“একি কথা শুনি আমি মন্থরার মুখে” পশ্চিমা গণতন্ত্রের ভণ্ডামি


“একি কথা শুনি আমি মন্থরার মুখে”। এই বাক্যটি কেবল একটি বিস্ময়সূচক উক্তি নয়। বাক্যটির মধ্যে লুকিয়ে আছে সন্দেহের বিষাক্ত সূক্ষ্ম কাঁটা, যা কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা উদ্দেশ্যকে গভীর ভাবে স্পর্শ করে। এই উক্তিটির মধ্যে সরাসরি কোন অভিযোগ নেই, আবার সরল কৌতূহলও নেই। আছে অবিশ্বাসের মৃদু কম্পন। স্মৃতির ভারে নুয়ে পড়া অভিজ্ঞতা। অতীত থেকে উঠে আসা এক গভীর সতর্কবার্তা। কথা সব সময় নির্দোষ নয়, বিশেষত যখন তা ক্ষমতা ও নৈতিকতার ভাষা ধার করে আসে। এই উক্তিটির শিকড় প্রোথিত রয়েছে প্রাচীন রামায়ণের আখ্যানে। মন্থরা ছিলেন অযোধ্যার রানি কৈকেয়ী-এর দাসী ও ধাত্রী। মন্থরার প্রধান পরিচয় আসে তাঁর কূটবুদ্ধি ও ষড়যন্ত্রমূলক পরামর্শের জন্য। রাজা দশরথ যখন শ্রী রামকে যুবরাজ হিসেবে অভিষেক করতে উদ্যোগী হন, তখন মন্থরা কৈকেয়ীর মনে ঈর্ষা ও আশঙ্কা জাগিয়ে তোলেন। তিনি কৈকেয়ীকে স্মরণ করিয়ে দেন দশরথের দেওয়া দুই বর দানের কথা এবং সেই বর ব্যবহার করে, রামকে ১৪ বছরের জন্য বনবাসে পাঠানো এবং ভরতকে অযোধ্যার রাজা করা, এই দুই দাবি আদায়ে প্ররোচিত করেন। এর ফলেই রামায়ণের কাহিনীতে এক নাটকীয় মোড় আসে: রামের বনবাস এবং পরবর্তী দীর্ঘ সংগ্রামের সূচনা। এই কারণে মন্থরাকে প্রায়ই রামায়ণের “খলচরিত্র” হিসেবে দেখা হয়। এই পৃথিবীর ভূ-রাজনীতিতে এমন মন্থরাদের সংখ্যা অগণিত। ইতিহাসের পথ পরিবর্তনে তাদের যাদু-টোনার প্রভাব বেশ দৃঢ়। একটু চোখ-কান খুললেই দেখতে পাবেন এদের বিচরণ।

রামায়ণের মন্থরার কথার জাদু বাহ্যত যুক্তিসংগত, এমনকি ন্যায়ের ভাষায় মোড়া হলেও, তার অন্তর্গত উদ্দেশ্য ছিল বিভাজন ও সর্বনাশ। তাঁর বাক্য সত্যের মুখোশ পরে বিশ্বাস ভাঙার কাজ করেছিল, রাজপরিবারের ভেতরে সন্দেহের বীজ বপন করেছিল, এবং ইতিহাসের গতিপথ ঘুরিয়ে দিয়েছিল এক অনিবার্য বিপর্যয়ের দিকে। তাই মন্থরার নাম আজ আর কেবল একটি চরিত্র নয়। নামটি একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে। চতুর বাকচাতুর্যের, নৈতিকতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্বার্থপরতার। এই প্রতীকের শক্তি আজও অম্লান। সমসাময়িক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে, বিশেষ করে যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ পশ্চিমা দেশগুলো গণতন্ত্র, মানবাধিকার, স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা বা নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে উচ্চকণ্ঠ হয়, তখন এই বাক্যটি নতুন করে প্রতিধ্বনিত হয়। প্রশ্ন জাগে: এই কথা কি নিছক ন্যায়ের আহ্বান, নাকি এর পেছনে আছে কৌশল, স্মৃতির নির্বাচনী ব্যবহার, এবং ক্ষমতার সূক্ষ্ম হিসাব? ঠিক যেমন মন্থরার কথায় একসময় সত্য আর স্বার্থের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল, তেমনি আজও এই উক্তি আমাদের সতর্ক করে দেয়: কে বলছে, কোন প্রেক্ষিতে বলছে, এবং সেই কথার পরিণতি কার জন্য কি। এই প্রশ্নগুলো না তুললে ইতিহাস বারবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করবে।

