শিক্ষা যখন চরিত্র গড়ে না


প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে। সমাজকে সমৃদ্ধ করে। একটি জাতির ভবিষ্যতকে গড়ে তোলে। শিক্ষার দর্শন ও চর্চার মধ্য দিয়েই একটি জাতিকে নির্ভরযোগ্য ভাবে চেনা যায়। সত্যিকারের শিক্ষা কেবল পাঠ্যবই, পরীক্ষা বা সনদের বিষয় নয়। শিক্ষা হলো একটি সমাজ কি ধরনের মানুষ তৈরি করতে চায়, তার স্পষ্ট ঘোষণা। পূর্ব বাংলার ইতিহাসে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন সেই ঘোষণাকে উচ্চকণ্ঠে প্রকাশ করেছিল। সেই ঘোষণায় শিক্ষা ছিল জাতিসত্তা, গণতন্ত্র, ভাষা ও নৈতিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা আইয়ুব খানের চাপিয়ে দেয়া অগণতান্ত্রিক ও ছাত্র স্বার্থ বিরোধী শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তীব্র আন্দোলন ও সংগ্রাম গড়ে তোলেন। সেই সময় শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের আন্দোলনের শেকড় ছিল শ্রেণীকক্ষ, পাঠাগার ও চিন্তার ভেতরে। অথচ আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমরা যখন শিক্ষার বাস্তব চিত্রটা দেখি তখন আমরা সত্যিই মহা- অস্বস্তিতে পড়ি। এখানে ফাঁকা শ্রেণীকক্ষ, মুখস্থনির্ভর পাঠ্যক্রম, প্রশ্নহীন শিক্ষা, নকল যুক্ত পরীক্ষা, অটো পাস ও রাজপথমুখী শিক্ষার্থী। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের কি বিশাল ব্যবধান? দিন দিন আমরা কোথায় যাচ্ছি? এই প্রশ্ন আজ আর কেবল চিন্তার বিষয় নয়, বরং এক মহা সংকটের প্রতিফলন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যেন ধীরে ধীরে তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ছে। জাতীয় পর্যায়ে দুর্নীতি, নৈতিক অবক্ষয় এবং চরিত্রহীনতার বিস্তার আমাদের সেই বাস্তবতাকেই স্পষ্ট করে তুলে ধরে। একজন বন্ধুর কথাই মনে পড়ে: “যে দেশের মানুষের চরিত্র বলতে কিছু নাই, সে দেশে প্রকৃত উন্নতি কখনোই সম্ভব নয়। যারা নৈতিকতার শিক্ষা গ্রহণ করে না, ধর্মের কথা শুনে না, তারা নিয়ম-কানুন বা রাষ্ট্রের নির্দেশনাও মেনে চলবে কীভাবে?” এই কথাগুলো নিছক আবেগ নয়। এতে লুকিয়ে আছে এক নির্মম সত্য।তাই প্রশ্ন জাগে। আমরা কি সত্যিই প্রকৃত শিক্ষাকে হারিয়ে ফেলছি, নাকি শিক্ষার প্রকৃত অর্থটাই ভুলে গেছি? শিক্ষা কি শুধুই ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি এর মূলে রয়েছে মানবিকতা, নৈতিকতা ও আত্মচেতনার বিকাশ? যদি শিক্ষা আমাদের মানুষ হতে না শেখায়, তবে সেই শিক্ষার মূল্যই বা কোথায়?

পূর্ব বাংলার ইতিহাসে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন ছিল না কেবল কোনো ক্ষণিক ছাত্র অসন্তোষ কিংবা প্রশাসনিক নীতির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া। এটি ছিল শিক্ষাকে একটি জাতির আত্মপরিচয় ও মুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিষ্ঠার এক সুদূরপ্রসারী সংগ্রাম। এই আন্দোলনের অন্তর্গত শক্তি ছিল শিক্ষার অধিকার, গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ, ভাষা ও সংস্কৃতির স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে শিক্ষার ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয়। তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থায় শিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়নি। বরং তা হয়ে উঠেছিল মুক্তচিন্তা, বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা এবং জাতিসত্তার বিকাশের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভেতরে নিহিত ছিল গভীর চিন্তা, পাঠাগারের ভবিষ্যৎ, পাঠ্যসূচির দিকনির্দেশনা, শিক্ষকের মর্যাদা, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন এবং সামগ্রিক জ্ঞানচর্চার কাঠামো নিয়ে সুস্পষ্ট ও প্রজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা, গবেষণার স্বাধীনতা এবং মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চার অধিকার, এসবই ছিল আন্দোলনের মৌলিক দাবি। শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তুলেছিল: শিক্ষা কি শাসকগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটানোর একটি যন্ত্রে পরিণত হবে, নাকি তা হবে জনগণের মুক্তি, সচেতনতা ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার পথ? এই মৌলিক প্রশ্নই আন্দোলনকে গভীরতা দিয়েছে। তাকে নিছক রাজনৈতিক প্রতিবাদ থেকে উত্তীর্ণ করে একটি সুসংগঠিত বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামে রূপান্তরিত করেছে, যা আজও আমাদের ভাবনার জগতে অনুরণিত হয়।

