
ব্যঙ্গ করে বলা এই প্রবাদটা বাঙালীর চিরচেনা রসবোধেরই এক অনন্য নিদর্শন। সমাজের তথৈবচ অবস্থার প্রেক্ষিতে, যখনই বাস্তবতার কদর্যতা চোখে পড়ে, তখনই যেন এই কথাটি এক ধরনের শিরা-উদ্দীপক ব্যঙ্গবাণী হয়ে ছুটে আসে। যেন সব অসামঞ্জস্য, বিশৃঙ্খলা আর অসংগতিকে এক নিমেষে ‘ভালো’ করে দেওয়ার অবাস্তব প্রত্যাশা। আর সেই চেষ্টার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তীব্র কৌতুক আর সূক্ষ্ম প্রতিবাদ। “চোরের মার বড় গলা”এই রসালো কথাগুলো বাঙালীর লোকজ প্রজ্ঞার এক তীক্ষ্ণ ও ব্যঙ্গময় প্রতিফলন। গ্রামীণ জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা এই কথাটির আক্ষরিক অর্থ যেমন সরল, তেমনি তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য গভীর। চোর ধরা পড়েও উল্টো উচ্চস্বরে চিৎকার করে, যেন সে-ই নির্দোষ, আর অন্যরাই অভিযুক্ত। এই চিত্রটি কেবল একটি নাটকীয় দৃশ্যের বর্ণনা নয়। বরং মানুষের এক চিরন্তন মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম উন্মোচন। যখন কেউ নিজের অপরাধ আড়াল করতে চায়, তখন প্রায়শই সে-ই সবচেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী, সবচেয়ে বেশি উচ্চকণ্ঠ হয়ে ওঠে। সত্যকে চাপা দিতে মিথ্যার এই বাড়াবাড়ি প্রদর্শনই যেন প্রবাদের মূল ব্যঞ্জনা। বাংলার লোক সমাজে বহুদিন ধরেই এই প্রবাদটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে এমন সব পরিস্থিতি বোঝাতে, যেখানে অন্যায়কারীই নিজের পক্ষে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হয়, কিংবা অন্যকে দোষারোপ করে পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে। সামাজিক, পারিবারিক, এমনকি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এর প্রয়োগ লক্ষণীয়। আজকের বাস্তবতায় এই প্রবাদের প্রাসঙ্গিকতা আরও প্রকট। সমাজের আনাচে-কানাচে, অলিতে-গলিতে প্রায় সর্বত্রই এখন এই ‘বড় গলা’দের দৌরাত্ম্য। তাদের হাত লম্বা, প্রভাব বিস্তৃত। মাথায় শানিত বুদ্ধি, আর কথাবার্তায় যেন বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক:মসৃণ, পরিশীলিত, বিশ্বাসযোগ্য। তারা অনেকেই ক্ষমতার অন্দর মহলে বিচরণ করে। মুখে দেশোদ্ধারের বাগাড়ম্বর, নীতির জোরালো পাঠ, আর কাজে-কর্মে নিঃশব্দ সর্বনাশ। এই শ্রেণির মানুষ জাতিগুলোর এক অদ্ভুত কৌশল আছে। নিজেদের দোষ ঢাকতে তারা সবচেয়ে জোরে কথা বলে। যুক্তির চেয়ে উচ্চকণ্ঠে, সত্যের চেয়ে প্রদর্শনে তারা বেশি পারদর্শী। এমনকি অনেক সময় ভুক্ত ভোগীকেই উল্টো প্রশ্নবিদ্ধ করে, যেন অপরাধের ভারটুকুও তারই কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া যায়। এই সব ঘটনা চোখের সামনে, আমাদের আশে-পাশে, ডানে-বায়ে হর-হামেশা ঘটছে। কেউ দেখছে কিন্তু না দেখার ভান করে থাকে। তাই “চোরের মার বড় গলা” আজ আর কোন নিছক একটি প্রবাদ নয়। এটি আমাদের সমাজেরই এক বাস্তবতার চিত্র। যেখানে সত্য নীরব, আর মিথ্যা উচ্চকণ্ঠ। সেখানে এই বড় গলাদের উন্মাদনা প্রায়ই বাস্তবতাকে ঢেকে দেয়। যেন শব্দের জোরেই সত্যকে হার মানানো যায়। এই ভ্রান্ত বিশ্বাসই আজ আমাদের সামাজিক বোধকে ক্রমাগত ক্ষয় করে দিচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন আমাদের এ দুরবস্থা? পুরো সমাজটাতেই যেন পচন ধরেছে। সুযোগ পেলেই আমরা যেন অন্য রকম হয়ে যাই। ভালো-মন্দের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই নেতিবাচক মানসিকতার প্রধান কারণ গুনগত মানের শিক্ষার অভাব। আর তাই বর্তমান সময়ে আমরা প্রায়ই দেখি, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক কেলেঙ্কারি কিংবা সামাজিক অন্যায়ে জড়িত ব্যক্তিরাই সমাজের বিভিন্ন স্তরে ভালো মানুষ সাজতে সবচেয়ে সোচ্চার। তারা গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সভা-সেমিনারে, এবং