নির্বাচন, গণতন্ত্র ও সংলাপের প্রত্যাবর্তন


গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিপুল ব্যবধানে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। বহু বছরের রাজনৈতিক টানাপোড়ন, উত্তপ্ত বিতর্ক, সন্দেহ ও অনিশ্চয়তার দীর্ঘ ছায়া অতিক্রম করে জাতি প্রত্যক্ষ করল এক ঐতিহাসিক নির্বাচন। যে নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বড় অংশ অবাধ ও সুষ্ঠু বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এটি কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ঘটনা নয়। এই নির্বাচনটি ছিল জনগণের নীরব কিন্তু দৃঢ় উচ্চারণ, ব্যালটের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ পুনর্লিখনের এক সাহসী প্রয়াস। যদিও দেশের অন্যতম বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ থাকায় এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি, তবুও বিচ্ছিন্ন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়া সার্বিকভাবে উৎসবমুখর পরিবেশেই ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। বহু বছর পর একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। এই পরিবর্তন রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো প্রথমবারের মতো বিপুল সংখ্যক জেনারেশন–জি তরুণের অংশগ্রহণ। তারা শুধু ভোট দেয়নি। এই প্রজন্ম অনেক প্রত্যাশা, প্রশ্ন এবং জবাবদিহির নতুন ভাষা নিয়ে এসেছে রাজনীতির প্রাঙ্গণে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসন পর্বের অবসান ঘটিয়ে জনগণ যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, তা কেবল একটি সরকারের বিদায় নয়। এটি গণতান্ত্রিক চর্চার পুনর্জাগরণ, আস্থার পুনর্নির্মাণ এবং ভবিষ্যতের প্রতি সাহসী অঙ্গীকারের প্রতীক। এই নির্বাচনের ফলাফল তাই সংখ্যার হিসাবের বাইরে গিয়ে হয়ে উঠেছে ইতিহাসের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত, যেখানে জনগণের ইচ্ছাই শেষ কথা বলে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

গত সরকারের পতনের পর দেশ যে অনিশ্চয়তার ঘূর্ণাবর্তে নিমজ্জিত হয়েছিল বিশেষ করে সহিংসতা, প্রতিশোধমূলক আক্রমণ, প্রশাসনিক শিথিলতা এবং জনমনে নিরাপত্তা হীনতার ছায়া, তা রাষ্ট্রকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। এমন এক প্রেক্ষাপটে এই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যখন প্রশ্ন ছিল শুধু কে ক্ষমতায় আসবে তা নয়। প্রশ্ন ছিল রাষ্ট্র কি আবার স্থিতি, শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার পথে ফিরতে পারবে? এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি, যা রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক বড় শূন্যতা তৈরি করেছিল। ফলে নির্বাচন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হলো, তা নিয়ে শুরু থেকেই আলোচনা ছিল তীব্র। বহু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অংশী জনদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল যেন একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়। তাঁদের কণ্ঠে ছিল উদ্বেগ, আবার প্রত্যাশাও বাংলাদেশ যেন সংঘাত নয়, সংলাপের পথ বেছে নেয়। সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন হয়ে ওঠে কেবল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পূরণের আয়োজন নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতির এক পরীক্ষা। তাই এই নির্বাচন ছিল আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, রাজনৈতিক মেরুকরণ, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে দেশজুড়ে যে তর্ক-বিতর্ক চলছিল, তা জনমনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বিরোধী দলগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি, নাগরিক সমাজের সক্রিয় অবস্থান এবং তরুণ প্রজন্মের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সাহসী ও বিশ্লেষণধর্মী উপস্থিতি নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে নতুন মাত্রা দেয়। বিশেষ করে জেনারেশন–জি ভোটাররা কেবল আবেগ নয়, তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণের চেষ্টা করেছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন ধারা সূচিত করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ইতিবাচক মন্তব্য তাই সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ও আস্থার অনুভূতি জাগিয়েছে। কারণ গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কেবল ফলাফলের বিজয়ে নয়, বরং সেই ফলাফল অর্জনের প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতার ন্যায্যতা এবং অংশগ্রহণের বিশ্বাসযোগ্যতায় নিহিত। যখন মানুষ নিশ্চিত হয় যে তাদের ভোট বিকৃত হয়নি, ভয়ভীতি বা প্রভাবমুক্ত পরিবেশে তারা মত প্রকাশ করতে পেরেছে, তখনই রাষ্ট্রের ভিত্তি দৃঢ় হয়। একটি নির্বাচন তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা বিভক্ত সমাজে পুনর্মিলনের সেতুবন্ধন গড়ে তোলে এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে শত্রুতায় নয়, নীতিগত পার্থক্যে সীমাবদ্ধ রাখে। সুতরাং এবারের নির্বাচন ছিল কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের দিন নয়। এটি ছিল বিশৃঙ্খলা থেকে শৃঙ্খলায়, অনিশ্চয়তা থেকে প্রত্যয়ের দিকে যাত্রার এক প্রতীকী মুহূর্ত। এখন দেখার বিষয়, এই আস্থার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার দাবি বাস্তব শাসনব্যবস্থায় কতটা প্রতিফলিত হয় এবং গণতন্ত্র কতটা প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিতে রূপ নেয়।

