নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা: দায় এড়ানোর শিক্ষাব্যবস্থা


গত কয়েক দশক ধরে আমরা ছাব্বিশ হাজার বর্গমাইলের মানুষেরা এক অদ্ভুত জাতীয় অভ্যাস লক্ষ্য করছি। আমি বিনয়ের সঙ্গে স্বীকারও করছি, আমিও সেই অভ্যাসের নিয়মিত চর্চাকারী। ইনিয়ে-বিনিয়ে, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কথা বলার এক অদ্ভুত দক্ষতা যেন আমাদের রক্তেই মিশে আছে। একই বিষয়কে বার বার নতুন মোড়কে উপস্থাপন করে চর্বিত চর্বণ করার ক্ষেত্রে আমরা সত্যিই সিদ্ধহস্ত। দেশের নানাবিধ সমস্যা নিয়ে এক শ্রেণির মানুষ যেন এই শব্দ-বুননের কোলাহলেই আনন্দ খুঁজে পায়। আলোচনার চেয়ে উচ্চারণটাই সেখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে এই অবিরাম কথার ভিড়ে যখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে শিক্ষা তখন বিষয়টি আর কেবল শব্দের খেলা বলে মনে হয় না। বরং তা গভীরভাবে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কারণ শিক্ষা নিয়ে কথাবার্তা মানেই শুধু মতামত নয়। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যৎ, দায়বদ্ধতা এবং এক সমাজের সম্ভাবনার দিকনির্দেশক। বিষয়টি হলো, শিক্ষার মান নিয়ে কথা বলা। শিক্ষা নিয়ে কথা বলবো এতে আবার দোষ কিসের? অবশ্যই নেই যদি না কথাগুলো কোন এ বিশে সময়ে, বিশেষ উদ্দেশ্যে বলা না হতো। এখানেই আমাদের সমস্যা।

শিক্ষা নিয়ে আমরা ঠিক সেই সময়গুলোতেই কথা বলি, যখন কথা বলাটা সবচেয়ে সহজ আর দায়িত্ব নেওয়াটা সবচেয়ে কঠিন। এটা যেন কোনো চিরসবুজ আলোচনার বিষয় নয়। বরং কোন মৌসুমি ফল। ঠিক যেমন কাঁঠাল পাকে নির্দিষ্ট সময়ে। তেমনি শিক্ষাবিদ সত্তাও পাকতে শুরু করে নির্দিষ্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে। বোর্ড পরীক্ষার ফল বের হলেই, প্রশ্ন ফাঁসের গন্ধ নাকে এলেই, কিংবা নতুন কারিকুলামের ‘বিপ্লবী ঘোষণা শুনলেই, হঠাৎ করে চারপাশে শিক্ষাবিদের অভাব থাকে না। বুদ্ধিজীবীদের নীতি বাক্যে শুরু হয়ে যায়। শুরু হয়ে যায় কথার কোলাহল, উপদেশের বন্যা আর বুদ্ধিবৃত্তিক কসরতের মহড়া। চায়ের দোকানে চা নাড়তে নাড়তেই বিশ্লেষণ। বাসে বসে বসে সমাধান, আর ফেসবুকে স্ট্যাটাসে বিপ্লব। আর টিবির পর্দায় টক শোর হৈ চৈ বেঁধে যায়। অনেকের আবার এইটাই প্রধান চাকুরী। সব মিলিয়ে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক মেলা বসে যায় দেশ জুড়ে। টকশোতে এমন সব আলোচনা হয়, শুনলে মনে হয়, এই তো, আগামীকাল থেকেই শিক্ষাব্যবস্থা একেবারে সোজা পথে হাঁটবে! হাবভাব দেখে কখনও মনে হয়, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা যেন পৃথিবীকে পথ দেখানোর দায়িত্বই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। কিন্তু কয়েকদিন পরেই সব শান্ত। আলোচনার ঝড় থেমে যায়। আর আমরা সবাই আবার নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। শেষ পর্যন্ত থেকে যায় সেই একই চিরচেনা, মুখরোচক, বহুল ব্যবহৃত প্রবাদের শব্দগুলো, “নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা। বাংলাদেশে শিক্ষার মান নিয়ে আলোচনা এখন প্রায় জাতীয় বিনোদনের পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলাফল খারাপ হলেই শুরু হয় বিশ্লেষণ। কিন্তু মজার বিষয় হলো, বিশ্লেষণের চেয়ে দোষারোপের অংশটাই বেশি উপভোগ্য। সবাই যেন প্রস্তুত। কেবল অপেক্ষা, কাকে দোষটা দেওয়া যায়!