অতীতে শিক্ষা ছিল চরিত্র গঠনের প্রক্রিয়া, বিবেক জাগরণের মাধ্যম। শিক্ষক ছিলেন পথপ্রদর্শক, বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সমাজের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেক। শিক্ষা মানে ছিল পড়া, ভাবা, প্রশ্ন করা এবং সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করা। শিক্ষা ছিল আন্দোলনের উদ্দেশ্য, আন্দোলন ছিল শিক্ষার জন্য। এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্কই ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনকে ইতিহাসে অনন্য করে তুলেছে। আজ স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতা সেই ইতিহাসের সঙ্গে দাঁড় করালে এক গভীর অস্বস্তি তৈরি হয়। শিক্ষা আজ অনেক ক্ষেত্রে পণ্য, সনদ আর প্রতিযোগিতার সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ। প্রশ্ন করার সংস্কৃতি দুর্বল, জ্ঞানচর্চা অনেক সময় মুখস্থ বিদ্যার কাছে পরাজিত। শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার যে গভীর সম্পর্ক একসময় স্বীকৃত ছিল, তা ক্রমেই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। অতীতের শিক্ষা আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা কখনোই কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার নাম নয়।  শিক্ষা হলো মানুষ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া, সমাজকে বদলে দেওয়ার প্রস্তুতি। সেই চেতনা পুনরুদ্ধার না করতে পারলে স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

 

আজকের বাংলাদেশে আমরা কি দেখছি? আমরা দেখছি শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে রাস্তা অবরোধ করছে, যান চলাচল বন্ধ করছে, নগরজীবন অচল করে দিচ্ছে। কখনো কোর্সের স্বীকৃতি নিয়ে, কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ ঘিরে, কখনো কোনো সহিংস ঘটনার বিচার দাবিতে, আবার কখনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে। দাবি আলাদা আলাদা হলেও প্রতিবাদের ভাষা একটাই, রাজপথ। ফলে পড়াশোনার প্রকৃত জায়গা হয়ে উঠছে ফাঁকা শ্রেণীকক্ষ, নীরব পাঠাগার আর স্থবির গবেষণাগার। আর শিক্ষার্থীর প্রধান পরিচয় ক্রমেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে “আন্দোলনকারী” পরিচয়ে। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, তারা কি সত্যিই শিক্ষার্থী, নাকি একটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অনিশ্চয়তা ও বিশ্বাসহীনতার ভেতরে জন্ম নেওয়া এক ধরনের ক্ষুব্ধ জনসমষ্টি, যারা শ্রেণি কক্ষের বদলে রাস্তায় নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে নিচ্ছে? এই পরিস্থিতি হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় রয়েছে সেশনজট, স্বচ্ছতার অভাব, দলীয়করণ, বেকারত্বের ভয় এবং ডিগ্রির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই জ্ঞানচর্চার বদলে টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যখন দেখে যে নিয়মিত পড়াশোনা করেও তাদের কণ্ঠস্বর শোনা যায় না, প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ন্যায্য দাবি আমলে নেয় না, তখন রাজপথই হয়ে ওঠে একমাত্র দৃশ্যমান মাধ্যম। কিন্তু এই রাজপথমুখী প্রবণতা শিক্ষার মৌলিক অর্থকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দেয়। আন্দোলন এখানে আর শিক্ষাকে রক্ষা করার জন্য নয়, বরং শিক্ষার শূন্যতার ভেতর জমে ওঠা ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই অবক্ষয়ের গভীরতম রূপটি পরিলক্ষিত হয় ইউনুস সরকারের সময়কালে। বিষয়টি ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। একজন নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বে কীভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে এমন দুর্বৃত্তায়নের পরিবেশ তৈরি হতে পারে? যে নেতৃত্বের কাছে নৈতিকতা, মানবিকতা ও প্রজ্ঞার দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রত্যাশা ছিল, সেখানেই যদি শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে তা কেবল একটি সময়ের ব্যর্থতা নয়, বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন তোলে।

