ইউরোপ: সভ্যতার মুখোশে সংঘাতের রাজনীতি


গণতন্ত্র, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মুক্ত-চিন্তা, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে পশ্চিমা বিশ্বে যে ভণ্ডামির আলামত চলছে আমরা যারা পশ্চিমা বিশ্বে বসবাস করছি নান্দনিক ও সৎ মননশীল চিন্তাধারাকে ধারণ ও লালন করে তারা হলফ  করে বলতে পারবেন পশ্চিমা দেশগুলো একেবারে উল্টোরথে চলছে। যার পরিণতি এক ভয়ানক ও সংঘাতের। এ ভাবে চলতে থাকলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই সব দেশগুলি সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে মুখ থুবরে পড়বে তা অনিবার্য। এক সময় ইউরোপিয়ান দেশগুলো সারা বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব বিস্তার করে লুট তরাজের সাম্রাজ্য কায়েম করে নিজেদের উন্নতি করেছে। এমন এক সময় আসবে যখন পশ্চিমারাই অন্যদের দ্বারা উপনিবেশিত হবে। সেদিনটি আর বেশী দুরে নয়। পশ্চিমা দেশগুলির এখন প্রচণ্ড প্রসব বেদনা শুরু হয়ে গেছে। তা এখন দিনের মতো পরিষ্কার। অনেকেই হয়তো এমন কথাগুলি শুনে বিস্ময়ে থমকে যাবেন। অবাক হওয়ারই কথা। কারণ হয়তো অজান্তেই আপনিও সেই প্রবাহের অংশ হয়ে গিয়েছেন। অথবা এখনো চোখ ও কান উপলব্ধির দরজায় বন্ধ। যদি গণতন্ত্র রক্ষার নামে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়। যদি রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার অজুহাতে ইউক্রেনকে এক রণ ক্ষেত্রে পরিণত করে অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার প্রহসন চালানো হয়। যদি মত প্রকাশের স্বাধীনতার মোড়কে সমাজে অস্থিরতা ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেওয়া হয়, এবং দ্বৈত নীতিকে পরিণত করা হয় রাজনৈতিক কৌশলের অলিখিত বিধানে। তাহলে আমরা কোন সভ্যতার কথা বলছি? এটাই কি তবে আধুনিক সভ্যতার নামে বরণ করে নেওয়া এক নতুন রূপের বর্বরতা? মুখে মানবতা, অন্তরে শোষণ, এই দ্বৈততার মধ্যেই কি লুকিয়ে আছে আজকের ‘উন্নত বিশ্ব’-এর আসল মুখ?

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু ভৌগোলিক অঞ্চল আছে যারা শুধু নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণেই নয়, বরং গোটা মানব সভ্যতার গতিপথ নির্মাণে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। ইউরোপ তেমনই এক মহাদেশ, যে সভ্যতার আলো ছড়ানোর দাবিদার হিসেবে আত্ম প্রকাশ করেছিল, অথচ যুগে যুগে অন্ধকারের ধারক হয়ে উঠেছে। সাম্রাজ্য বাদের বিস্তার, দমননীতি, অর্থনৈতিক শোষণ এবং যুদ্ধ বাজ মনোভাব ইউরোপকে একদিকে যেমন প্রযুক্তি ও জ্ঞানের কেন্দ্র করে তুলেছে, তেমনি অন্যদিকে পরিণত করেছে বিশ্বব্যাপী সংঘাত, বিভাজন ও অস্থিরতার কারিগরে। যে ইউরোপ একদিন সভ্যতার রূপকার ছিল বলে দাবি করে, সেই ইউরোপই আবার ইতিহাসের পাতায় বারবার রক্ত, আগুন আর ধ্বংসের ছাপ রেখে গেছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স, পর্তুগাল কিংবা জার্মানির মতো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর উপনিবেশ গড়ার উন্মাদনা শুধু ভূখণ্ড দখলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা মানুষ, সংস্কৃতি ও আত্ম-পরিচয়ের ওপর চালানো হয়েছে নিষ্ঠুর এক আক্রমণ হিসেবে। এমনকি দুইটি বিশ্বযুদ্ধের কেন্দ্রস্থলও ছিল ইউরোপে। সেখানে ক্ষমতার লালসা ও উগ্র জাতীয়তাবাদের সংঘর্ষে গোটা পৃথিবী টালমাটাল হয়ে পড়েছিল। আজ, শতাব্দী পেরিয়েও ইউরোপ তার সেই পুরনো প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ এর জ্বলন্ত উদাহরণ। এই যুদ্ধ শুধু দুটি রাষ্ট্রের সংঘর্ষ নয়, বরং একটি দীর্ঘ সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাধারার উত্তরাধিকার, ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অদূরদর্শী সম্প্রসারণ বাদী নীতি, এবং রাশিয়াকে কোণঠাসা করে রাখার পাশ্চাত্য কৌশলের ফলাফল। আজ খতিয়ে দেখার সময় এসেছে কীভাবে ইউরোপীয় ইতিহাস, রাজনীতি ও ভূ-কৌশলগত ভুল বারবার বিশ্বকে সংঘাত ও বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কেন বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি যুদ্ধ নয়, বরং ইউরোপের আত্মঘাতী নীতির এক চরম পরিণতি। যেখানে পতন শুধু আসন্ন নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবেই ন্যায্য বলে বিবেচিত হতে পারে। এখন জরুরী প্রশ্ন করার সময় এসেছে। ইউরোপ আদৌ সভ্যতার বাহক কিনা? না কি একটি দীর্ঘমেয়াদি, আত্ম মুগ্ধ, দম্ভবাহী ধ্বংসের সূত্রপাত, যার দাম গোটা বিশ্বকে আজও দিতে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দিতে হবে।

