একুশ: আমাদের মায়ের নাম


একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ভূখণ্ডের মানুষের আত্মপরিচয়ের তিলক, বেঁচে থাকার নির্ভরতা ও চেতনায় অগ্নি-স্পর্শ। একুশ কোনো ক্যালেন্ডারের সাধারণ দিন নয়। একুশ একটি সংগ্রাম, এক অনন্ত জাগরণ। এটি সময়ের পাতায় লেখা একটি জীবন্ত চেতনা, যা যুগ থেকে যুগান্তরে বাঙালির রক্তে, ভাষায় ও মানসে প্রবাহিত হয়ে চলেছে। এই দিনটি আমাদের শিরায় উপশিরায় প্রবাহিত এক অদৃশ্য রক্তধারা। যার নাম ভাষা, যার নাম চেতনা, যার নাম অস্তিত্ব। যে রক্তধারা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কেবল একটি ভূখণ্ডের বাসিন্দা নই, আমরা একটি ইতিহাসের উত্তরাধিকারী। বাংলাদেশ ভূখণ্ডের মানুষের জন্য একুশ মানে কেবল অতীতের কোনো স্মৃতিচারণ নয়। বরং প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা, অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার শক্তি এবং নিজের পরিচয় নিয়ে গর্ব করার সাহস। একুশ আমাদের মায়ের আত্মা, যে ভাষায় প্রথম ডাক শুনে আমরা মানুষ হয়েছি। একুশ আমাদের জাতিগত স্মৃতি, যেখানে রক্ত, অশ্রু আর স্বপ্ন একসাথে মিশে আছে। এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও অমলিন চিহ্ন, যা কোনো শাসকের নির্দেশে মুছে যাওয়ার নয়, কোনো নতুন সংগ্রামের নামেও বিস্মৃত হওয়ার নয়। একুশ আমাদের আত্ম জাগরণের পুরোহিত।

এই দিনটি আমাদের যোগ্য শিক্ষক। যার কাছ থেকে আমরা শিখেছি কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়, কীভাবে ভয়কে অতিক্রম করে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে নিজের ভাষায় নিজের কথা বলার অধিকারকে জীবনের চেয়েও মূল্যবান করে তুলতে হয়। এই দিনটি আমাদের কানে কানে বলে যায়, ভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়, ভাষাই আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি, ভাষাই আমাদের আত্মসম্মানের শেষ আশ্রয়, আর সেই ভাষাকে ভালোবাসা মানেই নিজেকে ভালোবাসা, নিজের মানুষ হওয়াকে সম্মান করা। আমরা যেমন মাকে কেবল জন্মদাত্রী হিসেবে দেখি না, তেমনি একুশও কেবল একটি দিনের নাম নয়। মা যেমন ভাষা শেখান, হাঁটতে শেখান, মাথা তুলে দাঁড়াতে শেখান, একুশও তেমনি আমাদের কথা বলতে শিখিয়েছে, প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছে, অপমানের সামনে নত না হতে শিখিয়েছে। মা যেমন নিভৃতে সন্তানের শক্তি হয়ে থাকেন, একুশও তেমনি নীরবে আমাদের আত্মসম্মানকে আগলে রেখেছে। তাই একুশ কোনো স্লোগান নয়, কোনো আনুষ্ঠানিক স্মৃতি নয়। একুশ আমাদের মায়ের নাম—যে আমাদের ভাষা দিয়েছে, পরিচয় দিয়েছে, মানুষ হয়ে ওঠার সাহস দিয়েছে। তাকে ভুলে যাওয়া মানে নিজের ভেতরের মানবিকতাকেই অস্বীকার করে দানবীয় হয়ে ওঠা।

