বাংলা কি শুধু একুশের ফেব্রুয়ারির জন্য?


বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সভাকক্ষ নয়। এটি কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার কনফারেন্স রুম নয়। কোনো ঔপনিবেশিক প্রশাসনের দরবার নয়। কোনো বিদেশি শক্তির নীতিনির্ধারণী মঞ্চও নয়। এটি সেই পবিত্র স্থান, যেখানে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, সংগ্রাম, অধিকার, বেদনা ও ভবিষ্যৎ একত্রিত হয়ে জাতীয় সিদ্ধান্তে রূপ নেয়। এই সংসদের প্রতিটি আসন জনগণের ভোট, জনগণের আস্থা এবং জনগণের প্রতিনিধিত্বের প্রতীক। এখানে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ কেবল একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত বক্তব্য নয়। এটি একটি জাতির কণ্ঠস্বর, একটি জনগোষ্ঠীর অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের ঘোষণা। এই সংসদ ভবনের দিকে তাকালে আমরা শুধু একটি স্থাপত্য দেখি না। আমরা দেখতে পাই একটি দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। আমরা দেখতে পাই ১৯৫২ সালের সেই রক্তাক্ত ফেব্রুয়ারিকে, যখন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে তরুণ ছাত্ররা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন রাজপথে। আমরা দেখতে পাই ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং একটি জাতির আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার অবিনাশী অভিযাত্রা। বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের গভীরে যে ভাষা, যে সংস্কৃতি এবং যে জাতিসত্তা প্রবাহিত হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলা ভাষা। বাংলা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। বাংলা আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের স্মৃতি, আমাদের পরিচয় এবং আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি।

এই কারণেই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ভাষার প্রশ্নটি নিছক ভাষা ব্যবহারের প্রশ্ন নয়। এটি জাতীয় চেতনার প্রশ্ন, সাংস্কৃতিক মর্যাদার প্রশ্ন এবং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রশ্ন। যে সংসদে দেশের কৃষকের ভাগ্য নির্ধারিত হয়, শ্রমিকের অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়, শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়, অর্থনীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয় এবং জাতীয় নীতি প্রণয়ন করা হয়, সেই সংসদের ভাষা এমন হওয়া উচিত যা দেশের সাধারণ মানুষ হৃদয় দিয়ে বুঝতে পারেন। নিজেদের ভাষা বলে অনুভব করতে পারেন। যার মধ্যে নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পান। বাংলাদেশের মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, সংগ্রাম ও স্বপ্ন যে ভাষায় প্রকাশ পায়, যে ভাষায় মায়ের ঘুম পাড়ানিয়ার গান শোনা যায়, যে ভাষায় কবিতা লেখা হয়, গান গাওয়া হয় এবং স্বাধীনতার শপথ উচ্চারিত হয়, সেই ভাষাটি স্বাভাবিকভাবেই হওয়া উচিত জাতীয় সংসদের প্রধান ভাষা, বাংলা। কারণ সংসদ জনগণের, রাষ্ট্র জনগণের, আর সেই জনগণের প্রাণের ভাষা বাংলা।

সম্প্রতি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে একজন সংসদ সদস্যের ইংরেজিতে প্রদত্ত বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গণমাধ্যম এবং জন-পরিসরে ব্যাপক আলোচনা, বিতর্ক ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। কেউ এই ঘটনাকে আধুনিকতা, বিশ্বায়নের বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আত্মপ্রকাশের সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। কেউ বলেছেন, একজন শিক্ষিত ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জনপ্রতিনিধির জন্য ইংরেজিতে সাবলীলভাবে বক্তব্য দেওয়া গর্বের বিষয়। আবার অনেকেই গভীর উদ্বেগের সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন, যে জাতির জন্মের ইতিহাস ভাষার অধিকারের সংগ্রামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, যে জাতি পৃথিবীর বুকে একমাত্র জাতি হিসেবে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে, সেই জাতির সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদে ইংরেজির ব্যবহার কি সত্যিই গ্রহণযোগ্য। নাকি এটি ধীরে ধীরে আমাদের ভাষাগত আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে দুর্বল করার একটি অশুভ প্রবণতার ইঙ্গিত? কিন্তু এই বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কোনো ব্যক্তি নন, কোনো নির্দিষ্ট সংসদ সদস্য নন, এমনকি কোনো রাজনৈতিক দলও নয়। প্রকৃত প্রশ্নটি অনেক বড়, অনেক গভীর এবং জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রশ্নটি হলো, বাংলাদেশের সংসদে কোন ভাষা প্রধান ভাষা হওয়া উচিত? জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যখন জনগণের পক্ষে কথা বলবেন, জনগণের সমস্যা, অধিকার, স্বপ্ন ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরবেন, তখন সেই ভাষা কি এমন হওয়া উচিত যা দেশের অধিকাংশ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বুঝতে পারেন। নাকি এমন একটি ভাষা যা সমাজের একটি সীমিত অংশের শিক্ষাগত বা সামাজিক সুবিধার প্রতিফলন? জাতীয় সংসদ কি কেবল আন্তর্জাতিক মহলের কাছে নিজেদের উপস্থাপনের একটি মঞ্চ, নাকি এটি সর্বাগ্রে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই আমাদের ফিরে তাকাতে হয় আমাদের ইতিহাসের দিকে, আমাদের ভাষা আন্দোলনের দিকে, আমাদের স্বাধীনতার চেতনার দিকে। সেই মৌলিক সত্যটির দিকে যে রাষ্ট্রের ভাষাগত চরিত্র নির্ধারিত হয় তার জনগণের ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তিতে। তাই আজকের বিতর্কের মূল বিষয় কোনো ব্যক্তির ইংরেজি জানার সক্ষমতা নয়। বরং জাতীয় সংসদের ভাষাগত চরিত্র, বাংলা ভাষার মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জনগণের ভাষাগত সম্পর্ক কতটা অটুট ও অর্থবহ থাকবে, সেই মৌলিক প্রশ্ন।

