আমরা তথ্যে শিক্ষিত, প্রজ্ঞায় নিরক্ষর


মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জানে। হাতের মুঠোয় এখন সারা বিশ্ব। হাতের মুঠোয় এখন সারা বিশ্ব। অনর্গল বলার অভ্যাসটাও বেশ আয়ত্তে এসেছে। কথা-বার্তায় সবাই যেন সবজান্তাদের দলে নাম লিখিয়েছে। কিন্তু আগের চেয়ে বেশি বোঝে কি? একসময় মানুষ জ্ঞান খুঁজত নিজেকে আলোকিত করার জন্য। আর এখন তথ্য খোঁজে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য। পৃথিবী আজ সত্যিই অন্যরকম। তাই মানুষগুলিও অন্যরকম। এখন একজন মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠেই কয়েক মিনিটের মধ্যে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, যুদ্ধ, জলবায়ু, ধর্ম, প্রযুক্তি থেকে শুরু করে মহাকাশ পর্যন্ত সব বিষয়ে আপডেট হয়ে যেতে পারে। হাতে স্মার্টফোন, ইন্টারনেটের অবাধ নাগাল, চারপাশে নোটিফিকেশনের অবিরাম শব্দ, সব মিলিয়ে আমরা যেন তথ্যের এক মহাসমুদ্রে বাস করছি। এখন আর কিছু জানাটা কঠিন নয়। কঠিন হলো, এত কিছুর ভেতর থেকে কি বোঝা জরুরি, সেটি বোঝা। অদ্ভুতভাবে, এই যুগে মানুষের জানাশোনা যত বেড়েছে, চিন্তাশক্তি যেন ততটাই অস্থির হয়ে পড়েছে। আমরা দ্রুত খবর পাই, দ্রুত মতামত দিই, দ্রুত উত্তেজিত হই। কিন্তু ধীরে ভাবার অভ্যাসটা হারিয়ে ফেলছি। পাঁচ মিনিটের ভিডিও দেখে আমরা ইতিহাস বিশ্লেষণ করি। কয়েকটি পোস্ট পড়ে অর্থনীতি বুঝে ফেলি। আর দুই-চারটি উদ্ধৃতি মুখস্থ করেই জীবনদর্শনের বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠি। ফলে তথ্যের পরিমাণ বাড়লেও প্রজ্ঞার গভীরতা বাড়ছে না। বরং অনেক সময় মনে হয়, আমরা জেনে যাওয়ার ভিড়ে বোঝার ক্ষমতাটাই হারিয়ে ফেলছি। এই কারণেই আজকের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি হয়তো এটাই। মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জানে, কিন্তু আগের চেয়ে বেশি বোঝে কি? প্রশ্নটা বিপদজ্জনকও বটে। কারণ এর উত্তর খুঁজতে গেলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আমরা তথ্যে শিক্ষিত, কিন্তু প্রজ্ঞায় নিরক্ষর।

একসময় প্রায় প্রতিটি গ্রামেই একজন করে লোক থাকত। ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের গ্রামেও এমন একজন ছিলেন। লেখাপড়ায় শিক্ষিত না হলেও দুনিয়ার সব খবরই উনি রাখতেন।  যিনি ছিলেন চলমান সংবাদ সংস্থা। সকালে চায়ের দোকানে বসে তিনি এমন ভঙ্গিতে খবর পরিবেশন করতেন, যেন জাতিসংঘের গোপন নথিও তার পকেটে আছে। কে কার সঙ্গে পালিয়ে গেল, কোন মেম্বার উন্নয়নের টাকা মেরে দিয়ে নতুন মোটরসাইকেল কিনল। কার গরু রাতে কার ধানক্ষেত চিবিয়ে খেল, কার মেয়ে কার হাত ধরে পালিয়ে গেল। কিংবা কার ছেলের বিদেশ যাওয়ার ভিসা তিনবার রিজেক্ট হলো, সব খবর তার নখদর্পণে। এমনকি খবরের সঙ্গে তিনি নিজস্ব বিশ্লেষণ, নাটকীয় বিরতি আর আবেগঘন উপসংহারও যোগ করতেন। গ্রামের মানুষ অনেক সময় রেডিওর খবরের চেয়ে তার কথাই বেশি বিশ্বাস করত। তাই মানুষ তাকে মজা করে ডাকত, “গাঁয়ের পত্রিকা”।

