
বিশ্ব রাজনীতির অস্থির মানচিত্রে আবারও ঘনীভূত হয়েছে গভীর উদ্বেগের ছায়া। এই নতুন উত্তেজনার কেন্দ্রে এবারো রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার ঘটনায় মুহূর্তেই পরিস্থিতি টালমাটাল হয়ে ওঠে। দ্রুতই শুরু হয় ইরানের পাল্টা হামলা, আর তাতে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক চিত্র আমূল বদলে যায়। ইরানে এই ভয়াবহ আক্রমণ এবং সর্বোচ্চ নেতার এমন পরিণতি কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়। এটি প্রায় সাঁইত্রিশ বছরের দীর্ঘ এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসানও বটে। এই সময়কালে একটি রাষ্ট্রের নীতি, ক্ষমতার বিন্যাস, আঞ্চলিক কৌশল এবং বৈশ্বিক অবস্থান একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতৃত্বের অধীনে গঠিত ও পরিচালিত হয়েছে। ফলে এমন একটি সমাপ্তি মানে শুধু সময়ের পরিবর্তন নয়। এটি হতে পারে আদর্শ, প্রভাব এবং ক্ষমতার ধারাবাহিকতার এক মৌলিক রূপান্তর। একটি দীর্ঘ নেতৃত্বকাল রাষ্ট্রের ভেতরে স্থিতি যেমন তৈরি করে, তেমনি কাঠামোগত নির্ভরশীলতাও সৃষ্টি করে। তাই সেই অধ্যায়ের শেষ হওয়া মানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হওয়া, একই সঙ্গে অনিশ্চয়তারও সূচনা। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্বের অবসান প্রায়শই নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য, নতুন কণ্ঠস্বর এবং নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। তবে সাম্প্রতিক বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয়, খামেনির মৃত্যু এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে, যার গভীরতা ও বিস্তার যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল কিংবা পশ্চিমা বিশ্ব হয়তো কল্পনাও করতে পারেনি। তারা হয়তো উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে যে ইরান কোনো সিরিয়া বা ভেনেজুয়েলা নয়। তার ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত বহন করে।
এই সম্ভাব্য ঘটনার তাৎপর্য বোঝার জন্য আমাদের একটু ফিরে তাকাতে হয় ১৯৭৯ সালের ইরানের বিপ্লব-এর দিকে। একটি বিপ্লব, যা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির গতিপথ সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছিলো। সেই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পতন ঘটে শাহ মুহম্মদ রাজা পাহলভির রাজতান্ত্রিক শাসনের এবং প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র। বিপ্লবের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক নেতা ছিলেন রুহোল্লাহ খোমেনি যিনি “ভেলায়েত-ই-ফকিহ” ধারণার ভিত্তিতে ধর্মীয় নেতৃত্বকে রাষ্ট্র ক্ষমতার কেন্দ্রে স্থাপন করেন। এর অর্থ হল “ধর্মীয় আইন বিশারদের শাসনাধিকার”। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একজন যোগ্য ইসলামি আইনজ্ঞ (ফকিহ) রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বহন করবেন। এই নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতা বা “সুপ্রিম লিডার” পদটি হয়ে ওঠে সর্বাধিক ক্ষমতাধর অবস্থান। যার অধীনে সামরিক বাহিনী, বিচার ব্যবস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচার মাধ্যম এবং কৌশলগত নীতি নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো পরিচালিত হয়। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তিনি ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে রুহোল্লাহ খোমেনি -এর মৃত্যুর পর ক্ষমতার রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে খামেনিইকে বিশেষজ্ঞ পরিষদের মাধ্যমে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। সেই থেকে তিনি ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোর শীর্ষে অবস্থান করছেন, এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ নীতি, আঞ্চলিক কৌশল ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা পালন করে আসছেন।
