৎ যে বুদ্ধিবৃত্তি মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখানোর বদলে ভয় দেখায়, অপমান করে, বিভক্ত করে, শত্রু তৈরি করে। নিজের মতাদর্শের বাইরে অন্য সব চিন্তাকে নৈতিকভাবে অবৈধ ঘোষণা করতে চায়। তারা সত্যিই যে কোন সমাজের জন্যই ভয়ানক।

বাংলাদেশে একটি কাল্পনিক বুদ্ধিজীবীর কথা ভাবা যাক। তাঁর নাম নাই দিলাম। তবে তিনি নামের আগে প্রফেসর শব্দটা ব্যাবহার করেন। ধরুন সেই প্রফেসরের তিনটি চশমা আছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ভুল দেখার সময় তিনি এক হাজার পাওয়ারের চশমা পরেন। নিজের পছন্দের দলের ভুল দেখার সময় পরেন ০.২৫ পাওয়ারের চশমা। আর নিজের ভুল দেখার সময়? তখন চশমাটাই খুলে টেবিলে রেখে দেন। এই প্রফেসর অবশ্য কোনো একটি রাজনৈতিক দলের স্থায়ী সম্পত্তি নন। তিনি বামপন্থীদের মধ্যেও আছেন, ডানপন্থীদের মধ্যেও আছেন। ধর্মীয় রাজনীতিতে আছেন, ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতেও আছেন। ক্ষমতাসীনদের পাশে আছেন, বিরোধীদের পাশেও আছেন। ঢাকায় আছেন, দিল্লিতে আছেন, কলকাতায় আছেন, লন্ডনে আছেন, নিউইয়র্কেও আছেন। তাঁর মূল সমস্যা মতাদর্শ নয়। তাঁর আসল রোগ হলো বাছাই করা নৈতিকতা। আমার লোক করলে সেটি “অনিচ্ছাকৃত ভুল”, তোমার লোক করলে “জাতীয় বিপর্যয়”। আমার পক্ষের সহিংসতা “বঞ্চিত মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ”, তোমার পক্ষের সহিংসতা “সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ”। আমার দলের দুর্নীতি “কিছু বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির বিচ্যুতি”, তোমার দলের দুর্নীতি “পুরো দলের চরিত্র”। আমার পক্ষের গুজব “জনমনের বাস্তব অনুভূতি”, তোমার পক্ষের গুজব “পরিকল্পিত অপপ্রচার”। এমনকি গণতন্ত্রও কখনো কখনো আমাদের কাছে ছাতার মতো, বৃষ্টি হলে খুলে ফেলি, রোদ উঠলে ভাঁজ করে রাখি।