এসএসসি বা এইচএসসি ফল প্রকাশের দিনটা যেন এক ধরনের ‘দোষ-বিনিময় দিবসহিসেবে পালিত হয়। সকাল থেকে টেলিভিশনে ফল প্রকাশের খবর। বিকেলে টকশোতে ফলাফল বিশ্লেষণ, আর রাতের মধ্যে ফেসবুকে শিক্ষাব্যবস্থার পোস্টমর্টেম। সব মিলিয়ে এক জমজমাট আয়োজন। এক তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যায়। পুরো দেশ যেন সরব হয়ে উঠে। শিক্ষক বলবেন, ছাত্ররা আর আগের মতো মনোযোগী নয়, পড়ার টেবিল ছেড়ে তারা এখন মোবাইলের স্ক্রিনে বেশি সময় দেয়। ছাত্ররা পাল্টা যুক্তি দেবে, শিক্ষকরা সাংঘাতিক ফাঁকি বাজ। ক্লাসে ঠিক মতো পড়ানো হয় না, প্রশ্ন করলে বিরক্তিবোধ করেন, ধমক দেন, না করলে উদাসীনতা। শিক্ষকরা প্রাইভেট টিউশনি নিয়া ব্যস্ত। অভিভাবকরা বলবেন, এই নতুন সিস্টেমেই সমস্যা, “আমাদের সময় এমন ছিল না। এই বাক্যগুলি যেন জাতীয় যুক্তি হয়ে উঠেছে। আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানাবে, সব ঠিক আছে, কেবল ‘কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, যা শিগগিরই কাটিয়ে ওঠা যাবে। অর্থাৎ, সমস্যাটা যেন এক রহস্যময় সত্তা। সবাই তাকে চেনে, কিন্তু কেউ তাকে নিজের ঘরে ঢুকতে দেয় না। ফলে শেষ পর্যন্ত দোষটা গিয়ে পড়ে সেই চিরচেনা উঠানের ওপর। যেটি নাকি সব সমস্যার মূল। নতুন কারিকুলাম নিয়ে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটাও যেন এক চলমান রম্য নাটক। প্রথমে ঘোষণা, তারপর প্রশংসা, তারপর বিভ্রান্তি, এবং শেষে নীরবতা। বলা হলো, মুখস্থ বিদ্যার ইতি, পরীক্ষায় নকল রোধে ব্যাপক আয়োজন। বড়ো বড়ো সংবাদ মাধ্যমে ক্যাপশন। এখন থেকে দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষা। শুনতে এত সুন্দর মনে হয় যেন শিক্ষাব্যবস্থা বুঝি এক লাফে বিশ্বমানের হয়ে গেল! কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, শিক্ষক নিজেই বুঝে উঠতে পারছেন না কীভাবে এই নতুন পদ্ধতিতে ক্লাস নেবেন।  প্রশিক্ষণ সীমিত, নির্দেশনা অস্পষ্ট। ছাত্ররা খাতায় কি লিখবে, পরীক্ষায় কীভাবে মূল্যায়ন হবে, সেই প্রশ্নে দিশেহারা। অভিভাবকরা সন্ধ্যায় সন্তানের খাতা দেখে আরও বেশি বিভ্রান্ত, “এটা পড়াশোনা, না প্রকল্প?” ফলে পুরো ব্যবস্থাই এক অদ্ভুত পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। এখানে সবাই অংশগ্রহণকারী। কিন্তু কেউই নিশ্চিত নয়, পরীক্ষাটা আসলে কি বিষয়ে। শেষ পর্যন্ত এক বিন্দুতে এসে দাঁড়ায়। সবাই চেষ্টা করছে, কিন্তু কেউই নিশ্চিত না সে ঠিক পথে আছে কিনা। আর এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত, “দেখি কি হয়

এ যেন পরীক্ষার আগেই সবাই ফেল করে বসে আছে। তবে ফল প্রকাশের আগে কেউই সে কথা স্বীকার করতে রাজি নয়। সবাই এমন ভাব করছে, যেন ফলটা একটু ‘ম্যানেজ হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এর মধ্যে কোচিং সংস্কৃতি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এক অনিবার্য উপাখ্যান হয়ে উঠেছে। স্কুলে ক্লাস হয়। ঠিকই হয়, কিন্তু সেটা যেন নিয়ম রক্ষার জন্য। উপস্থিতি খাতায় সই, একটু বোর্ডে লেখা, আর বাকি সময়টা ‘বাসায় পড়ে নিও বলে দায়িত্ব হস্তান্তর। তারপর সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় আসল শিক্ষা। কোচিং সেন্টারের ব্যস্ত রাজপথে। সেখানে শিক্ষকরা যেন হঠাৎ করেই আলোকিত, “এইটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট, “এই প্রশ্নটা আসার সম্ভাবনা বেশি, “এই অংশটা কমন পড়বে। শুনতে শুনতে মনে হয়, এটা পড়াশোনা নয়, বরং ভবিষ্যদ্বাণীর সূক্ষ্ম বিদ্যা। ছাত্ররাও তখন জ্ঞান অর্জনের চেয়ে ‘কমন পাওয়ার কৌশল রপ্ত করতে ব্যস্ত। শিক্ষা যেন আর শেখা নয় বরং সম্ভাব্য প্রশ্নের সঙ্গে সখ্য গড়া। আমাদের সময়টা যেন ছিল ‘স্টার-এর দখলে। ফাইভ স্টার মানেই প্রশ্নপত্রে নিশ্চিত জায়গা। নামী-দামী কিছু শিক্ষক টেপ-রেকর্ডার চালিয়ে একসঙ্গে চার-পাঁচটা ব্যাচ পড়াতেন। শিক্ষার চেয়ে যেন ব্যবসার চাকা ঘুরত বেশি জোরে। সেই রমরমা বাণিজ্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সবচেয়ে বেশি হারিয়ে যেত মেধাবী অথচ দরিদ্র ছাত্রদের স্বপ্ন।