অতএব, তাঁর মৃত্যু কেবল একজন ব্যক্তির জীবনাবসানের প্রশ্ন নয়। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতা-ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার ভবিষ্যৎকে ঘিরে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত। কয়েক দশক ধরে ইরানের রাষ্ট্র কাঠামো এমনভাবে বিন্যস্ত হয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ নেতার পদ শুধু আনুষ্ঠানিক বা প্রতীকী নয়। বরং সামরিক নীতি, বিচারব্যবস্থা, কৌশলগত নিরাপত্তা, এমনকি আঞ্চলিক মিত্রতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রেও নির্ধারক প্রভাব রাখে। ফলে এই পদে কোনো পরিবর্তন মানে কেবল নেতৃত্বের রদবদল নয়। এটি হতে পারে নীতির পুনর্বিন্যাস, অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণের পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ দিক নির্দেশনার পুনঃ সংজ্ঞা। ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোতে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান ও অনির্বাচিত ধর্মীয় কর্তৃত্ব, এই দুইয়ের একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রয়েছে। সেই ভারসাম্যের কেন্দ্রে অবস্থান করেন সর্বোচ্চ নেতা। তাঁর অনুপস্থিতি নতুন নেতৃত্বের উত্থান, অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের পুনরুত্থান, কিংবা নীতিগত রূপান্তরের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাব-নিকাশেও পরিবর্তন আনতে পারে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নিরাপত্তা জোট ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে। তাই এই পরিস্থিতিকে আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়ার আলোকে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা সম্ভব নয়। প্রয়োজন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের গভীর অনুধাবন।
খামেনির মৃত্যুতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এর অভিঘাত কেবল একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং তা ছড়িয়ে পড়তে পারে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির বিস্তৃত পরিসরে। এর পরিণতি আমরা ইতিমধ্যেই প্রত্যক্ষ করছি। মধ্যপ্রাচ্যে যেখানেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি অবস্থিত, সেখানেই ইরানের পাল্টা আঘাত নেমে আসছে। তেলের বাজারে অস্থিরতা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তা জোটগুলোর পুনর্বিন্যাস, সবকিছুই এক নতুন সমীকরণের মুখোমুখি হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য এমনিতেই ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্র। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, উত্তেজনা ও সংঘাতের আগুন কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হয়েছিল একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে। কিন্তু পরিণত হয়েছিল লক্ষ লক্ষ প্রাণহানির এক বিশ্বব্যাপী বিপর্যয়ে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ আরও ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনে। শহর ধ্বংস হয়, হলোকাস্টের মতো মানবিক ট্র্যাজেডি ঘটে, এবং পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ মানবসভ্যতার বিবেককে চিরতরে কাঁপিয়ে দেয়। একইভাবে, ইরাকের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রের ভাঙন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদের বিস্তার তার ফলাফল হয়ে দাঁড়ায়। লিবিয়ার গৃহ যুদ্ধের পর লিবিয়ায় কেন্দ্রীয় শাসনের পতন দেশটিকে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। আর