কেন এই উক্তিটি এখানে টেনে আনা? এই লাইনটির মূল শক্তিই বা কোথায়? এই লাইনটির মূল শক্তি আসলে তার স্মৃতি বাহী প্রতিধ্বনিতে। এটি এমন এক মুহূর্তে উচ্চারিত হয়, যখন আমরা বর্তমানের ভেতর অতীতের ছায়া স্পষ্ট দেখতে পাই। যখন কোনো পরিচিত সুর আবার কানে আসে, অথচ সেই সুর একদিন সর্বনাশের পূর্বাভাস ছিল। এই বাক্যটি আমাদের বলে দেয়, ইতিহাস সব সময় নতুন ভাষায় কথা বলে না। অনেক সময় সে পুরনো শব্দই ব্যবহার করে, শুধু প্রেক্ষাপট বদলে যায়। মন্থরার কণ্ঠ ছিল মধুর, তার যুক্তি ছিল সাজানো, তার বক্তব্য ছিল আংশিক সত্যের ওপর দাঁড়ানো। কিন্তু সেই সত্য ছিল নির্বাচিত, উদ্দেশ্য ছিল আচ্ছাদিত। সে কখনো মিথ্যে বলেনি পুরোপুরি, আবার সত্যও বলেনি সম্পূর্ণ। এই মধ্যবর্তী ধূসর অঞ্চলেই তার শক্তি নিহিত ছিল। যেখানে শ্রোতা নিজেই বিভ্রান্ত হয়, সন্দেহ আর বিশ্বাসের দোলাচলে দুলতে থাকে। তাই মন্থরার কথা বিপজ্জনক ছিল তার তীক্ষ্ণতার জন্য নয়, বরং তার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য। এইখানেই বাক্যটির রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর হয়ে ওঠে। রাজনীতিতে সবচেয়ে কার্যকর ভাষা প্রায়শই সেই ভাষা, যা নৈতিকতার আবরণ পরে আসে। আজ যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ তাদের দোসররা বিশ্বমঞ্চে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের কথা বলে, তখন সেই ভাষা নিঃসন্দেহে উচ্চকিত ও নীতিনিষ্ঠ শোনায়। কিন্তু ঠিক তখনই এই লাইনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নৈতিক ভাষা নিজেই প্রশ্নাতীত নয়। প্রশ্ন জাগে, এই মূল্যবোধগুলো কি সর্বত্র সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়, নাকি ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী তার ব্যাখ্যা বদলে যায়? এই সন্দেহ কোনো সরল অবিশ্বাস নয়। এটি অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া সতর্কতা। অতীত আমাদের শিখিয়েছে, ক্ষমতার ভাষা যতই আদর্শবাদী হোক না কেন, তার পেছনের নীরব হিসাবগুলো বোঝা জরুরি। “একি কথা শুনি আমি মন্থরার মুখে”, এই উক্তি তাই এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মরক্ষা। এটি আমাদের থামিয়ে দেয়, ভাবতে শেখায়, এবং মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাসে সবচেয়ে বিপজ্জনক কথাগুলো প্রায়ই আসে নৈতিকতার সুরে।

এই লাইনটির রাজনৈতিক তাৎপর্য তখনই নির্মমভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন আমরা সাম্প্রতিক বিশ্ব রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে এটি মিলিয়ে দেখি। এই নতুন বছরের ঊষা লগ্নে  ভেনিজুয়েলায় যা ঘটে গেলো তা অবিশ্বাসযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের মাধ্যমে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে জোড় করে ধরে নিয়ে যায় যুক্ত রাষ্ট্রে। দেশটিতে চালানো হয়েছে ব্যাপক হামলা। এই ন্যক্কারজনক হামলাকে আন্তর্জাতিক ভাবে নিন্দা জানানো হয়। সৃষ্টি করেছে ব্যাপক বিতর্ক ও প্রশ্নের। এই হস্তক্ষেপকে জাতিসংঘ সহ বিশ্বের শতাধিক দেশ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সার্বভৌমত্ব ও শান্তির নীতির প্রতি চূড়ান্ত হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেছে বিশ্ববাসী। তবে ইউরোপীয় ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো এ ব্যাপারে ছিল একেবারে নীরব। অথচ পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বিশেষ সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে বিশ্বমঞ্চে নৈতিক এবং আইনগত অবস্থান নেয় শক্ত ভাবে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযানের পর থেকেই দৃঢ় ভাষায় নিন্দা জানিয়েছে, হাজারো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা আর সার্বভৌমত্ব  রক্ষার কথা বলেছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু আজ যখন ভেনিজুয়েলা এমন নগ্ন হস্তক্ষেপ হয়, চারিদিকে নিন্দার ঝড় উঠে. তখন পশ্চিমা নীতির নীরবতা ও সংযত বাস্তবকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