এই জায়গাটিতেই বুদ্ধিজীবী এবং বুদ্ধি ব্যবসায়ীর পার্থক্য বোঝা জরুরি। সমাজে বুদ্ধিজীবী অবশ্যই দরকার। বরং একটি গণতান্ত্রিক সমাজে তাঁরাই সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মানুষদের একজন। তিনি ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের ভুল ধরবেন, সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষা করবেন, ধর্মান্ধতার বিরোধিতা করবেন। একই সঙ্গে ধর্ম বিদ্বেষকেও প্রশ্ন করবেন। জাতীয়তাবাদের নামে অন্যায় হলে বলবেন, আবার আন্তর্জাতিকতার নামে জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়া হলেও বলবেন। রাষ্ট্র অন্যায় করলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন। জনতা অন্যায় করলে জনতার বিরুদ্ধেও দাঁড়ানোর সাহস রাখবেন। সমস্যা শুরু হয় যখন বুদ্ধিজীবী পরিণত হন বুদ্ধি ব্যবসায়ীতে। তিনি তখন সত্য অনুসন্ধান করেন না। সত্যের এমন টুকরো খোঁজেন যা তাঁর রাজনৈতিক দোকানে ভালো বিক্রি হবে। তথ্য তখন তাঁর কাছে অস্ত্র। ইতিহাস তখন শিক্ষা নয়, গোলাবারুদের গুদাম। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান তৈরির জায়গা নয়, মতাদর্শের নিয়োগ কেন্দ্র। আর কলম? কলম তখন আর আলোর উৎস নয়, সেটি হয়ে ওঠে এমন এক ছুরি যার কোনো রক্তের দাগ দেখা যায় না। অথচ সমাজের বিশ্বাসকে নিঃশব্দে কেটে দুই ভাগ করে দিতে পারে। বাংলাদেশে আমরা গার্মেন্টস রপ্তানি করি, চা রপ্তানি করি, ওষুধ রপ্তানি করি, জনশক্তিও রপ্তানি করি। কিন্তু দেশের ভেতরে সম্ভবত আরেকটি শিল্প অসাধারণ গতিতে বেড়ে উঠেছে, মানুষকে তকমা দেওয়ার শিল্প। একজন সরকারের সমালোচনা করলেন, তাঁর জন্য একটি বাক্স প্রস্তুত। একজন ধর্মীয় রাজনীতির সমালোচনা করলেন, আরেকটি বাক্স। একজন ভারতের কোনো নীতির সমালোচনা করলেন, তাঁর জন্য আলাদা স্টিকার। আবার কেউ ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের কথা বললেন, তাঁর জন্যও স্টিকার তৈরি। কেউ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নতুন গবেষণার প্রশ্ন তুললেন, কেউ সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে কথা বললেন, কেউ পশ্চিমা বিশ্বের দ্বৈত-নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, প্রত্যেকের জন্য আমাদের রাজনৈতিক স্টিকার কারখানায় উপযুক্ত লেবেল প্রস্তুত আছে। শেষ পর্যন্ত মানুষটি কোথায় গেলেন? কিংবা হারিয়ে গেলেন। রয়ে গেল শুধু তাঁর গায়ে লাগানো পরিচয়ের স্টিকার।

এ কারণেই “দেমাগি নকশাল” কিংবা এ-জাতীয় যে কোনো শব্দ ব্যবহারে সতর্ক থাকা দরকার। কারণ শব্দটি যদি একটি নির্দিষ্ট ধ্বংসাত্মক মতাদর্শের বুদ্ধি বৃত্তিক সহযোগিতাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, সেটি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু যদি শব্দটি এমন একটি বস্তায় পরিণত হয় যেখানে রাষ্ট্র বা সমাজ তার অপছন্দের সব সাংবাদিক, অধ্যাপক, লেখক, গবেষক, মানবাধিকার-কর্মী কিংবা প্রতিবাদী তরুণকে ঢুকিয়ে দিতে পারে, তবে সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আমরা আরও বড় সমস্যা তৈরি করব। শত্রু খুঁজতে খুঁজতে এমন যেন না হয় যে শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন করাকেই শত্রুতা বলে ঘোষণা করি। অন্যদিকে, বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার অর্থও এই নয় যে শিক্ষিত মানুষ যা ইচ্ছা তা বলে যাবেন এবং তার সামাজিক পরিণতির কোনো দায় নেবেন না।

