অন্ধের কিবা রাত্রি কিবা দিন


এ প্রবাদটা আমাদের অতি পরিচিত। কোন নতুন প্রবাদ নয়। বরং এতটাই পুরনো যে, এর জন্ম তারিখ জানতে গেলে ইতিহাসেরও চশমা লাগবে। কে কখন কিভাবে কাকে উদ্দেশ্য করে এমন সুললিত শব্দের বাক্যটি গেঁথেছিলেন সেটা জানা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার বড়মা, যিনি জীবনের শেষ পর্বে বেশ কুঁজো হয়ে হাঁটতেন এবং একশত আট বছর এই ধরাধামে কাটিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন, তিনিও এই শব্দগুলো বহুবার উচ্চারণ করেছিলেন। তবে প্রবাদটি মূলত লোকজ বুদ্ধির এক সরল কিন্তু খুবই এক গম্ভীর প্রকাশ। যার চোখ নেই, তার কাছে দিন-রাতের পার্থক্য অর্থহীন। আলো-অন্ধকার তার জীবনে সমান। তবে নতুন প্রযুক্তির বাহারে এখনকার অন্ধরা বেশ এগিয়েই আছেন। নানা পদ্ধতি অবলম্বন করে তারাও এখন সাধারণ মানুষের মতোই কাজ কর্ম করছে। বহাল তবিয়তে চলাফেরা করছে। যেমন ধরুন, ডেভিড ব্লাংকেট। তিনিতো রীতিমতো ইতিহাস তৈরি করেছিলেন যুক্তরাজ্যের কেবিনেট মন্ত্রী হয়ে। ১৯৯৭ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত অতি দক্ষতার সাথে শিক্ষা ও কর্ম সংস্থান মন্ত্রণালয় চালিয়েছিলেন। তবে বাংলার গ্রামীণ সমাজে এই কথাটি ব্যবহার হতো এমন সব আজব প্রজাতির মানুষদের বোঝাতে, যারা বাস্তবতা বুঝতে অক্ষম বা ইচ্ছাকৃতভাবে না বোঝার ভান করে। এই সব মানুষেরা চোখ থাকতেও দেখতে পায় না। আর এদের জন্যই এই প্রবাদটি অতি প্রযোজ্য। শুধু এই প্রবাদটিই নয়। আমাদের ভাষা সহ নানা ভাষায় এমন আরও অনেক প্রবাদ আছে, যেগুলো একই পরিবারের সদস্য। যেমন, “চোরের দশ দিন, গৃহস্থের এক দিন।” অতি পরিচিত আরেকটি লোকজ প্রবাদ। মানে অন্যায় কিছুদিন চললেও একদিন ধরা পড়বেই। অথবা “গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল।” ঘটনার আগেই ফলাফল ভোগের প্রস্তুতি! এসব প্রবাদ শুধু ভাষার অলংকার নয়, সমাজের আয়না। যে আয়নাতে আমরা নিজেদেরই মুখ দেখি। যদিও অনেক সময় সেই আয়নাটাও আমরা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখি। বাংলাদেশে এখন সময়টা বড় বিচিত্র। দিন না রাত। এ প্রশ্নটা আর খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ আমাদের সামাজিক ও শিক্ষাগত বাস্তবতায় অনেকেই এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে “অন্ধের কিবা রাত্রি কিবা দিন” কথাটা যেন জাতীয় প্রবাদ হয়ে উঠতে বসেছে।

