
বাংলাদেশে শিক্ষা আজ আর কেবল জ্ঞান অর্জন, মানবসম্পদ উন্নয়ন কিংবা সামাজিক অগ্রগতির একটি মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সেবা, প্রতিষ্ঠান, উপকরণ এবং বাজারব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিস্তৃত শিক্ষা অর্থনীতি। আর এই অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো কোচিং নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা। গত চার দশকে এই ব্যবস্থা এমন এক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে, যা শুধু শিক্ষাক্ষেত্রকেই নয়, পরিবার, সমাজ এবং জাতীয় অর্থনীতিকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। একসময় বিদ্যালয়ই ছিল শিক্ষাদান ও শিক্ষা গ্রহণের প্রধান এবং একমাত্র কেন্দ্র। শ্রেণী কক্ষের পাঠ, শিক্ষকের নির্দেশনা এবং পাঠ্যপুস্তক ভিত্তিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের চাহিদা পূরণ করত। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউশন, ভর্তি প্রস্তুতি কার্যক্রম, গাইড বই, প্রশ্ন ব্যাংক এবং অনলাইন শিক্ষা সেবাকে ঘিরে একটি সমান্তরাল শিক্ষা কাঠামো গড়ে উঠেছে। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল, প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় সাফল্য এবং চাকরির বাজারে এগিয়ে থাকার তাগিদে এই কাঠামো ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে শিক্ষা আজ শুধু একটি সামাজিক অধিকার বা মানবিক বিনিয়োগ নয়, বরং একটি শক্তিশালী বাজার ভিত্তিক অর্থনৈতিক খাত হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছে। দিনে দিনে এর পরিধি, প্রভাব এবং আর্থিক গুরুত্ব প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কোচিং’ শব্দটির উৎপত্তি মূলত ইউরোপে। যদিও এর ধারণাগত শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত। ইতিহাসবিদদের মতে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে যে অতিরিক্ত একাডেমিক সহায়তা প্রদান করা হতো, সেখান থেকেই ‘কোচিং’ ধারণার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ ঘটে। ‘কোচ’ শব্দটি মূলত পরিবহনের একটি বাহনকে নির্দেশ করত, যা যাত্রীকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দেয়। শিক্ষাক্ষেত্রে এই শব্দের ব্যবহার শুরু হয় রূপক অর্থে। যে শিক্ষক বা প্রশিক্ষক শিক্ষার্থীকে তার কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাগত গন্তব্যে, অর্থাৎ পরীক্ষায় সাফল্য বা নির্দিষ্ট যোগ্যতা অর্জনের লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে সহায়তা করেন। অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যক্তিগত শিক্ষাদান বা ‘টিউটোরিয়াল’ পদ্ধতির সম্প্রসারণ হিসেবে এই কোচিং সংস্কৃতি জনপ্রিয়তা লাভ করে। শিল্প বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে শিক্ষা ও পেশাগত প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় পরীক্ষা ভিত্তিক মূল্যায়নের গুরুত্বও বাড়তে থাকে। এর ফলে নিয়মিত শ্রেণি কক্ষ শিক্ষার বাইরে অতিরিক্ত প্রস্তুতির চাহিদা সৃষ্টি হয়। ধীরে ধীরে এই ধারণা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং পরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষত ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং চীনের মতো উচ্চ প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থার দেশগুলোতে কোচিং একটি শক্তিশালী সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। শুরুতে এর মূল উদ্দেশ্য ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি পূরণ করা, বিশেষ মেধাবী শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত দিকনির্দেশনা প্রদান করা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ও পেশাগত পরীক্ষার জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নিশ্চিত করা। অর্থাৎ এটি ছিল মূল শিক্ষাব্যবস্থার একটি পরিপূরক সহায়ক ব্যবস্থা।
কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, উচ্চশিক্ষায় সীমিত আসন, চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অভিভাবকদের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা কোচিং ব্যবস্থাকে নতুন মাত্রা দেয়। শিক্ষা ধীরে ধীরে বাজারমুখী হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কোচিংও একটি সেবাভিত্তিক শিল্পে রূপান্তরিত হয়। বিভিন্ন দেশে বৃহৎ কোচিং প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, পরীক্ষা কেন্দ্রিক কোর্স, গাইড বই প্রকাশনা এবং সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্মকে ঘিরে একটি বিশাল অর্থনৈতিক খাত গড়ে ওঠে। ফলে কোচিং আর শুধু শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সহায়তা প্রদানের একটি পদ্ধতি নয়। বরং এটি এখন বিশ্বব্যাপী শিক্ষা অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা শিক্ষা, সমাজ ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর সমানভাবে প্রভাব বিস্তার করছে। তবে বাংলাদেশে কোচিং সংস্কৃতির বিকাশ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তিত বাস্তবতা, উচ্চশিক্ষায় ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক প্রত্যাশার একটি স্বাভাবিক পরিণতি। আশির দশকের শেষভাগ এবং নব্বইয়ের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য প্রতিযোগিতা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। উচ্চশিক্ষার আসনসংখ্যা সীমিত থাকলেও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা প্রতি বছর বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ও প্রস্তুতির প্রবণতা বাড়তে থাকে। এই সময়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে ওঠে। ফলে বিদ্যালয় ও কলেজের নিয়মিত পাঠদানের বাইরে অতিরিক্ত প্রস্তুতির চাহিদা সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীকালে কোচিং শিল্পের ভিত্তি রচনা করে।
প্রাথমিক পর্যায়ে কোচিং ছিল মূলত কয়েকজন খ্যাতিমান শিক্ষক বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর উদ্যোগে পরিচালিত ছোট আকারের টিউটোরিয়াল ক্লাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট এবং মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন এলাকায় ভর্তি-প্রত্যাশীদের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি মূলক ক্লাস নিতেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ঢাকার ফার্মগেট, নীলক্ষেত, আজিমপুর এবং ধানমন্ডি এলাকাকে কেন্দ্র করে প্রথম সংগঠিত ভর্তি কোচিং কেন্দ্রগুলোর উত্থান ঘটে। এ সময় ‘উদ্ভাস’, ‘রেটিনা’, ‘ফোকাস’, ‘প্যারাগন’ বা পরবর্তী সময়ের অন্যান্য সুপরিচিত প্রতিষ্ঠানের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে গড়ে উঠলেও এর আগেই নীলক্ষেত ও ফার্মগেট এলাকায় অসংখ্য ছোট কোচিং সেন্টার বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। বাংলাদেশের প্রথম কোচিং সেন্টার কোনটি ছিল, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক নথি নেই। কারণ বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং অনানুষ্ঠানিক ভাবে যাত্রা শুরু করেছিল। তবে শিক্ষাবিদদের মতে, নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই ঢাকা কেন্দ্রিক ভর্তি প্রস্তুতি কার্যক্রম একটি সংগঠিত বাণিজ্যিক রূপ নিতে শুরু করে। সেখান থেকেই আধুনিক কোচিং শিল্পের ভিত্তি গড়ে ওঠে। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু একদিন আমাকে বাংলাদেশের কোচিং ব্যবস্থার আদ্যোপান্ত সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেন। তিনি বুয়েটের একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। শিক্ষাজীবনে কয়েকজন সহপাঠীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি একটি কোচিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পাশাপাশি, বুয়েটে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ভর্তি-গাইডও রচনা করেন, যা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের কাছে সমাদৃত ছিলো।
পরবর্তীকালে এই প্রবণতা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এসএসসি, এইচএসসি, বৃত্তি পরীক্ষা, বিসিএস, ব্যাংক নিয়োগ, এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্যও কোচিং সেবা বিস্তৃত হতে থাকে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে কোচিং সেন্টারগুলো বড় আকারের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যারা নিয়মিত ক্লাস, মডেল টেস্ট, প্রশ্নব্যাংক, গাইড বই এবং আবাসিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করতে থাকে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল ও রংপুরসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে দ্রুত কোচিং ব্যবসার প্রসার ঘটে। পরে জেলা শহর, উপজেলা সদর এবং এমনকি গ্রামীণ এলাকাতেও এই সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনলাইন কোচিং, ভিডিও লেকচার এবং ডিজিটাল শিক্ষা মাধ্যম যুক্ত হওয়ায় এই খাত আরও বিস্তৃত হয়েছে। আজ কোচিং আর কেবল শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সহায়তা প্রদানের একটি ব্যবস্থা নয়। এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি সমান্তরাল কাঠামো। একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। যে উদ্যোগ একসময় কয়েকজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল, তা এখন হাজার হাজার কোটি টাকার শিক্ষা অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