বিশ্ব ইতিহাসের শিক্ষা থেকে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ইউরোপই বারংবার বিশ্ব অশান্তির মূল উৎসে পরিণত হয়েছে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে যতগুলি বৃহৎ যুদ্ধ, ঔপনিবেশিক শোষণ, সাংস্কৃতিক ধ্বংস এবং অর্থনৈতিক দুর্যোগ সংঘটিত হয়েছে, তার অধিকাংশই ইউরোপীয় রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রেক্ষাপটে উৎপন্ন হয়েছে। ইউরোপের ভূখণ্ড তুলনামূলক ভাবে সীমিত হলেও, সেখানকার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিদ্যমান অতিশয় প্রতিযোগিতা, একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রবণতা এবং "সাম্রাজ্য গঠনের স্বপ্ন", এই সবই এক চরম আগ্রাসী ও অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। এর পরিণামে গোটা বিশ্বকেই একাধিকবার বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছে। ইউরোপীয় ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া এই প্রতিযোগিতার মূল কারণ ছিল সম্পদের সংকট এবং নতুন বাজার দখলের প্রয়াস। শিল্প বিপ্লব ইউরোপের মধ্যে নতুন এক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি সঞ্চার করে, যা একদিকে তাদের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের পথ খুলে দিলেও, অন্যদিকে কাঁচামাল, শ্রম ও বাজারের প্রয়োজনে তাদেরকে অন্য ভূখণ্ডের প্রতি আগ্রাসী করে তোলে। আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নানা অঞ্চল ইউরোপীয় দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। ইউরোপীয় শক্তিরা শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠনেই থেমে থাকেনি। তারা স্থানীয় সংস্কৃতি, ধর্ম, শিক্ষা এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে ধ্বংস করে নিজেদের মত করে একটি 'নব্য সভ্যতা' চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে বর বর।

