যে দেশে খেলনা নয়, প্রশ্নপত্রে বড় হয় শিশুরা


সাহিত্য প্রেমীদের অতি চেনা পরিচিত একটি নাম হলো  ম্যাক্সিম গোর্কি (১৮৬৮-১৯৩৬)। তবে তার আসল নাম হলো আলেক্সেই ম্যাক্সিমোভিচ পেশকভ। তিনি শুধু একজন স্বনামধন্য  রাশিয়ান এবং সোভিয়েত লেখকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন শৈশবের বেদনা থেকে মানবিকতার আলো খুঁজে নেওয়া এক অনমনীয় কণ্ঠ। সমাজতন্ত্রের প্রতি তার ছিল বিশেষ অনুরাগ,  যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কারের জন্য পাঁচবার মনোনীত হয়েছিলেন। কিন্তু তার জীবনের প্রকৃত নোবেল যেন লুকিয়ে ছিল শৈশবের ক্ষতচিহ্নে। তার শৈশব কালটা ছিল খুবই কষ্টের এবং অযত্নের। চার বয়স বয়সে কলেরায় মারা যায় তার বাবা। বাবার মৃত্যুর পর  মা, ছেলেকে নিয়ে চলে আসেন নিঝনি নভগোরাদে ম্যাক্সিম গোর্কির দাদা-দাদীর বাড়ীতে। তখন আলেক্সির বয়স ছিল মাত্র সাত বছর। তার দাদা ছিল একজন হিংস্র মানুষ। হিংস্র ও রূঢ় দাদার অত্যাচার ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। প্রায় সময়ই তার স্ত্রী এবং ছেলেকে নির্যাতন করতেন। একবার তো সেই নিষ্ঠুরতার হাত থেকে প্রিয় দাদীকে বাঁচাতে গিয়ে ছোট আলেক্সি নিজেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে। সেই দাদীই ছিল তার জীবনের একমাত্র কোমল আশ্রয়, যার ভালোবাসা, মমতা আর অন্তহীন লোককাহিনীর ভাণ্ডার ছোট আলেক্সির ভাঙা শৈশবে রোপণ করেছিল কল্পনার বীজ।

 

‘মাই চাইল্ডহুড’-এ ম্যাক্সিম গোর্কি লিখেছেন, “দাদীর কথা ছিল সঙ্গীতের মতো, ফুলের মতো, যা আজও তার স্মৃতিতে চিরন্তন পুষ্প হয়ে ফুটে থাকে। সেই হাসি, বড় চোখের উজ্জ্বলতা আর সাদা দাঁতের প্রাণবন্ত ঝলক তার কাছে হয়ে উঠেছিল মানবিক সৌন্দর্যের প্রথম পাঠ।….“ এই অভিজ্ঞতা থেকেই গোর্কি বিশ্বাস করতেন, শিশুদের শৈশব ভয়, চাপ আর বিচারবুদ্ধির কারাগার হওয়া উচিত নয়। বরং শৈশব কালটা হবে বিস্ময়, আবিষ্কার আর কল্পনার বাতাবরণে ধীরে ধীরে উন্মোচনের এক মুক্ত প্রান্তর। শিশুদের বেড়ে ওঠা দরকার কৌতূহলের স্বাধীন আশ্রয়ে, ভুল-শেখার স্বাভাবিক পরীক্ষাগারে, যেখানে উদ্বেগ নয়, নির্দোষ চোখে পৃথিবীকে দেখাই হবে শেখার প্রথম শর্ত। কিন্তু এই দর্শন কি আজ বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রতিফলিত হয়? এখানে তিন-চার বছর বয়সী শিশুরা খেলার সূক্ষ্ম শিল্প রপ্ত করার আগেই পরীক্ষার চাপে নুয়ে পড়ছে। শিক্ষার কোমল, মানবিক দিক উপেক্ষিত হলে শৈশবের আসল সুরটাই যেন হারিয়ে যায়, আর সেই সঙ্গে হারিয়ে যায় ভবিষ্যতের সৃজনশীল মানুষটিও। আজকের বাস্তবতায় আরও বেদনাদায়ক দৃশ্যটি হলো, খেলাধুলার বয়সে শিশুরা প্লে-স্কুল, নার্সারি আর প্রাইমারি স্কুলে যাচ্ছে বিশাল ভারী একটি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে। বইয়ের অতিরিক্ত ভারে তাদের ছোট শরীর নুয়ে পড়ে, হাঁটার ছন্দ হারিয়ে যায়। চোখে মুখে যে প্রানচঞ্চলতা আর উচ্ছ্বাস থাকার কথা, তা তাদের হাঁটায় দেখা যায় না। শৈশব যেন বোঝা বইতে বইতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

