সরকারকে এখনই সোশ্যাল মিডিয়ার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে


সোশ্যাল মিডিয়ার ক্রমবর্ধমান বিস্তার আজ গোটা বিশ্বটাকে এক অদৃশ্য সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোররা এর প্রভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে তাদের স্বাভাবিক বিকাশের পথ। ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের মনে এর নেতিবাচক প্রভাব দিন দিন ছড়িয়ে পড়ছে এক ভয়ানক দাবানলের মতো, যা সমাজের জন্য রীতি মতো উদ্বেগজনক। উদ্ভিন্ন হয়ে পড়ছেন সচেতন পিতা-মাতারা। এই বাস্তবতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার শিশুদের সুরক্ষায় সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করা হয়েছে। শিশুদের জীবনে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে এই রায়টি একটি যুগান্তকারী রায়ই বটে। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব যে সত্যিই ভয়ানক সেই বৈশ্বিক বিতর্ককে পুনরায় সমাজের সামনে তুলে ধরেছে এই রায়টি। যে সকল অভিভাবক দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন, তারা এই রায়ের ফলে কিছুটা স্বস্তিও অনুভব করছেন।

১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ করার তাদের আহ্বান প্রযুক্তির ভয় থেকে জন্ম নেয়নি। বরং সোশ্যাল মিডিয়ার কালো থাবায় কীভাবে শিশুদের শৈশব এক অসুস্থতার রূপ নিচ্ছে সেই বাস্তবতা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। আমরা আজ  এমন এক যুগে বাস করছি যা সকলের জন্য, বিশেষ করে শিশুদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে। এখানে শিশুরা কেন, আমরা কেউই আজ নিরাপদ নই। এক সমীক্ষা থেকে জানা গেছে, যুক্তরাজ্যে শিশুদের শৈশবকাল দিন দিন খারাপ হচ্ছে। শৈশব এখন আর আনন্দের নয় বরং এক মহা উদ্বেগের। যেখানে লক্ষ লক্ষ শিশু-কিশোর সোশ্যাল মিডিয়ার কালো থাবার নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনছে। বেশিরভাগ শিশুই একটি ভালো ও সুখী শৈশবের পথে প্রধান বাধা হিসেবে অনলাইন বুলিং নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি হলো সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া অনেক তরুণের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এখন তরুণরা অনলাইনে বেশি সময় কাটাচ্ছে। আর তাই আমরা তাদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার উপর সোশ্যাল মিডিয়ার প্রকৃত প্রভাব দেখতে পাচ্ছি। এই আসক্তি এক অপ্রতিরোধ্য ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ছে সমাজে। সুতরাং, এই প্রেক্ষাপটে এই রায়টি মোটেও আশ্চর্যজনক ছিল না।

বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা ও গুগলকে ২০ বছর বয়সী এক তরুণীর ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউব-নির্ভর আসক্তির জন্য দায়ী করা হয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেসের এক আদালতের রায়ে উল্লেখ করেছেন যে, উভয় প্রতিষ্ঠানই জানত তাদের প্ল্যাটফর্ম নাবালকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তবুও তারা যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ভুক্তভোগীকে ২.২৫ মিলিয়ন পাউন্ডের সমপরিমাণ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই রায় কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এই রায়টি  আরও হাজারো মামলার পথ উন্মুক্ত করতে পারে। অনেকের কাছে এই রায়টি শিশুদের জন্য ন্যায়বিচারের সূচনা। একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে তাদের পরিষেবা প্রদানের ধরন পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে। এখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: কীভাবে তারা তাদের প্ল্যাটফর্মগুলোকে শিশুদের জন্য নিরাপদ করে তুলবে? নিঃসন্দেহে, এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে। শিশু ও কিশোরদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া-সংক্রান্ত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ক্রমবর্ধমান হার এই ধরনের আরও আইনি পদক্ষেপকে উৎসাহিত করবে। প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাকে তাই একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। অভিভাবকেরা ক্রমেই উপলব্ধি করছেন যে সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি তাদের সন্তানদের মানসিক ও সামাজিক সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একবার এতে জড়িয়ে পড়লে তা থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্ল্যাটফর্মকে এমনভাবে নির্মাণ করেছে, যা ব্যবহারকারীদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করে রাখে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, ৫১৫ বছর বয়সী শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, আর ১২১৫ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৯০ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে তরুণদের মধ্যে এর ব্যবহার বিশেষভাবে প্রকট। তাই এই রায়টি শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এখনই সময় দ্রুত কার্যকর নীতি গ্রহণ করে তরুণদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। শৈশবের মান উন্নত করতে হলে প্রতিটি সরকারকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