গণতন্ত্র কোনো স্থির কাঠামো নয়। এটি এক অব্যাহত চর্চা, যা নাগরিক অংশগ্রহণ, জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং মতের বহুত্বের ওপর দাঁড়িয়ে ক্রমাগত বিকশিত হয়। গণতন্ত্র কেবল ভোটের দিনটিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি প্রতিদিনের আচরণে, সংসদের বিতর্কে, আদালতের স্বাধীনতায়, সংবাদমাধ্যমের সাহসে এবং নাগরিকের প্রশ্ন তোলার অধিকারেই প্রাণ পায়। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকন তার গেটিসবার্গের ঐতিহাসিক উক্তিতে গণতন্ত্রকে ব্যাখ্যা করেছিলেন: “Government of the people, by the people, for the people।” অর্থাৎ রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ, পরিচালনার কর্তৃত্ব জনগণের প্রতিনিধি, এবং লক্ষ্যও জনগণের কল্যাণ। এই দর্শন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে গণতন্ত্রে ক্ষমতা কোনো ব্যক্তির অনুগ্রহ নয়। এটি নাগরিকের অর্পিত দায়িত্ব, যা শাসকদের জবাবদিহির মধ্যে রাখে। সাম্প্রতিক নির্বাচন সেই মৌলিক চেতনার পুনঃ প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, কারণ জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে যে রাষ্ট্রের দিকনির্দেশ নির্ধারণের অধিকার তাদেরই।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, গণতন্ত্র নিখুঁত নয়, এতে ধীরগতি আছে, মতবিরোধ আছে, তর্ক-বিতর্ক আছে। কিন্তু বিকল্প শাসনব্যবস্থাগুলোর তুলনায় এটি মানব মর্যাদা ও স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।

তাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য তার অসম্পূর্ণতায়। কারণ সেই অসম্পূর্ণতাই সংশোধনের সুযোগ সৃষ্টি করে। এটি এমন এক ব্যবস্থা যেখানে ভুল স্বীকার করা যায়, নীতির পরিবর্তন সম্ভব হয়, এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই উপলব্ধি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনৈতিক উত্তাপ, সামাজিক বিভাজন এবং প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জের মাঝেও গণতন্ত্রই একমাত্র পথ, যা সংঘাতকে সংলাপে, অবিশ্বাসকে প্রক্রিয়াগত আস্থায় এবং ক্ষমতার একচেটিয়াকে অংশগ্রহণমূলক কাঠামোয় রূপান্তর করতে পারে। তাই গণতন্ত্রকে কেবল একটি রাজনৈতিক পদ্ধতি হিসেবে নয়, বরং একটি নৈতিক অঙ্গীকার ও সামাজিক সংস্কৃতি হিসেবে ধারণ করাই আজ সময়ের দাবি। তবে গণতন্ত্রের প্রকৃত প্রাণশক্তি নিহিত একটি কার্যকর, মর্যাদাপূর্ণ ও শক্তিশালী সংসদে। যে সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের কারখানা নয়, বরং জাতীয় বিবেকের প্রতিফলন। সংসদ কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের কণ্ঠস্বর বহন করে না। এটি সংখ্যালঘু মত, ভিন্নমত এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষারও নিরাপদ আশ্রয়। একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সংসদে করতালির চেয়ে প্রশ্নের গুরুত্ব বেশি, আনুগত্যের চেয়ে যুক্তির মূল্য বেশি, এবং নীরব সম্মতির চেয়ে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ অধিক প্রয়োজনীয়। সেখানে সরকারকে জবাব দিতে হয়, নীতির পক্ষে তথ্য উপস্থাপন করতে হয়, এবং সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে হয়। সংসদীয় কমিটিগুলোর কার্যকর ভূমিকা, বাজেট নিয়ে গভীর পর্যালোচনা, নীতিগত প্রস্তাবের ওপর দীর্ঘ বিতর্ক, এসবই একটি পরিণত গণতন্ত্রের লক্ষণ। তাই নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সংসদকে এমন এক প্রাণবন্ত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা, যেখানে সংখ্যার জোর নয়, যুক্তির শক্তি প্রাধান্য পায়। যেখানে দলীয় অবস্থানের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ অগ্রাধিকার পায়। যেখানে আইন প্রণয়ন হয় তড়িঘড়ি করে নয়, বরং গবেষণা, পরামর্শ ও অংশী জনের মতামতের ভিত্তিতে। বিরোধী দলের দায়িত্বও কম নয়। গঠনমূলক বিরোধিতা মানে কেবল সমালোচনা নয়। বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া, নীতিগত ত্রুটি চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন হলে জাতীয় ইস্যুতে ঐকমত্য গড়ে তোলা। সরকার যদি সমালোচনাকে বিদ্বেষ বা ষড়যন্ত্র হিসেবে না দেখে বরং উন্নতির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে, আর বিরোধী দল যদি অচলাবস্থা সৃষ্টি নয় বরং জবাবদিহি নিশ্চিত করাকে লক্ষ্য করে, তবে সংসদ হয়ে উঠতে পারে গণতন্ত্রের সত্যিকারের প্রাণকেন্দ্র। তখনই রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা পাবে, নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং জনগণের আস্থা দৃঢ় হবে। শক্তিশালী সংসদ মানেই শক্তিশালী গণতন্ত্র। কারণ সেখানেই জনগণের কণ্ঠস্বর সবচেয়ে সংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