এই সাম্রাজ্যবাদী লিপ্সা শুধু ভৌগোলিক সম্প্রসারণেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং একটি কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্ববোধকে প্রতিষ্ঠা করতেও ব্যবহৃত হয়েছে। 'সাদা চামড়ার শ্রেষ্ঠত্ব' নামক ধারণার মাধ্যমে ইউরোপ নিজেকে একটি 'উন্নত, সভ্য এবং ধার্মিক জাতি' হিসেবে উপস্থাপন করে, যেন তারা বাকি পৃথিবীর অবনত ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীকে সভ্য করে তোলার জন্য দায়বদ্ধ। এই দম্ভপূর্ণ মনোভাব কেবল রাজনৈতিক আধিপত্য নয়, সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক ঔপনিবেশিকতার একটি রূপে পরিণত হয়, যার ফলে বহু জাতি তাদের নিজস্ব পরিচয়, ভাষা, ধর্ম ও ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধ ও সামরিক আগ্রাসনকে রাষ্ট্রনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে থাকে। শক্তি ও আধিপত্যের প্রতীক হিসেবে ইউরোপ সমর নীতি, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, ও সামরিক প্রযুক্তির বিকাশে বিপুল বিনিয়োগ করে। এর ফলে সামরিকবাদ ইউরোপীয় রাজনৈতিক চেতনার কেন্দ্রে স্থান করে নেয়। যুদ্ধ যেন কেবল অপরিহার্য নয়, বরং গৌরবের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। ফলে, ছোট ছোট দ্বন্দ্ব ও সংকটও একে একে বৃহৎ আকার ধারণ করে এবং পরিণত হয় বিশ্বব্যাপী সংঘাতে। উগ্র জাতীয়তাবাদও ইউরোপীয় সংকটের আরেকটি অনিবার্য উপাদান। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, ব্রিটেনসহ অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসকে অতিমানবীয় স্তরে প্রতিষ্ঠা করে অন্য জাতিকে অবজ্ঞা করতে শিখেছে।

১৭শ শতক থেকে ২০শ শতকের শুরু পর্যন্ত সময়কাল ছিল ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী বিস্তারের এক বর্ণিল ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। ইউরোপের একাধিক রাষ্ট্র, বিশেষ করে ব্রিটেন, ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন, অস্ট্রো-হাঙ্গেরি ও পরবর্তীকালে জার্মানি, বিশ্বের নানা প্রান্তে সামরিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য এক চরম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এই প্রতিযোগিতা শুধুমাত্র ভূখণ্ড দখলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর অন্তরালে ছিল এক সুপরিকল্পিত শোষণমূলক কাঠামো, যার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষকে অর্থনৈতিক দাসত্বে আবদ্ধ করা হয়েছিল। আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার উপনিবেশগুলোতে এই শোষণ ছিল বহুমুখী। প্রাকৃতিক সম্পদের লুণ্ঠন, স্থানীয় অর্থনীতির ধ্বংস, শ্রমিক শ্রেণির নিপীড়ন এবং বিশাল জনগোষ্ঠীর উপর কর আরোপের মাধ্যমে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সম্পদ ও কলকারখানা সমৃদ্ধ করেছিল। শুধু অর্থনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক দিক থেকেও ইউরোপীয় শক্তিগুলো এক নব্য উপনিবেশিকতা চাপিয়ে দেয়। স্থানীয় ভাষা, ধর্ম, শিক্ষা, জীবনদর্শন ও ঐতিহ্যকে পশ্চাদপদ ও 'অসভ্য' হিসেবে চিহ্নিত করে ইউরোপীয় সংস্কৃতিকে আধুনিকতা ও উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে বহু জাতিগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব পরিচয় থেকে বিচ্যুত হয় এবং এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, যার ফলস্বরূপ উপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটলেও আজ পর্যন্ত তার প্রভাব বহু রাষ্ট্রের উপর রয়ে গেছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ইউরোপ নিজেদের 'সভ্যতা'র বাহক হিসেবে উপস্থাপন করলেও, প্রকৃতপক্ষে তারা বিশ্বজুড়ে যে নৃশংসতা, দমননীতি ও শ্রেষ্ঠত্ববোধের চর্চা করেছে, তা ছিল একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বর্বরতা।