 

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা আমাকে সেদিন গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আমি আমার ভাগ্নির সঙ্গে তার সন্তানদের অর্থাৎ আমার নাতি-নাতনিদের সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়ি। ভাগ্নিই বলছিলো এতটুকু অল্প বয়সেই একটি শিশু কিভাবে নিয়মিত চাপ, ভয় আর মানসিক অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। আমার কল্পনায় তখনও ভেসে উঠছিল শৈশবের সেই স্বাভাবিক ছবি, রঙিন খাতা, ছড়া আর গল্পের বই, মেঝেতে বসে আঁকিবুঁকি, নির্ভার হাসি, খেলনার ছোট্ট জগত; যেখানে শেখা মানে আনন্দ, আর শৈশব মানে নিরাপদ বিস্ময়ের আশ্রয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা সেই কল্পনাকে নির্মমভাবে ভেঙে যেন দেয়। বিস্ময়ে ভরা চোখ আর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠের সেই শিশুটি সদ্য একটি পরীক্ষা শেষ করেছে, এই কথাটি শুনেই বুকের ভেতর এক অজানা শীতলতা নেমে আসে। আরও ভয়ের বিষয় হলো, স্কুলের প্রধান নাকি পিতা-মাতাদের সতর্ক করে দিয়েছেন পরীক্ষায় ফেল করলে শিশুদেরকে স্কুল থেকেই বের করে দেওয়া হবে এবং কয়েকটি শিশুকেও নাকি বের করে দেওয়া হয়েছে। তিন-চার বছরের একটি শিশুর কাছে ‘ফেল’ শব্দটির অর্থই বা কি? সে কি বোঝে ব্যর্থতা কাকে বলে, কিংবা নিজের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার মতো মানসিক প্রস্তুতি কি তার আছে? এই বয়সে শিশুদের কাজ হলো পেন্সিল ধরে অনুভূতির রেখা টানা, শব্দ আর রঙের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা, ভুল করেই শেখা। অথচ আমরা তাদের সেই স্বাভাবিক বিকাশের পথ থেকে সরিয়ে এনে স্মৃতি নির্ভর লিখিত পরীক্ষার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছি। ফলে শেখার জায়গা দখল করছে ভয়, কৌতূহলের জায়গায় বসছে চাপ। প্রশ্নটা তাই আরও গভীর হয়ে ওঠে: আমরা কি শিশুদের সত্যিই জ্ঞান দিচ্ছি, নাকি শৈশব থেকেই তাদের ভয় শেখাচ্ছি?

 

এই প্রশ্ন কোনো একটি পরিবারের ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তার মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নয়। এটি যেন আমাদের সামগ্রিক শিক্ষানীতির গভীর বাস্তবতাকে তুলে ধরছে। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠার পথে থাকা শিশুদের কোমল মনের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কি হতে পারে, এই ভাবনাই গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এ অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের বহু বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম ও মিশনারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নার্সারি পর্যায় থেকেই শিশুদের ওপর কঠোর, পরীক্ষা-কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। ‘উচ্চমানের’ ও ‘অভিজাত’ শিক্ষার মোহজাল বিস্তার করে তারা অভিভাবকদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের ফি আদায় করছে, অথচ বিনিময়ে যে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে তা প্রায়শই শৈশব-বান্ধব তো নয়ই বরং মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক শিক্ষার মৌলিক দর্শন, শিশু মনোবিজ্ঞান, এমনকি স্নায়ুবিজ্ঞানের সুপ্রতিষ্ঠিত গবেষণাকেও কার্যত উপেক্ষা করছে। শিশুর সহজাত কৌতূহল, কল্পনাশক্তি ও বিস্ময়বোধকে লালন করার বদলে সেখানে চালু করা হচ্ছে মূল্যায়ন, র‍্যাঙ্কিং আর প্রতিযোগিতার এক নিষ্ঠুর সংস্কৃতি। প্রশ্নটা তাই আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে: আমরা কি সত্যিই এমন একটি সমাজ গড়তে চাই, যেখানে শৈশবটা শুরু হবে আত্মবিশ্বাস, আনন্দ আর কৌতূহল দিয়ে নয়, বরং ব্যর্থতার ভয় আর মানসিক চাপ দিয়ে?

