আমাদের শিক্ষা মানুষ বানায় না, প্রতিযোগী বানায়


কয়েক বছর আগের কথা। ঢাকার উত্তরায় ভোর সাড়ে সাতটা। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটি স্কুলের সামনে পৌঁছাইলাম। মনে হলো উত্তরার একটি নামী স্কুল। স্কুলের গেইটের সামনের রাস্তার অবস্থা দেখে মনে হলো যেন কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। রাস্তাজুড়ে গাড়ির লাইন, রিকশার ভিড়, হর্নের শব্দ। আর সেই ভিড়ের মাঝে ছোট ছোট শিশুরা। কারও কাঁধে নিজের শরীরের চেয়েও বড় ব্যাগ, কারও হাতে পানির বোতল আর স্কুলের খাতা। একজন মা ছেলের টাই ঠিক করতে করতে বলছেন, “আজ কিন্তু ম্যাথসে ফুল মার্কস চাই।” পাশেই আরেক বাবা ফোনে কাউকে বলছেন, “ওকে এবার কোচিং বদলাতে হবে, সবাই অনেক এগিয়ে যাচ্ছে।” একটি সাত-আট বছরের শিশু মায়ের হাত ধরে ধীরে ধীরে স্কুলের দিকে যাচ্ছে। তার চোখে ঘুম, মুখে ক্লান্তি। মা জিজ্ঞেস করলেন, “কালকের পরীক্ষার সব পড়া শেষ করেছ তো?” শিশুটি মাথা নিচু করে বলল, “হ্যাঁ… কিন্তু আমি আজ স্কুল শেষে খেলতে যেতে চাই।” মা দ্রুত উত্তর দিলেন, “এখন খেলার সময় না। আগে ভালো রেজাল্ট করতে হবে, না হলে ভালো স্কুলে যেতে পারবে না।” এই দৃশ্য কেবল ঢাকার নয়। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট কিংবা গ্রামের উপজেলা শহরেও দেখা যায়। বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গাতেই একই বাস্তবতা। শিশুদের শৈশব যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে নম্বর, আর প্রতিযোগিতার চাপে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত স্কুল, কোচিং, প্রাইভেট। তারপর আবার পরীক্ষা। যেন জীবন নয়, একটি অবিরাম প্রতিযোগিতা। আমি বাংলাদেশে এই দৃশ্য অসংখ্যবার দেখেছি। দেখেছি, অভিভাবকের উদ্বেগ কীভাবে শিশুর কাঁধে অদৃশ্য বোঝা হয়ে চেপে বসে। দেখেছি, শিশুরা ধীরে ধীরে শেখার আনন্দ হারিয়ে ফেলছে। তারা বই পড়ছে জ্ঞান অর্জনের জন্য নয়, বরং অন্যকে হারানোর জন্য। যেন শিক্ষা আর মানুষ হওয়ার পথ নয়। এটি হয়ে উঠেছে কেবল “সফল” হওয়ার দৌড়।