জনসমক্ষে এমনভাবে নিজেদের উপস্থাপন করে যেন তারাই সমাজের ভালো কাজগুলি করছেন। কিন্তু তাদের দিকে কেউ কখনো দোষারোপের অঙ্গুলি নির্দেশ করলেই এমন হম্বি-তম্বি শুরু করে দেয় যেন তারাই প্রকৃত ভুক্তভোগী। শব্দের জোর, প্রভাবের বলয় এবং ক্ষমতার ছত্রছায়া মিলিয়ে তারা এমন এক বয়ান তৈরি করে, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। সত্য তখন আর তথ্যের উপর নির্ভর করে না। বরং নির্ভর করে কে কত জোরে এবং কত দক্ষতার সঙ্গে নিজের কথা তুলে ধরতে পারছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন আলোচিত ঘটনার দিকে তাকালেই এই প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে যখন একের পর এক তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তখন অভিযুক্ত অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি উল্টো নিজেদের ‘ষড়যন্ত্রের শিকার’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। তারা দাবি করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, কিংবা তাদের সাফল্যকে ক্ষুণ্ণ করার জন্য একটি গোষ্ঠী সক্রিয়। একইভাবে, কিছু আলোচিত দুর্নীতির মামলায় দেখা গেছে, অভিযুক্তরা সংবাদমাধ্যমে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে, তদন্ত প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার কৌশল নিয়েছেন। এতে করে মূল অভিযোগ থেকে জনমতের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া সহজ হয়। তবে “রাজনৈতিকভাব প্রণোদিত” শব্দ দুটি বেশ জোরে -সোরে ইদানীং এই মহলের লোকদের অভিধানে স্থান করে নিয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। এদের গলাটা এতোটাই লম্বা যে এরা ইনিয়ে-বিনিয়ে যত্র-তত্র কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংগঠিতভাবে নিজেদের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে একটি বিকল্প বয়ান দাঁড় করাতে অতি প্রাজ্ঞ। সত্য-মিথ্যার সীমারেখাকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট করে দেওয়ায় এরা অভিজ্ঞ। কখনও ভুয়া তথ্য, কখনও আংশিক সত্য, আবার কখনও আবেগঘন বক্তব্য ব্যবহার করে এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যাতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। প্রকৃত ঘটনাটি অনুধাবন করা কঠিন হয়ে যায়। তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কিংবা অতীতের রাজনৈতিক প্রাঙ্গণে এমন সব ধুরন্ধর লোকগুলোর কথা কেইবা ভুলে যাবে। এ লোকগুলোর মধ্যে একটা জিনিষ একেবারেই নেই। লাজ-লজ্জা। যেটা সবচেয়ে বেশী প্রকট সেটা ভদ্রবেশী মানুষের মুখোশ। ফলে যে সকল মানুষেরা আসলে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হওয়ার কথা, তারাই উল্টো সহানুভূতির দাবিদার হয়ে ওঠে। এই প্রবণতা শুধু উচ্চ পর্যায়ের আর্থিক বা রাজনৈতিক ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এমনকি ব্যক্তিগত বিরোধেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। ক্ষমতার নিকটবর্তী বা প্রভাবশালী কেউ যখন অভিযোগের মুখে পড়ে, তখন প্রায়শই দেখা যায় তারা নিজেদের অবস্থান ব্যবহার করে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে অভিযোগকারীই সন্দেহের মুখে পড়ে। সমাজে চলছে সত্যের চেয়ে প্রভাবশালীর গলাবাজির জয় জকার। সেই নিরিখে “চোরের মার বড় গলা” আমাদের সময়ের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আমাদের পচে যাওয়া মানসিকতার এক বিকৃত প্রতিফলন।