মানুষ যখন জন্মায়, তখন সে কোনো রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে জন্মায় না। সে জন্মায় একটি ভাষার সন্তান হয়ে। এই ভাষাই তাকে মানুষ করে তোলে, তাকে চিনতে শেখায় কে সে, কোথা থেকে এসেছে, আর কীভাবে সে পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়াবে। জীবনের প্রথম আলো, প্রথম অনুভব, প্রথম ভালোবাসা সবই ধরা দেয় মায়ের মুখে শোনা প্রথম শব্দে। আর সেই শব্দের মধ্য দিয়েই একটি শিশুর মনে গড়ে ওঠে অনুভূতির বর্ণমালা, ভাবনার কাঠামো, পৃথিবীকে দেখার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলা ভাষা আমাদের কাছে তাই কেবল বাক্য গঠনের উপকরণ নয়। এটি আমাদের মানসিক ঘরবাড়ি, যেখানে আমরা আশ্রয় নিই, এটি আমাদের স্বপ্নের ঠিকানা, যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকাই। এই ভাষায় আমরা হাসি, কাঁদি, প্রেমে পড়ি, প্রতিবাদ করি। এই ভাষাতেই আমরা মানুষ হয়ে উঠি। বাংলাকে অস্বীকার করা মানে আমাদের চিন্তাকে অস্বীকার করা, আমাদের অনুভূতিকে দমিয়ে রাখা, আমাদের অস্তিত্বকে মুছে ফেলা। আর সেই অন্যায় অস্বীকৃতির বিরুদ্ধেই একদিন রাজপথে নেমে এসেছিল বাংলার তরুণেরা। হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, কোনো ক্ষমতার আসন ছিল না, ছিল শুধু বুকভরা সাহস, অদম্য প্রত্যয় আর মাতৃভাষার প্রতি গভীর, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। তারা প্রমাণ করে দিয়েছিল, শক্তি বন্দুকে নয়, শক্তি বিশ্বাসে। শক্তি শাসনে নয়, শক্তি ভাষায়। সেই তরুণদের আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে, যে ভাষায় আমরা কথা বলি, সেই ভাষার মর্যাদা রক্ষা করাই মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখাই শেষ পর্যন্ত মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম।

একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের ইতিহাসের সেই অগ্নি ক্ষণ, যখন ভাষা রাজনীতির সীমা ছাড়িয়ে সরাসরি অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল। যখন শব্দের লড়াই রূপ নিয়েছিল বেঁচে থাকার লড়াইয়ে। সেদিন প্রশ্ন ছিল না শুধু কোন ভাষা রাষ্ট্রভাষা হবে। প্রশ্ন ছিল আরও গভীর, আরও মৌলিক।আমরা কি আমাদের মতো করে ভাবতে পারব, আমাদের মতো করে কথা বলতে পারব, আমাদের সংস্কৃতি ও আত্মাকে অক্ষত রেখে বেঁচে থাকতে পারব তো? এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে কোনো আপস সম্ভব ছিল না, কোনো নীরবতা ছিল না নিরাপদ। রাজপথে নেমে আসা ছাত্রদের বুকের রক্তেই সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর লেখা হয়েছিল। ভাষা কোনো শাসকের অনুগ্রহ নয়, কোনো রাষ্ট্রের দয়া নয়। ভাষা মানুষের জন্মগত অধিকার, মানুষের আত্মার অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই রক্তে ভেজা উত্তরই ইতিহাসের অমোঘ সত্য হয়ে আজও আমাদের পথ দেখায়। কিন্তু সময়ের প্রবাহে, সেই রক্তের বিনিময়ে পাওয়া অধিকার আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এতটাই স্বাভাবিক অংশ হয়ে গেছে যে আমরা প্রায় ভুলে যেতে বসেছি, এই স্বাভাবিকতার পেছনে কতটা যন্ত্রণা, কতটা আত্মত্যাগ, কতগুলো তরুণ জীবন নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। একুশ আমাদের তাই শুধু গর্ব করতে শেখায় না, সতর্কও করে দেয়, যে অধিকার রক্ত দিয়ে কেনা, তাকে অবহেলায় হারিয়ে ফেলা ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