আজ আমাদের শিক্ষা মানুষ গড়ার চেয়ে প্রতিযোগী তৈরির কারখানায় বেশি পরিণত হয়েছে। আজকের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে মনে হয় আমরা যেন ধীরে ধীরে স্কুলকে শিক্ষালয় থেকে “প্রতিযোগিতার প্রশিক্ষণকেন্দ্রে” পরিণত করছি। একটি পরিবারে অতিথি এলে শিশুকে এখন আর খুব বেশি জিজ্ঞেস করা হয় না, তুমি কি শিখছ? কিংবা তুমি কেমন মানুষ হচ্ছ? বরং প্রথম প্রশ্ন হয়, তোমার রেজাল্ট কেমন?, ক্লাসে কতজনের মধ্যে কত?, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে? কয়েকদিন আগে এক অভিভাবকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি গর্ব করে বললেন, “আমার ছেলে দিনে দশ ঘণ্টা পড়ে। ওকে আমি শুধু একটাই কথা বলি, তোমাকে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে।” আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি কখনও তাকে জিজ্ঞেস করেন, সে সুখী কিনা? তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। কারণ আমাদের সমাজে এখন শিশুর আনন্দের চেয়ে তার অর্জনের মূল্য বেশি। আমরা শিশুদের শেখাচ্ছি কীভাবে প্রতিযোগিতায় জিততে হয়, কিন্তু শেখাচ্ছি না কীভাবে ব্যর্থ বন্ধুর পাশে দাঁড়াতে হয়। শেখাচ্ছি কীভাবে নিজের সিভি শক্তিশালী করতে হয়, কিন্তু শেখাচ্ছি না কীভাবে একজন সৎ, সহানুভূতিশীল ও বিবেকবান মানুষ হতে হয়। পরীক্ষার নম্বর, বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিং, চাকরির বাজার, সবকিছু মিলে শিক্ষা এমন এক ব্যবস্থায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে “মানুষ” হওয়ার চেয়ে “পারফর্মার” হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একজন শিক্ষার্থী হয়তো অসাধারণ ফলাফল করছে, কিন্তু সে যদি অন্যের কষ্ট অনুভব করতে না শেখে, সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি না হয়, কিংবা নিজের ভেতরে মানবিকতা গড়ে না ওঠে, তাহলে সেই শিক্ষা কতটা পূর্ণ? ইতিহাস আমাদের অন্য শিক্ষা দেয়। পৃথিবীকে সত্যিকারের এগিয়ে নিয়েছেন শুধু মেধাবী মানুষ নন, বরং মানবিক, সৃজনশীল এবং নৈতিক সাহস সম্পন্ন মানুষ। বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেছেন প্রযুক্তি, কিন্তু মানবিক মানুষ সেই প্রযুক্তিকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার পথ দেখিয়েছেন। সমাজকে বদলেছেন তারা, যারা শুধু বুদ্ধিমান ছিলেন না। যারা মানুষের প্রতি গভীর মমতা ও দায়িত্ববোধ অনুভব করতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় মানবিকতা প্রায়ই “অতিরিক্ত বিষয়” হয়ে গেছে, আর প্রতিযোগিতা হয়ে উঠেছে মূল পাঠ।

বাংলাদেশে এই সংকট যেন আরও গভীর ও দৃশ্যমান। এখানে একটি শিশুর শৈশব খুব অল্প বয়সেই ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নামের এক অদৃশ্য চাপে হারিয়ে যেতে শুরু করে। বিকেলে মাঠে খেলার বয়সে শিশুরা ছুটছে কোচিং সেন্টারে। বইয়ের বাইরে পৃথিবীকে জানার আগেই তারা শিখে ফেলছে পরীক্ষার কৌশল, শর্টকাট উত্তর, আর কমন পড়ার হিসাব। একদিন এক ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বড় হয়ে তুমি কি হতে চাও? সে উত্তর দিল, আমি এখনও ঠিক করিনি ডাক্তার হব নাকি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। কারণ সবাই বলছে এখন কম্পিউটারের লাইন ভালো। তার বয়স মাত্র এগারো। অথচ এই বয়সে তার ভাবনার কথা ছিল গল্পের বই, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা, কিংবা আকাশের মেঘ দেখে নতুন কল্পনা তৈরি করা। আরেকদিন এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সে খুব হতাশ কণ্ঠে বলল, আংকেল, আমার সিজিপিএ যদি ৩.৮০ না হয়, তাহলে আমি শেষ। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি শিখেছ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে? সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, আসলে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে শিখেছি। এই উত্তর শুনে মনে হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যেন জ্ঞানের চেয়ে উদ্বেগ বেশি তৈরি করছে। আজকের তরুণেরা জানে কীভাবে সিজিপিএ বাড়াতে হয়, কীভাবে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হয়, কীভাবে নিজের প্রোফাইলকে আকর্ষণীয় করতে হয়। কিন্তু অনেকেই জানে না কীভাবে ব্যর্থতার সঙ্গে শান্তভাবে বাঁচতে হয়। কীভাবে ভিন্ন মতের মানুষকে সম্মান করতে হয়। কিংবা কীভাবে নিজের ভেতরের ভয়, একাকীত্ব ও স্বপ্নকে বুঝতে হয়। আমরা তাদের ক্যারিয়ার শেখাচ্ছি, কিন্তু জীবন শেখাচ্ছি না। ফলে অনেক শিক্ষিত তরুণও সামান্য ব্যর্থতায় ভেঙে পড়ছে। সামান্য মতপার্থক্যে অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। কারণ তারা বড় হয়েছে প্রতিযোগিতার মধ্যে, কিন্তু মানবিক বিকাশের যথেষ্ট সুযোগ পায়নি।