তবে শিক্ষা খাতের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানের বাইরে গড়ে ওঠা এই সমান্তরাল অর্থনীতির আকার কত বড়, তার সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব না থাকলেও বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে দেখা যায় যে শহরাঞ্চলের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী কোনো না কোনো ধরনের কোচিং বা ব্যক্তিগত টিউশনের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং বিভিন্ন শিক্ষা-গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরিবারগুলোর শিক্ষা ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন বিদ্যালয় বা কলেজের ফি নয়, বরং কোচিং, প্রাইভেট টিউশন, গাইড বই, মডেল টেস্ট এবং ভর্তি প্রস্তুতি কার্যক্রমের পেছনে ব্যয় হচ্ছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হাজার হাজার কোচিং সেন্টার, লক্ষাধিক গৃহশিক্ষক এবং অসংখ্য অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে একটি বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে। এর বার্ষিক আর্থিক লেনদেন কয়েক হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এই অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মী, ফ্রিল্যান্স প্রশিক্ষক, নোট ও গাইড বই প্রকাশক, প্রশ্নব্যাংক প্রস্তুতকারী, প্রিন্টিং প্রেস, বিজ্ঞাপন সংস্থা, ভবন মালিক, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতারা। একটি বড় ভর্তি কোচিং প্রতিষ্ঠান একাই শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষা উপকরণ, বই প্রকাশনা, ফটোকপি ব্যবসা, পরিবহন এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতও এই কোচিং অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে কোচিং শিল্প আজ কেবল শিক্ষা সেবা নয়, বরং কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
কোচিং অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা সংস্কৃতি এবং সনদ নির্ভর সামাজিক মানসিকতা। বাংলাদেশে শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা কিংবা ব্যবহারিক দক্ষতার তুলনায় পরীক্ষার নম্বর, জিপিএ এবং ভর্তি পরীক্ষায় সাফল্যকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। সীমিত সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় আসন, সরকারি চাকরিতে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক মর্যাদা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের ‘অতিরিক্ত প্রস্তুতি সংস্কৃতি’ গড়ে তুলেছে। ফলে অনেক অভিভাবক মনে করেন, বিদ্যালয়ের পাঠদান যতই ভালো হোক না কেন, কোচিং ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন সম্ভব নয়। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে কোচিং হলো সাফল্যের অপরিহার্য পূর্বশর্ত। এই মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতাই কোচিং শিল্পকে ক্রমাগত সম্প্রসারিত করছে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে একটি শক্তিশালী সমান্তরাল বাজার কাঠামো তৈরি করছে। তবে কোচিংনির্ভর শিক্ষা অর্থনীতির প্রভাবকে একমাত্রিক ভাবে মূল্যায়ন করা যায় না। এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই রয়েছে। একদিকে এই খাত হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাভিত্তিক প্রস্তুতিতে সহায়তা করছে এবং শিক্ষা খাতকে ঘিরে একটি নতুন সেবা বাজার গড়ে তুলেছে।
কিন্তু এর সামাজিক ও শিক্ষাগত মূল্যও কম নয়। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ব্যবস্থা শিক্ষায় বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও গভীর করে তুলছে। আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা একাধিক কোচিং, ব্যক্তিগত টিউটর, বিশেষায়িত ভর্তি প্রস্তুতি কোর্স এবং ডিজিটাল শিক্ষা সেবার সুযোগ গ্রহণ করতে পারলেও নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে একই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে একটি অদৃশ্য শ্রেণী বিভাজন তৈরি হয়, যেখানে সাফল্যের সুযোগ ক্রমশ অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। শিক্ষা তখন সামাজিক গতিশীলতার সেতুবন্ধন না হয়ে অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্য পুনরুৎপাদনের একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কোচিং সংস্কৃতির বিস্তারের ফলে অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যালয় ও কলেজের নিয়মিত পাঠদানকে পর্যাপ্ত বলে মনে করা হয় না। কখনো কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে শেখার পরিবেশকে এমনভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় যে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা গৌণ হয়ে পড়ে। এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের আস্থা কমে যায় এবং শিক্ষকদের সামাজিক ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে পরীক্ষার নম্বর, সম্ভাব্য প্রশ্ন এবং কৌশলগত প্রস্তুতি; অথচ জ্ঞানার্জনের আনন্দ, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিকতা ও সৃজনশীল বিকাশ ক্রমশ গুরুত্ব হারাতে থাকে।
