
বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এক সহকর্মী আছেন। প্রাচ্য আর পাশ্চাত্য, দুই ধারার দর্শনেই তাঁর বেশ গভীর পড়াশোনা। মানুষটাকে দেখলে আমার প্রায়ই মনে হয়, বইয়ের সঙ্গে তাঁর বহুদিনের একটা গোপন বোঝাপড়া আছে। একটা বই শেষ হতে না হতেই আরেকটা এসে হাজির হয় তাঁর হাতে। ক্লাসের ফাঁকে কখনো করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে, কখনো চায়ের কাপ হাতে আমাদের কথা জমে ওঠে। শুরুটা হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের একেবারে মামুলি কোনো ঘটনা দিয়ে। কিন্তু কীভাবে যেন সেখান থেকে সক্রেটিস-প্লেটো, কনফুসিয়াস-বুদ্ধ কিংবা মার্কাস অরেলিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যাই। তারপর আবার ঘুরতে ঘুরতে ফিরে আসি আমাদের নিজেদের সমাজে। আমাদের চারপাশের মানুষজন, শিক্ষা, জ্ঞান আর জ্ঞানী হয়ে ওঠার নানা কায়দা কানুনে।
এসব আলাপে তাঁর একটা আফসোস প্রায়ই ফিরে আসে। তাঁর মনে হয়, এখন অনেকের আগ্রহ জ্ঞান অর্জনের চেয়ে জ্ঞানী হিসেবে পরিচিত হওয়ার দিকেই বেশি। পড়ার চেয়ে পদ-পদবি, বোঝার চেয়ে সার্টিফিকেট, আর কাজের চেয়ে নিজের ঢোলটা ঠিকঠাক পেটাতে পারার কদরও যেন কম নয়। একদিন ক্যাম্পাসের পাশেই হলবর্নের ছোট্ট এক পার্কে বসে আমাদের সেই আলাপ জমেছিল। পার্কটা খুব বড় নয়, কিন্তু পুরনো গাছগুলোর বিশাল ডালপালা মাথার ওপর এমনভাবে ছড়িয়ে আছে, যেন সবুজ পাতার এক প্রাকৃতিক ছাতা। ফাঁক গলে লন্ডনের ম্লান আলো এসে পড়ে নিচে। শহরের ব্যস্ততা চারদিকে থাকলেও ভেতরটায় কেমন এক টুকরো নিরিবিলি ভাব। পার্কের ছোট্ট কফি শপ থেকে চা নিয়ে আমরা বসেছিলাম গাছের ছায়ায়। কাঁচের গ্লাসে ধোঁয়া-ওঠা চায়ে চুমুক দিতে দিতে তিনি সেদিনও বলছিলেন জ্ঞান আর জ্ঞানী সাজার মধ্যকার সেই পুরনো ফারাকের কথা। আমি কিছুক্ষণ শুনলাম। তারপর হেসে বললাম,‘সমস্যা ভণ্ডের সংখ্যা না ভাই, সমস্যা হইল ভণ্ডের বাজারডা ভালো!’ কথাটা শুনে দুজনেই বেশ হাসলাম। কিন্তু পরে কথাটা মাথায় ফিরে এলো। ভাবলাম, এটা কি আসলেই শুধু হাসির কথা? যে সমাজে জ্ঞানের চেয়ে জ্ঞানের অভিনয়ের বাজার ভালো, সেখানে সত্যিকার জ্ঞানী মানুষটার জায়গা আসলে কই?
