যেখানে ঘর নিরাপদ, মানুষ নয়


আমরা আজ এক আতংকের সাম্রাজ্যে বসবাস করছি। প্রায় বিশ কোটি মানুষের এই দেশটিতে এমন অসংখ্য ঘর আছে, যেগুলোর দরজা রাতে তালাবন্ধ হয় নিরাপত্তার জন্য। তালা ঝোলে চোরের ভয় থেকে বাঁচতে, জানালায় গ্রিল বসে বাইরের হুমকি ঠেকাতে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, সেই দরজার ভেতরে পা রাখলেই অনেক মানুষের জীবনের নিরাপত্তা শেষ হয়ে যায়। এই ঘরগুলোর বেশীর ভাগই শহরের বিলাস বহুল এলাকায়। এই সব ঘরের দেয়ালগুলো হয়তো শক্ত, ছাদ হয়তো পাকা, ঠিকানাটা হয়তো ভদ্র এলাকা। তবু সেই ঘরের ভেতরে থাকা মানুষগুলো, বিশেষ করে দরিদ্র, দুর্বল, শিশু ও নারীরা, প্রতিদিন বেঁচে থাকে এক অদৃশ্য আতঙ্কের মধ্যে। এখানে ঘর নিরাপদ, মানুষ নয়। এই বৈপরীত্যটাই আমাদের সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য। বাইরে থেকে যে ঘরগুলোকে নিরাপত্তার প্রতীক বলে মনে হয়, ভেতরে সেগুলোই হয়ে ওঠে নির্যাতনের অদৃশ্য কারাগার। এসির ঠাণ্ডা বাতাসে চাপা পড়ে যায় কান্না। ভারী পর্দার আড়ালে হারিয়ে যায় আর্ত চিৎকার। প্রতিবেশীরা শুনেও না শোনার ভান করে। কারণ ভেতরে যা ঘটে, তা নাকি ঘরের ব্যাপার। আর এই একটি বাক্যের আড়ালেই দিনের পর দিন ভেঙে পড়ে অসংখ্য শৈশব, নিঃশেষ হয় নারীর সম্মান, নিঃশব্দে মারা যায় মানবতা। আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে দরজার তালা আছে, কিন্তু বিবেকের দরজা খোলা থাকে না। যেখানে নিরাপত্তা মানে সম্পদের সুরক্ষা, মানুষের নয়। যেখানে শিশুর শরীরে আঘাতের দাগ লুকিয়ে রাখা যায় জামার নিচে। কিন্তু সেই আঘাতের দায় লুকিয়ে যায় সামাজিক নীরবতায়। এই নীরবতা কাকতালীয় নয়। এটি গড়ে তোলা, অভ্যাসে পরিণত হওয়া এক নিষ্ঠুর সংস্কৃতি। কারণ এই নীরবতাই ক্ষমতাবানকে সাহসী করে তোলে, আর দুর্বলকে আরও অসহায় করে দেয়। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ওঠে, আমরা কি সত্যিই একটি সভ্য সমাজ? নাকি আমরা কেবল ঘর বানাতে শিখেছি, মানুষ হতে শিখিনি? যে সমাজে ঘর নিরাপদ থাকে, কিন্তু ঘরের ভেতরের মানুষ নয়। সেই সমাজের উন্নয়ন, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা নৈতিক দাবির অর্থ কোথায়? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আর নেই। কারণ প্রতিটি তালাবন্ধ দরজার আড়ালেই আজ মানবতার পরীক্ষা হচ্ছে। আর বারবারই আমরা সেখানে ব্যর্থ হচ্ছি।