 

উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের বাস্তবতার মৌলিক পার্থক্যটি শুরুই হয় তাদের শৈশব-দর্শনে। সেখানে শিশুকে ভবিষ্যতের পরীক্ষার্থী বা উৎপাদনশীল কর্মী হিসেবে নয়, বরং বর্তমানের একটি সম্পূর্ণ, অনুভূতি সম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখা হয়। তাই প্রাথমিক শৈশব শিক্ষাকে তারা শেখার প্রতিযোগিতা নয়, শেখার জন্য প্রস্তুত হওয়ার এক স্বাভাবিক ও আনন্দময় পর্ব হিসেবে বিবেচনা করে। এই দৃষ্টিভঙ্গির ফলেই খেলাধুলা, গল্প বলা, গান, দৌড়ঝাঁপ, প্রকৃতির সঙ্গে মেলামেশা এবং সহপাঠীদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগই হয়ে ওঠে শেখার প্রধান ভাষা। চার বছর বয়সে একটি শিশুর মস্তিষ্ক থাকে দ্রুত বিকাশের এক সংবেদনশীল পর্যায়ে, আর এই বিকাশ সবচেয়ে গভীর ও কার্যকর হয় তখনই, যখন শিশু নিজে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকে: প্রশ্ন করে, ভুল করে, আবার নতুন করে চেষ্টা করে। এই কারণেই উন্নত দেশগুলোর শিক্ষা দর্শন মুখস্থ নির্ভর, নিষ্ক্রিয় শেখার বদলে অনুসন্ধানমূলক, অংশগ্রহণ ভিত্তিক ও আনন্দ নির্ভর শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। তারা জানে, এই বয়সে অতিরিক্ত চাপ, ভয় কিংবা ‘ব্যর্থতা’র অভিজ্ঞতা শিশুর মস্তিষ্কে স্থায়ী ছাপ রেখে যেতে পারে, যার ফল হিসেবে ভবিষ্যতে দেখা দেয় উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি এবং শেখার প্রতি অনীহা। ঠিক এই উপলব্ধি থেকেই ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা সেখানে শুধু অপ্রয়োজনীয় নয়, বরং স্পষ্টভাবেই ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয়।

 

ইউরোপের বহু দেশে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য যে আইনি ও নীতিগত কাঠামো গড়ে উঠেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে খেলা-ভিত্তিক শিক্ষা এবং শিশুর সামগ্রিক বিকাশের প্রতি গভীর অঙ্গীকার। প্লে-গ্রুপ বা কিন্ডারগার্টেন পর্যায়ে শিশুদের কখনোই পরীক্ষার মাধ্যমে বিচার করা হয় না, বরং শিক্ষকরা ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করেন শিশুটি কীভাবে চিন্তা করে, সমস্যা সমাধান করে, অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং নিজের সৃজনশীলতাকে প্রকাশ করে। এখানে মানসম্মত পরীক্ষাও সাধারণত সাত বছর বয়সের আগে শুরু হয় না, আর যখন শুরু হয়, তার উদ্দেশ্য শিশুদের বাছাই, তুলনা বা প্রতিযোগিতায় নামানো নয়, বরং তাদের শেখার প্রয়োজন, শক্তি ও সহায়তার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা। ফিনল্যান্ড-এর প্রাথমিক শিক্ষার আন্তর্জাতিক সাফল্যের পেছনেও রয়েছে এই মানবিক দর্শন যেখানে র‍্যাঙ্কিং, অতিরিক্ত হোমওয়ার্ক কিংবা প্রতিযোগিতার চাপ নেই, কিন্তু আছে উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, শিক্ষার প্রতি সামাজিক আস্থা এবং শিশুর মানসিক সুস্থতার প্রতি গভীর সম্মান। একইভাবে জার্মানি-র কিন্ডারগার্টেন গুলোতে শিশুদের শেখা মূল্যায়ন করা হয় তাদের দৈনন্দিন আচরণ, কৌতূহল ও সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে। সুইডেন ও নরওয়ে-র মতো দেশে শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের বড় একটি অংশ কাটে খোলা আকাশের নিচে, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে তারা শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে বিকশিত হয়। এমনকি যুক্তরাজ্য-এর প্রাথমিক শিক্ষার প্রথম ধাপেও শিশুর একাডেমিক সাফল্যের চেয়ে তার আবেগগত নিরাপত্তা, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। খুব অল্প বয়সে একাডেমিক প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার কারণে কোনো শিশুকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা সেখানে কেবল অচিন্তনীয়ই নয়, অনেক ক্ষেত্রে আইনত দণ্ডনীয়ও।