একটা সময় ছিল, মানুষ অন্ধ হলে লাঠি নিয়ে হাঁটত, আর সমাজ তার পাশে দাঁড়াত। লাঠিটা ছিল পথ চেনার সহায়। আর মানুষ ছিল বিবেকের আলো। এখন দৃশ্যটা একটু বদলেছে। লাঠি আছে, কিন্তু সেটা আর পথ দেখার জন্য নয়। বরং পথ দেখানোর অভিনয়ের জন্য। আজকাল দেখা যায়, যে লোকটা সবচেয়ে জোরে দিকনির্দেশনা দিচ্ছে, “এই পথে যাও, ওইটা ভুল” সে নিজেই ঠিক কোন পথে যাচ্ছে, সেটাই জানে না। একবার এক সেমিনারে একজন বক্তা এত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের পরিকল্পনা বোঝাচ্ছিলেন যে, উপস্থিত সবাই মুগ্ধ। শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বে এক ছাত্র ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করল, “স্যার, আপনি কি কখনো কোনো শ্রেণীকক্ষে পড়িয়েছেন?” বক্তা একটু থেমে বললেন, “না, তবে আমি অনেক ইউটিউব ভিডিও দেখেছি!” তখন বোঝা গেল, লাঠি হাতে হাঁটছেন ঠিকই, কিন্তু পথটা গুগল ম্যাপেও নেই। আমাদের গ্রামেও ছোটবেলায় এমন এক প্রাজ্ঞ মহাশয় ছিলেন। আমরা তাঁকে বলতাম “সব জান্তার বাপ”। লোকটা প্রতিদিন ঠিক সময়মতো চায়ের দোকানে হাজির হতেন। যেন দেশ পরিচালনার অঘোষিত উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই তিনি দেশের অর্থনীতি উদ্ধার করতেন, ক্রিকেট টিম সাজাতেন, পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করতেন, এমনকি চাইলে নাসার মহাকাশ গবেষণারও দু-একটা ভুল ধরিয়ে দিতেন। দেশে কোথায় কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে, আগামী পাঁচ বছরে কি হবে, সবকিছুর এমন বিশ্লেষণ দিতেন, যেন প্রধানমন্ত্রী সকালে নাশতা করার আগে ফোন করে তাঁর পরামর্শ নিয়েছেন।। আর তাঁর যুক্তির জোর এতটাই ছিল যে, পাশের লোকজন প্রতিবাদ তো দূরের কথা, চা নেড়েচেড়ে চুপচাপ শুনত। কেউ কিছু বলতে গেলেই তিনি এমন ভঙ্গিতে তাকাতেন, যেন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অশিক্ষিত প্রতিনিধি ঢুকে পড়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, দেশ-বিদেশের সব সমস্যার সমাধান তাঁর ঝুলিতে থাকলেও নিজের সংসারের হালটাই ঠিক করতে পারেননি কোনোদিন।

ঘরের চাল চুইয়ে পানি পড়ছে, বাজারে বাকি জমে পাহাড়। তবু তিনি বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে এমন আত্মবিশ্বাসে বক্তৃতা দিতেন, যেন আইএমএফ তাঁর কাছেই ঋণ চাইতে আসে।

আসলে লোকটা ছিলেন অলসতার জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ। আর গপ্পোবাজির আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। কাজের বেলায় শূন্য, কিন্তু কথার বেলায় মহাবিশ্বের শেষ সীমানা পর্যন্ত অবাধ বিচরণ। এ যেন এক আজব সময়। এখানে জ্ঞান থাকাটা জরুরি নয়, জরুরি হলো গলার জোর আর অটল আত্মবিশ্বাস। মানুষ এখন না দেখেও দেখে। না জেনেও বোঝে। আর না পড়েই বিশ্লেষণ দেয় এমন ভঙ্গিতে, যেন সত্যের একমাত্র ইজারাদার সে-ই। এই যুগে দৃষ্টিশক্তির চেয়ে আত্মবিশ্বাসের দাম অনেক বেশি। তাই অনেকে দিব্যি ঘুটঘুটে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয়ের রঙ বর্ণনা করে যাচ্ছে, আর আশেপাশের লোকজনও মাথা নেড়ে ভাবছে, “বাহ! কি গভীর পর্যবেক্ষণ!” কেউ প্রশ্ন করলে তাকে এমনভাবে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, যেন সন্দেহ প্রকাশ করাটাই মহাপাপ।