 

বাংলা ভাষা বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাস, জাতীয় চেতনা এবং স্বাধীন সত্তার সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে এ দুটিকে আলাদা করে দেখা প্রায় অসম্ভব। বিশ্বের বহু জাতি ভূখণ্ডের জন্য যুদ্ধ করেছে, রাজনৈতিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছে, অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছে। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম জাতির ভাগ্যেই এমন গৌরবময় অথচ বেদনা বিধুর অধ্যায় লেখা আছে, যেখানে মানুষ নিজের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বুকের তাজা রক্ত বিলিয়ে দিয়েছে। বাংলা ভাষার ইতিহাস তাই কেবল একটি ভাষার ইতিহাস নয়। এটি একটি জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার ইতিহাস। একটি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার ইতিহাস এবং আত্মপরিচয়ের জন্য আপসহীন সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে শুধু ভাষাগত অধিকারের দাবি হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্যকে খাটো করা হয়। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি জাতির প্রতিবাদ, রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে আত্মমর্যাদার ঘোষণা এবং নিজের পরিচয়কে অস্বীকার করার সব প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাকে উপেক্ষা করে একটি ভিন্ন ভাষাকে রাষ্ট্রের একমাত্র ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, তখন বাংলার তরুণেরা বুঝতে পেরেছিলেন যে ভাষা হারানো মানে কেবল শব্দ হারানো নয়; ভাষা হারানো মানে ইতিহাস হারানো, সংস্কৃতি হারানো, সাহিত্য হারানো, আত্মপরিচয় হারানো এবং শেষ পর্যন্ত নিজের জাতিসত্তাকে হারিয়ে ফেলা। তাই তারা রাজপথে নেমেছিলেন। তারা কোনো ভাষার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেননি, কোনো ভাষাকে ঘৃণা করেননি, কোনো ভাষার অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি; বরং তারা লড়াই করেছিলেন নিজেদের ভাষার ন্যায্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও অগণিত নাম না-জানা শহীদ যখন পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তাঁদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। ছিল শুধু মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা এবং নিজের জাতিগত পরিচয় রক্ষার অদম্য সংকল্প। সেই আত্মত্যাগই পরবর্তীকালে বাঙালির জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করেছে, স্বাধীনতার আন্দোলনের বীজ বপন করেছে এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্মের পথ প্রশস্ত করেছে। এ কারণেই বাংলা ভাষা আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি, জাতীয় পরিচয়ের মূল স্তম্ভ এবং রাষ্ট্রের অস্তিত্বের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