চলমান রাশিয়া-ইউক্রেইনের সংকট আমাদের চোখের সামনে দেখিয়ে দিচ্ছে, আধুনিক বিশ্বেও যুদ্ধ মানে ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর, উদ্বাস্তু মানুষের স্রোত, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট, এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা। এই প্রতিটি উদাহরণ আমাদের একটি কঠিন সত্যের সামনে দাঁড় করায়: যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু তার পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। সংঘাত একবার ছড়িয়ে পড়লে তা কেবল সীমান্তে থেমে থাকে না। তা মানুষের মন, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যতের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। সুতরাং যত বিশ্লেষণই করা হোক না কেন, একটি মৌলিক সত্য অটুট থাকে “যুদ্ধ কখনোই মানবতার বিজয় নয়”। যুদ্ধের পর বিজয়ীর পতাকা উড়তে পারে, কিন্তু মানবতার আকাশে তখনও ধোঁয়া আর শোকের মেঘ ভেসে বেড়ায়। বিজয় যদি মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে না পারে, তবে তা কেবল শক্তির প্রদর্শন, মানবিক অগ্রগতি নয়।
যুদ্ধকে অনেক সময় রাজনৈতিক সাফল্য বা কৌশলগত অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। মানচিত্রের সীমানা বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, সামরিক শক্তির প্রদর্শন হয় এবং সংবাদ শিরোনামে “বিজয়” শব্দটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কিন্তু এই তথাকথিত বিজয়ের অন্তরালে থাকে অগণিত অদৃশ্য পরাজয়। একজন মায়ের অশ্রু, একটি শিশুর ভাঙা স্বপ্ন, একটি পরিবারের ছিন্নমূল হয়ে যাওয়া জীবন। বিজয়ের পরিসংখ্যান থাকে, কিন্তু ক্ষতির গভীরতা মাপার কোনো নির্ভুল পরিমাপ নেই।
ইতিহাসের পাতা খুললেই আমরা দেখি, প্রতিটি যুদ্ধের পর বিজয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষই মানবিক ক্ষত বহন করেছে। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর ইউরোপের মানচিত্র বদলে গেলেও, এক প্রজন্মের তরুণ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শেষে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছিল, কিন্তু কোটি কোটি প্রাণহানি, গণহত্যা ও পারমাণবিক ধ্বংস মানবসভ্যতার বিবেককে চিরতরে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। যুদ্ধের শেষ দিনে যে পতাকা উড়ে, তার ছায়ায় থাকে অনাথ শিশু, ভাঙা শহর, এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষত। যুদ্ধ মানে কেবল সামরিক সংঘর্ষ নয়। এটি এক বহুমাত্রিক মানবিক বিপর্যয়। হাসপাতালগুলো আহতদের চাপে নত হয়ে পড়ে, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট দেখা দেয়। শিক্ষা ব্যবস্থা থমকে যায়। স্কুল ভবন পরিণত হয় আশ্রয় কেন্দ্রে কিংবা ধ্বংসস্তূপে। অর্থনীতি ধসে পড়ে। মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও খাদ্য সংকট মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। অবকাঠামো ধ্বংস হলে পুনর্গঠনে লাগে দশক, কিন্তু সেই দশকে একটি পুরো প্রজন্ম পিছিয়ে পড়ে। যুদ্ধ সামাজিক কাঠামোকেও ভেঙে দেয়। অবিশ্বাস ও ঘৃণা সমাজের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন তৈরি করে। যারা সিদ্ধান্ত নেয়, তারা প্রায়শই ক্ষমতার নিরাপদ প্রাচীরের আড়ালে থাকে। কিন্তু যারা সেই সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করে, তারা সাধারণ মানুষ, যাদের কোনো মতামত শোনা হয়নি, কোনো কণ্ঠস্বর গণনা করা হয়নি। রাষ্ট্রের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে একজন নাগরিকের স্বপ্ন বা নিরাপত্তা প্রায়ই অদৃশ্য হয়ে যায়।