এখন তো চলছে আবার নতুন আলামত। এই আলামতে যোগ হয়েছে জিপিএ-৫-এর সার্কাস। এর প্রতি রয়েছে আমাদের প্রায় আবেগঘন আসক্তি। ব্যাপারটি এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছি, যেখানে শেখার গভীরতা নয়, নম্বরের উচ্চতাই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি। ছাত্র শিখছে, কীভাবে কম পড়ে বেশি নম্বর পাওয়া যায়।  শিক্ষক শেখাচ্ছেন, কীভাবে কঠিন অংশ এড়িয়ে নিরাপদে নম্বর তোলা যায়। আর অভিভাবক স্বস্তিতে। কারণ রিপোর্ট কার্ডে সবই ঝকঝকে। কেউ জিজ্ঞেস করছে না, এই জিপিএ-৫-এর ভেতরে আসলে কি আছে? জ্ঞান, নাকি শুধু নম্বরের চকচকে মোড়ক? বাস্তব দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, এসব যেন ‘অতিরিক্ত সুবিধা। থাকলে ভালো, না থাকলেও চলে। অথচ জাতীয় টিভির সাংবাদিকরা যখন  সহজ প্রশ্ন করেন, ২৬শে মার্চ কি ঘটেছিল, আমরা কেন বিজয় দিবস পালন করি, তখন জিপিএ৫ পাওয়া আমাদের সেই তথাকথিত মেধাবী সন্তানেরা নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। যেন অর্জিত ফলাফল আর প্রকৃত জ্ঞানের মধ্যে এক অদৃশ্য ফাঁক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সবচেয়ে উপভোগ্য এবং একই সঙ্গে উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, এই পুরো ব্যবস্থায় দায়বদ্ধতার এমন এক নিখুঁত ভারসাম্য তৈরি হয়েছে, যেখানে কেউই দায়ী নয়। শিক্ষক বলছেন, প্রশিক্ষণ নেই, তাই ঠিকমতো পড়াতে পারছেন না। ছাত্র বলছে, পরিবেশ নেই, তাই মন বসে না। অভিভাবক বলছেন, সময় নেই, তাই নজর রাখা কঠিন। আর নীতিনির্ধারকরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানাচ্ছেন, পরিকল্পনা তো যুগান্তকারী! অর্থাৎ, সবাই নিজের জায়গা থেকে যথার্থ। কিন্তু ফলাফল কেন যেন ঠিক আসছে না। যেন সবাই ঠিক তালে নাচছে, তবুও কোথাও একটা অদৃশ্য বেসুরো সুর বাজছে। শেষ পর্যন্ত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এক বিশাল নাচঘরের মতো। যেখানে আলোর ঝলকানি আছে, শব্দ আছে, ভিড় আছে, কিন্তু তাল নেই। আর এই তালহীনতার দায় কেউ নিজের কাঁধে নিতে রাজি না। তাই খুব সহজ এক ব্যাখ্যা আমরা হাতে রেখে দিয়েছি, “নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা। সমস্যা হলো, এই ব্যাখ্যাটা যত আরামদায়ক, ততটাই বিপদজ্জনক। কারণ, যতদিন আমরা উঠানকে দোষ দিয়ে স্বস্তি পাব, ততদিন নাচ শেখার প্রয়োজনটাই অনুভব করব না।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এলেই মনে হয় এবার বুঝি গল্পটা বদলাবে। কিন্তু একটু ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এখানে শুধু মঞ্চটা বড় হয়েছে, নাটকটা একই রয়ে গেছে। সরকারি বিশ্ব বিদ্যালয়গুলিতে সেশনজট যেন এক অনিবার্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কবে শুরু হবে জানা যায়, কবে শেষ হবে কেউ জানে না। সিলেবাস এখনো পুরনো ধাঁচে চলছে।, ছাত্ররা চাকরির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে যেন অতীতের জ্ঞান মুখস্থ করছে। গবেষণার কথা উঠলেই এক ধরনের নীরবতা নেমে আসে। যেন এটি একটি ঐচ্ছিক বিলাসিতা, প্রয়োজনীয় কাজ নয়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। কথাটি নিঃসন্দেহে বাস্তবতার প্রতিফলন। কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছে, যারা ডিগ্রিধারী হলেও কর্মদক্ষতায় পিছিয়ে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানই তাদের নিয়োগ দিতে অনীহা প্রকাশ করে। অনেক সময় এমনও মনে হয়, অদক্ষ ও অপ্রস্তুত কর্মী নিয়োগ দেওয়া প্রতিষ্ঠানের জন্য বাড়তি ঝুঁকি ও বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বেশীর ভাগ শিক্ষার্থীর কাছে ক্লাসে উপস্থিতির চেয়ে ‘নোট জোগাড় করাটাই বেশি কার্যকর কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। কারণ শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় পাশ করাই তো মূল লক্ষ্য। এর সঙ্গে যোগ হয় রাজনৈতিক প্রভাব। যা কখনো কখনো শিক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়ে যায়। কিন্তু আলোচনা শুরু হলেই সেই চিরচেনা সংলাপ, “ছাত্ররা সিরিয়াস না। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা আমরা খুব সচেতনভাবেই এড়িয়ে যাই। সমস্যার আসল জায়গাটা কোথায়? কারণ সেখানে গেলে আয়নার সামনে দাঁড়াতে হয়। শিক্ষককে ভাবতে হবে, তিনি কি সত্যিই ক্লাসে সময় দিচ্ছেন, নাকি সিলেবাস শেষ করাই দায়িত্ব মনে করছেন? ছাত্রকে ভাবতে হবে, সে কি জ্ঞান অর্জন করতে চায়, নাকি শুধু পাশ করার শর্টকাট খুঁজছে? অভিভাবককে ভাবতে হবে, সন্তানের শিক্ষায় তার ভূমিকা ঠিক কতটা? আর নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে, ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন কতটা কঠিন এবং গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই আত্মসমালোচনা সহজ নয়। এতে স্বস্তি নেই, দায় আছে। তাই আমরা খুব স্বাভাবিকভাবেই সহজ পথটা বেছে নিই। দোষটা উঠানের ঘাড়ে চাপিয়ে দিই।

