পিতা-মাতা কি কুম্ভকর্ণের ঘুমে আচ্ছন্ন

একদিন এক বন্ধু শ্বাস আটকে আসা বিস্ময়ে বলছিলো ঘটনাটা। কলেজ পড়ুয়া এক মেয়ে। মুখে এখনও কাঁচা লাজ, চোখে অঙ্কের সূত্রের ভ্রূকুটি। সে নাকি প্রেম করছে টানা পাঁচ বছর ধরে! অর্থাৎ প্রেম শুরু করার সময় তেরো বছরের কিশোরী। যখন খাতা-কলমই হওয়ার কথা সবচেয়ে কাছের সাথী, তখনই সে পা বাড়িয়েছে সম্পর্কের ঘূর্ণিঝড়ে। আমি হতভম্ব। এও কি সম্ভব। স্কুল পড়ুয়া বয়েসে কেমন করে এমন প্রাপ্তবয়স্ক কাহিনী বোনা সম্ভব? অথচ তার প্রেম ছিল নিরেট, আসল, দমবন্ধ করা সত্যি। কিন্তু হঠাৎ একদিন, এক তুচ্ছ ঝগড়ার পরে, ছেলেটির আঙুলের চাপ পড়ল মোবাইলের ব্লক বাটনে। সেই ক্ষণেই যেন ভেঙে গেল মেয়েটির ভুবন। শব্দহীন ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠল তার মন। পরের দিন বোর্ড পরীক্ষা। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই, অথচ তার মস্তিষ্কে তখন একটাই করুণ প্রতিধ্বনি:“আমাকে ব্লক করে দিলো।” অঙ্কের সূত্র মিলিয়ে গেল অন্ধকারে, ইংরেজি রচনার বাক্যগুলো উবে গেল শূন্যে, জীব-বিজ্ঞানের ডায়াগ্রাম ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেল চোখের জল ভেজা পাতায়। তার মাথার ভেতরে তখন শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে হাজারো মৌমাছির মতো পাগলাটে, আজব ভাবনা। এক একটি হুলে গেঁথে যাচ্ছে বুকের গভীরে।

এ যেন শুধু এক মেয়ের গল্প নয়। এক পুরো প্রজন্মের নগ্ন প্রতিচ্ছবি। যেখানে পরীক্ষার হল ভরে ওঠার কথা কাগজের খসখসে ঘর্ষণে। কলমের ছুটে চলা অক্ষরে। সেখানে ভিজে যাচ্ছে খাতা অশ্রুজলে, প্রেম ভাঙার দগদগে ক্ষতে। গণিতের সমীকরণে ঘাম ঝরার কথা, অথচ চোখ ভিজছে ভার্চুয়াল ব্লকের নির্মম শোকে। পড়াশোনার অঙ্গনে মনোযোগ দেওয়ার কথা জ্ঞানের আলোয়, অথচ সে মন আটকে আছে কারো টাইমলাইনে, কারো নীল বিন্দুর টুকরো নোটিফিকেশনে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দায় কি শুধু তরুণদের? না, আসল দোষ লুকিয়ে আছে আরও গভীরে। অচেতন এক পরিবারে, উদাসীন সমাজে, আর পিতা-মাতাদের গভীর নিদ্রায়। যেখানে কথোপকথন নেই, শোনার সময় নেই, ভালোবাসার নিরাপদ আশ্রয় নেই। সেখানেই তরুণ মন হাহাকার করে ছুটে যায় অকাল-প্রাপ্ত-বয়স্ক প্রেমের দিকে।