এই জাতীয় কথার বিস্ফোরণে সব সময় বাড়ি ঘর ভাঙে না। প্রথমে ভাঙে বিশ্বাস। আমি আর আমার প্রতিবেশীকে প্রতিবেশী হিসেবে দেখি না। দেখি হিন্দু অথবা মুসলমান, আওয়ামী অথবা বিএনপি, জামায়াত অথবা বাম, ভারত পন্থী অথবা ভারত বিরোধী, সেক্যুলার অথবা মৌলবাদী। অর্থাৎ মানুষ ধীরে ধীরে মানুষ থাকা বন্ধ করে দেয়। তার একটি পরিচয়ই তার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব হয়ে দাঁড়ায়। এটাই বুদ্ধিবৃত্তিক উগ্রবাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। বন্দুকধারী একজন মানুষ আপনার শরীরকে আক্রমণ করতে পারে। কিন্তু চরম পন্থী বুদ্ধি ব্যবসায়ী আপনার প্রতিবেশী সম্পর্কে আপনার ধারণাটিকেই আক্রমণ করে। প্রথম আক্রমণে একজন মানুষের মৃত্যু হতে পারে। দ্বিতীয় আক্রমণ একটি সমাজের বহু বছরের পারস্পরিক বিশ্বাস হত্যা করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এই কাজটিকে আরও সহজ করেছে। আগে বুদ্ধিজীবী হতে প্রচুর বই পড়তে হতো। এখন অনেক সময় একটি স্মার্ট ফোন এবং আত্মবিশ্বাসই যথেষ্ট। আগে কোনো জটিল বিষয়ে মতামত দেওয়ার আগে মানুষ বলতেন, “বিষয়টি একটু পড়ে দেখি।” এখন প্রশ্ন করা হয়, “ভিডিওটা দেখেছেন?” ভিডিওর দৈর্ঘ্য ৪৭ সেকেন্ড, বিষয় তিনশ বছরের ইতিহাস, মন্তব্য আঠারো হাজার, আর সিদ্ধান্ত, সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছে। আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত তথ্যের অভাব নয়। তথ্যের অতিরিক্ততা এবং প্রজ্ঞার ঘাটতি।

সমস্যাটি বাংলাদেশের নয়। দিল্লি থেকে ঢাকা, লন্ডন থেকে ওয়াশিংটন, সব খানেই। রাজনীতি ক্রমশ এমন একটি বাজারে পরিণত হচ্ছে যেখানে যুক্তির চেয়ে ক্ষোভের বাজারদর বেশি। কারণ যুক্তি ধীর, রাগ দ্রুত। যুক্তি বুঝতে সময় লাগে, রাগ ছড়াতে লাগে কয়েক সেকেন্ড। যুক্তির জন্য হাজার শব্দের নিবন্ধ লাগে, রাগের জন্য একটি হ্যাশট্যাগ-ই যথেষ্ট। ফলে আমাদের সময়ের সবচেয়ে সফল রাজনৈতিক ব্যবসায়ী সেই ব্যক্তি, যিনি সবচেয়ে দক্ষতার সঙ্গে বলতে পারেন, “আপনার সব সমস্যার জন্য ওই মানুষগুলো দায়ী।” কখনো “ওই মানুষ” ধর্মীয় সংখ্যালঘু, কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ; কখনো অভিবাসী, কখনো উদারপন্থী; কখনো ইসলামপন্থী, কখনো বামপন্থী; কখনো জাতীয়তাবাদী, কখনো বিশ্বায়ন পন্থী; কখনো ভারত, কখনো পাকিস্তান, কখনো আমেরিকা, কখনো চীন। শুধু একজন মানুষকে আমরা সন্দেহ করতে ভুলে যাই—নিজেকে।

তাই একটি জাতির বেশি বুদ্ধিমান মানুষ দরকার নেই। দরকার আরও বেশি সৎ বুদ্ধিমান মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি জ্ঞান দিতে পারে, চরিত্রের সার্টিফিকেট দেয় না। পি এইচ ডি এর সঙ্গে বিবেক ফ্রি আসে না। নামের আগে প্রফেসর লিখলেই পক্ষ-পাত মুছে যায় না। কলামিস্ট হলেই সত্যের মালিকানা পাওয়া যায় না। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দশ লাখ ফলোয়ার থাকলেই দশ লাখ মানুষের চেয়ে বেশি সত্য জানা হয়ে যায় না। আমাদের দরকার এমন বুদ্ধিজীবী, যিনি নিজের পক্ষের মিথ্যাও ধরবেন। নিজের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উগ্রতার বিরুদ্ধেও কথা বলবেন। নিজের রাজনৈতিক দলের দুর্নীতিও লিখবেন। নিজের প্রিয় নেতার ভুলকে ভুল বলবেন। প্রতিপক্ষ ভালো কিছু করলে সেটিও স্বীকার করবেন। আর সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন তিনটি শব্দ উচ্চারণ করতে পারবেন, “আমি ভুল ছিলাম।” বাংলাদেশে যেদিন কোনো টেলিভিশন টকশোতে একজন বুদ্ধিজীবী বলবেন, “গত সপ্তাহে আমি যে কথাটি বলেছিলাম, নতুন তথ্য দেখে বুঝতে পারছি সেটি ভুল ছিল”, সেদিন তাঁকে অন্তত একটি জাতীয় পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা যেতে পারে। কারণ আমাদের উপমহাদেশে প্রকাশ্যে ভুল স্বীকার করা সম্ভবত বিলুপ্ত প্রায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় ওঠার অপেক্ষায় আছে।