আমাদের সমাজে জ্ঞানী হওয়া যতটা কঠিন, জ্ঞানী হয়ে জনপ্রিয় থাকা সম্ভবত তার চেয়েও কঠিন। জ্ঞান অর্জনের জন্য বই পড়তে হয়, প্রশ্ন করতে হয়, নিজের ভুল স্বীকার করতে হয়, কখনো বহু বছরের বিশ্বাসকেও নতুন প্রমাণের সামনে দাঁড় করাতে হয়। কিন্তু জনপ্রিয় হওয়ার রাস্তাটা অনেক সময় এত দীর্ঘ নয়। সেখানে গভীর জ্ঞানের চেয়ে দরকার দৃঢ় কণ্ঠস্বর, একটু নাটকীয়তা এবং কয়েকটি চমকপ্রদ বাক্য। সাথে এমন এক আত্মবিশ্বাস, যেন পৃথিবীর যাবতীয় রহস্যের চাবি বক্তার পাঞ্জাবির পকেটেই আছে। জ্ঞানী মানুষ কথা বলার আগে ভাবেন। ভণ্ড মানুষ ভাবার আগেই কথা শেষ করে ফেলেন। জ্ঞানী বলেন, ‘বিষয়টা একটু জটিল, আরও কিছু তথ্য দেখা দরকার।’ ভণ্ড বলেন, ‘এইডা তো পানির মতো সোজা! আসল ঘটনা কেউ আপনাদের কয় না।’ ব্যস, শ্রোতা নড়েচড়ে বসে। কারণ জটিল সত্যের চেয়ে সরল মিথ্যার পরিবেশন অনেক সময় বেশি আকর্ষণীয়। জ্ঞানীর আরেক বিপদ। তিনি নিজের জ্ঞানের সীমা জানেন। তাই তাঁর মুখে ‘হতে পারে’, ‘নিশ্চিত নই’, ‘আরও যাচাই করা দরকার’ এমন অজনপ্রিয় বাক্য শোনা যায়। অন্যদিকে ভণ্ডের অভিধানে সংশয় বলে কোনো শব্দ নেই। অর্থনীতি থেকে ইতিহাস, চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে ভূরাজনীতি, সব বিষয়েই তাঁর সিদ্ধান্ত প্রস্তুত। আপনি শুধু প্রশ্নটা করেন; উত্তর আগে থেকেই পকেটে আছে। প্রয়োজন হলে সঙ্গে দু-একটা ভুল-ভাল ইংরেজি শব্দ, একটা অজানা গবেষণার উল্লেখ এবং রহস্যময় গলায় ‘ভেতরের খবর’ যোগ হয়ে যাবে। ফলে একজন অধ্যাপক ত্রিশ বছর গবেষণা করে যে বিষয়ে দশ মিনিট ভেবে উত্তর দেন, সেই বিষয়ে আরেকজন তিনটি ফেসবুক পোস্ট পড়ে এমনভাবে কথা বলেন, যেন সক্রেটিস মরার আগে তাঁর কাছ থেকেই শেষ পরামর্শটা নিয়ে গিয়েছিলেন।
সমস্যা হলো, আমাদের সময় সত্যের সঙ্গে মিথ্যার লড়াই যতটা, তার চেয়েও বেশি লড়াই ধীর চিন্তার সঙ্গে দ্রুত আত্মবিশ্বাসের। সত্যকে প্রমাণ দেখাতে হয়। ভণ্ডামির শুধু মাইক্রোফোন হলেই চলে। জ্ঞানী একটি বাক্যের পাশে দশটি প্রশ্ন রাখেন, ভণ্ড দশটি প্রশ্নের জন্য একটি উত্তর বানিয়ে রাখেন। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে সেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যদি ক্যামেরার দিকে তাকানোর কায়দা, গলার উপযুক্ত ওঠানামা এবং শিরোনামে ‘যে সত্য এতদিন আপনাকে জানতে দেওয়া হয়নি’ যোগ করা যায়, তাহলে আর পায় কে! স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় জনের ভিডিওতে ভিউ বেশি। প্রথম জন তখন বইয়ের পাতায় ফুটনোট খুঁজছেন, আর দ্বিতীয়জনের কমেন্ট বক্সে ইতিমধ্যে লেখা শুরু হয়ে গেছে, ‘স্যার, আপনি জাতির চোখ খুলে দিলেন!’ এইখানেই বোধহয় আমাদের সময়ের সবচেয়ে মজার এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বেদনাদায়ক বৈপরীত্য। যিনি সত্যিই জানেন, তিনি নিজের জ্ঞান নিয়ে সাবধান। আর যিনি জানেন না, তাঁর আত্মবিশ্বাসে আকাশও ছোট মনে হয়। ফলে যে সমাজে শব্দের উচ্চতাকে জ্ঞানের গভীরতা বলে ভুল করা হয়, সেখানে ভণ্ডের চারপাশে ভিড় জমে আর জ্ঞানী মানুষটি ক্রমশ একা হয়ে পড়েন। প্রশ্নটা তাই শুধু কে সত্য বলছে তা নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কাকে শুনতে ভালোবাসি, এবং কেন?