তাই “একি কথা শুনি আমি মন্থরার মুখে”, এই উক্তিটি যেমন অতীতের বিতর্কিত কণ্ঠের স্মৃতি জাগায়, তেমনি গত দুই-তিন দশকের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একই রকম দ্বৈত মানদণ্ডের ভাবনাকে খতিয়ে দেখাতে অনুরূপ প্রেক্ষাপট তৈরি করছে। পশ্চিমারা যখন গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনকে সর্বজনীন সত্য হিসেবে ঘোষণা করে, তখনও সেই একই উচ্চকণ্ঠ নীতিগত বক্তব্য শুনে আমাদের হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠে। এ বুঝি আবার কোন নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হচ্ছে। এটি কোনো সরল রাজনৈতিক সমালোচনা নয়। বরং ভাবনার বিষয় যে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ভাষা কতটা নির্বাচনী হতে পারে যখন এটি নির্দিষ্ট ঘটনা বা পক্ষের বিরুদ্ধে জোরালো হয়। ঠিক সেই কারণেই এই লাইনটি শক্তিশালী। যখন নৈতিক উচ্চভূমিতে উচ্চারিত কথাগুলো বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না, তখন সেই ভাষার স্বার্থ, উদ্দেশ্য ও প্রভাব পুনরায় প্রশ্নের মুখে পড়ে। কাগজে-কলমে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো নিজেকে একটি নৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে। এই শক্তি যেন বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই নৈতিক ভাষা আর বাস্তব নীতির মধ্যে কি ক্রমশ একটি স্পষ্ট ফাঁক তৈরি হচ্ছে না? মন্থরার মতোই কি এখানে কথার মধুরতা বাস্তবের কঠোর হিসাবকে আড়াল করছে না?

যখন কোনো দেশ পশ্চিমা কৌশলের বাইরে অবস্থান নেয়, তখন সেখানে গণতন্ত্রের ঘাটতি হঠাৎ-ই প্রধান আলোচ্য হয়ে ওঠে। আবার মিত্র বা কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সেই একই ঘাটতি “অভ্যন্তরীণ বিষয়” বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। এই দ্বৈত মানদণ্ড আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও জ্বালানি রাজনীতির ক্ষেত্রে। রাশিয়া–ইউক্রেন সংকটের পর রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য চীন ও ভারত–কে প্রকাশ্যে হুমকি ও চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। নৈতিক ভাষায় বলা হয়েছে, “যুদ্ধ অর্থনীতিকে অর্থ জোগানো যাবে না।” অথচ বাস্তবতা হলো, গত দুই–তিন বছরে ইউরোপ নিজেই রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কিনেছে, বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস। পাইপলাইনের সরবরাহ কমলেও, ইইউ দেশগুলো রাশিয়ান এলএনজি আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করেনি, বরং গত বছর দুয়েক তা আগের তুলনায় বেড়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অপরিশোধিত তেল না কিনলেও, রাশিয়ান ইউরেনিয়াম, পারমাণবিক জ্বালানি ও পরোক্ষভাবে তেল জাত পণ্যের ওপর নির্ভরতা বজায় রেখেছে। এখানেই মন্থরার কণ্ঠ সবচেয়ে পরিচিত শোনায়। কথা সত্যের কাছাকাছি, কিন্তু প্রয়োগে নির্বাচিত। এই কারণেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক গভীর অনাস্থা জন্ম নিচ্ছে। গণতন্ত্র কি সত্যিই একটি সার্বজনীন নীতি, নাকি এটি শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর হাতে এক ধরনের কূটনৈতিক ভাষা, যা প্রয়োজনে অস্ত্র, আবার প্রয়োজনে নীরবতা? ভেনিজুয়েলা ইস্যুতে পশ্চিমা নীরবতা, রাশিয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নৈতিক বক্তৃতা, আর জ্বালানি বাণিজ্যে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার বাস্তবতা, সব মিলিয়ে একই প্রশ্ন ফিরে আসে। “একি কথা শুনি আমি মন্থরার মুখে” তাই আজ নিছক সাহিত্যিক ব্যঙ্গ নয়, এটি একটি রাজনৈতিক সতর্ক সংকেত। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, নৈতিকতার ভাষা যখন ধারাবাহিকতা হারায়, তখন তা বিশ্বাস জন্মায় না। বরং সন্দেহের বীজ বপন করে।