আমরা প্রায় সময়ই মনে করি অশিক্ষিত মানুষগুলোই সমাজের জন্য বিপজ্জনক। কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়। অশিক্ষা বিপজ্জনক, তা ঠিক। কিন্তু শিক্ষিত সয়তানের অসততা আর ভন্ডামি পনা আরও বিপজ্জনক। অশিক্ষিত মানুষে যখন গুজব বিশ্বাস করে, শিক্ষিত অসৎ মানুষগুলো গুজব তৈরি করে যা যে কোন সমাজের জন্য ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসতে পারে। সুতরাং আমাদের নতুন কোনো শত্রু শ্রেণি তৈরি করার দরকার নেই। সাংবাদিক, অধ্যাপক, আলেম, লেখক, শিল্পী, ছাত্র, গবেষক কিংবা মানবাধিকার কর্মীর কপালে “দেমাগি নকশাল”, “দেশদ্রোহী”, “দালাল”, “মৌলবাদী”, “ফ্যাসিস্ট” কিংবা অন্য কোনো সুবিধাজনক স্টিকার লাগিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং প্রত্যেক প্রভাবশালী কণ্ঠকে কয়েকটি সহজ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করানো দরকার। তিনি কি সত্য বলছেন, নাকি সত্যকে ব্যবহার করছেন? তিনি কি প্রশ্ন করতে শেখাচ্ছেন, নাকি ঘৃণা করতে শেখাচ্ছেন? তিনি কি মানুষকে স্বাধীনভাবে ভাবতে সাহায্য করছেন, নাকি নিজের মতাদর্শের সৈনিক বানাচ্ছেন? সবচেয়ে বড় কথা, তিনি কি নিজের পক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও একই ভাষায় কথা বলেন? কারণ গণতন্ত্রের শত্রু শুধু সেই ব্যক্তি নন, যার হাতে বন্দুক আছে। গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন সেই ব্যক্তিও, যিনি আপনার হাতে বন্দুক না দিয়েও আপনার মাথার ভেতরে একজন স্থায়ী শত্রু তৈরি করে দেন। তখন আপনি প্রতিবেশীকে আর মানুষ হিসেবে দেখেন না, দেখেন প্রতিপক্ষ হিসেবে। বন্ধুকে দেখেন মতাদর্শ হিসেবে। সহকর্মীকে দেখেন ভোট হিসেবে। আর দেশকে দেখেন দুটি ভাগে, “আমরা” এবং “ওরা”। ঠিক সেই মুহূর্তেই আমাদের রাজনৈতিক হাঁড়ির ঢাকনাটা একটু তুলে দেখা দরকার। ডাল দেখতে ঠিকই আছে। হলুদের রং সুন্দর। উপরে ধনে পাতাও ছড়ানো। বক্তৃতায় গণতন্ত্র আছে, পোস্টারে দেশপ্রেম আছে, সেমিনারে মানবতা আছে, টকশোতে নৈতিকতার প্রচণ্ড আওয়াজ আছে। কিন্তু চামচটা একটু নিচ পর্যন্ত নামিয়ে নাড়লেই মাঝে মাঝে মনে হয়,  ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। আর সম্ভবত কালোটা ডালে নয়। কালোটা সেই বুদ্ধিবৃত্তিতে। যে বুদ্ধির কাজ ছিল অন্ধকারে আলো জ্বালানো, অথচ একদিন সে নিজেই আবিষ্কার করল, আলো বিক্রি করার চেয়ে অন্ধকারের ব্যবসায় লাভ অনেক বেশি।

 

Leave your review