বাংলাদেশে কাজের মেয়েদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা আজ আর কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। এটি নীরবে, নিয়মিত এবং প্রায় স্বাভাবিকের মতো ঘটে চলা এক ভয়ংকর সামাজিক বাস্তবতা। মাঝেমধ্যে কোনো একটি ঘটনা গণমাধ্যমে এলে আমরা শিউরে উঠি। পোড়া শরীরের ছবি দেখি, নির্যাতনের বর্ণনা পড়ে আঁতকে উঠি। কয়েকদিন ক্ষোভে ফুঁসি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ভাষা খুঁজি, দোষীদের কঠোর শাস্তি চাই। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ক্ষোভও ম্লান হয়ে যায়। নতুন খবর আসে, পুরনো যন্ত্রণা চাপা পড়ে যায় আর আমাদের দৈনন্দিন জীবন আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে। কিন্তু যাদের শরীরে সেই ক্ষত, যাদের শৈশব পুড়ে যায় গরম খুন্তি, ইস্ত্রির ছ্যাঁক বা অবিরাম মারধরের আঘাতে। যাদের চোখে জমে থাকে আজীবনের ভয়, অবিশ্বাস আর অপমান। তাদের জন্য কিছুই কখনো স্বাভাবিক হয়ে ওঠে না। তারা বাঁচে এক স্থায়ী আতঙ্ক নিয়ে। তাদের যন্ত্রণা কোনো ব্রেকিং নিউজ নয়, কোনো ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ নয়। সেটি প্রতিদিনের, নীরব, দীর্ঘস্থায়ী এক বাস্তবতা, যা ঘরের চার দেয়ালের ভেতরেই ঘটে, সমাজের চোখের আড়ালে। আর এই আড়ালটাই সবচেয়ে বিপদজ্জনক। কারণ এখানে নির্যাতন শুধু ঘটে না, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। ভুক্তভোগীরা হারিয়ে ফেলে প্রতিবাদের ভাষা, আর আমরা হারিয়ে ফেলি লজ্জা বোধের শেষটুকু।

আমরা কি সত্যিই ভুলে গেছি সেই ১১ বছরের শিশু গৃহকর্মী মোহনার কথা, যার ছোট্ট শরীরটা ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল ক্ষুধা, ভয় আর নির্যাতনের এক নীরব দলিলে। যেখানে প্রতিটি দগ্ধ দাগ, প্রতিটি কালশিটে, প্রতিটি ক্ষত যেন লিখে রেখেছিল আমাদের সমাজের নির্মম উদাসীনতার ইতিহাস? দিনের পর দিন তাকে মারধর করা হয়েছিল, ইচ্ছে করে খাবার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল, গরম বস্তু চেপে ধরা হয়েছিল তার কোমল চামড়ায়, যেন তার শরীরটাই ছিল শাস্তি দেওয়ার জন্য সবচেয়ে সহজ জায়গা, সবচেয়ে নিরাপদ কাগজ, যেখানে অপরাধীরা নিশ্চিন্তে তাদের নিষ্ঠুরতা লিখে যেতে পারে। তার অপরাধ কি ছিল? সে কি চুরি করেছিল, কাউকে আঘাত করেছিল, নাকি কেবল দরিদ্র হয়ে জন্মেছিল বলেই তার জীবন এতটাই তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল? বেঁচে থাকার আশায় কাজ করতে আসা, কিংবা দুর্বল হয়ে জন্মানো কি তবে এই সমাজে সবচেয়ে বড় অপরাধ? রাজধানীর এক তথাকথিত “ভদ্র” বাসায় কাজ করতে গিয়ে মোহনার শরীরে যে নির্যাতনের চিহ্নগুলো ধরা পড়েছিল, সেগুলো কোনো হঠাৎ রাগের ফল নয়, বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত সহিংসতার সাক্ষ্য। প্রতিটি আঘাত যেন সমাজের দিকে ছুড়ে দিয়েছিল জ্বলন্ত প্রশ্ন, এই আঘাতগুলো কে করল, কেন করল। আর সবচেয়ে ভীতিকর প্রশ্নটি হলো, এতদিন ধরে কেউ কীভাবে দেখল না, কিংবা দেখেও চুপ করে রইল? তার ক্ষতগুলো যেন নিঃশব্দে আর্তনাদ করে বলছিল, এই যন্ত্রণা একদিনে তৈরি হয়নি, এই যন্ত্রণা জন্ম নিয়েছে আমাদের নীরবতা থেকে। আর আমরা যখন চোখ ফিরিয়ে নিয়েছি, স্বস্তির সঙ্গে বলেছি, এ আমাদের বিষয় নয়, ঠিক তখনই আমরা সবাই একটু একটু করে অপরাধী হয়ে উঠেছি। কারণ ভুলে যাওয়া শুধু স্মৃতির ব্যর্থতা নয়, ভুলে যাওয়া অনেক সময় নির্যাতনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী।