ফলাফল হলো, যারা সত্যিই কিছু জানে তারা চুপচাপ থাকে, আর যারা কিছুই জানে না, তারাই সবচেয়ে বেশি শব্দ করে। এখনকার অনেক আলোচনাই যেন জ্ঞানের নয়, অভিনয়ের প্রতিযোগিতা।এখানে তথ্যের চেয়ে ভঙ্গি বড়। আর সত্যের চেয়ে আত্মবিশ্বাস বেশি বিশ্বাসযোগ্য।

শিক্ষা ব্যবস্থার কথাই ধরুন। এখানে এখন এক ধরনের নীরব নাটক প্রতিদিন মঞ্চস্থ হয়। পরীক্ষার খাতা দেখে শিক্ষক কখনো ভাবেন, “ছাত্রটি আসলে কি লিখেছে?” লেখাটা উত্তর না ধাঁধা, সেটাই বোঝা দায়। আর ছাত্র খাতা জমা দিয়ে মনে মনে প্রার্থনা করে, “স্যার বুঝবেন তো?”মানে উত্তরটা ঠিক কি না, সেটা বড় কথা নয়। স্যার যেন কোনোভাবে “মনে করে” ঠিক ধরে নেন! এই পারস্পরিক অনুমান নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞানটা কোথায় আছে, সেটা খুঁজে বের করা প্রায় প্রত্নতাত্ত্বিক কাজ। একবার এক ছাত্র ইতিহাস পরীক্ষায় এমন সব তথ্য লিখেছিল যে, শিক্ষক পরে স্টাফ রুমে গিয়ে অন্য শিক্ষকদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এই ঘটনা সত্যিই ঘটেছিল, নাকি ছেলেটা নতুন ইতিহাস আবিষ্কার করেছে?’ আবার অন্যদিকে, এমনও শিক্ষক আছেন যারা খাতার হাতের লেখা সুন্দর দেখলেই ধরে নেন, “বুঝে লিখেছে।” একবার আমাদের গ্রামের স্কুলে এক মহা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে গেল। আমাদের এক শিক্ষক মহাশয় ছিলেন অসম্ভব রসিক মানুষ। তবে তাঁর খাতা দেখার পদ্ধতি ছিল আরও রসিক। তিনি উত্তর দেখে নয়, খাতার পৃষ্ঠা দেখে নম্বর দিতেন! খাতা যত মোটা, নম্বর তত মোটা। তো একবার পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। এক ছাত্র খাতা হাতে নিয়েই প্রায় অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা। কারণ, ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় সে পেয়েছে ১০৬! ছেলেটার চোখ একেবারে ছানাবড়া। সে তো জীবনে পাস নম্বর পেলেই বাড়িতে মিষ্টি খাওয়ানোর অবস্থা। সেখানে হঠাৎ শতকেরও ওপরে।অবশেষে সাহস করে স্যারের কাছে গিয়ে বলল, “স্যার, মনে হয় একটু ভুল হয়েছে… ১০০তে ১০৬ দিয়েছেন!” স্যার তখন একদম গম্ভীর মুখে চশমা নামিয়ে বললেন,“ভুল না। ছয় নম্বর বোনাস।” ছাত্র হতভম্ব। “কিসের বোনাস স্যার?” স্যার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তোমার খাতা এত পরিষ্কার ছিল যে, আমার চোখের কষ্ট কম হয়েছে। এই মানবিক কারণেই ছয় নম্বর বাড়তি।” সেদিনের পর থেকে স্কুলে পড়াশোনার চেয়ে বেশী বেশী করে লেখা আর সুন্দর করে লেখার কদর কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল!