অনেক দেশেই সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের ফেসবুক, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের অনুমতি নেই সেখানে। অন্যদিকে চীনে বেশিরভাগ বিদেশি সোশ্যাল মিডিয়া সাইট ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে শিশুদের জন্য `মাইনর মোড`এর মাধ্যমে। ডুইন (টিকটকের চীনা সংস্করণ)-এর মতো চীনা প্ল্যাটফর্মে ১৪ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য পুরোপুরি নিষিদ্ধ। ইরান, উত্তর কোরিয়া, তুর্কমেনিস্তানেও সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ। রাশিয়ায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং অন্যান্য বিদেশি সোশ্যাল মিডিয়া সাইটে প্রবেশাধিকার সীমিত। এমনকি ফেসবুককে একটি চরমপন্থি সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মিয়ানমার, আলবেনিয়া এবং উগান্ডায় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বিধি নিষেধ রয়েছে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক, স্পেন, ফ্রান্স, পোল্যান্ডসহ অনেক ইউরোপীয় দেশও ১৬ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে। বিভিন্ন দেশে সরকার অনলাইন নিরাপত্তা এবং তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের কারণে সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য বয়সসীমা নির্ধারণ করছে। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে, সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার তরুণদের জন্য খুবই ক্ষতিকর, যার মধ্যে আত্মহত্যা এবং আত্ম-ক্ষতির মতো ঘটনাও রয়েছে।

কৈশোর মানবজীবনের এক সংবেদনশীল ও সৃজনশীল অধ্যায়। এ বয়সেই তরুণ-তরুণীরা আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হয়। নিজস্ব সত্তার রূপ নির্মাণে সচেষ্ট হয়। পরিচয়-গঠনের এই সূক্ষ্ম ও তাৎপর্যপূর্ণ পর্যায়ে সামাজিক মাধ্যম এক নতুন পরিসরের দুয়ার উন্মুক্ত করে। যেখানে তারা সমমনা, সমঅভিজ্ঞতা ও সম-মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে। এর ফলে তাদের ভাবনা, অভিজ্ঞতা ও আকাঙ্ক্ষার বিনিময় সহজতর হয় এবং আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়। কিন্তু এই ইতিবাচকতার অন্তরালেও লুকিয়ে আছে এক জটিল বাস্তবতা। অনেক অভিভাবকের দৃষ্টিতে সন্তানের সামাজিক মাধ্যম-নির্ভরতা প্রথমে তুচ্ছ বা অপ্রকাশ্য বলে মনে হলেও, ক্রমে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক সময়  এটি অভ্যাস থেকে আসক্তিতে রূপান্তরিত হয়। শিশুরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক সময় এর ভেতরেই এক প্রকার বসবাস শুরু করে। তখন তাদের পরিচয়বোধ, বন্ধুত্বের ধারণা এবং আত্মমর্যাদার অনুভূতি ধীরে ধীরে ডিজিটাল যোগাযোগের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে পড়ে। বিশেষত লক্ষণীয় যে, বহু ডিজিটাল মাধ্যম ও বিষয়বস্তু এমনভাবে নির্মিত, যা শিশু-কিশোরদের দীর্ঘ সময় ধরে আকৃষ্ট ও ব্যস্ত রাখার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত। যা আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ বিনোদন বলে প্রতীয়মান হলেও, তার অন্তরালে প্রায়শই কার্যকর থাকে এক সুপরিকল্পিত কৌশল। যা ধীরে ধীরে শিশুদের সুস্থ মানসিকতাকে মনোযোগ আকর্ষণ, আবেগীয় সাড়া জাগানো এবং নির্ভরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সূক্ষ্মভাবে গ্রাস করতে থাকে।

মানসিক স্বাস্থ্যের উপর সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব অন্যতম। তাই এই বিষয়টির ব্যাপারে সকলের মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। অনেক গবেষণায় এর অতিরিক্ত ব্যবহারকে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, একাকীত্ব এবং আত্মবিশ্বাস হ্রাসের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। শিশুরা অবাস্তব ছবি ও জীবনধারা দেখে এবং নিজেদেরকে এই নির্বোধ মানদণ্ডের সাথে তুলনা করতে শেখে। তারা লাইক, কমেন্ট এবং ফলোয়ারের মাধ্যমে স্বীকৃতি পেতে চায়। শিশুরা আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া এমনভাবে ব্যবহার করছে, যা ধীরে ধীরে তাদের আত্ম-প্রতিচ্ছবি ও আত্ম-উপলব্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাদের বেড়ে ওঠার এই সংবেদনশীল সময়ে যে স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠার কথা, তা অনেক সময়ই এই ভার্চুয়াল জগতের তুলনা ও প্রভাবের নিচে চাপা পড়ে যায়। একই সঙ্গে, তাদের ক্রমবর্ধমান শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত জরুরি, যা সুস্থ বিকাশের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, গভীর রাত পর্যন্ত তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ডুবে থাকে। অবিরাম স্ক্রল করে, বার্তার জবাব দেয়, আর ধীরে ধীরে ঘুম তাদের থেকে দূরে সরে যায়। ফলস্বরূপ, যখন তাদের শরীর ও মন বিশ্রাম চায়, তখনও তারা জেগে থাকে। এই অনিদ্রা তাদের মনে অস্থিরতা তৈরি করে, মেজাজে ওঠানামা বাড়ায় এবং মনোযোগে ঘাটতি আনে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে তাদের পড়াশোনায় এবং সামগ্রিক বিকাশেও।