 

এই ঘটনাগুলোর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক শুধু নির্যাতনের মাত্রা নয়, বরং নির্যাতনকারীদের পরিচয়। তারা কেউ অন্ধকার গলিতে ঘুরে বেড়ানো অপরাধী নয়, কেউ মাদকাসক্ত ছিনতাইকারী নয়। তারা ডাক্তার, যাদের হাতে মানুষ প্রাণ খোঁজে। সরকারি কর্মকর্তা, যাদের দায়িত্ব মানুষের অধিকার রক্ষা করা। প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, যাদের অর্থ সমাজে ক্ষমতা এনে দেয়। কখনো কখনো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা মানুষ, যাদের নাম শুনলে আমরা শ্রদ্ধা করতে শিখেছি। ঠিক এই মানুষগুলোর ঘরেই, এই সম্মানিত ঠিকানার ভেতরেই শিশুরা নির্যাতিত হয়।  নারীরা ভেঙে পড়ে, মানবতা ধীরে ধীরে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যায়। এই বৈপরীত্যটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা, যেখানে শিক্ষা, পদমর্যাদা আর ধর্মীয় পরিচয় কাউকে মানবিক করে তোলে না, বরং অনেক সময় নিষ্ঠুরতাকে আরও নিরাপদ আশ্রয় দেয়। কারণ এই ঘরগুলোর দেয়াল উঁচু, দরজা বন্ধ, আর সমাজের দৃষ্টি সেখানে পৌঁছায় না। সেখানে নির্যাতন হয় নিঃশব্দে, আর নীরবতাকেই বানানো হয় সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। আমরা তখন স্বস্তির সঙ্গে বিশ্বাস করি, ভালো পরিবারে এসব হয় না। আর সেই বিশ্বাসের আড়ালেই সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধগুলো নির্বিঘ্নে চলতে থাকে। আর তখন প্রশ্নটা শুধু নির্যাতনের নয়। প্রশ্নটা হয়ে ওঠে আমাদের সমাজের চরিত্র নিয়ে। এমন সমাজে আমরা কাদের মানুষ বলে স্বীকৃতি দিই, আর কাদের জীবন এতটাই তুচ্ছ যে তা ধীরে ধীরে, শব্দহীনভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই সমাজ কি সত্যিই অবাক হয় নির্যাতনের খবরে, নাকি আমরা কেবল অবাক হওয়ার অভিনয় করি, যতক্ষণ না খবরটা পুরনো হয়ে যায় এবং আরেকটি শিশুর আর্তনাদ আমাদের আরামদায়ক নীরবতায় হারিয়ে যায়?