রাজনৈতিক সংলাপে পারস্পরিক সম্মান প্রতিষ্ঠা আজ কেবল একটি নৈতিক আহ্বান নয়, বরং জাতীয় পুনর্গঠনের অপরিহার্য শর্ত। দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি, অবিশ্বাস এবং বিদ্বেষের ভাষা আমাদের রাজনৈতিক পরিসরকে সংকুচিত করেছে। মতভেদকে শত্রুতায় রূপ দিয়েছে, আর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে প্রতিশোধে পরিণত করেছে। অথচ গণতন্ত্রের আসল শক্তি সংঘাতে নয়, সংলাপে। প্রতিপক্ষকে নীরব করায় নয়, তাকে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায়। সহিষ্ণুতা ও শ্রদ্ধা ছাড়া গণতন্ত্র কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো হয়ে পড়ে। এর প্রাণ থাকে না, নৈতিক উচ্চতা থাকে না। রাজনৈতিক সহিংসতা বা বিদ্বেষ হয়তো সাময়িক বিজয়ের অনুভূতি এনে দিতে পারে, কিন্তু তার ক্ষত সমাজের গভীরে দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন তৈরি করে। বিদ্বেষের ভাষা একবার স্বাভাবিক হয়ে গেলে তা প্রজন্মের পর প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে, আস্থা নষ্ট করে এবং প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে। তাই সত্যিকারের নেতৃত্বের পরীক্ষা হয় ক্ষমতার প্রদর্শনে নয়, বরং আত্মসংযমে। প্রতিপক্ষকে আঘাত করার সক্ষমতায় নয়, বরং তাকে মর্যাদা দেওয়ার উদারতায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার চেষ্টা গণতন্ত্রকে সংকুচিত করে, কিন্তু তাকে অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া গণতন্ত্রকে বিস্তৃত করে। কারণ ভিন্নমতই নীতিকে শাণিত করে, সমালোচনাই সিদ্ধান্তকে পরিপক্ব করে, এবং বিতর্কই গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত রাখে। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি সুস্থ ও পরিণত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায়, তবে আমাদের রাজনৈতিক ভাষা ও আচরণে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে হবে, যেখানে প্রতিপক্ষকে অবমাননা নয়, সম্মান দেওয়া হবে। যেখানে মতভেদকে ভয় নয়, শক্তি হিসেবে দেখা হবে। যেখানে জাতীয় স্বার্থ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান পাবে। রাজনৈতিক সংলাপ তখনই অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠবে, যখন তা প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও সৌজন্য বজায় রাখবে এবং ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যেও মানবিক মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখবে। সেদিনই আমাদের গণতন্ত্র কেবল টিকে থাকবে না। সে বিকশিত হবে, পরিণত হবে, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক গর্বিত উত্তরাধিকার হয়ে উঠবে।