এই কারণেই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বাংলা ভাষার প্রশ্নটি নিছক একটি ভাষা ব্যবহারের প্রশ্ন নয়। কিংবা এটি কেবল যোগাযোগের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কোনো প্রশাসনিক বিতর্কও নয়। এটি মূলত জাতীয় পরিচয়, গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব এবং রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক চরিত্রের প্রশ্ন। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সংসদ তার জনগণের সম্মিলিত কণ্ঠস্বরের প্রতীক। সেখানে যে ভাষা উচ্চারিত হয়, যে ভাষায় আইন প্রণীত হয়, যে ভাষায় জাতীয় সমস্যার সমাধান খোঁজা হয় এবং যে ভাষায় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা হয়, সেই ভাষা আসলে রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্কের প্রকৃত চরিত্রকে প্রকাশ করে। সংসদ সদস্যরা কোনো বিচ্ছিন্ন অভিজাত গোষ্ঠীর প্রতিনিধি নন। তাঁরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাহক এবং জনগণের কাছেই জবাবদিহি করতে বাধ্য। তাঁদের রাজনৈতিক বৈধতার উৎস কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান নয়, কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাও নয়। তাঁদের শক্তির উৎস বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। আর সেই সাধারণ মানুষ চিন্তা করেন বাংলায়, স্বপ্ন দেখেন বাংলায়। আনন্দ ও বেদনা প্রকাশ করেন বাংলায়। সন্তানকে প্রথম শব্দ শেখান বাংলায় এবং রাষ্ট্রকে বোঝেন বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতির আলোকে। সংসদের বিতর্ক, আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ এবং জাতীয় প্রশ্নে আলোচনা যদি এমন ভাষায় পরিচালিত হয় যা দেশের অধিকাংশ মানুষ সহজে অনুসরণ করতে না পারেন, তবে জনগণ ও তাদের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়। তখন সংসদ ধীরে ধীরে জনগণের ঘর থেকে সরে গিয়ে একটি সীমিত গোষ্ঠীর পরিসরে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। প্রতিনিধিত্বের যে মৌলিক সেতু জনগণ ও সংসদকে এক সূত্রে বেঁধে রাখে, সেই সেতুর অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো ভাষা। আর সেই কারণেই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বাংলা ভাষার প্রশ্নটি কেবল ভাষার প্রশ্ন নয়; এটি জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কতটা গভীর, গণতন্ত্র কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জাতীয় পরিচয় কতটা সম্মানিত থাকবে—সেই মৌলিক প্রশ্ন।

অনেকে যুক্তি দেন যে ইংরেজি আজকের বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক ভাষাগুলোর একটি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কূটনীতি, বাণিজ্য, উচ্চশিক্ষা এবং বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইংরেজির গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এই বক্তব্য সম্পূর্ণ সত্য। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়িত বাস্তবতায় ইংরেজি জানা একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা, এবং একজন সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, কূটনীতিক, শিক্ষক, গবেষক কিংবা পেশাজীবীর জন্য আন্তর্জাতিক পরিসরে ইংরেজিতে যোগাযোগ করার সক্ষমতা নিঃসন্দেহে একটি বড় সম্পদ। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, যা প্রায়ই ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষিত হয়। ইংরেজি জানা, ইংরেজিতে দক্ষ হওয়া এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগে ইংরেজি ব্যবহার করা এক বিষয়। আর একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় সংসদে ইংরেজিকে অগ্রাধিকার দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কোনো জাতি তখনই আত্মবিশ্বাসী ও পরিণত হয়ে ওঠে, যখন সে বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করে আন্তর্জাতিক ভাষায়, কিন্তু নিজের রাষ্ট্র পরিচালনা করে নিজের ভাষায়। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর শক্তিশালী, উন্নত এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা আন্তর্জাতিক যোগাযোগে ইংরেজির গুরুত্ব স্বীকার করলেও নিজেদের সংসদ, আইনসভা এবং জাতীয় নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব ভাষাকেই প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।

চীনের দিকে তাকানো যাক। আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র এবং ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক শক্তি চীন। চীনের নেতারা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রয়োজনে অনুবাদের সাহায্য নেন, বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বহু ভাষিক যোগাযোগ করেন, কিন্তু বেইজিংয়ের জাতীয় গণ কংগ্রেসে প্রধান ভাষা ম্যান্ডারিন চীনা। তারা কখনো নিজেদের জাতীয় সংসদে ইংরেজিকে মর্যাদার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন বোধ করেনি। কারণ তারা জানে, অর্থনৈতিক শক্তির উৎস নিজের আত্মপরিচয়কে শক্তিশালী করা, তাকে দুর্বল করা নয়। রাশিয়ার উদাহরণ আরও তাৎপর্যপূর্ণ। রাশিয়া একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী দেশ। কিন্তু রাশিয়ার স্টেট দুমা কিংবা ফেডারেশন কাউন্সিলে রাষ্ট্র পরিচালনার ভাষা রুশ ভাষা। রুশ নেতারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভাষান্তরের সাহায্যে বক্তব্য দেন, কিন্তু নিজেদের জাতীয় আইনসভায় ইংরেজিতে বক্তৃতা দিয়ে আধুনিকতার প্রমাণ করার প্রয়োজন অনুভব করেন না। কারণ তারা বুঝতে পারে, রাষ্ট্রের ভাষা রাষ্ট্রের মর্যাদারই অংশ। ইউরোপের দেশগুলোর দিকেও তাকানো যেতে পারে। ফ্রান্সে জাতীয় পরিষদে ফরাসি ভাষাই প্রধান মাধ্যম। ফরাসিরা বরাবরই তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষায় অত্যন্ত সচেতন। জার্মানির বুন্ডেস্ট্যাগে জার্মান ভাষা, ইতালির পার্লামেন্টে ইতালীয় ভাষা, স্পেনের কংগ্রেসে স্প্যানিশ ভাষা, পোল্যান্ডে পোলিশ ভাষা, হাঙ্গেরিতে হাঙ্গেরিয়ান ভাষা এবং গ্রিসে গ্রিক ভাষাই প্রধান সংসদীয় ভাষা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহু ভাষা ব্যবহার করলেও নিজেদের জাতীয় সংসদে মাতৃভাষার স্থান কখনো ছেড়ে দেয়নি। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেই ভাষাগত বৈচিত্র্যকে গণতন্ত্রের একটি মৌলিক মূল্যবোধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