সক্রেটিসের দর্শনের গোড়াতেই ছিল প্রশ্ন। তিনি মানুষকে শুধু উত্তর দিতেন না। বরং প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে জানতে চাইতেন, তুমি যাকে সত্য বলে জানো, সেটি সত্য জানলে কীভাবে? নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতন হওয়াকেই তিনি জ্ঞানের পথে গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে দেখেছিলেন। আজকের বাংলাদেশে সক্রেটিস থাকলে সম্ভবত এথেন্সের বাজারের বদলে কোনো চায়ের দোকানে বসে চায়ের কাপে ফুঁ দিতে দিতে জিজ্ঞেস করতেন, ‘হুনেন মিয়া, খবরটা সত্য জানলেন কেমনে?’উত্তর আসত,
‘ফেসবুকে দেখছি।’
‘কে লিখছে?’
‘একজনে।’
‘লোকটা বিষয়টা জানে?’
‘জানি না।’
‘খবরের সূত্র কি?’
‘হেইডাও জানি না।’
‘তাইলে বিশ্বাস করলেন ক্যান?’ এবার ভদ্রলোক একটু বিরক্ত হয়ে বলতেন, ‘আরে মিয়া, পঞ্চাশ হাজার মানুষ শেয়ার করছে! এত মানুষ কি আর ভুল করে?’ সক্রেটিস সম্ভবত চায়ের কাপটা আস্তে করে নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। আড়াই হাজার বছর দর্শন চর্চার পরও তাঁকে আবার গোড়া থেকে শুরু করতে হতো। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাস আর সত্য এক জিনিস নয়। আমাদের সময়ে অবশ্য কোনো বক্তব্যের সত্যতা অনেক সময় প্রমাণের চেয়ে তার ‘ভাইরাল’ হওয়ার ক্ষমতা দিয়ে বিচার করা হয়। দশজন ভুল কথা বললে আমরা সন্দেহ করি, দশ হাজার মানুষ একই ভুল বললে একটু নড়েচড়ে বসি, আর দশ লাখ মানুষ বললে মনে মনে ভাবি, ‘কিছু একটা তো আছেই!’অথচ মিথ্যার একটা বড় সুবিধা হলো, সত্যের মতো তার সার্টিফিকেট লাগে না; শুধু ভালো একটা শিরোনাম আর যথেষ্টসংখ্যক শেয়ার হলেই সে সমাজে সম্মানিত অতিথির মতো ঘুরে বেড়াতে পারে।
প্লেটোর বিখ্যাত ‘গুহার উপমা’য় কিছু মানুষ সারাজীবন একটি গুহার ভেতর বন্দী ছিল। তাদের চোখের সামনে শুধু দেয়াল, আর সেই দেয়ালে পড়া ছায়াকেই তারা বাস্তব জগৎ বলে জানত। তাদের একজন কোনোভাবে গুহার বাইরে গিয়ে আলো দেখল। প্রকৃত পৃথিবী দেখল। ফিরে এসে অন্যদের বোঝাতে চাইল, ‘ভাইসব, এতদিন যা দেখছেন, এইডাই পুরা দুনিয়া না।’ কিন্তু বহু দিনের পরিচিত ছায়া ছেড়ে নতুন সত্য মেনে নেওয়া কি এত সহজ? আজকের গুহা অবশ্য পাথরের নয়। পকেটে রাখা যায়, চার্জ দিতে হয়, আর ওয়াই-ফাই দুর্বল হলে আমাদের মেজাজও দুর্বল হয়ে যায়। গুহার দেয়ালের জায়গা নিয়েছে মোবাইলের স্ক্রিন, আর ছায়ার জায়গায় এসেছে পোস্ট, রিল, ভিডিও ও ফরোয়ার্ড করা বার্তা। আমরা একই ধরনের বক্তব্য বারবার দেখি, একই মতের মানুষের মন্তব্য পড়ি, একই কথার শত সংস্করণ শুনি। একসময় মনে হয়, ‘সবাই তো এই কথাই বলছে! তাইলে মিথ্যা হইব কেমনে?’ আসলে সবাই বলছে না। নিজের পছন্দের কথাই বারবার শুনতে শুনতে আমরা কখনো কখনো ভুলে যাই, আমার পর্দায় যে পৃথিবী দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীটা তার চেয়েও অনেক বড়। প্লেটোর গুহার মানুষ অন্তত জানত না যে তারা ছায়া দেখছে। আমাদের বিপদ হলো, হাতে স্মার্ট ফোন নিয়েও আমরা অনেক সময় ছায়াকেই ‘ব্রেকিং নিউজ’ ভেবে বসি।