এই নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা কেবল উল্লেখযোগ্যই নয়, বরং যুগান্তকারী। প্রথমবার ভোট দেওয়া অসংখ্য তরুণ–তরুণী শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দায়িত্ব পালন করেননি। তাঁরা নির্বাচনের আগে ও পরে জন পরিসরে সক্রিয় থেকেছেন, তথ্য যাচাই করেছেন, গুজব প্রতিরোধে ভূমিকা রেখেছেন এবং নীতিগত প্রশ্নে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অনলাইন আলোচনা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কিংবা স্থানীয় সমাবেশ, সব জায়গাতেই তাঁদের উপস্থিতি ছিল প্রাণবন্ত ও বিশ্লেষণধর্মী। এই প্রজন্ম এমন এক বাস্তবতায় বড় হয়েছে, যেখানে বিশ্ব রাজনীতি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তন তাদের হাতের মুঠোয় দৃশ্যমান। ফলে তাদের প্রত্যাশাও ভিন্ন। স্বচ্ছতা, ডিজিটাল দক্ষতা ভিত্তিক উন্নয়ন, টেকসই কর্মসংস্থান, পরিবেশ-সচেতন নীতি, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। তারা উন্নয়নকে শুধু অবকাঠামো নয়, বরং সুযোগের সমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সততার সঙ্গে দেখতে চায়। তরুণদের এই সক্রিয়তা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখন এক নতুন সামাজিক শক্তির মুখোমুখি। যে শক্তি প্রশ্ন করতে ভয় পায় না, তথ্যের দাবি তোলে, এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চায়। এই প্রজন্ম দলীয় আনুগত্যের চেয়ে নীতিগত সামঞ্জস্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো আর কেবল আবেগ নির্ভর ভাষণ বা প্রচলিত স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারবে না। তাদেরকে হতে হবে আরও দায়বদ্ধ, স্বচ্ছ ও সৃজনশীল। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পরবর্তী অধ্যায় তাই অনেকাংশেই নির্ভর করবে এই উদ্যমী, সচেতন ও প্রযুক্তি সচেতন প্রজন্মের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার ওপর।

নির্বাচন শেষ হয়েছে, কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত পথচলা এখনই শুরু। ব্যালটের বাক্স বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বের দ্বার খুলে যায়, এ কথা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। বিজয়ীদের জন্য এটি আত্মতৃপ্তির সময় নয়, বরং সংযম, উদারতা ও প্রজ্ঞার পরীক্ষা। পরাজিতদের জন্য এটি হতাশার মুহূর্ত নয়, বরং দায়িত্বশীল বিরোধিতার মাধ্যমে ইতিহাসে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই। এখানে কেউ স্থায়ী বিজয়ী নয়, কেউ চিরস্থায়ী পরাজিত নয়। স্থায়ী কেবল জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা। একটি রাষ্ট্র তখনই এগিয়ে যায়, যখন ক্ষমতাসীনরা মনে রাখেন যে ক্ষমতা জনগণের অর্পিত আমানত, আর বিরোধীরা উপলব্ধি করেন যে সমালোচনা ধ্বংসের জন্য নয়, সংশোধনের জন্য। সরকার যদি জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে, নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা বজায় রাখে এবং ভিন্নমতকে জায়গা দেয়, তবে আস্থা জন্মায়। আবার বিরোধী দল যদি গঠনমূলক সমালোচনা, বিকল্প প্রস্তাব ও সংসদীয় শালীনতার চর্চা করে, তবে রাজনৈতিক ভারসাম্য সুদৃঢ় হয়। এই পারস্পরিক দায়বদ্ধতাই গণতন্ত্রকে টেকসই করে তোলে। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, নির্বাচনের ফলাফল যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার পরবর্তী আচরণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ইতিহাস কেবল কে ক্ষমতায় এলো তা মনে রাখে না। ইতিহাস মনে রাখে ক্ষমতায় এসে কে কেমন আচরণ করল। আমরা যদি শক্তিশালী সংসদ, সম্মানজনক সংলাপ, আইনের শাসন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে এগোতে পারি, তবে এই নির্বাচন কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা হয়ে থাকবে না। এটি হয়ে উঠবে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের এক আলোকবর্তিকা। আজকের এই সন্ধিক্ষণে আমাদের প্রত্যাশা, রাজনীতি যেন বিভাজনের ভাষা ত্যাগ করে দায়িত্বের ভাষা গ্রহণ করে। ক্ষমতা যেন প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়ে সেবার অঙ্গীকারে রূপ নেয় এবং গণতন্ত্র যেন কাগজের শব্দ না হয়ে নাগরিক জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। তাহলেই এই নির্বাচন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক প্রেরণাদায়ক অধ্যায় হয়ে থাকবে, যেখানে জনগণের ইচ্ছা ও প্রজ্ঞাই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের দিকনির্দেশ নির্ধারণ করেছে।

Leave your review