এ যেন এমন এক শিক্ষা, যেখানে ডিগ্রি আছে, কিন্তু আত্মজ্ঞান কম। দক্ষতা আছে, কিন্তু মানসিক দৃঢ়তা দুর্বল। তথ্য আছে, কিন্তু প্রজ্ঞা অনুপস্থিত।

আমরা এমন এক সমাজ তৈরি করছি যেখানে সফলতা আছে, কিন্তু প্রশান্তি নেই। দক্ষতা আছে, কিন্তু সহমর্মিতা কমে যাচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো পৃথিবীতেই শিক্ষা ধীরে ধীরে বাজারের যুক্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এখন প্রায়ই মানবিক নাগরিক তৈরির চেয়ে গ্লোবাল কর্মী তৈরিতে বেশি মনোযোগী। শিশুরা ছোটবেলা থেকেই শিখছে, তোমার মূল্য তোমার ফলাফলে, তোমার চাকরিতে, তোমার আয়ে। ফলে মানুষ নিজেকে আর মানুষ হিসেবে দেখে না। আজ পৃথিবী অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত উন্নতির যুগে দাঁড়িয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সবকিছু মানুষকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত করার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা যেন উল্টো গল্প বলছে। মানুষ অনলাইনে হাজার মানুষের সঙ্গে যুক্ত, অথচ ভেতরে ভেতরে ক্রমেই একা হয়ে যাচ্ছে। ঢাকার একটি ক্যাফেতে বসে একদিন লক্ষ্য করছিলাম, একটি টেবিলে চারজন তরুণ-তরুণী বসে আছে, কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে খুব বেশি কথা বলছে না। সবার চোখ মোবাইলের পর্দায়। হয়তো তারা পৃথিবীর নানা তথ্য জানছে, কিন্তু পাশের মানুষটির মনের খবর জানছে না। আজ ডিগ্রি বাড়ছে, দক্ষতা বাড়ছে, তথ্যের প্রবাহ বাড়ছে, কিন্তু মানবিক সংযোগ যেন ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আমাকে একবার বলেছিল, “স্যার, আমি সবসময় ভয় পাই আমি পিছিয়ে যাচ্ছি।” অথচ তার ভালো ফলাফল, ভালো দক্ষতা, সবই ছিল। কিন্তু জীবনের গভীর অর্থ, নিজের ভেতরের শান্তি কিংবা সম্পর্কের উষ্ণতা, এসবের জায়গা তার শিক্ষাজীবনে খুব কম ছিল।