সাইবার জগতে উৎপীড়ন আজ এক নতুন, অদৃশ্য অথচ অবিরাম বিপদের রূপ নিয়েছে। প্রচলিত উৎপীড়নের মতো এর কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই। এটি সময়-স্থান পেরিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে একজন শিশুকে তাড়া করতে পারে। সামনাসামনি অপমানের মতোই এটি গভীর আঘাত হানে, কখনও কখনও আরও নির্মম হয়ে ওঠে। কারণ এখানে লুকিয়ে থাকে অগণিত অদৃশ্য কণ্ঠ। একটি কটু বাক্য, একটি বিদ্রূপ, মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে। অল্প সময়ে শত শত, এমনকি হাজারো বার্তা এসে ভরিয়ে তোলে নির্যাতিত শিশুর পর্দা। অথচ সে প্রায় কিছুই করতে পারে না। বন্ধ করার পথ তার কাছে অস্পষ্ট, প্রতিরোধ যেন অসম্ভব। এই অসহায়তার অনুভূতি তার মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। যার পরিণতি অনেক সময় ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কখনও কখনও এই মানসিক যন্ত্রণা আত্মঘাতী প্রবণতার দিকেও ঠেলে দিতে পারে, এমনকি জীবনহানির কারণও হয়ে দাঁড়ায়। তবে এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো সামাজিক মাধ্যমের আসক্তিমূলক প্রকৃতি। এগুলো এমনভাবে নির্মিত, যা মানুষের মস্তিষ্ককে উদ্দীপিত করে। ঠিক জুয়া বা অন্যান্য আসক্তির মতো। বারবার ফিরে আসতে বাধ্য করে, অজান্তেই জড়িয়ে ফেলে এক অন্তহীন চক্রে। শিশুদের জন্য, এমনকি অনেক প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রেও, এই আসক্তি ধীরে ধীরে জীবনের ভেতরের লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। বাহ্যিক স্বীকৃতি, লাইক-কমেন্টের আকর্ষণ তাদের মনকে আবদ্ধ করে ফেলে। ফলে একসময় সামাজিক মাধ্যমই হয়ে ওঠে কেন্দ্রবিন্দু, আর বাস্তব জীবনের ভারসাম্য নষ্ট হতে থাকে। এই চক্র যত গভীর হয়, ততই এর প্রভাব হয়ে ওঠে নেতিবাচক ও ক্ষতিকর।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক এই রায়টি এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। জবাবদিহিতার প্রতি এক দৃঢ় অঙ্গীকারের ইঙ্গিত। অন্তত এই বিষয়টি পরিষ্কার যে, প্রযুক্তি শিল্পের হাতে সবকিছু ছেড়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়। যখন এই শিল্পগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন হস্তক্ষেপ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। যেমনভাবে আইন অ্যালকোহল, তামাক বা অন্যান্য ক্ষতিকর পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি এখন ডিজিটাল জগতের জন্যও সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে।  শৈশব মানেই শেখা, বাস্তব সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং চারপাশের পৃথিবীকে আবিষ্কার করা। এই সময়ে শিশুদের  মানসিক ও সামাজিক দক্ষতার বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  এখন আর সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব নিয়ে সংশয় নেই। বিশ্বের নানা প্রান্তের সরকার এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন: কীভাবে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। আইনের পাশা পাশি ডিজিটাল সাক্ষরতা আজ অপরিহার্য। প্রযুক্তি সম্পর্কে সঠিক শিক্ষা শুধু শিশুদের জন্য নয়, অভিভাবকদের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সচেতন ব্যবহার, বোঝাপড়া এবং সঠিক দিকনির্দেশনাই পারে একটি নিরাপদ ও সুস্থ ডিজিটাল ভবিষ্যৎ।

সবশেষে, এই সংকট আমাদের সামনে কেবল একটি নীতিগত বা প্রযুক্তিগত প্রশ্নই তোলে না। এটি আমাদের মানবিক দায়িত্ববোধকেও গভীরভাবে নাড়া দেয়। আমরা কি ধরনের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চাই, সেটিই আজ মূল প্রশ্ন। প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে অগ্রগতির বাহক, কিন্তু সেই অগ্রগতি যদি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের শৈশব, মানসিক সুস্থতা ও স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশকে গ্রাস করে, তবে সেই উন্নয়ন নিঃসন্দেহে প্রশ্নবিদ্ধ। তাই এখন প্রয়োজন সম্মিলিত সাহস, দূরদর্শিতা এবং নৈতিক অবস্থান, যেখানে সরকার, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি সংস্থাগুলো একসঙ্গে কাজ করবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে। আমাদের সিদ্ধান্তগুলো শুধু বর্তমানকে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তা, অনুভব ও জীবনবোধকে গড়ে তুলবে। তাই বিলম্ব না করে, সচেতনতা, সংযম এবং দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে আজই এমন পথ বেছে নেওয়া জরুরি, যা শিশুদের জন্য নিরাপদ, সুস্থ ও মানবিক এক ডিজিটাল আগামী নিশ্চিত করতে পারে। অন্য দেশের সরকারের মতো আমাদের দেশের সরকারকেও এখনই সোশ্যাল মিডিয়ার বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপটি নিতে হবে।

Leave your review