অথচ যারা প্রকৃত ভুক্তভোগী, তারা অনেক ক্ষেত্রেই নীরব থাকতে বাধ্য হন। সামাজিক লজ্জা, আইনি জটিলতা, প্রভাবশালী মহলের চাপ কিংবা প্রতিশোধের ভয়ে তারা সামনে আসতে পারেন না। অনেকের মনেই জন্ম নেয় এক গভীর হতাশা। আওয়াজ তুলেও যেন কোনো লাভ নেই। কারণ এই পচে যাওয়া সমাজে শক্তির ভারসাম্য তাদের পক্ষে নয়। এর ফলে অন্যায়ের শিকার মানুষগুলো ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ে, আর অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই নীরবতা কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্যের প্রতিচ্ছবি নয়। এটি এক গভীর সামাজিক ব্যর্থতার প্রকাশ, যেখানে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার মতো সাহস ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দুটোরই অভাব স্পষ্ট। আর এই বাস্তবতা যদি সত্যই আমরা অস্বীকার করতে চাই, তবে সেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে যারা বড় বড় প্রতিশ্রুতি ও কথার আড়ালে অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেছে, জাতীয় ক্রীড়াকে ঘরমুখো করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার নামে বৈষম্যের পাহাড় তৈরি করে ঘুষ, দুর্নীতি, ভয় ও জুলুমের নানা কৌশলে হাজারো কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, এমনকি দেশপ্রেমের মুখোশ পরে দেশটিকে বিদেশি তাবেদারদের হাতে ইজারা দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে, তাদেরকেই সর্ব প্রথম বিচারের আওতায় আনা জরুরি। আমাদের সরকার কি পারবেন এই প্রয়োজনীয় কাজটি করতে? সদিচ্ছা থাকলেও হয়তো এই কাজটি করা সম্ভব নয়। কারণ আমাদের সমাজ এখনো সত্যের পক্ষে নেই, বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থার পক্ষে নেই। এটি আসলে আমাদের সমষ্টিক বিবেকেরও একটি কঠিন পরীক্ষা। আমরা প্রায়ই ন্যায়বিচারের কথা বলি, কিন্তু যখন সত্য উচ্চারণের সময় আসে, তখন নীরবতাকেই বেছে নিই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষণিকের ক্ষোভ দেখালেও সুবিধার কাছে নীতিকে বিসর্জন দিই। ক্ষমতা, প্রভাব, আর ব্যক্তি স্বার্থের জালে আটকে পড়ে সত্য যেন বারবার পরাজিত হয়, আর ন্যায়বিচার হয়ে ওঠে কেবল এক দূরবর্তী স্বপ্ন। যে সমাজে অন্যায়কে সহ্য করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, সেখানে শুদ্ধতার জন্য লড়াই করা মানুষগুলো ধীরে ধীরে একা হয়ে যায়। তাদের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কোলাহলের ভিড়ে। এই পরিস্থিতিতে শুধু সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে চলবে না। কারণ পরিবর্তনের জন্য দরকার মানুষের মানসিকতার রূপান্তর। দরকার সাহসী অবস্থান, দরকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ। যদি আমরা নিজেরাই সত্যের পাশে দাঁড়াতে না পারি, তবে কোনো সরকারই একা এই অন্ধকার দূর করতে পারবে না। আর ততদিন পর্যন্ত ন্যায়বিচার শুধু প্রত্যাশার আলো হয়ে জ্বলতে থাকবে, কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে তার পূর্ণ বিকাশ ঘটবে না।
তবে বর্তমান সময়টা নিঃসন্দেহে এক নাজুক সন্ধিক্ষণ। আমরা এমন এক যুগে বসবাস করছি, যেখানে বাস্তবতা আর ভার্চুয়াল জগতের সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই ডিজিটাল যুগে সমস্যাগুলোর প্রকৃতি শুধু জটিলই হয়নি, বরং আরও সূক্ষ্ম ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সমাজের কাঠামোকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। এটি যেমন সাধারণ মানুষের কণ্ঠকে শক্তিশালী করেছে, প্রতিবাদের ভাষা দিয়েছে, তেমনি একই সঙ্গে বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের এক ভয়ংকর অস্ত্রেও পরিণত হয়েছে। অনেক সময় মনে হয়, এই ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মগুলো যেন অপরাধীদের জন্য এক প্রকার নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এখানেই তারা পরিকল্পিতভাবে নিজেদের পক্ষে জনমত গড়ে তোলে, ভুয়া তথ্যের জাল বিস্তার করে এবং সত্যকে বিকৃত করে। সুপরিকল্পিত কৌশলে অসত্য তথ্য