এই বাস্তবতাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই গভীর কথাটি, শিক্ষা কেবল তথ্য আহরণ নয়, শিক্ষা হলো মানুষের আত্মার মুক্তি। কিন্তু আজ আমরা শিক্ষাকে এমন সংকীর্ণ কাঠামোর মধ্যে আটকে ফেলেছি, যেখানে কল্পনা, শিল্প, সাহিত্য, নৈতিকতা কিংবা মানবিকতার জায়গা ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। স্কুলে শিশুরা পরীক্ষার জন্য সূত্র মুখস্থ করছে, কিন্তু প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুভব করার সময় পাচ্ছে না। তারা জটিল সমীকরণ সমাধান করতে শিখছে, কিন্তু নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করছে। একজন শিক্ষার্থী হয়তো পদার্থবিজ্ঞানের কঠিন সূত্র নির্ভুলভাবে সমাধান করতে পারে, কিন্তু রাস্তার পাশে ক্ষুধার্ত একটি শিশুকে দেখে তার হৃদয় যদি না কাঁপে, তাহলে কি তাকে সত্যিকারের শিক্ষিত বলা যায়? কারণ শিক্ষা শুধু মস্তিষ্ককে দক্ষ করার বিষয় নয়। এটি হৃদয়কে জাগ্রত করারও বিষয়। আমাদের প্রয়োজন এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা, যা শিশুদের শুধু চাকরি প্রার্থী নয়, সমাজ নির্মাতা হিসেবে গড়ে তুলবে। এমন শিক্ষা, যেখানে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতা শেখানো হবে। যেখানে নম্বরের পাশাপাশি চরিত্রের মূল্য থাকবে। যেখানে শিশুকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেওয়া হবে যে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবিকতা। আমরা যদি সত্যিই একটি সুন্দর সমাজ চাই, তাহলে আমাদের প্রশ্নও বদলাতে হবে। শিশুকে শুধু জিজ্ঞেস করলে চলবে না, তুমি কত পেয়েছ? আমাদের জানতে হবে, তুমি কেমন মানুষ হচ্ছ? কারণ ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে শুধু মেধাবী মানুষ নয়, মানবিক মানুষই সবচেয়ে বেশি বদলে দেবে।

পৃথিবীর কিছু দেশ ইতোমধ্যে দেখিয়ে দিয়েছে যে ভালো শিক্ষা মানেই অবিরাম চাপ, ভয় কিংবা প্রতিযোগিতা নয়। ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থার কথা প্রায়ই উদাহরণ হিসেবে আসে। সেখানে ছোট শিশুদের ওপর অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ নেই, দীর্ঘ কোচিং সংস্কৃতি নেই, প্রথম হওয়ার অবিরাম মানসিক যুদ্ধও নেই। বরং সেখানে গুরুত্ব দেওয়া হয় শিশুর মানসিক সুস্থতা, কৌতূহল, সৃজনশীলতা এবং শেখার আনন্দকে। শিক্ষকরা শুধু পাঠ্যবই শেষ করেন না। তারা চেষ্টা করেন শিশুর ভেতরের মানুষটিকে বুঝতে। একজন বাংলাদেশি অভিভাবক একবার বলছিলেন, ওদের দেশে তো প্রতিযোগিতা কম, তাই তারা আরাম করতে পারে। আমাদের দেশে তো টিকে থাকতেই যুদ্ধ করতে হয়। কথাটি আংশিক সত্য হলেও এর ভেতরে আমাদের দীর্ঘদিনের এক মানসিক বিশ্বাস লুকিয়ে আছে। আমরা এখনও মনে করি ভয় আর চাপ ছাড়া ভালো শিক্ষা সম্ভব নয়। যেন শিশুকে সবসময় আতঙ্কে না রাখলে সে সফল হবে না। কিন্তু বাস্তবতা অন্য কথা বলে। ভয় হয়তো কাউকে কিছুদিনের জন্য শৃঙ্খলিত রাখতে পারে, পরীক্ষায় ভালো নম্বরও এনে দিতে পারে। কিন্তু ভয় কখনও সৃজনশীল মানুষ তৈরি করতে পারে না। যে শিশু সবসময় ব্যর্থতার আতঙ্কে বড় হয়, সে হয়তো ভুল করতে ভয় পায়, নতুন কিছু ভাবতেও ভয় পায়। অথচ ইতিহাসের বড় পরিবর্তনগুলো এনেছেন তারাই, যারা প্রশ্ন করতে পেরেছেন, কল্পনা করতে পেরেছেন, প্রচলিত সীমার বাইরে ভাবতে পেরেছেন। মহান মানুষ তৈরি হয় স্বাধীন চিন্তা, আত্মবিশ্বাস এবং মানবিক সাহস থেকে, ভয় থেকে নয়।

 