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ডায়োজিনিসকে নিয়ে বহুল প্রচলিত গল্প আছে। তিনি দিনের আলোয় বাতি হাতে ঘুরে বেড়াতেন একজন সৎ মানুষ খুঁজে পাওয়ার আশায়। আজকের বাংলাদেশে এলে তাঁর অনুসন্ধান সম্ভবত আরও কঠিন হতো। বাতির বদলে সঙ্গে রাখতে হতো পাওয়ার ব্যাংক। তারপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিনের পর দিন খুঁজতেন এমন একজন মানুষকে, যিনি কোনো বিষয়ে না জানলে নির্দ্বিধায় বলতে পারেন, ‘আমি জানি না।’ কারণ আমাদের সময়ে ‘আমি জানি না’ বলা যেন অজ্ঞতার স্বীকারোক্তি। অথচ সেটিই অনেক সময় জ্ঞানী হওয়ার প্রথম লক্ষণ। এখন সকালে দুটি ভিডিও দেখে অর্থনীতিবিদ, দুপুরে তিনটি পোস্ট পড়ে ইতিহাসবিদ, সন্ধ্যায় একটি পডকাস্ট শুনে ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞ এবং রাতে কয়েকটি রিল দেখে মনোবিজ্ঞানী হয়ে যাওয়ার সুযোগ যখন আছে, তখন বছরের পর বছর বইপত্র ঘাঁটার দরকারটাই বা কি! আগে বিশেষজ্ঞ হতে পড়াশোনা করতে হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস থাকলেই চলে। তথ্য ভুল হলেও সমস্যা নেই, গলার স্বর যেন ঠিক থাকে। বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেন, ‘দোস্ত, এত কিছু জানলি কেমনে?’ উত্তর আসবে, ‘পড়াশোনা করি ভাই।’
‘কি পড়েন?’
‘ক্যাপশন।’
ডায়োজিনিস সম্ভবত তখন বাতিটা নিভিয়ে পাওয়ার ব্যাংকটাও ব্যাগে ঢুকিয়ে বলতেন, ‘থাউক মিয়া, মানুষ খোঁজা পরে হইব!’
এখানেই জ্ঞানীর বিপদ। একজন গবেষককে জিজ্ঞেস করুন, ‘এই সমস্যার সমাধান কি?’ তিনি হয়তো বলবেন, ‘আরও তথ্য দরকার। বিষয়টির অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক দিক আছে।’ পাশের লোকটি বলবেন, ‘মূল সমস্যা একটাই, আমি তিন মিনিটে বুঝাইয়া দিতেছি।’ শ্রোতা কার দিকে যাবে, অনুমান করা কঠিন নয়। কারণ সত্য প্রায়ই জটিল। ভণ্ডামি আশ্চর্য রকম সরল। জ্ঞানী বলেন, ‘প্রমাণটা দেখি।’ ভণ্ড বলেন, ‘আমার কথা মিলাইয়া নিয়েন।’ জ্ঞানী নতুন তথ্য পেলে মত পরিবর্তন করেন। ভণ্ড মত পরিবর্তন করাকে দুর্বলতা মনে করেন। জ্ঞানী একটি বাক্য বলার আগে তিনবার ভাবেন, আর ভণ্ড তিনটি বাক্যের মধ্যে আঠারোটি সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেলেন। আমাদের জন পরিসরে তাই এক নতুন ধরনের ‘বিশেষজ্ঞ সংস্কৃতি’ তৈরি হয়েছে। যে বিষয়ে যত কম জানা, সে বিষয়ে তত দৃঢ় মতামত দেওয়ার একটা অদ্ভুত সাহস দেখা যায়। অ্যারিস্টটল যুক্তি বিদ্যার এত আয়োজন করেছিলেন মানুষ যেন কারণ, প্রমাণ ও সিদ্ধান্তের সম্পর্ক বুঝতে পারে। এখনকার কিছু আলোচনা শুনলে তিনি হয়তো তাঁর যুক্তিবিদ্যার নতুন অধ্যায়ের নাম দিতেন, ‘বাবারে বাবা!’ সমস্যা শুধু হাসির নয়। ভণ্ডের জনপ্রিয়তার পেছনে মানুষের একটি স্বাভাবিক দুর্বলতাও কাজ করে। আমরা অনিশ্চয়তা পছন্দ করি না। যে লোক বলেন, ‘বিষয়টি জটিল’, তাঁকে শুনে অস্বস্তি হয়। আর যে বলেন, ‘সব রহস্য আমার জানা’, তাঁর কথা শুনে নিশ্চিন্ত লাগে। জ্ঞানী আমাদের প্রশ্ন দেন। ভণ্ড আমাদের নিশ্চয়তা দেন। জ্ঞানী আয়না ধরেন, ভণ্ড অহংকারে তেল দেন। বাজারে তেলের ক্রেতা আয়নার ক্রেতার চেয়ে বরাবরই বেশি।