আমাদের সমাজে এখন অনেকেই চোখ খুলে ঘুমায়। এ যেন এক নতুন ধ্যানযোগ, যেখানে জেগে থেকেও না দেখার শিল্প রপ্ত করা হয়। তারা দেখে, কিন্তু দেখে না। শোনে, কিন্তু শোনে না। রাস্তার পাশে বড়সড় গর্ত। পাশ দিয়ে সবাই দিব্যি হেঁটে যায়, কেউ পড়ে না। কেন? কারণ সবাই আগেই অন্য কোনো গর্তে পড়ে আছে। কেউ সুবিধার গর্তে। কেউ উদাসীনতার গর্তে। কেউ আবার “এটা আমার বিষয় না” নামক নিরাপদ খাদে। ফলে নতুন করে আর পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি নেই। একবার এক এলাকায় নালা উপচে রাস্তায় পানি জমে আছে। পথচারীরা জুতা হাতে নিয়ে কাদা মাড়িয়ে পার হচ্ছে। পাশেই এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে মোবাইলে ভিডিও করছেন। ক্যাপশন দেবেন, “দেশের অবস্থা দেখুন!” কিন্তু তিনি নিজে পাশের ভাঙা ঢাকনাটা সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না। কারণ সমস্যা দেখানোটা এখন দায়িত্ব, সমাধান করা নয়। আবার অফিসে ফাইল আটকে আছে। যতক্ষণ না “তেল” দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ ফাইল নড়ে না। কিন্তু সবাই এমন স্বাভাবিকভাবে বিষয়টা নেয়, যেন এটাই নিয়ম, আর নিয়ম মানাই নাগরিক কর্তব্য। দুর্নীতি, অব্যবস্থা, আর দায় এড়ানোর শিল্পে আমরা এমন দক্ষ হয়ে গেছি যে, সত্যিকারের সমস্যাগুলো এখন আর সমস্যাই মনে হয় না। বরং যেদিন কোনো কাজ নিয়মমতো হয়ে যায়, সেদিনই আমরা একটু চমকে উঠি। যেন স্বাভাবিকতাই অস্বাভাবিক, আর অস্বাভাবিকতাই আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা।

রাজনীতির মাঠে তো এই প্রবাদটা আরও বেশি মানানসই। এখানে বাস্তবতা মাঝে মাঝে এতটাই নমনীয় যে, সত্যি নিজেই লজ্জা পায়। কেউ ভুল করলে সেটা আর ভুল থাকে না। সেটাকে বলা হয় “কৌশলগত সিদ্ধান্ত”। শুনতে এমন, যেন দাবার বোর্ডে কয়েক চাল আগেই ভাবা কোনো মহা পরিকল্পনা। আর কেউ যদি সেই ভুলটা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাহলেই সে হয়ে যায় অশুভ শক্তি, ষড়যন্ত্রকারী, কিংবা অতিরিক্ত সচেতন নাগরিক, যা এই সময়ে প্রায় অপরাধের সমান। একবার এক টকশোতে দেখা গেল, দুই পক্ষই নিজেদের জয় ঘোষণা করছে। একজন বলছেন, “আমরা জিতেছি কারণ আমরা এগিয়ে,” আরেকজন বলছেন, “আমরাই জিতেছি কারণ ওরা পিছিয়ে।” দর্শক ভাবছে, তাহলে হারল কে? কিন্তু সেই প্রশ্ন করার সাহস কারও নেই। প্রশ্ন করলেই আপনি কোনো না কোনো পক্ষের এজেন্ট হয়ে যাবেন। ফলে সবাই নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে হাততালি দেয়। কার জন্য, সেটা পরে বোঝা যাবে। এইভাবে ধীরে ধীরে আলো আর অন্ধকারের পার্থক্যটাই মুছে যাচ্ছে। অন্ধের কাছে যেমন রাত-দিন সমান, তেমনি আমাদের অনেকের কাছেই সত্য-মিথ্যা এখন প্রায় সমান। যেটা বেশি জোরে বলা হয়, সেটাই বেশি সত্যি বলে মনে হয়। আর যেটা চুপচাপ থাকে, সেটা হয়তো সত্যি, কিন্তু তার কোনো মাইক্রোফোন নেই।