মজার ব্যাপার হলো, পৃথিবী বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু সেই চরিত্রটা হারিয়ে যায়নি। বরং সে এখন বিশ্বায়িত হয়েছে। আজ পুরো পৃথিবীই যেন সেই লোকটার বর্ধিত এবং নতুন সংস্করণ। পার্থক্য শুধু, এখন সে চায়ের দোকানে বসে না। সে ফেসবুকে লাইভে আসে, ইউটিউবে বিশ্লেষণ দেয়, টুইটারে ক্ষেপে যায়, আর হোয়াটসঅ্যাপে “বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া” খবর ফরওয়ার্ড করে। আগে তার শ্রোতা ছিল গ্রামের মানুষ। এখন তার মঞ্চ পুরো পৃথিবী। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, এখন আর কেউ যাচাই করে না, খবরটা সত্যি কি না। বরং কে আগে শেয়ার করল, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে মানুষ সকালবেলা দাঁত ব্রাশ করার আগেই তিনটি যুদ্ধ, চারটি ভূমিকম্প, পাঁচটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আর সাতটি মোটিভেশনাল উক্তি জেনে যায়। মোবাইলের স্ক্রিনে আঙুল ঘোরাতে ঘোরাতে সে জেনে ফেলে কোন দেশের সরকার পড়তে যাচ্ছে, কোন তারকার বিয়ে ভাঙছে, আর কোন ধনকুবের মহাকাশে নতুন রকেট পাঠাচ্ছে। কিন্তু পাশের বাসার বৃদ্ধ লোকটা তিনদিন ধরে একা আছে, কিংবা নিজের সন্তানটা শেষ কবে মন খুলে কথা বলেছে, এই খবরগুলো তার টাইমলাইনে আসে না। কারণ তথ্য এখন আমাদের কাছে খাবারের মতো নয়, নেশার মতো। যত পাই, তত চাই। কিন্তু তৃপ্তি আসে না। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা ঘটেছে বইয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের জায়গায়। একসময় মানুষ বই পড়ত নিজেকে বড় করার জন্য। বই ছিল চিন্তার দরজা, কল্পনার জানালা, আর নিঃশব্দে মানুষ হয়ে ওঠার এক গোপন বিদ্যালয়। এখন বইয়ের জায়গা নিয়েছে ফেইসবুক, রীল। মানুষ আর অধ্যায় পড়ে না, ক্যাপশন পড়ে। যুক্তি শেখে না, মন্তব্য শেখে। গভীরতা খোঁজে না, ভাইরাল খোঁজে।

ক্লাসে মাঝে মাঝে আমি ছাত্রদের জিজ্ঞেস করি, “শেষ কবে একটা বই পড়েছ?” প্রশ্নটা শুনে তারা এমনভাবে তাকায়, যেন আমি মধ্যযুগের কোনো অভ্যাসের কথা জিজ্ঞেস করেছি। কেউ বলে, “স্যার, সময় পাই না।” অথচ সেই ছাত্রই দিনে চার ঘণ্টা রিল দেখে, রাত জেগে সিরিজ দেখে, আর সকালে উঠে বলে, “মাথাটা খুব ক্লান্ত লাগে!” কেউ কেউ আবার গর্ব করেই বলে, “আমি বই পড়ি না, ইউটিউব দেখে সব শিখে ফেলি।” যেন টলস্টয়, রবীন্দ্রনাথ কিংবা হুমায়ূন আহমেদ যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো তারাও উপন্যাস না লিখে “৩ মিনিটে জীবনের সেরা ১০টি শিক্ষা” নামে ভিডিও বানাতেন। সমস্যা হলো, বই মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না। বই মানুষকে ধৈর্য শেখায়, ভাবতে শেখায়, নিজের ভেতরের শব্দ শুনতে শেখায়। আর স্ক্রলিং মানুষকে শুধু দ্রুত প্রতিক্রিয়া দিতে শেখায়। ফলে আমরা এখন অনেক কিছু জানি, কিন্তু খুব কম জিনিস বুঝি। কারণ বই পড়া মানুষ কমছে, আর মতামত দেওয়া মানুষ বাড়ছে। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে আমরা এমন এক অদ্ভুত সভ্যতায় পৌঁছে গেছি। মানুষ এখন জ্ঞান অর্জনের চেয়ে মতামত উৎপাদনে বেশি দক্ষ।  সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, আজকের মানুষ “আমি জানি না” কথাটা বলতে ভয় পায়। যেন না জানাটা একটা সামাজিক অপরাধ। ইন্টারনেট তাকে শিখিয়েছে, সব বিষয়ে মতামত থাকা নাগরিক দায়িত্ব। আর সেই মতামত যত দ্রুত দেওয়া যায়, তত বেশি স্মার্ট দেখায়। ফলে এখন মানুষ ভাবার আগে মন্তব্য করে, বোঝার আগে বিতর্কে নামে, আর পড়ার আগেই সিদ্ধান্ত দিয়ে দেয়। কেউ পুরো খবর পড়ে না, কিন্তু কমেন্ট সেকশনে এমন আত্মবিশ্বাসে তর্ক করে, যেন ঘটনাস্থলে সে নিজেই উপস্থিত ছিল।