কি হচ্ছে চারিদিকে? অদ্ভুত কিছু কথা শুনলাম আরেক অধ্যাপক বন্ধুর মুখে। সে বাংলাদেশেই এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। তার মতে বাংলাদেশের পরিবারগুলোতে আজকাল এক অদ্ভুত নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। দৃশ্যটা এমন। ঘরের এক কোণে মা বাজারের ব্যাগ থেকে নতুন শাড়ি বের করছেন আর সঙ্গে ফেসবুক লাইভে বলছেন, “এই শাড়িটা মাত্র এক হাজার টাকায় নিলাম, দারুণ সেল ছিল।” বাবা ব্যস্ত ইউটিউবে গতকালের ম্যাচের হাইলাইটস দেখতে। আর পাশের ঘরে ছেলে বা মেয়ে মুখ গুঁজে বসে আছে ফোনে। বই খোলা আছে বটে, কিন্তু তার ভেতরে লুকানো মোবাইল থেকে ভেসে আসছে টিকটকের গানের শব্দ। বাবা-মা ভাবছেন, “দেখো দেখো, আমাদের ছেলে মেয়ে কত মনোযোগ দিয়ে পড়ছে।” আসলে সন্তান তখন অ্যালজেব্রার সূত্র নয়, শিখছে নতুন নাচের স্টেপ বা মগ্ন কোন হ্যাংকি প্যাংকি নাক ছিদ্র বন্ধুর আবোল তাবোল গল্পে। । 

আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,“একি তবে শুধু শহরের খণ্ড চিত্র?” তিনি হেসে উঠলেন,—“না স্যার! এ তো সারা বাংলাদেশের মহা খণ্ড চিত্র। গ্রামে-গঞ্জে, পাড়া-মহল্লায়, খালের ধারে,বিলের পারে, পুকুর ঘাটে, স্কুল মাঠে, গাছের তলায় সব খানে। যেখানেই জায়গা খানিক ফাঁকা, অমনি মানুষের জম জমাট প্রদর্শনী। মনে হয় গোটা বাংলাদেশটাই এক বিশাল মিটিং-মাঠ। তারপর তিনি তর তর করে কিছু অভিজ্ঞতার কথা বললেন।
একদিন মা রান্নাঘর থেকে ডাক দিলেন,
—বাবা, পড়াশোনা করছিস তো?
ছেলে উত্তর দিল,
—হ্যাঁ মা, এখনই ম্যাথসের প্রবলেমটা সলভ করলাম। ক্লাসে টিচার ঠিকমতো বুঝিয়ে দেন না। তাই এতো দেরী হলো।
আসলে তখন সে “স্টাডি ভাইবস” লিখে বইয়ের উপর কলম রেখে ছবি তুলছিল, ইনস্টাগ্রামে দেবার জন্য। নিজের কয়েকটি সেলফি নিয়ে এডিটিং করছিলো।
মা আবার বললেন,
—মোবাইল নিয়ে খেলা করবি না, পড়াশোনায় মন দাও।
ছেলে হেসে বলল,
—হ্যাঁ মা, আমি তো অনলাইন ক্লাস দেখছি।
মা নির্ভার হয়ে গেলেন। কিন্তু জানলেন না, অনলাইন ক্লাসের ছদ্মবেশে ছেলে আসলে দেখছে ফেইসবুকে আজে বাজে রিলস। এমনকি প্রেমের কথাবার্তাও এখন চলে সেই ফোনের ভেতর। মা একদিন হঠাৎ লক্ষ্য করলেন তার স্কুল পড়ুয়া শান্ত শিষ্ট মেয়েটি যে কোনদিন সন্ধ্যা প্রদীপ দিতে ভুল করেনি, খাটের এক কোণে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
—কি হলো মা, কাঁদছিস কেন?
মেয়ে বলল,—মা, ও আমাকে আন ফলো করে দিয়েছে…
মা হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,—আনফলো মানে কি?
-ও বলছে আমার সাথে আর সম্পর্ক রাখবে না। আমাকে ব্লক করে দিছে। আমাকে আর মেসেজ দিচ্ছে না।
মা চোখ কপালে তুলে বললেন,—তোর বয়স তো মাত্র ১২! এই বয়সে আবার প্রেম?
মেয়ে উত্তর দিল,—মা, তুমি বোঝো না, লাইক-কমেন্ট ছাড়া তো এখনকার দুনিয়ায় কেউ বাঁচে না। স্কুলে বন্ধুরা বলবে তুই একটা গেয়ো। তুকে দিয়া কিচ্ছু হবে না।
মা আর কিছু বলতে পারলো না। বলবেই বা কি? মাওতো সারাক্ষণ ফেইসবুক নিয়া ব্যস্ত।
এমন নাটক প্রতিদিন ঘটছে হাজারো ঘরে। সন্তানরা লুকিয়ে প্রেম করছে, ব্রেকআপ করছে, কান্নাকাটি করছে, আবার নতুন পোস্ট দিয়ে নতুন প্রেমও খুঁজে নিচ্ছে। আর বাবা-মা? তাঁরা ভাবছেন, সন্তান শান্ত।। ঘরে বসে আছে, বাইরে যায় না, খারাপ কোন সঙ্গ নেই। তাই চিন্তার কিছু নেই। তাঁরা জানেন না, সন্তানের মাথার ভেতরে এখন আর পাঠ্য বই নেই, আছে ভার্চুয়াল পৃথিবীর ঝড়।