রাজনীতি, মতাদর্শ কিংবা সীমান্ত, এসব মানুষের নির্মিত কাঠামো। কিন্তু জীবন, মর্যাদা ও নিরাপত্তা, এসব মানবতার মৌলিক অধিকার। যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন প্রথমেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই অধিকারগুলো। প্রতিশোধের আগুন হয়তো সাময়িক তৃপ্তি দিতে পারে, কিন্তু তা কখনোই টেকসই শান্তি গড়ে তোলে না। বরং প্রতিটি সংঘর্ষ নতুন সংঘর্ষের বীজ বপন করে। প্রতিটি রক্তপাত ভবিষ্যতের প্রতিশোধের গল্প রচনা করে। আমরা দেখেছি কীভাবে আঞ্চলিক সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতায় রূপ নিয়েছে ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া কিংবা আফগানিস্তান। রাষ্ট্র কাঠামোর ভাঙন, ক্ষমতার শূন্যতা, কিংবা বৈশ্বিক খাদ্য ও জ্বালানি সংকট, সবই প্রমাণ করে যে যুদ্ধের অভিঘাত সীমান্ত অতিক্রম করে। আধুনিক বিশ্বে কোনো যুদ্ধই এককভাবে “স্থানীয়” থাকে না। তা অর্থনীতি, কূটনীতি ও মানবিক বাস্তবতাকে বৈশ্বিক পরিসরে নাড়া দেয়। এই মুহূর্তে বিশ্ব যে অনিশ্চয়তার দিকে তাকিয়ে আছে, তা আমাদের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আমরা কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেব, নাকি একই ভুল বারবার পুনরাবৃত্তি করব? গত শতাব্দীর দুই বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। আঞ্চলিক সংঘাত, গৃহযুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, এসবের মূলেও আছে ক্ষমতার লড়াই, অবিশ্বাস এবং সংলাপের অভাবের দীর্ঘ ইতিহাস। সুতরাং যুদ্ধকে যদি “বিজয়” বলা হয়, তবে সেই বিজয় অসম্পূর্ণ। কারণ সত্যিকারের বিজয় হলো মানবিক মর্যাদা রক্ষা, জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থিতিশীল পৃথিবী গড়ে তোলা। শক্তির প্রদর্শন সাময়িক আধিপত্য দিতে পারে, কিন্তু শান্তি ও সহমর্মিতাই দীর্ঘস্থায়ী অগ্রগতির ভিত্তি। এমন সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সংযম। আমাদের দরকার এমন নেতৃত্ব, যা সামরিক শক্তির প্রদর্শনের চেয়ে মানুষের জীবন, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দেয়। এমন নেতৃত্ব, যা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে বেশি মূল্য দেয়। প্রতিটি মিসাইলের পরিবর্তে একটি আলোচনা, প্রতিটি হুমকির পরিবর্তে একটি সংলাপ, প্রতিটি প্রতিশোধের বদলে একটি সমঝোতার চেষ্টা। এই পথই হতে পারে টেকসই সমাধানের ভিত্তি।
শান্তি কোনো দুর্বলতার চিহ্ন নয়। বরং তা মানবসভ্যতার সবচেয়ে উচ্চতম নৈতিক সাহসের প্রকাশ। অস্ত্র ধরতে আবেগ যথেষ্ট, কিন্তু অস্ত্র নামাতে প্রয়োজন প্রজ্ঞা। শান্তি প্রতিষ্ঠা সহজ নয়। এতে লাগে ধৈর্য, সংযম, সংলাপের প্রতি আস্থা। সবচেয়ে বড় কথা ক্ষমা করার মানসিকতা। তবু ইতিহাসের প্রতিটি অন্ধকার অধ্যায় আমাদের শিখিয়েছে, যুদ্ধের দ্রুত উত্তেজনার চেয়ে শান্তির ধীর পথই শেষ পর্যন্ত অধিক স্থায়ী ও কল্যাণকর। যুদ্ধ মুহূর্তের আবেগে সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়। শান্তি দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে শেখায়। শান্তি কেবল কোনো চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না। এটি গড়ে ওঠে মানুষের মানসিকতায়, পারস্পরিক শ্রদ্ধায়, এবং ভিন্নমতকে সহ্য করার সক্ষমতায়। যখন নাগরিকরা সহমর্মিতা বেছে নেয়, তখন নেতারাও সংলাপের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। এই মুহূর্তে আমাদের সকলের উচিত উত্তেজনার পরিবর্তে স্থিরতা বেছে নেওয়া। কারণ স্থির মনই বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বিভাজনের পরিবর্তে সহমর্মিতা বেছে নেওয়া। কারণ সহমর্মিতাই শত্রুতার দেয়াল ভাঙতে পারে। প্রকৃত বিজয় মানে কেবল শত্রুকে পরাজিত করা নয়। প্রকৃত বিজয় মানে মানবতার সুরক্ষা, জীবনের মর্যাদা অটুট রাখা, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করা। যদি সেই মানদণ্ডে বিচার করি, তবে স্পষ্ট হয়ে যায়, যুদ্ধ কখনোই মানবতার বিজয় নয়। বিজয় তখনই, যখন মানুষ মানুষকে রক্ষা করে।Top of Form