এই অনাস্থার ভিত্তি আরও গভীর হয় যখন আমরা গত দুই দশকের বৈশ্বিক হস্তক্ষেপগুলোর দিকে তাকাই, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন–এর নেতৃত্বাধীন নীতিই বহু অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। ইরাক–এ “গণতন্ত্র রপ্তানি”র নামে সামরিক আগ্রাসন রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে দিয়েছে। লিবিয়া–তে শাসন পরিবর্তনের পর আজও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আফগানিস্তান–এ দুই দশকের যুদ্ধ শেষে ক্ষমতার শূন্যতা ও মানবিক বিপর্যয় রেখে বিদায় নেওয়া হয়েছে। আর সিরিয়া–তে গৃহযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়েছে বহিরাগত শক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভাষা ছিল মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও নিরাপত্তার। কিন্তু ফল হয়েছে ভাঙা রাষ্ট্র, শরণার্থী স্রোত এবং স্থায়ী অস্থিতিশীলতা। তবু এই একই শক্তিগুলো অন্য দেশগুলোর উদ্দেশে নৈতিক উপদেশ দেয়, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, “সঠিক পথে” চলার নির্দেশ দেয়। এখানেই বৈশ্বিক রাজনীতির সবচেয়ে তীব্র বৈপরীত্য প্রকাশ পায়। যারা নিজেরাই বিশৃঙ্খলার উত্তরাধিকার রেখে গেছে, তারাই আবার নৈতিক অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ফলে “একি কথা শুনি আমি মন্থরার মুখে” শুধু সন্দেহ নয়, ইতিহাস-সঞ্জাত এক গভীর প্রশ্ন। এই ভাষ্য কি সত্যিই কল্যাণের জন্য, না কি ক্ষমতার রাজনীতিতে আরেকটি পরিচিত, বিপজ্জনক সুর?

আসলে মন্থরার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছ থেকে কথা বলা। তিনি প্রান্তের কেউ ছিলেন না, ছিলেন অভ্যন্তরের কণ্ঠ। আজকের বিশ্ব-রাজনীতিতেও বিপদ আসে প্রান্ত থেকে নয়, আসে সেই শক্তিগুলোর কাছ থেকে, যারা নিজেদের নৈতিকতার একমাত্র বৈধ ব্যাখ্যাকারী বলে দাবি করে। যখন কোনো রাষ্ট্র নিজেকে বিচারক, অভিযোক্তা ও শাস্তিদাতা, এই তিন ভূমিকাতেই একসঙ্গে স্থাপন করে, তখন গণতন্ত্র আর অধিকার রক্ষার ভাষা ক্রমে কর্তৃত্বের ভাষায় রূপ নেয়। তখন প্রশ্ন আর থাকে না কে সঠিক, বরং কে শক্তিশালী। সব মিলিয়ে, “একি কথা শুনি আমি মন্থরার মুখে” আজ একটি গভীর রাজনৈতিক উপলব্ধিতে রূপ নিয়েছে। এটি আমাদের শেখায় যে ইতিহাসে সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তগুলো আসে তখনই, যখন নৈতিকতার ভাষা ক্ষমতার সঙ্গে মিশে যায় এবং প্রশ্নহীন সত্য হিসেবে উপস্থাপিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের গণতন্ত্র–বিষয়ক বক্তৃতা, নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি নীতির দ্বৈততা এবং ধারাবাহিক সামরিক হস্তক্ষেপ একসঙ্গে মিলিয়ে দেখলে স্পষ্ট হয়, সমস্যা আদর্শে নয়, তার নির্বাচনী প্রয়োগে। গণতন্ত্র যদি সত্যিই সার্বজনীন মূল্যবোধ হয়, তবে তার ভাষা ও আচরণে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি; নইলে সেই ভাষা বিশ্বাস তৈরি করে না, বরং সন্দেহ জাগায়। এই সন্দেহই আমাদের থামিয়ে দেয়, ভাবতে শেখায়, এবং মনে করিয়ে দেয়, মন্থরার মতো মধুর কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা উদ্দেশ্য চিহ্নিত না করলে ইতিহাস আবারও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে।

Leave your review