আমার শিক্ষক বন্ধু যেন থামার নামই নিচ্ছে না। প্রবল উৎসাহে একের পর এক ঘটনা বলে চলেছে। আর যেহেতু সে বুঝেই গেছে যে এই বিষয়ে আমার জ্ঞান একেবারেই সীমিত, তাই তার শিক্ষামূলক সংলাপগুলো আমার ওপর উজাড় করে দেওয়ার এই সুবর্ণ সুযোগ সে মোটেও হাতছাড়া করতে রাজি নয়।
শুনুন স্যার, আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন এক ব্যবসায়ী। লেখাপড়া খুব বেশি না হলেও, টাকার জোরে তার আত্মবিশ্বাস যেন উপচে পড়ে। তার স্ত্রীও কম যান না—চালচলনে বেশ স্মার্ট, গায়ের রং উজ্জ্বল হলেও ভেতরের স্বভাবটা ঠিক ততটা নয়। তাদের একমাত্র একটি ছেলে।
একদিন বাবা বিরক্ত হয়ে ছেলেকে বললেন,“বই ধরবি না? সারাদিন ফোনে কি করিস?”
ছেলে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
—“বাবা, আমি তো ই-বুক পড়ছি!”
আসলে সে তখন মগ্ন হয়ে গেম খেলছিল। কথাটা শুনে বাবা একটু গর্বের হাসি হাসলেন, তারপর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“দেখছো? আমাদের ছেলেটা কত আধুনিক! কাগজের বই বাদ দিয়ে ই-বুক পড়ে!”
মা মুচকি হেসে সায় দিলেন। চোখেমুখে তৃপ্তির ছাপ—মনে মনে ভাবলেন, সত্যিই তো, তারা ছেলেকে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে বেশ আধুনিক ভাবেই গড়ে তুলছেন।

এবার আরেকটা ঘটনা শোনান স্যার। আমাদেরই বিল্ডিংয়ের।একদিন গভীর রাতে, নিচতলার এক বাসায় মা হঠাৎ খেয়াল করলেন, মেয়েটা এখনো জেগে আছে। ফোনের আলোয় মুখটা ঝলমল করছে। মা একটু বিরক্ত হয়েই জিজ্ঞেস করলেন,
—“এত রাত পর্যন্ত ফোনে কি করছিস?”
মেয়ে বিন্দুমাত্র দেরি না করে শান্ত গলায় বলল,—“প্রজেক্টের কাজ করছি, মা।”
আসলে সে তখন মগ্ন হয়ে প্রেমিকের সাথে চ্যাটে।
পাশ থেকে বাবা কথাটা শুনে হালকা গম্ভীর ভঙ্গিতে বললেন,
—“ওকে পড়তে দাও। আজকালকার ছেলে-মেয়েরা তো রাত জেগেই বেশি মনোযোগ দিয়ে কাজ করে।”
মা আর কিছু বললেন না। মুখে নরম হাসি এনে চুপ করে গেলেন। মনে মনে যেন মেয়ের ‘পরিশ্রমে’ খুশিই হলেন।
কিন্তু পরের দিন বাস্তবতা ধরা দিল একেবারে নির্মমভাবে। পরীক্ষার হলে সেই মেয়েটা অর্ধেক প্রশ্নই ফাঁকা রেখে বেরিয়ে এলো। রাত জাগার ফলটা তখন স্পষ্ট হয়ে গেল।