সব মিলিয়ে ছবিটা এখন বেশ পরিষ্কার। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আসলে কোনো একক সমস্যার শিকার নয়। বরং এটি একটি সম্মিলিত দায় এড়ানোর মহড়া। এখানে সবাই নিজের অবস্থান ঠিক রাখে। যুক্তি ঠিক রাখে, ব্যাখ্যাও ঠিক রাখে। শুধু ফলাফলটাই ঠিক আসে না। শিক্ষক শেখান, ছাত্র পড়ে। অভিভাবক খোঁজ নেন, নীতিনির্ধারক পরিকল্পনা করেন কাগজে-কলমে সবই নিখুঁত। কিন্তু বাস্তবে কোথাও যেন তাল কেটে যায়। আর সেই তাল কেটে যাওয়ার দায় কেউ নিজের ঘাড়ে নিতে রাজি নন। তাই আমরা খুব স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে একটি পুরনো প্রবাদকে আধুনিক নীতিতে পরিণত করেছি। “নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা। এটি এখন আর শুধু একটি কথা নয়, বরং একটি মানসিকতা। একটি নিরাপদ আশ্রয়। যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা নিজের অদক্ষতাকে আড়াল করতে পারি। উঠানকে দোষ দিলে আত্মসমালোচনা করতে হয় না। পরিবর্তনের দায় নিতে হয় না। কষ্টও করতে হয় না।  কিন্তু সত্যিটা আরও সহজ, আরও নির্মম। উঠান কখনোই বাঁকা ছিল না। বাঁকা হয়ে আছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের প্রস্তুতি, আমাদের দায়বোধ। যতদিন আমরা উঠানের দোষ খুঁজতেই ব্যস্ত থাকব, ততদিন নাচ শেখা হবে না। আর যেদিন আমরা সত্যিকারের শেখার সাহস করব, সেদিনই বুঝব, সমস্যার মূলে ছিল না পরিবেশ। ছিল আমাদের ভেতরের ঘাটতি। সেই উপলব্ধি থেকেই শুরু হতে পারে পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার একটাই। গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা। ভালো শিক্ষা শুধু জ্ঞান দেয় না। দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে, দায়বোধ জাগায়। আমাদের শেখায় নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে তা অতিক্রম করতে। সেদিনই হয়তো আমরা সত্যিকার অর্থে শিখব নাচটাও, আর নিজেদেরও।

Leave your review