আগে মুরব্বিরা বলতেন, “কম জানলে চুপ থাকো।” এখন সময় বদলেছে। এখন কম জানলেই মানুষ বেশি কথা বলে। কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এমন এক মঞ্চ তৈরি করেছে, যেখানে তথ্যের চেয়ে আত্মবিশ্বাসের দাম বেশি। সত্যি জানার চেয়ে ভাইরাল হওয়াটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে মজার এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে করুণ ব্যাপার হলো, আমরা এখন তথ্যকে জ্ঞান আর জ্ঞানকে প্রজ্ঞা ভেবে বসে আছি। কেউ যদি টানা দশ মিনিট কথা বলে দশটা পরিসংখ্যান, পাঁচটা আন্তর্জাতিক রিপোর্ট আর তিনটা বিদেশি গবেষণার নাম বলতে পারে, আমরা সঙ্গে সঙ্গে তাকে “বুদ্ধিজীবী” বলে মেনে নিই। অথচ সেই মানুষটাই হয়তো নিজের সন্তানের সঙ্গে বসে দশ মিনিট গল্প করতে পারে না, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের একাকীত্ব বুঝতে পারে না, বন্ধুর মুখের হাসির আড়ালের ক্লান্তি ধরতে পারে না, কিংবা সামান্য সমালোচনায় নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তথ্য মাথাকে ভারী করে, প্রজ্ঞা মানুষকে গভীর করে। আজকাল আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে মানুষের ফোনে হাজারো কন্টাক্ট আছে, কিন্তু মনের কথা বলার মানুষ নেই। মানুষ মহাকাশের ছবি দেখে মুগ্ধ হয়, কিন্তু নিজের ঘরের মানুষের চোখের জল দেখতে পায় না। আমরা এত কিছু জানি যে, না জানার বিনয়টাই হারিয়ে ফেলেছি।

এখনকার মানুষ গুগলে সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। কীভাবে দ্রুত সফল হওয়া যায়, কীভাবে ধনী হওয়া যায়, কীভাবে মানুষকে ইমপ্রেস করা যায়। সব কিছুর টিউটোরিয়াল আছে। কিন্তু কখন চুপ থাকা উচিত, কীভাবে ক্ষমা করতে হয়, কীভাবে নিজের ভুল স্বীকার করতে হয়, কিংবা কেন কম জানলেও বিনয়ী থাকা দরকার, এসবের কোনো খোঁজ নেই।  বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ছে, ডিগ্রি বাড়ছে, সার্টিফিকেট বাড়ছে, কিন্তু মানুষের ভেতরের আলোর পরিমাণ কেমন যেন কমে যাচ্ছে। এখন দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো সনদের সংখ্যা দেখে মানুষ মুগ্ধ হয়। কিন্তু চরিত্রের গভীরতা মাপার কোনো ব্যবস্থা নেই। আমরা সিজিপিএ দিয়ে মেধা মাপি, বেতন দিয়ে সফলতা মাপি, আর ফলোয়ার দিয়ে প্রভাব মাপি। কিন্তু একজন মানুষ কতটা মানবিক, কতটা সহনশীল, কতটা বিবেকবান, সেটা মাপার কোনো অ্যাপ এখনো আবিষ্কার হয়নি। সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হলো, আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বানাচ্ছি, অথচ প্রাকৃতিক বুদ্ধিমত্তাটাই ব্যবহার করছি কম। মানুষ এখন মেশিনকে মানুষের মতো ভাবতে শেখাচ্ছে, আর মানুষ নিজে ধীরে ধীরে মেশিনের মতো হয়ে যাচ্ছে, দ্রুত, কার্যকর, তথ্যসমৃদ্ধ, কিন্তু অনুভূতিহীন।

আজকাল একটা ছোট শিশুও জানে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ কে, কোন তারকার কত ফলোয়ার, কিংবা কোন কোম্পানির বাজারমূল্য সবচেয়ে বেশি। কিন্তু তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, মানুষের সবচেয়ে বড় গুণ কি? সে হয়তো থেমে যাবে। কারণ আমরা তাকে তথ্য দিচ্ছি, কিন্তু দিশা দিচ্ছি না। আমরা তাকে প্রতিযোগিতা শেখাচ্ছি, কিন্তু সহমর্মিতা শেখাচ্ছি কম। সফল হওয়ার কৌশল শেখাচ্ছি, কিন্তু ভালো মানুষ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা শেখাতে ভুলে যাচ্ছি। সভ্যতার এই সময়ে মানুষ চাঁদে যেতে পারে, মঙ্গলগ্রহে রোবট পাঠাতে পারে, কয়েক সেকেন্ডে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে কথা বলতে পারে, কিন্তু একই খাবার টেবিলে বসে পাঁচ মিনিট ফোন ছাড়া পরিবারকে সময় দিতে পারে না। প্রযুক্তি আমাদের দূরের মানুষকে কাছে এনেছে, কিন্তু কাছের মানুষকে অনেক সময় দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এটাই আধুনিক সময়ের সবচেয়ে নীরব ট্র্যাজেডি। তথ্যের এই বন্যায় সবচেয়ে বেশি ডুবে গেছে “চিন্তা” নামের জিনিসটা। মানুষ এখন দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেয়, কিন্তু ধীরে ভাবতে ভুলে যাচ্ছে। এক ক্লিকে রাগে, এক ক্লিকে প্রেমে পড়ে, এক ক্লিকে বিপ্লব ঘটায়, আরেক ক্লিকে সম্পর্ক ভেঙে ফেলে। অথচ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কখনো তাড়াহুড়োয় নেওয়া যায় না। ভালোবাসা, মানবিকতা, ক্ষমা, ধৈর্য এসব ধীরে ধীরে শেখা জিনিস।