এটা শুধু বাংলাদেশের গল্প নয়, এটা দক্ষিণ এশিয়ার এক গভীরভাবে পচে যাওয়া বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, প্রায় সর্বত্রই গৃহকর্মী শিশুদের ওপর নির্যাতনের খবর মাঝেমধ্যে পত্রিকার পাতায় ভেসে ওঠে, তারপর ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় আমাদের স্মৃতির অন্ধকারে। কোথাও সন্দেহের বশে একটি শিশুকে হত্যা করা হয়, কোথাও বছরের পর বছর আটকে রেখে দাসের মতো খাটানো হয়। শৈশবকে পরিণত করা হয় নিঃশেষ শ্রম আর নীরব যন্ত্রণার দীর্ঘ কারাদণ্ডে। আধুনিক রাষ্ট্র আছে, সংবিধান আছে, আইন আছে, আদালত আছে, সবই আছে কাগজে-কলমে। নেই শুধু মানুষের মূল্য, নেই দুর্বল জীবনের প্রতি ন্যূনতম সংবেদনশীলতা। আর ঠিক এখানেই উঠে আসে সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রশ্নটি। বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যেখানে সংবিধানে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম; যে ধর্ম স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে মানুষের মর্যাদা কোনো রাষ্ট্র দেয় না, আল্লাহ নিজেই তা দান করেছেন। যে ধর্মে দুর্বল মানুষের ওপর জুলুম করাকে সরাসরি স্রষ্টার বিরুদ্ধে যুদ্ধের শামিল বলা হয়েছে। যে ধর্ম স্পষ্টভাবে বলা আছে, “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার হক আদায় করো।” তাহলে এই সমাজে মানবতা এত অনুপস্থিত কেন? এত নিষ্ঠুরতা কীভাবে এত স্বাভাবিক হয়ে উঠল? ধর্ম কি এখানে মানুষকে নৈতিক ও সংবেদনশীল করে তুলছে, নাকি কেবল পরিচয়ের ঢাল, সামাজিক সম্মান রক্ষার মুখোশ, যার আড়ালে নির্বিঘ্নে চলতে পারে নির্যাতন, অবিচার আর নীরব সহিংসতা? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি, কারণ যতদিন আমরা ধর্ম, আইন আর সভ্যতার নাম ব্যবহার করে নিজেদের দায় এড়িয়ে যাব, ততদিন শিশুরা কেবল সংখ্যায় পরিণত হবে, আর মানবতা থাকবে শুধু বক্তৃতা আর শ্লোগানের অলংকার।

ধর্মীয় আচারের আনুষ্ঠানিকতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দৃশ্যমান। ইবাদত পালিত হয়, উৎসব উদযাপিত হয়, পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নৈতিকতার দাবি। অথচ সেই একই ঘরের ভেতরে যদি একটি শিশু অনাহারে থাকে, মার খায়, অপমান আর ভয় নিয়ে দিন পার করে, তখন সেই নৈতিকতার অবস্থান কোথায় দাঁড়ায়? কেন এমন হয় যে ঘরের দরজা পেরোনোর সঙ্গেই মানবতা থেমে যায়, আর দুর্বল মানুষের আর্তনাদ দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে? যে নৈতিক দর্শন দুর্বলকে রক্ষা করার কথা বলে, যে বিশ্বাস ক্ষমতাবানকে সংযত হতে শেখানোর কথা, তা ক্ষমতার বলয়ে ঢুকলেই কেন অদৃশ্য হয়ে যায়? নির্মম সত্য হলো, এই সমাজে মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, উপযোগিতা দিয়ে বিচার করা হয়। যতক্ষণ একজন কাজের মেয়ে বা শিশু গৃহকর্মী কাজ করতে পারে, ততক্ষণ সে প্রয়োজনীয়। তার শ্রমের মূল্য আছে, কিন্তু অসুস্থ হলেই সে হয়ে ওঠে বোঝা, প্রতিবাদ করলেই বিপজ্জনক, আর একদিন নিঃশব্দে মারা গেলে সে রয়ে যায় কয়েক দিনের খবর আর পরিসংখ্যানের একটি সংখ্যা মাত্র। এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল আইনের ব্যর্থতার গল্প নয়। এটি এক গভীর নৈতিক পতনের প্রতিচ্ছবি।কারণ আইন অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করতে পারে, মামলা চালাতে পারে, রায় দিতে পারে, কিন্তু মানুষকে মানুষ করে তোলে যে বিবেক, সেই বিবেক যদি সমাজ জুড়ে ক্ষয়ে যায়, তবে সবচেয়ে শক্ত আইনও শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে একা, নিষ্প্রভ আর অসহায়।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো আমাদের নীরবতা। এক ধরনের আরামদায়ক, স্বার্থপর নীরবতা, যেখানে আমরা অনেকেই জানি, অনেকেই সন্দেহ করি, তবু নিজেদের নিরাপত্তা আর স্বস্তির জন্য বলে উঠি, ওদের ঘরের ব্যাপার। এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অসংখ্য অপরাধের নীরব অনুমোদন, কারণ দেয়ালের ভেতরে যা ঘটে তাকে ব্যক্তিগত বলে মেনে নিয়ে আমরা অনায়াসেই আমাদের মানবিক দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলি, বিবেককে বোঝাই যে এটি আমাদের দেখার বিষয় নয়। অথচ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধগুলো সংঘটিত হয় তখনই, যখন সমাজ কথা বলা বন্ধ করে দেয়, যখন অন্যায়ের সামনে নীরবতা হয়ে ওঠে সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী। যে সমাজে ঘর নিরাপদ থাকে কিন্তু মানুষ নিরাপদ থাকে না, সেখানে রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল কাগজের পরিসংখ্যান, জিডিপি আর সূচকের বাহারি প্রদর্শনী। সেখানে উঁচু উঁচু ভবন দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু নৈতিকতার ভিত ভেঙে পড়ে ধীরে ধীরে, অদৃশ্যভাবে। সেখানে শিশুর কান্না চাপা পড়ে যায় এসির একটানা শব্দে, দরজা বন্ধ থাকে, পর্দা টানা থাকে, আর মানবতার মৃত্যু ঘটে নিঃশব্দে, সম্মানিত ঠিকানার ভেতরে, যেখানে বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক, নিরাপদ, এমনকি ঈর্ষণীয় বলেই মনে হয়।