অথচ অতীতের চিত্রটা ছিলো একেবারেই ভিন্ন। শিক্ষা এবং আন্দোলন ছিলো একে অপরের পরিপূরক। শিক্ষা এক সময় মানুষকে উন্নত চরিত্র গঠনের সহায়ক ছিলো। মানুষকে সংযমী করে তুলতো। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়ার সাহস যোগাতো। আন্দোলন ছিলো জ্ঞান, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত। সমাজ গঠনে, রাষ্ট্রের বিনির্মাণে শিক্ষার্থীরা ছিলো অগ্রভাগে। আজ সেই ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে। আন্দোলন রয়ে গেছে, কিন্তু তার সঙ্গে জ্ঞানচর্চা, পাঠাভ্যাস ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতির সম্পর্ক দিন দিন দুর্বল হয়ে গেছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় শিক্ষার উন্নয়নের জন্য এখন আর সত্যিকারের কোন আন্দোলন হয় না। নিজের ভাগ্যকে পরিবর্তনই এই সময়ের আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য। ফলে শিক্ষা তার রূপ হারাচ্ছে, আর শিক্ষার্থী পরিণত হচ্ছে এক অনিশ্চিত পরিচয়ের মানুষে। বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীরা তাই না পুরোপুরি ছাত্র, না পুরোপুরি নাগরিক আন্দোলনের সংগঠক। এই বাস্তবতা আমাদের বাধ্য করে নতুন করে ভাবতে: শিক্ষা কি কেবল দাবি আদায়ের হাতিয়ার হবে, নাকি আবারও তা হয়ে উঠবে মানুষ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের শিক্ষার ভবিষ্যৎ। আমরা যদি এখনই এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে না পাই, প্রায়োগিক সমাধান না দেখাতে পারি তা হলে জাতি হিসেবে আমাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা হবে ভয়ানক।

 

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, সমস্যা শুধু শিক্ষার্থীদের আচরণ বা আন্দোলন প্রবণতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমস্যাটি আরও জটিল এবং তা বাংলাদেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত শূন্যতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এই শিক্ষা ব্যবস্থা আজ কার্যত দিশাহীন। যেখানে পাঠ্যক্রম এখনো মুখস্থনির্ভর, পরীক্ষামুখী ও সৃজনশীল চিন্তা বিমুখ। যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতা ও প্রশাসনিক দূরত্বে পরিণত হয়ে প্রাণহীন। যেখানে গবেষণা, পাঠাগার, আলোচনা ও প্রশ্ন করার সংস্কৃতি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যে জ্ঞানচর্চার উন্মুক্ত পরিসর হওয়ার কথা ছিল, তা আজ অনেক সময় কেবল সনদ বিতরণের কারখানায় রূপ নিচ্ছে। যে শিক্ষা শিক্ষার্থীদের যুক্তিবাদী, বিশ্লেষণক্ষম, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিকে পরিণত করার কথা ছিল, সেই শিক্ষা তাদের দিতে পারছে না কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা। না জীবনের অর্থ বোঝার বৌদ্ধিক হাতিয়ার।  আর তাই শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভেতরে জমে ওঠা অসন্তোষ, ক্ষোভ ও হতাশার ভাষা খুঁজে পায় না শ্রেণীকক্ষে, পাঠ্যসূচি বা শিক্ষকের সঙ্গে সংলাপে। বরং সবচেয়ে সহজ, দ্রুত ও দৃশ্যমান মাধ্যম হিসেবে তারা রাস্তাকেই বেছে নেয়। রাজপথ তখন কেবল প্রতিবাদের জায়গা নয়, হয়ে ওঠে একটি ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থার নীরব স্বীকারোক্তি, যেখানে শিক্ষা আর মানুষ গড়ে তোলে না, বরং মানুষকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।