বিশ্বযুদ্ধের উদ্ভব ছিল ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মধ্যকার এক দীর্ঘকালীন সংঘর্ষ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ, যার রক্তাক্ত ফলাফল গোটা মানবসভ্যতার ওপর গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ একদিকে যেমন সাময়িকভাবে ইউরোপীয় রাজনীতির ভারসাম্যকে ধ্বংস করে দেয়, তেমনি এটি ছিল শতাব্দীব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা, কৌশলগত সংঘর্ষ, এবং অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টার একটি ভয়ানক পরিণতি। এই সময়ে ইউরোপ ছিল এক দ্বিখণ্ডিত মহাদেশ। একদিকে ছিল ত্রৈমাত্রিক জোট: জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও ইতালি।  অন্যদিকে ত্রৈমাত্রিক ঐক্য: ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া। এই দুই শিবিরের মধ্যে অব্যাহত অস্ত্র প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে সমুদ্রপথে নৌবাহিনীর আধিপত্য বিস্তার এবং স্থলভাগে আধুনিক সমরাস্ত্রের উৎপাদন, এক অদৃশ্য ‘শীতল যুদ্ধ’-এর পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল, যা একমাত্র কোনো সুযোগের অপেক্ষায় ছিল বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য। সেই সুযোগ আসে ১৯১৪ সালে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইউরোপের রাষ্ট্রসমূহ এতটাই পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নিমজ্জিত ছিল যে, যুদ্ধ একটি অবশ্যম্ভাবী গন্তব্যে পরিণত হয়েছিল। এই যুদ্ধ কেবল একটি সামরিক সংঘাত ছিল না; এটি ছিল ইউরোপীয় চিন্তাধারার, রাজনৈতিক দম্ভের এবং জাতীয়তাবাদী উন্মত্ততারও মহাকাব্যিক ধ্বংসযজ্ঞ।  

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি শুধুমাত্র ইউরোপীয় দ্বন্দ্ব ছিল না। এটি সরাসরি এশিয়া, আফ্রিকা এবং আমেরিকার ভূ-রাজনীতিতেও প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষত জার্মান নাৎসিবাদ, ইতালির ফ্যাসিবাদ ও জাপানের সামরিক আগ্রাসন যৌথভাবে বিশ্বকে এক পরাশক্তির মঞ্চে পরিণত করে। যার কেন্দ্র ছিল ইউরোপীয় অহংকার ও প্রতিহিংসার রাজনীতি। ঐতিহাসিকভাবে ইউরোপ যে যুদ্ধবাজ ও ঔপনিবেশিক মনোভাব পোষণ করে আসছে, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরও পরিবর্তন হয়নি। বর্তমান রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধও সেই দীর্ঘস্থায়ী ইউরোপীয় সংকট, ক্ষমতালিপ্সা ও কূটনৈতিক দম্ভেরই আধুনিক রূপ, যার শিকড় নিহিত রয়েছে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপীয় ভূরাজনীতির ভ্রান্ত নকশায়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমা জোট, বিশেষ করে ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, একতরফাভাবে পূর্ব ইউরোপের ভূখণ্ডে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের নীতিকে অগ্রাধিকার দিতে থাকে। রাশিয়াকে কোনো সুরক্ষা নিরাপত্তা না দিয়েই ন্যাটো ধাপে ধাপে তার সদস্যপদ সম্প্রসারণ করে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তিনি ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণের ব্যাপারে বারবার সতর্ক করে আসছেন। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব তাঁর এই সতর্ক বার্তাকে উপেক্ষা করেই রাশিয়ার সীমান্তের কাছা কাছি অগ্রসর হতে থাকে। একসময় তারা ইউক্রেনকেও নিজেদের প্রভাব বলয়ের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।