একুশ আমাদের দর্শনের গভীরতম জায়গাটিকে স্পষ্ট করে দেয়। এটি আমাদের শেখায় ভাষা কেবল শব্দের সমষ্টি নয়, ভাষা একটি জাতির চিন্তার কাঠামো, অনুভবের মানচিত্র এবং আত্মার ভাষ্য। যে ভাষায় আমরা ভাবি, সেই ভাষাই আমাদের পৃথিবী দেখার চোখ তৈরি করে, আমাদের ভালো-মন্দের বোধ গড়ে তোলে, আমাদের ন্যায়-অন্যায়ের সীমা নির্ধারণ করে। মাতৃভাষায় কথা বলার স্বাধীনতা মানে শুধু মুখে শব্দ উচ্চারণের স্বাধীনতা নয়। এটি নিজের মতো করে ভাবার, প্রশ্ন করার, স্বপ্ন দেখার এবং সত্য বলার স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা ছাড়া মানুষ কেবল একটি চলমান দেহ মাত্র। তার চিন্তা বন্দী, তার অনুভূতি শৃঙ্খলিত, তার আত্মা অসম্পূর্ণ। একুশ আমাদের এই কঠিন সত্যটি মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা কখনো হঠাৎ করে নেমে আসে না আকাশ থেকে। এটি আসে দীর্ঘ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে, আসে ত্যাগের ভেতর দিয়ে, আসে এমন মানুষদের হাত ধরে যারা জানত, নিজের ভাষা রক্ষা না করতে পারলে কোনো স্বাধীনতাই টেকসই হয় না। এই একুশই ধীরে ধীরে আমাদের অন্য সব আন্দোলনের ভিত তৈরি করেছে, আমাদের সাহসের ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে উঠেছে। ভাষার জন্য যে জাতি জীবন দিতে পারে, সে জাতি কোনো অন্যায়ের সামনে মাথা নত করে না, কোনো অবিচারের সঙ্গে আপস করতে শেখে না। একুশ থেকে যে চেতনার জন্ম হয়েছিল, সেটিই পরবর্তীতে আমাদের অধিকার আন্দোলনগুলোকে শক্তি জুগিয়েছে, মানুষকে সংগঠিত করেছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার করেছে। তাই একুশ কখনোই শুধু একটি দিনের স্মৃতি হয়ে থাকেনি। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, একটি জাগ্রত চেতনা, যা আমাদের ইতিহাসকে বারবার নাড়িয়ে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। একুশ আমাদের শেখায়, যে জাতি নিজের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে জানে, সেই জাতিই নিজের ভাগ্য গড়ার অধিকার রাখে।

আজকের নতুন প্রজন্ম হয়তো সেই রক্তাক্ত রাজপথ দেখেনি, শোনেনি গুলির শব্দ, দেখেনি তরুণদের নিথর দেহ। তারা জন্মেছে একটি স্বাধীন দেশে, যেখানে বাংলায় কথা বলা স্বাভাবিক, বাংলায় পড়াশোনা করা স্বাভাবিক, জাতীয় পতাকা ও সংগীত দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার ভেতরেই সবচেয়ে ভয়ংকর ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে। ভুলে যাওয়ার ঝুঁকি। ভুলে যাওয়া যে, এই স্বাধীনতা কোনো দুর্ঘটনা নয়, কোনো হঠাৎ পাওয়া উপহার নয়। এটি রক্তে লেখা, ত্যাগে গড়া, অগণিত স্বপ্নের দামে কেনা। যখন ইতিহাসকে ইচ্ছাকৃত ভাবে বিকৃত করা হয়, যখন স্বাধীনতার গল্পকে মুছে ফেলতে চাওয়া হয়, যখন জাতির জনক, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় সংগীত বা স্বাধীনতার স্মৃতিচিহ্নকে অস্বীকার বা ধ্বংস করার চেষ্টা চলে, তখন আসলে আঘাত করা হয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শেকড়ে। কারণ ইতিহাস ধ্বংস মানে কেবল ইট-পাথর ভাঙা নয়, ইতিহাস ধ্বংস মানে একটি জাতির আত্মাকে আহত করা। যে প্রজন্ম নিজের অতীতকে সম্মান করতে শেখে না, সে প্রজন্ম ভবিষ্যতের দায়িত্ব বহন করার শক্তিও হারিয়ে ফেলে।

 

ভুলে গেলে চলবে না, মাতৃভাষাকে অবহেলা করা, স্বাধীনতার ইতিহাসকে অস্বীকার করা, জাতীয় পরিচয়ের স্তম্ভগুলো ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা, সবই একই সূত্রে গাঁথা। এগুলো আমাদের ধীরে ধীরে শেকড় ছাড়া করে দেওয়ার প্রক্রিয়া। একটি জাতি তখনই সবচেয়ে দুর্বল হয়, যখন তাকে বলা হয় তার অতীতের কোনো মূল্য নেই, তার বীরদের কোনো প্রয়োজন নেই, তার আত্মত্যাগ কেবল গল্প মাত্র। নতুন প্রজন্মের প্রতি তাই এই সময়ের সবচেয়ে জরুরি আহ্বান, তোমরা প্রশ্ন করো, জানো, পড়ো, বোঝো। ইতিহাসকে ভালোবাসো, কারণ ইতিহাসই তোমাদের শক্তি। যারা ভাষার জন্য, স্বাধীনতার জন্য, একটি মানচিত্রের জন্য জীবন দিয়েছে, তারা কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে, তারা জাতির বিবেক। তাদের স্মৃতি রক্ষা করা মানে কেবল অতীতকে সম্মান করা নয়, নিজেদের অস্তিত্বকে রক্ষা করা। একুশ, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় সংগীত, জাতীয় স্মৃতি, এসব মুছে গেলে আমরা শুধু একটি দেশ হারাব না, আমরা হারাব নিজেদের পরিচয়। তাই নতুন প্রজন্মকে বুঝতে হবে, ইতিহাস বাঁচানো মানেই ভবিষ্যৎ বাঁচানো, আর সেই দায়িত্ব কারও একার নয়, এটি আমাদের সবার।

বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হওয়া জরুরি। অন্য ভাষা শেখা জরুরি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব দরজা খুলে দেওয়াও জরুরি। কিন্তু নিজের ভাষাকে পেছনে ফেলে দিয়ে নয়। মাতৃভাষার উপর দাঁড়িয়েই অন্য ভাষা শেখা সবচেয়ে শক্ত ভিত তৈরি করে, কারণ যে মানুষ নিজের ভাষায় দৃঢ়, সে মানুষই আত্মবিশ্বাস নিয়ে অন্য ভাষার জগতে প্রবেশ করতে পারে। যার একটি স্পষ্ট পরিচয় আছে, একটি দৃঢ় কেন্দ্র আছে, সেই মানুষই সত্যিকারের বিশ্ব নাগরিক হতে পারে। এই সত্যটিই একুশে ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব-মানবতার সম্পদে পরিণত করেছে। ভাষার জন্য বাঙালির রক্তদানের ইতিহাস কেবল আমাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই ত্যাগ একদিন বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। সেই কারণেই জাতি সংঘের স্বীকৃতিতে ২১শে ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। একটি জাতির সংগ্রাম থেকে জন্ম নেওয়া এমন একটি দিবস, যা সারা পৃথিবীর মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, মাতৃভাষা রক্ষা করা মানে মানবিক বৈচিত্র্য রক্ষা করা। বিশ্বের ইতিহাসে খুব কমই আছে এমন উদাহরণ, যেখানে ভাষার অধিকারের জন্য জীবন দেওয়া হয়েছে, আর সেই আত্মত্যাগ বিশ্বজনীন স্বীকৃতি পেয়েছে। একুশ সেই বিরল ইতিহাস, যা আমাদের গর্বের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বও বাড়িয়ে দেয়।

এই ইতিহাসকে আরও গভীরভাবে জানতে হলে আমাদের মনে রাখতে হবে একটি বিস্মৃত অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাম  ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর প্রথম যে মানুষটি পাকিস্তান গণপরিষদে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট কণ্ঠে দাবি তুলছিলেন যে বাংলাও রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত, তিনি ছিলেন একজন হিন্দু বাঙালী। তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ভাষার অধিকার নিয়ে কথা বলেছিলেন নির্ভীক ভাবে, কোনো সাম্প্রদায়িক পরিচয় নয়, বরং ন্যায় ও মানবিকতার ভিত্তিতে। কতজন আজ এই সত্যটি জানি? কতজন জানি যে ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্নে ধর্ম নয়, ভাষাই ছিল মূল পরিচয়? এই জানা আমাদের জন্য জরুরি, কারণ ইতিহাসকে জানাই মানে ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা। যারা ভাষার অধিকারের কথা বলেছিলেন, তারা কেউ ক্ষমতার জন্য নয়, তারা কথা বলেছিলেন মানুষের সম্মানের জন্য। একুশ আমাদের কাছে তাই শুধু ফুল দেওয়ার আনুষ্ঠানিক দিন নয়, শুধু শহীদ মিনারে মাথা নত করার আনুষ্ঠানিকতা নয়। একুশ মানে সচেতনভাবে বাংলা বলা, বাংলাকে ভালোবাসা, বাংলায় ভাবার সাহস রাখা। একুশ মানে অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করা, কারণ এই ভাষাই আমাদের প্রতিবাদের ভাষা, আমাদের সত্য বলার ভাষা। একুশ মানে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে গর্ব করা। একুশ আমাদের শিখিয়েছে, ভাষা হারালে শুধু শব্দ হারায় না। হারায় স্মৃতি, হারায় পরিচয়, হারায় মানুষ হয়ে ওঠার সবচেয়ে মৌলিক অধিকার।