আজকের আন্দোলনগুলোর দিকে গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, সেগুলোর অধিকাংশই শিক্ষার দর্শন, জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা বা শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের মতো মৌলিক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে না। বরং সেগুলো সীমাবদ্ধ থাকছে প্রশাসনিক স্বীকৃতি আদায়, তাৎক্ষণিক সুবিধা নিশ্চিত করা কিংবা কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে দ্রুত সিদ্ধান্ত আদায়ের কৌশলে। কিন্তু এটি কোনো সুস্থ, পরিপক্ব ও ভবিষ্যতমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অবরোধ, বিশৃঙ্খলা ও জনজীবন অচল করে দেওয়ার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের পথে আটকে যাওয়া, কর্মজীবী মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া, এসব দৃশ্য আর সমাজকে নাড়িয়ে দেয় না। যেন এগুলো দৈনন্দিন জীবনের অনিবার্য অংশে পরিণত হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থী পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে বিশৃঙ্খলা, দায়িত্বহীনতা ও জবরদস্তির এক বিপজ্জনক সংস্কৃতি। অথচ শিক্ষা মানে তো ছিল শৃঙ্খলা, যুক্তি, সহনশীলতা, সংলাপ ও নৈতিক বোধের ধারাবাহিক চর্চা। সেই শিক্ষার গভীর অনুপস্থিতিই আজ এই বাস্তবতাকে জন্ম দিয়েছে। যেখানে আন্দোলন আছে, কিন্তু শিক্ষা নেই। কণ্ঠ আছে, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি হারিয়ে যাচ্ছে।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বলা কঠিন যে বাংলাদেশে শিক্ষা কেবল অবনতির পথে রয়েছে। সত্যটি আরও নির্মম। বাস্তব অর্থে এখানে আর একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা অবশিষ্ট নেই। আছে কিছু প্রতিষ্ঠান, আছে নির্দিষ্ট কিছু পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা ও সনদ। কিন্তু নেই এমন একটি সামগ্রিক, চিন্তাশীল ও ভবিষ্যতমুখী কাঠামো, যা মানুষকে জ্ঞান, বোধ ও দায়িত্বের দিকে নিয়ে যায়। শিক্ষা আজ আর সমাজ নির্মাণের প্রকল্প নয়, বরং একটি খণ্ডিত ও যান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে শিক্ষার্থী নিজেকে গড়ে তোলার সুযোগ পায় না। ফলে তারা পাঠ্যবই, শ্রেণীকক্ষ বা শিক্ষকের ভেতরে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায় না। নিজেদের দৃশ্যমান ও শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে তারা নেমে আসে রাজপথে। এটি শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। এটি একটি দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় অবহেলা, নীতিগত দৃষ্টিহীনতা ও সামাজিক দায়িত্বহীনতার সম্মিলিত ফল। একটি সামগ্রিক জাতীয় ব্যর্থতার প্রকাশ। যে দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে কার্যকর, সেখানে শিক্ষার্থী প্রথমে প্রশ্ন করতে শেখে, বিশ্লেষণ করতে শেখে, যুক্তি দিয়ে মত গঠন করতে শেখে, ভিন্নমত সহ্য করতে শেখে। সেই বৌদ্ধিক প্রস্তুতির পরই, প্রয়োজন হলে, শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদের পথে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে সেই স্বাভাবিক ও সুস্থ প্রক্রিয়াটি আজ সময়ের বিবর্তনে উল্টে গেছে। সমাজে বিরাজ করছে গভীর এক শূন্যতা। এই শূন্যতা পূরণ না হলে শিক্ষার্থীরা কখনোই রাজপথ ছেড়ে শ্রেণীকক্ষে ফিরবে না। কারণ শ্রেণীকক্ষ নিজেই আজ তাদের দেওয়ার মতো সব কিছু হারিয়ে ফেলেছে। আর যতদিন শিক্ষা কেবল সনদ, সুবিধা আর দাবি আদায়ের গণ্ডিতে বন্দি থাকবে, ততদিন স্বাধীন দেশের এই ভাঙা কাঠামো থেকে সত্যিকারের শিক্ষা, বিবেকবান নাগরিক কিংবা ভবিষ্যৎ নির্মাতার জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়ে যাবে ক্ষীণ ও অনিশ্চিত।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি গিয়ে ঠেকে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যে নিয়ে। আমরা শিক্ষা দিয়ে কি তৈরি করতে চাই? দক্ষ কর্মী, সনদধারী ভিড়, নাকি চিন্তাশীল, দায়িত্বশীল ও নৈতিক মানুষ? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রকৃত শিক্ষা কখনোই কেবল দাবি আদায় বা সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার ছিল না। শিক্ষা ছিল চরিত্র গঠনের প্রক্রিয়া, বিবেক জাগরণের অনুশীলন। যেখানে শিক্ষা কার্যকর, সেখানে শিক্ষার্থী আগে মানুষ হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীরা শিখে যুক্তি, শৃঙ্খলা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধ; তারপরই সে প্রতিবাদ করে, প্রয়োজন হলে দৃঢ়ভাবে কিন্তু নৈতিক সীমার ভেতরে। শিক্ষার শেষ লক্ষ্য জ্ঞান নয়, ক্ষমতাও নয়। শিক্ষার শেষ লক্ষ্য চরিত্র। আর যে শিক্ষা চরিত্র গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তা একটি জাতিকে কেবল অস্থিরই করে তোলে, আলোকিত করতে পারে না।

Leave your review