তাই বর্তমান রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ একটি ভৌগোলিক সংঘাত নয়, বরং ইউরোপ ও পশ্চিমা নেতাদের এক দীর্ঘদিনের কৌশলগত গুণগত ভুলের ফলাফল। শীতল-যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেক প্রজাতন্ত্র এবং বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো ন্যাটোর সদস্য হওয়াটা ছিলো মস্কোর চোখে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা। কথা দিয়ে কথা ভাঙ্গার বিশ্বাসঘাতকতা। তাছাড়া, ইউক্রেনের ২০১৩ সালের প্রস্তাবিত ইইউ-অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি, রাশিয়ার কাছে ছিল একটি স্নায়ুবিক আক্রমণ, যা কিয়েভে ময়দান বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করেছিল। আজ চার বছরেরও বেশী সময় ধরে চলছে ইউক্রেইনের সংকট। তবে যেভাবে পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেইনকে সহায়তা করে নিজেদের সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যকে হারাচ্ছে তা দেখে একটা জিনিষ স্পষ্ট যে পশ্চিমা দেশগুলো এখন দিশেহারা। এই পরিস্থিতি একটি অস্বস্তিকর অথচ অস্বীকার করা যায় না এমন সত্যকে সামনে নিয়ে আসে। ইউরোপের দীর্ঘদিনের যুদ্ধবাজ, দম্ভপূর্ণ ও সংকীর্ণ রাজনীতি কেবল নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামোকে ক্ষয়িষ্ণু করে তুলেছে না, বরং গোটা বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চয়তা, মেরুকরণ এবং সংঘাতের এক বিপজ্জনক ভবিষ্যতের দিকে।  ইউরোপের এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড এমনকি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর ভেতরেও ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে জনমত এখন দ্বিধাবিভক্ত। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালিনি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, অস্ত্র সহায়তার জন্য বাজেট ঘাটতি, এবং নাগরিকদের ক্রমবর্ধমান অনাস্থা ইউরোপীয় সরকারগুলোকে এক অস্থিতিশীল অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।  ইউরোপে উগ্র-ডানপন্থী রাজনীতির পুনরুত্থান, রাশিয়াপন্থী মতবাদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি, এবং অভিবাসী সংকটের পুনরায় উত্থান, সব মিলিয়ে আজ ইউরোপ কৌশলগতভাবে একটি অভ্যন্তরীণ ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে। এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়া, চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়া ও অন্যান্য উদীয়মান শক্তি এক নতুন ভূরাজনৈতিক বিন্যাস গঠন করতে যাচ্ছে। আর ইউরোপ ক্রমশ একটি বৌদ্ধিকভাবে ক্লান্ত, রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে পরনির্ভরশীল মহাদেশে পরিণত হচ্ছে। যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী এক-দু'দশকের মধ্যে ইউরোপকে শুধু সামরিক ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দ্বিতীয় শ্রেণির ভূমিকায় দেখতে পাওয়া অসম্ভব নয়।

বিশ্ব অশান্তির শিকড় আজও গভীরভাবে ইউরোপের বুকে গাঁথা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাম্রাজ্যবাদের উত্তরাধিকার, আধিপত্যের নেশা ও দম্ভপূর্ণ কূটনীতির ধারাবাহিকতা ইউরোপকে বিশ্ব সংঘাতের কেন্দ্রস্থলে পরিণত করেছে। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ সেই ইতিহাসের আধুনিক এক প্রতিচ্ছবি, যেখানে তথাকথিত “সভ্যতা” ও “গণতন্ত্র রক্ষার” আবরণে আবারও দেখা দিচ্ছে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও দমননীতি। অথচ ইউরোপ, যে নিজেকে আলো ও যুক্তির মহাদেশ বলে পরিচয় দিতে চায়, বারবারই নিজস্ব সীমাবদ্ধতা, সংকীর্ণতা ও ঔপনিবেশিক অহংকারের কাছে পরাজিত হয়েছে। এই যুদ্ধ, এবং তার চারপাশে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, ইউরোপের সামনে একটি মোড়লভিত্তিক নীতি বনাম মানবিক দায়িত্বের দ্বন্দ্ব তুলে ধরছে। প্রশ্ন হলো, ইউরোপ কি নিজেকে আত্মসমালোচনার সাহস দেখিয়ে নতুন পথে চালিত করতে পারবে? নাকি সে আবারও নিজের অতীত ভুলের পুনরাবৃত্তি করে এক অবশ্যম্ভাবী পতনের দিকে ধাবিত হবে? ইতিহাস যদি কিছু শেখায়, তবে তা হলো, ক্ষমতা ও দম্ভ একদিন ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই এই যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং ইউরোপ যদি আত্মসমালোচনা না করে, তবে আগামী প্রজন্ম ইতিহাসের পৃষ্ঠায় এ পতনকে কেবল অনিবার্য বলেই নয়, বরং ন্যায়সংগত হিসেবেই বিবেচনা করবে। একটি মহাদেশ যা বিশ্বে আলো ছড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, শেষত তা যদি অন্ধকারের উৎস হয়ে ওঠে, তবে পৃথিবীর নতুন যুগে সেই ইউরোপের স্থান শুধুই একটি সতর্কবার্তা হিসেবে থেকে যাবে।

Leave your review