এই দিনটি আমাদের নতুন প্রজন্মকে গভীরভাবে মনে করিয়ে দেয়, তোমরা কেবল একটি দেশের নাগরিক নও, তোমরা একটি ভাষার উত্তরাধিকার বহন করছ, যা রক্তে কেনা, ত্যাগে গড়া এবং ইতিহাসে অমর। এই উত্তরাধিকার কোনো জাদুঘরে রাখা নিস্তেজ স্মারক নয়। এটি জীবন্ত, স্পন্দিত, প্রতিদিন লালন করার মতো একটি দায়িত্ব। যদি আমরা এই ভাষাকে অবহেলায় ফেলে দিই, যদি আমরা এর ইতিহাস ভুলে যাই বা ইচ্ছাকৃত ভাবে অস্বীকার করি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার মতো আমাদের আর কিছুই থাকবে না। না আত্মপরিচয়, না গর্ব, না নৈতিক শক্তি। একুশ তাই কেবল অতীতের প্রতি নীরব শ্রদ্ধা নয়। এটি বর্তমানের প্রতি এক গভীর দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যতের প্রতি এক দৃঢ় অঙ্গীকার। যে অঙ্গীকার বলে, আমরা আমাদের ভাষা, আমাদের ইতিহাস এবং আমাদের আত্মসম্মানকে কোনোদিন বিসর্জন দেব না। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের সবচেয়ে নির্মম অথচ সবচেয়ে সত্য কথাটি শেখায়, ভাষা ছাড়া মানুষ শূন্য, পরিচয় ছাড়া জাতি অচেনা, আর আত্মসম্মান ছাড়া কোনো ভবিষ্যৎ টিকে থাকতে পারে না। এই উপলব্ধি যেন আমাদের জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রতিফলিত হয়। আমাদের কথায়, আমাদের লেখায়, আমাদের শিক্ষায়, আমাদের রাজনীতিতে, আমাদের সিদ্ধান্তে। একুশ হোক কেবল বছরে একদিনের আবেগ নয়, হোক প্রতিদিনের চেতনা, প্রতিদিনের সাহস।

একুশ আজ আমাদের সামনে একটিই অমোঘ প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি কেবল উত্তরাধিকার পেয়েই ক্ষান্ত থাকব, নাকি সেই উত্তরাধিকার রক্ষা ও বহন করার নৈতিক যোগ্যতা অর্জন করব? সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি কীভাবে উন্মত্ততা ও গোষ্ঠী গত সহিংসতা ইতিহাসের স্মারক ধ্বংস করেছে, স্বাধীনতার চেতনাকে আঘাত করেছে, এমনকি জাতীয় সংগীত ও জাতিসত্তার মৌল ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। কিন্তু একুশ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ইতিহাস কোনো শাসকের ইচ্ছায় লেখা বা মুছে ফেলা যায় না। যে ভাষা আমাদের মানুষ করেছে, যে ভাষা আমাদের মাথা নত না করতে শিখিয়েছে, সেই ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখাই সর্বোচ্চ দেশপ্রেম। একুশ আমাদের ডাকে স্মৃতির ভেতর আটকে থাকার জন্য নয়, বরং স্মৃতি থেকে শক্তি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। একুশ তাই কেবল কান্নার দিন নয়, আনুষ্ঠানিকতার দিনও নয়—এটি প্রতিজ্ঞার দিন। প্রতিজ্ঞা এই যে আমরা ইতিহাস ভুলব না, ভাষাকে অবহেলা করব না, আত্মসম্মান বিসর্জন দেব না। যারা ইতিহাসের পাতা মুছে ফেলতে চায়, তারা ভুলে যায়—ইতিহাসই একদিন তাদের মুছে ফেলে। যতদিন বাংলায় সত্য বলা হবে, যতদিন বাংলায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উচ্চারিত হবে, যতদিন নতুন প্রজন্ম গর্ব করে বলবে “এটাই আমার ভাষা”—ততদিন একুশ বেঁচে থাকবে। আর একুশ বেঁচে থাকলে, বেঁচে থাকবে বাংলাদেশ, বেঁচে থাকবে বাঙালির আত্মা।

Leave your review