ছড়িয়ে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়। এমনকি সংগঠিত অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই সত্যকে আড়াল করে ফেলা হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। বুঝতে পারে না। কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা তা নির্ধারণ করাই যেন এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সত্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় গুজবের কোলাহলে, আর প্রকৃত ঘটনা রয়ে যায় ধোঁয়াশার আড়ালে। এই অবস্থায় শুধু প্রযুক্তির অগ্রগতি নয়, নৈতিকতা, সচেতনতা এবং দায়িত্ববোধের অভাবই আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে সামনে আসে। এখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সত্যের প্রাপ্যতা ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রবণতা আরও উদ্বেগজনক। তার বহুবিধ কারণও আছে। এখানে বেশিরভাগ সময় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাব চোখে পড়ে। যখন অপরাধের সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত হয় না, তখন অপরাধীরা এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ পায় এবং আরও উচ্চকণ্ঠ হয়ে ওঠে। তারা জানে, শব্দের জোরে এবং প্রভাবের শক্তিতে অনেক কিছুই ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব। এই সংস্কৃতি ধীরে ধীরে সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। আর তা হলো, সত্যের চেয়ে প্রভাবশালী হওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এমন পরিস্থিতিতে সমাজের একটি অংশ কখনও কখনও অনিচ্ছাকৃতভাবে এই প্রবণতাকে উৎসাহিত করে। যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য গ্রহণ করা, গুজবে বিশ্বাস করা কিংবা শুধুমাত্র আবেগের বশে মতামত দেওয়া এসব আচরণ অন্যায়কারীদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করে।
এই হীন মানসিকতার শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে আমাদের দৃষ্টি ভঙ্গিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতেই হবে। শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বা আবেগ দিয়ে নয়, দীর্ঘ মেয়াদি ও টেকসই সমাধানের দিকে এগোতে হবে। আর তার জন্য প্রয়োজন গুনগত মানের শিক্ষা। সরকারকে তাই অগ্রাধিকার দিতে হবে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে, যেখানে শুধু তথ্য নয়, মানবিকতা, ানুষেরা ও চরিত্র গঠনের শিক্ষা সমান গুরুত্ব পায়। একইসঙ্গে সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক, সকল স্তরে গুণগত ও নৈতিক শিক্ষাকে মূল্য দিতে হবে। একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে তার ানুষেরা চরিত্রের ওপর। এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে আমাদের তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যাতে আমরা সহজে বিভ্রান্ত না হই। ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানোর সামাজিক সাহস তৈরি করতে হবে, যাতে তারা একা না পড়ে যায়। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে উচ্চকণ্ঠতার আড়ালে কোনো অপরাধী নিজেকে রক্ষা করতে না পারে। যখন একটি সমাজ শিক্ষার মাধ্যমে চরিত্র, মূল্যবোধ ও ন্যায়বোধে দৃঢ় হয়ে ওঠে, তখন এ ধরনের সমস্যা স্বাভাবিকভাবেই কমে আসে, অন্যায়ের স্থান সংকুচিত হয়। অন্যথায় আমরা এমন এক অন্ধকার বাস্তবতার দিকে এগোব, যেখানে অপরাধীরা শুধু অপরাধ করেই থামবে না, বরং সেটিকেই ন্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দুঃসাহস দেখাবে। আর তখন “চোরের মার বড় গলা” শুধু প্রবাদ নয়, আমাদের প্রতিদিনের নির্মম বাস্তবতায় রূপ নেবে, যেখানে সত্য নীরবে হারিয়ে যাবে আর মিথ্যা উচ্চকণ্ঠে শাসন করবে।