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও অনেকটাই নির্ভর করছে আমরা আগামী প্রজন্মকে কীভাবে গড়ে তুলছি তার ওপর। যদি আমরা শুধু প্রতিযোগী তৈরি করি, তাহলে হয়তো দক্ষ কর্মী পাবো, বড় বড় অফিস পাবো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাড়বে। কিন্তু একইসঙ্গে আমরা হয়তো এমন এক সমাজ পাবো, যেখানে মানুষ একে অপরের প্রতি ক্রমশ উদাসীন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, যদি আমরা সত্যিকারের মানুষ গড়তে পারি, যারা জ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি মানবিক, সৃজনশীল ও নৈতিক, তাহলে তারাই দেশকে এগিয়ে নেবে। শুধু প্রযুক্তি বা অর্থনীতিতে নয়, সংস্কৃতিতে, সামাজিক ন্যায়বিচারে, মানবিক মূল্যবোধেও। কারণ একটি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি তার উঁচু ভবন নয়, তার জিডিপি নয়, তার মানুষ। শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের ভেতরের আলো জ্বালানো। এমন আলো, যা তাকে শুধু নিজের সফলতার জন্য নয়, অন্যের কল্যাণের জন্যও ভাবতে শেখায়। এখন সময় এসেছে নিজেদের গভীরভাবে প্রশ্ন করার। আমরা কি শিশুদের শুধু দৌড়াতে শেখাচ্ছি, নাকি সত্যিকার অর্থে বাঁচতেও শেখাচ্ছি?

আমাদের সত্যিকার অর্থেই মনে রাখতে হবে, শিক্ষা কোনো প্রতিযোগিতার ট্রফি নয়। এটি মানুষের ভেতরের মানুষটিকে আবিষ্কারের যাত্রা। একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়ার অর্থ কেবল তাকে কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করা নয়, বরং তাকে এমন এক চেতনার দিকে নিয়ে যাওয়া, যেখানে সে পৃথিবীকে শুধু ভোগ করার বস্তু হিসেবে নয়, অনুভব করার একটি বিস্ময় হিসেবে দেখতে শেখে। আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন শিশুরা আগের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে বেশি তথ্য জানে, কিন্তু অনেক সময় কম অনুভব করে। তারা দ্রুত উত্তর দিতে পারে, কিন্তু ধীরে চিন্তা করতে শেখে না। তারা সফল হওয়ার কৌশল শিখছে, কিন্তু জীবনের সৌন্দর্য উপলব্ধি করার অবকাশ হারিয়ে ফেলছে। অথচ শিক্ষা যদি মানুষের হৃদয়কে প্রসারিত না করে, যদি তা তাকে আরও সহানুভূতিশীল, আরও সত্যবাদী, আরও উদার না বানায়, তাহলে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, মানুষ তখনই সত্যিকার শিক্ষিত হয়, যখন তার ভেতরে স্বাধীন চিন্তা, সৌন্দর্যবোধ এবং মানবিকতার মিলন ঘটে। শিক্ষা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা মানুষকে কেবল জীবিকা নয়, জীবনের অর্থও খুঁজে নিতে শেখায়। আমাদের শিশুরা শুধু ভবিষ্যতের কর্মী নয়। তারা ভবিষ্যতের কবি, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, স্বপ্নদ্রষ্টা, সমাজ নির্মাতা। তাদের ভেতরে ভয় নয়, বিস্ময় জাগাতে হবে। প্রতিযোগিতা নয়, কৌতূহল জাগাতে হবে। মুখস্থ উত্তর নয়, সত্য অনুসন্ধানের সাহস তৈরি করতে হবে। কারণ একটি জাতি তখনই মহান হয়, যখন তার মানুষ শুধু বুদ্ধিমান নয়, প্রজ্ঞাবান হয়। শুধু সফল নয়, মানবিক হয়। হয়তো একদিন আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমন জায়গায় পরিণত হবে, যেখানে শিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে না সে কাকে হারালো, বরং সে কাকে ভালোবাসতে শিখলো। সে কত নম্বর পেল তা নয়, সে কতটা মানুষ হয়ে উঠলো। সেদিনই শিক্ষা সত্যিকার অর্থে মুক্ত হবে। আর সেই মুক্ত শিক্ষাই হয়তো আমাদের সমাজকে আবার মানুষ হওয়ার পথ দেখাবে।

 

Leave your review