মজার ব্যাপার হলো, এই অবস্থায় সবাই বেশ আরামেই আছে। এক ধরনের সম্মিলিত স্বস্তি। যেখানে প্রশ্ন না করাটাই ভদ্রতা বলে গণ্য হয়। শিক্ষক ভাবেন, ছাত্র তো পাস করলেই হলো। ছাত্র ভাবে, স্যার বেশি কিছু জিজ্ঞেস না করলেই বাঁচি। আর নাগরিক ভাবে, রাষ্ট্র যা করছে, নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। এই ‘নিশ্চয়ই’-টাই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। ফলে কেউ কাউকে প্রশ্ন করে না। ক্লাসরুমে নীরবতা, অফিসে নীরবতা, এমনকি অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়েও এক ধরনের মার্জিত নীরবতা। যেন প্রশ্ন করা মানেই অশান্তি সৃষ্টি করা। সবাই নিজের মতো করে দেখে, আর সেই দেখাটাকেই সত্যি বলে ধরে নেয়। কারণ অন্যের দেখাটা মেনে নিলে নিজের আরামটা নষ্ট হতে পারে। একবার এক জায়গায় দেখা গেল, একটি ভাঙা সেতু দিয়ে মানুষ প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছে। সবাই জানে সেতুটি বিপদজ্জনক, কিন্তু কেউ জোরে কিছু বলে না। কারণ বললে হয়তো পথটাই বন্ধ হয়ে যাবে। তাই ঝুঁকিটাকেই স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়। এ এক অদ্ভুত সমঝোতা। সমস্যা আছে, কিন্তু সেটাকে সমস্যা বলা যাবে না। তবে আশার কথা একটাই। এই অন্ধত্ব পুরোপুরি প্রাকৃতিক নয়। এটা অনেকটাই অনুশীলনের ফল। আমরা ধীরে ধীরে না দেখার, না শোনার, না প্রশ্ন করার অভ্যাস গড়ে তুলেছি। আর যেহেতু এটা অভ্যাস, তাই চাইলে বদলানোও সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো, চোখ খুললে যে হঠাৎ আলোটা এসে চোখে লাগবে, সেই ঝলকানির জন্য আমরা কেউই খুব প্রস্তুত নই। অন্ধকারে থাকতে থাকতে আলোটা এখন আমাদের জন্য একটু বেশি উজ্জ্বল, একটু বেশি অস্বস্তিকর।

এই অন্ধকারের ভেতরেও পথ হারিয়ে যায়নি। শুধু পথ দেখার চোখটা ঝাপসা হয়ে গেছে। আর সেই চোখ পরিষ্কার করার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো চরিত্র শিক্ষা। জ্ঞান মানুষকে দক্ষ করে, কিন্তু চরিত্র মানুষকে দায়বদ্ধ করে। আমরা যদি এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারি, যারা শুধু তথ্য মুখস্থ করবে না, বরং সত্যকে মূল্য দেবে। যারা শুধু নম্বরের জন্য পড়বে না, বরং ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বুঝতে শিখবে। তাহলেই এই “অন্ধের কিবা রাত্রি কিবা দিন” বাস্তবতা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করবে। চরিত্র শিক্ষা মানে বড় বড় নীতিকথা নয়। বরং ছোট ছোট সৎ অভ্যাস। সত্য বলা, দায়িত্ব নেওয়া, অন্যায়ের সামনে চুপ না থাকা। একটি শ্রেণীকক্ষে যখন শিক্ষক ভুল স্বীকার করতে পারেন, একটি ছাত্র যখন নকল না করে কম নম্বর পেতেও রাজি থাকে, একটি নাগরিক যখন নিজের সুবিধার বাইরে গিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, সেখানেই চরিত্র শিক্ষার বীজ রোপিত হয়। এই বীজই একদিন আলো হয়ে ফিরে আসে। আমাদের প্রয়োজন এমন শিক্ষা, যা মানুষকে শুধু পেশাজীবী বানাবে না, মানুষ বানাবে। কারণ চোখ থাকলেই দেখা যায় না। দেখার জন্য লাগে দৃষ্টিভঙ্গি। আর সেই দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে চরিত্রের ভেতর দিয়ে। যদি আমরা সেই জায়গাটায় কাজ করতে পারি, তবে একদিন হয়তো আমরা সত্যিই বলতে পারব

Leave your review