আমি অবাক হয়ে বন্ধুর কথাগুলো শুনছিলাম আর অবাক হচ্ছিলাম।
আমরা কি কখনো ভেবেছি যে, এই আধুনিকতার আড়ালেই লুকিয়ে আছে বড় বিপদ। শিশুরা আজকাল বই পড়ার চাইতে বেশি মনোযোগ দেয় ছবিতে কতো লাইক পড়ল তা গোনায়। মেয়েরা ছবিতে `কিউট` কমেন্টের অপেক্ষায় থাকে, ছেলেরা ভিডিও বানিয়ে `শেয়ার` বাড়াতে চায়। না পেলে মন খারাপ, আত্মসম্মান কমে যায়, কেউ কেউ বিষণ্ণতায় ডুবে যায়। অথচ মা-বাবারা তা টেরই পান না। তাঁরা খুশি থাকেন এই ভেবে যে সন্তান ঘরে আছে, বাইরে খারাপ সঙ্গ নেই। তাঁরা জানেন না, খারাপ সঙ্গ এখন ঘরের ভেতরেই ঢুকে পড়েছে—সোশ্যাল মিডিয়ার অদৃশ্য জগত।

এই দৃশ্যগুলো আসলে এক একটি ট্র্যাজেডি। সন্তানরা বইয়ের পাতায় মনোযোগ হারাচ্ছে, অথচ তাদের মা-বাবা নিজেদের দুনিয়ায় ব্যস্ত। মা অনলাইনে সেল, বাবা মোবাইলে ম্যাচ। তাঁরা বিশ্বাস করেন, সন্তান ঘরে থাকলেই নিরাপদ। কিন্তু এই ঘরই যে এখন তাদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা। কারণ ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই সন্তান ধীরে ধীরে ভার্চুয়াল দুনিয়ার ক্রীতদাস হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, পিতা-মাতারা, আর কতদিন কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে থাকবেন? সন্তানদের চোখের সামনে তাদের মনন, পড়াশোনা, আবেগ, সবকিছু বদলে যাচ্ছে। তারা প্রেম করছে, পড়াশোনা বাদ দিচ্ছে, লাইক-শেয়ারের দৌড়ে আত্মসম্মান হারাচ্ছে। আর আপনারা ভাবছেন, সন্তান শান্ত, সন্তান ঘরে আছে, সন্তান নিরাপদ। সময় এসেছে চোখ খোলার। নয়তো একদিন সন্তান নিজেরাই বলবে, “আমরা হারিয়ে গেছি তোমাদের চোখের সামনেই, অথচ তোমরা তখনও ঘুমিয়ে ছিলে।”

বাংলাদেশের পরিবারগুলোতে এক আশ্চর্য নীরব বিপ্লব চলছে। একসময় বাচ্চারা স্কুলে যাওয়ার পথে হাতে থাকত টিফিন বক্স আর ব্যাগ ভর্তি বই। আজকাল তাদের হাতে থাকে ঝকমকে স্মার্ট ফোন, আর মুখে থাকে সেই বিখ্যাত কথা: “আম্মু, পাঁচ মিনিট প্লিজ!” এই পাঁচ মিনিটই ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যায়। মা তখন খুশি, বাচ্চা অন্তত ঘরে আছে। বাইরে বখাটেদের সাথে মেশে না। বাবা স্বস্তি পান, সন্তান অন্তত চায়ের দোকানে আড্ডা দেয় না। অথচ এই ঘরের ভেতরেই সন্তানের জীবন গোপনে বদলে যাচ্ছে, আর বাবা-মা সেই কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে চলেছেন। আজকের কিশোররা বইয়ের পাতায় অঙ্ক কষে না, বরং কষে লাইক-শেয়ারের হিসাব। বাংলা রচনা লেখার চেয়ে তারা ক্যাপশন লিখতে বেশি উৎসাহী। ক্লাসের নোট খুলে পড়ার বদলে টিকটকের নাচের স্টেপ মুখস্থ করা এখন তাদের প্রধান দায়িত্ব। পরীক্ষার হলে যোগ-বিয়োগ ভুল হয়ে গেলেও, কতো লাইক এলো সেটা গুনতে তারা এক সেকেন্ডও ভুল করে না। অথচ বাবা-মার গর্ব: “আমাদের ছেলেমেয়ে তো প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে গেছে!”