ধরেন, কুমিল্লার বড়ুরা বাজারের কোনো চায়ের দোকানে বিশ বছর ধরে একটি বিষয়ে গবেষণা করা অধ্যাপক বসে আছেন। পাশে আরেক ভদ্রলোক গত রাতে এগারো মিনিটের একটি ইউটিউব ভিডিও দেখেছেন। আলোচনা শুরু হলো। অধ্যাপক বললেন, ‘আরও তথ্য না দেখে নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।’ ইউটিউব-শিক্ষিত ভদ্রলোক কাপ নামিয়ে বললেন, ‘স্যার, আপনি আসল জায়গাটাই ধরতে পারেন নাই।’সবাই তাঁর দিকে ফিরল। অধ্যাপক বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আসল জায়গাটা কি?’ ভদ্রলোক গলা নামিয়ে বললেন, ‘ঘটনা অনেক গভীর।’‘কত গভীর?’ ‘এইডা এখানে বলা যাবে না।’ ব্যস। অধ্যাপক পরাজিত। কারণ গবেষণার সঙ্গে রহস্যের প্রতিযোগিতা বড় কঠিন। রোমান সম্রাট ও স্টোয়িক দার্শনিক মার্কাস অরেলিয়াস নিজের জন্য লেখা “মেডিটেশন”- এ বারবার নিজের চরিত্র, অহংকার ও কর্তব্যকে পরীক্ষা করেছেন। এখানেই জ্ঞান আর প্রদর্শনের পার্থক্যটি সুন্দরভাবে ধরা পড়ে। জ্ঞানী আয়না খোঁজেন, ভণ্ড ক্যামেরা খোঁজেন। আয়না বলে, ‘নিজেকে দেখো’। ক্যামেরা বলে, ‘নিজেকে দেখাও।’ তবু হতাশ হওয়ার কারণ নেই। সক্রেটিসের জীবন শেষ হয়েছিল বিষের পেয়ালায়, কিন্তু তাঁর প্রশ্ন শেষ হয়নি। প্রায় আড়াই হাজার বছর পরও তিনি আমাদের জিজ্ঞেস করছেন, ‘তুমি যা বিশ্বাস করো, কেন বিশ্বাস করো?’ প্লেটোর গুহা এখনো আমাদের সতর্ক করে, ছায়াকে বাস্তব ভেবো না। ডায়োজিনিসের বাতিও এখনো জ্বলছে, মানুষের ভিড়ে সত্যিকারের মানুষ খোঁজার জন্য।
ভণ্ডামি দ্রুত জনপ্রিয় হয়, কারণ তার গলা উঁচু। জ্ঞান ধীরে ছড়ায়, কারণ তার স্বভাবই প্রশ্ন করা। কিন্তু শব্দের আয়ু আর চিন্তার আয়ু এক নয়। শেষ পর্যন্ত একটি সমাজের সংকট শুধু এই নয় যে সেখানে ভণ্ড মানুষ আছে। ভণ্ড তো সক্রেটিসের এথেন্সেও ছিল, ডায়োজিনিসের পথেও ছিল, আজও আছে। আসল সংকট শুরু হয় তখন, যখন আমরা প্রশ্নের চেয়ে স্লোগান, প্রমাণের চেয়ে প্রচার, জ্ঞানের চেয়ে আত্মবিশ্বাস আর সত্যের চেয়ে জনপ্রিয়তাকে বেশি মূল্য দিতে শুরু করি। তখন জ্ঞানী মানুষ একা হয়ে যান। তিনি কথা বলতে পারেন না বলে নয়, বরং তাঁর কথা শোনার মতো ধৈর্য আমাদের কমে যায় বলে। তাই ভণ্ডের মাইক কেড়ে নেওয়ার চেয়ে জরুরি হলো নিজের ভেতরের শ্রোতাটাকে শিক্ষিত করা। যে হাততালি দেওয়ার আগে একটু থামবে। শেয়ার করার আগে যাচাই করবে। আর প্রবল আত্মবিশ্বাসে বলা কথার সামনেও সাহস করে জিজ্ঞেস করবে, ‘প্রমাণটা কই?’ যে সমাজে এই প্রশ্নটি বেঁচে থাকে, সেখানে জ্ঞানী মানুষ হয়তো কখনো একা হন, কিন্তু জ্ঞান শেষ পর্যন্ত একা থাকে না।