কোচিংনির্ভর এই সংস্কৃতির আরেকটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় কোচিং, ব্যক্তিগত টিউশন এবং মডেল টেস্টের চাপে তাদের অবসর, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও সামাজিক বিকাশের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী অল্প বয়সেই এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং ব্যর্থতার ভয় নিয়ে বেড়ে উঠছে। শিক্ষা জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ ও অনুসন্ধিৎসা অনেক ক্ষেত্রে হারিয়ে যাচ্ছে পরীক্ষাকেন্দ্রিক সাফল্যের নিরন্তর দৌড়ে। সামাজিক পর্যায়েও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। ধীরে ধীরে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে কোচিং ছাড়া ভালো ফলাফল সম্ভব নয়। এই বিশ্বাস শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি করার পাশাপাশি পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে বাধ্য করছে। অনেক নিম্ন আয়ের পরিবার সন্তানদের কোচিংয়ের খরচ মেটাতে অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে দেয়, এমনকি ঋণ গ্রহণ করতেও বাধ্য হয়। ফলে শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার থেকে ক্রমেই একটি ক্রয়ক্ষমতা নির্ভর সেবায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকির মুখে পড়ছে। শিক্ষা যখন অতিমাত্রায় কোচিংনির্ভর হয়ে ওঠে, তখন তার মানবিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষা আর কেবল মানুষ গড়ার প্রক্রিয়া থাকে না। এটি ধীরে ধীরে একটি বাজারজাত পণ্যে রূপ নেয়। আর সেই বাজারে জ্ঞান ও মূল্যবোধের চেয়ে পরীক্ষায় সাফল্য অর্জনের কৌশলই হয়ে ওঠে প্রধান পণ্য।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে মৌলিক প্রশ্ন হলো, শিক্ষার মূল কেন্দ্র কি বিদ্যালয় ও শ্রেণিকক্ষ থাকবে, নাকি শিক্ষার্থীদের শেখার প্রধান ভরসা হয়ে উঠবে কোচিং ও বেসরকারি সহায়ক ব্যবস্থা? বাস্তবতা হলো, কোচিংকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি এটিকে মূলধারার শিক্ষার বিকল্প হিসেবেও গ্রহণ করা যায় না। কারণ কোনো সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থায় শ্রেণি কক্ষই হওয়া উচিত জ্ঞান অর্জনের প্রধান ক্ষেত্র। শিক্ষকই হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর প্রথম ও প্রধান শিক্ষা সহায়ক। তাই সমস্যার সমাধান কোচিং বন্ধ করার মধ্যে নয়। বরং বিদ্যালয় ভিত্তিক শিক্ষাকে এমন ভাবে মানসম্পন্ন ও কার্যকর করে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ শিক্ষাগত চাহিদা শ্রেণী কক্ষেই পূরণ হয়। এজন্য সরকারকে পাঠদানের গুণগত মান বৃদ্ধি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার, শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত একাডেমিক তদারকিও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের শ্রেণী কক্ষ ভিত্তিক পাঠদানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের বাইরে অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে। পরীক্ষা কেন্দ্রিক শিক্ষা সংস্কৃতির পরিবর্তে বিশ্লেষণী চিন্তা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান দক্ষতা এবং ব্যবহারিক শিক্ষাকে মূল্যায়নের আওতায় আনতে পারলে কোচিংয়ের ওপর অস্বাভাবিক নির্ভরতাও অনেকাংশে কমে আসবে। মনে রাখতে হবে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শ্রেণী কক্ষে, কোচিং সেন্টারের ব্যবসায়িক কক্ষে নয়। শিক্ষা যদি ক্রমাগত বাজারের যুক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে, তবে জ্ঞান, মূল্যবোধ ও মানবিক বিকাশের মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সময়ের দাবি হলো এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কোচিং হবে কেবল সহায়ক, আর বিদ্যালয়ই হবে শিক্ষার প্রকৃত কেন্দ্র। অন্যথায় কোচিং নির্ভর শিক্ষা অর্থনীতি আরও বিস্তৃত হবে। আর শিক্ষা ধীরে ধীরে তার সামাজিক ন্যায়, মানবিক উন্নয়ন ও জাতি গঠনের মৌলিক লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যাবে।