আর প্রেমের গল্প? আগে প্রেম করতে হলে অন্তত চিঠি লিখতে হতো। ডাকবিভাগের ভরসা করতে হতো, কিংবা বন্ধুর হাতে খাম গুঁজে দিতে হতো। এখন প্রেম আসে ভাইরাল দৃশ্যে, শব্দে আর ইমোজি হার্টে। দশ-বারো বছরের বাচ্চারা ঘোষণা দেয়: “আমার ব্রেকআপ হইছে।” মা আঁতকে ওঠেন, বাবা মাথা চুলকান। কিন্তু মা কি জানতেন না যে তিনি সারাদিন ফেসবুক মার্কেট প্লেসে শাড়ি খুঁজছিলেন আর বাবা ইউটিউবে ক্রিকেট হাইলাইটসে হারিয়ে ছিলেন? সন্তানের যে চোখের সামনে অন্য এক দুনিয়া তৈরি হচ্ছে, সেটা কেউ দেখল না। শিশুরা এখন সোশ্যাল মিডিয়ার ‘ইনফ্লুয়েন্সার’। পড়ার টেবিলে বসে সলজ্জ ভঙ্গিতে বইয়ের ছবি তুলে ক্যাপশন দেয়, “স্টাডি ভাইবস”। যেখানে সত্যিকার পড়াশোনার চেয়ে ফিল্টার বেশি থাকে। বইয়ের ভেতরে কখনো চার্জার, কখনো ফোন লুকানো থাকে, যেন বইটা শুধু এক ধরনের ডেকোরেশন পিস। বাবা-মা আবার আত্মতুষ্টি পান, “দেখো, আমাদের ছেলে-মেয়ে কতক্ষণ বইয়ের টেবিলে বসে থাকে!” তাঁরা জানেন না বইয়ের ছায়ায় সন্তান আসলে টিকটক ট্রেন্ড শিখছে।

আজকের এই নীরব বিপ্লব আসলে এক গভীর ট্র্যাজেডি। সন্তানরা বইয়ের পাতায় নয়, স্ক্রিনের আলোয় বড় হচ্ছে। ভালোবাসা খুঁজছে লাইক-কমেন্টের ভেতর।  অথচ আমাদের পিতা-মাতাদের কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙেনি। তাঁরা মনে করেন, সন্তান ঘরে আছে মানেই নিরাপদ। তাঁরা জানেন না, নিরাপত্তা শুধু চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সন্তানের মনে, তার চিন্তায়। সন্তান হয়তো ঘরেই আছে, কিন্তু তার মন উড়ে যাচ্ছে ভার্চুয়াল জগতে, যেখানে মা-বাবার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সেখানে সন্তানের শিক্ষক হচ্ছে ফলোয়ার, পরীক্ষক হচ্ছে লাইক সংখ্যা, আর পুরস্কার হচ্ছে একগুচ্ছ কমেন্ট, “সুন্দর লাগছে”, “কিউট”, “লাভ ইউ।” বাবা-মায়েরা যদি এখনই না জাগেন, তবে একদিন হয়তো সন্তানরাই বলবে, “আমরা তো ছোটবেলায় বলেছিলাম, আমাদের দিকে তাকাও। তখন তোমরাই ঘুমাচ্ছিলে। এখন আমাদের কেন জাগাতে চাইছ?” তাহলে প্রশ্ন একটাই। পিতা-মাতারা, কুম্ভকর্ণের মতো আর কতদিন ঘুমাইবেন? সন্তানদের ভবিষ্যৎ কি লাইক-শেয়ারের মধ্যে হারিয়ে যাবে, আর আপনারা ফেসবুকে ‘আত্মীয়ের বিয়ে’তে ব্যস্ত থাকবেন? সময় এসেছে জেগে ওঠার। মোবাইলের নীল আলো থেকে চোখ সরিয়ে সন্তানের চোখের ভেতর আলো খোঁজার। নয়তো, খুব শিগগিরই হয়তো আপনার সন্তান আপনাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাবে না, বরং পাঠাবে এক দীর্ঘশ্বাসের নোটিস, “ আমরা হারিয়ে গিয়েছিলাম তোমাদের চোখের সামনেই, অথচ তোমরা তখনও ঘুমিয়ে ছিলে।”

Leave your review