প্রশ্নটা এখন আর শুধু কাজের মেয়েদের বা নির্যাতিত শিশুদের নয়। প্রশ্নটা আমাদের সবার অস্তিত্বকে ছুঁয়ে যায়। আমরা আসলে কি ধরনের সমাজ হতে চাই, কি ধরনের মানুষ হয়ে উঠতে চাই? এমন এক সমাজ, যেখানে সংবিধানে ধর্মের নাম জ্বলজ্বল করে, কিন্তু দৈনন্দিন আচরণে তার কোনো ছাপ নেই। যেখানে ঘরের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, অথচ সেই ঘরের ভেতরের মানুষ অনিরাপদ থাকে। যেখানে দেয়াল, তালা আর সিসিটিভি রক্ষা পায়, কিন্তু মানবজীবনের মর্যাদা ক্রমে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে? নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে মানবতা কোনো বিলাসী ধারণা বা ঐচ্ছিক সদ্গুণ নয়, বরং বেঁচে থাকার ন্যূনতম শর্ত। যেখানে দুর্বলকে রক্ষা করা দায়িত্ব, নীরব না থাকা সাহস, আর প্রতিবাদ করা নাগরিকত্বের অংশ? এই প্রশ্নের উত্তর আইন একা দিতে পারবে না, ধর্মীয় স্লোগানও নয়; এই উত্তর জন্ম নেয় আমাদের প্রতিদিনের সিদ্ধান্তে। চুপ থাকব, না কথা বলব।  চোখ ফিরিয়ে নেব, না পাশে দাঁড়াব। আমরা যদি এখনই এই উত্তর না দিই, ইতিহাস ঠিকই আমাদের হয়ে উত্তর লিখে দেবে। আর সেই রায় হবে নির্মম, কারণ ইতিহাস কখনো নীরবতাকে নির্দোষ বলে মানে না, কিন্তু মানবতাকে বেছে নেওয়া সমাজকেই শেষ পর্যন্ত সত্যিকারের উন্নত বলে স্বীকৃতি দেয়।

Leave your review