প্রজ্ঞা আসলে খুব ধীর, খুব নীরব এক শক্তি। সে নোটিফিকেশন পাঠায় না। সে ভাইরাল হয় না। তাকে নিয়ে মানুষ উত্তেজিত পোস্টও দেয় না। কিন্তু সে নিঃশব্দে একজন মানুষকে গভীর করে, বিনয়ী করে, আলোকিত করে। প্রজ্ঞা মানুষকে শুধু সফল হতে শেখায় না। মানুষ হয়ে উঠতে শেখায়। তাই পৃথিবী যতই তথ্যসমৃদ্ধ হোক, যতই প্রযুক্তিতে উন্নত হোক, যদি মানুষ নিজের ভেতরটা আলোকিত করতে না শেখে, তবে এই অগ্রগতি একদিন ক্লান্ত হয়ে পড়বে। কারণ সভ্যতার আসল শক্তি প্রযুক্তিতে নয়, মানুষের বিবেকে। তথ্যের পরিমাণে নয়, প্রজ্ঞার গভীরতায়। হয়তো ভবিষ্যতের পৃথিবী আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেবে সব জানার চেয়ে, কিছু গভীরভাবে বোঝা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সত্যিকারের শিক্ষিত সেই মানুষ, যে শুধু তথ্য সংগ্রহ করে না। মানুষকে ভালোবাসতে শেখে, বিনয়ী থাকতে শেখে, এবং অন্ধকার সময়েও নিজের ভেতরের আলো জ্বালিয়ে রাখতে জানে।

একটি সভ্যতা কত উঁচু ভবন বানিয়েছে, কত দ্রুত ইন্টারনেট চালায়, কিংবা কত উন্নত প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে, ইতিহাস শুধু তা দিয়েই তাকে বিচার করে না। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত দেখে, সেই সভ্যতা কেমন মানুষ তৈরি করেছিল। কারণ তথ্য দিয়ে দক্ষ কর্মী তৈরি করা যায়, কিন্তু প্রজ্ঞা ও মূল্যবোধ ছাড়া ভালো মানুষ তৈরি করা যায় না। আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু আরও শিক্ষিত মানুষ নয়, আরও মানবিক মানুষ। এমন মানুষ, যে প্রতিযোগিতা জানবে, কিন্তু সহমর্মিতাও হারাবে না। যে প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, কিন্তু বিবেককে অচল হতে দেবে না। যে সফল হতে চাইবে, কিন্তু সততাকে বিক্রি করবে না। আর এই মানুষ তৈরি হয় না শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য দিয়ে। এর জন্য দরকার চরিত্রের শিক্ষা, মূল্যবোধের শিক্ষা, মানবিকতার শিক্ষা। শিশুকে শুধু কীভাবে গণিত সমাধান করতে হয় তা শেখালেই হবে না। তাকে এটাও শেখাতে হবে কীভাবে একজন মানুষকে সম্মান করতে হয়। কীভাবে সততা ধরে রাখতে হয়। কীভাবে ব্যর্থতার পরও ভেঙে না পড়ে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়। কারণ ডিগ্রি মানুষকে চাকরি দিতে পারে, কিন্তু চরিত্র মানুষকে মর্যাদা দেয়। তাই সময় এসেছে শিক্ষাকে শুধু তথ্য আর পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, তাকে মানুষের ভেতরের আলো জ্বালানোর একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের উচ্চতার ওপর নয়, বরং তার মানুষের চরিত্রের গভীরতার ওপর। হয়তো পৃথিবীকে বদলানোর জন্য আমাদের আরও দ্রুত প্রযুক্তি নয়, আরও উন্নত মানবিকতা দরকার। কারণ শেষ পর্যন্ত জ্ঞান মানুষকে শক্তিশালী করে, কিন্তু চরিত্রই মানুষকে মহান করে তোলে

Leave your review