আসলে একটি জাতির আত্মবিশ্বাসের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তখনই, যখন সে বিশ্বের সঙ্গে সমান মর্যাদায় কথা বলে নিজের ভাষাকে সম্মান জানিয়ে। যে দেশ নিজের সংসদে নিজের ভাষা ব্যবহার করতে সংকোচ বোধ করে, সে দেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সাংস্কৃতিকভাবে আত্মবিশ্বাসী হতে পারে না। ইংরেজি শেখা অবশ্যই জরুরি, ইংরেজিতে দক্ষ হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু জাতীয় সংসদে মাতৃভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া তার চেয়েও বেশি জরুরি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সত্য আরও গভীর, কারণ এই রাষ্ট্রের জন্মের পেছনে ভাষার জন্য আত্মত্যাগের ইতিহাস রয়েছে। একজন সংসদ সদস্য যত বেশি শিক্ষিত হবেন, যত বেশি ভাষা জানবেন, যত বেশি আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন, তা নিঃসন্দেহে জাতির জন্য গৌরবের বিষয়। তিনি ইংরেজিতে কথা বলবেন, বিদেশি রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন, এতে আপত্তির কোনো কারণ নেই। বরং সেটিই প্রত্যাশিত। কিন্তু যখন তিনি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে দাঁড়াবেন, তখন তিনি আর কেবল একজন ব্যক্তি নন। তিনি কোটি কোটি বাঙালির প্রতিনিধি, ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকারী এবং একটি ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর। তাই প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তির ভাষাজ্ঞান নিয়ে নয়, কোনো সংসদ সদস্যকে ছোট করা বা আক্রমণ করারও নয়। প্রশ্নটি হলো, আমরা আমাদের রাষ্ট্রের আত্মাকে কোথায় খুঁজে পেতে চাই? আমরা কি এমন একটি সংসদ চাই, যেখানে জনগণ নিজেদের ভাষার প্রতিধ্বনি শুনতে পাবে, নাকি এমন একটি সংসদ চাই, যেখানে ভাষা ধীরে ধীরে জনগণ ও প্রতিনিধিদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করবে? আমরা কি সত্যিই বিশ্বাস করি যে একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল অর্পণ করলেই ভাষা আন্দোলনের চেতনার প্রতি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? নাকি ভাষা শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা তখনই জানানো হয়, যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলা ভাষা শুধু আনুষ্ঠানিকতার ভাষা নয়, বরং মর্যাদা, ক্ষমতা, আইন, নীতিনির্ধারণ এবং জাতীয় সিদ্ধান্তের প্রধান ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকে?

পৃথিবীর প্রতিটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি প্রথমে নিজের ভাষাকে সম্মান করতে শিখেছে, তারপর অন্য ভাষাকে সম্মান করেছে। যে জাতি নিজের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সে অন্যের ভাষাকেও প্রকৃত অর্থে সম্মান করতে পারে না। তাই জাতীয় সংসদে বাংলা কোনো ঐচ্ছিক পছন্দ নয়, কোনো আবেগ প্রসূত দাবি নয়, কোনো রাজনৈতিক স্লোগানও নয়। এটি আমাদের ইতিহাসের অনিবার্য উত্তরাধিকার, আমাদের জাতীয় পরিচয়ের মৌলিক ভিত্তি। আমাদের গণতন্ত্রের সবচেয়ে স্বাভাবিক, সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত এবং সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ভাষা। তাই ভুলভাল ইংরেজি বলার ব্যর্থ চেষ্টায় নিজেকে ও বাংলার মানুষকে হাস্যাস্পদ না করে, বাংলার সংসদে দাঁড়িয়ে গর্বের সঙ্গে বাংলায় কথা বলুন। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করুন, আর সোজা রাখুন নিজের মেরুদণ্ড।

Leave your review