 

বাংলাদেশে শৈশবকালীন শিক্ষা আজ বৈশ্বিক শিক্ষা দর্শনের সঙ্গে কেবল অসামঞ্জস্যপূর্ণই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তার সম্পূর্ণ বিপরীত স্রোতে প্রবাহিত হচ্ছে। আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করছি, যেখানে বহু অভিভাবক আন্তরিক বিশ্বাসে ধরে নেন পরীক্ষার সংখ্যা যত বাড়বে, শিক্ষা তত উন্নত হবে,  চাপ যত বেশি হবে, ভবিষ্যৎ তত উজ্জ্বল হবে। অথচ এই বিশ্বাসই সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ অজান্তেই তা শিশুদের মানসিক নিরাপত্তা, স্বাভাবিক বিকাশ ও জ্ঞানীয় সক্ষমতার ওপর গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। আরও বিস্ময়কর হলো, যে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজেদের ‘মানসম্মত’ ও ‘আধুনিক’ বলে জোরালোভাবে প্রচার করে, তারাই প্রায়শই শিশুদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ফি আদায় করে, অথচ বিনিময়ে ন্যূনতম মানসিক যত্ন, নিরাপদ পরিবেশ কিংবা শৈশব-বান্ধব শিক্ষার নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়। একদিকে তারা উন্নত শিক্ষার স্বপ্ন দেখায়, অন্যদিকে সেই শিক্ষার একেবারে সূচনালগ্নেই শিশুর কৌতূহল, আনন্দ ও আত্মবিশ্বাসকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দেয়। এই গভীর সামাজিক বৈপরীত্য আমাদের শুধু শিক্ষাব্যবস্থাকেই নয়, সমাজ হিসেবে আমাদের বিবেককেও কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।

 

যদি আমরা সত্যিই চিন্তাশীল, সৃজনশীল ও মানসিকভাবে স্থিতিস্থাপক একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, তবে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শুধু আমূল পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন এক দৃষ্টান্তমূলক রূপান্তর। ছয় বছরের আগে আনুষ্ঠানিক পরীক্ষাকে কেবল নিরুৎসাহিত নয়, স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা উচিত। মূল্যায়নের নামে বিচার ও তুলনার সংস্কৃতি পরিহার করে এমন পর্যবেক্ষণ ভিত্তিক পদ্ধতি চালু করতে হবে, যা শিশুর খেলাধুলা, কল্পনা ও স্বতঃস্ফূর্ত শেখাকে উৎসাহিত করে। প্রাথমিক শৈশব শিক্ষায় নিযুক্ত শিক্ষকরা যেন কেবল পাঠ্যসূচি বাস্তবায়নকারী না হয়ে ওঠেন, বরং শিশু বিকাশ, মনোবিজ্ঞান ও আবেগগত যত্নে প্রশিক্ষিত পেশাজীবী হন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে, যেসব প্রতিষ্ঠান ছোট বাচ্চাদের ওপর মানসিকভাবে ক্ষতিকর অনুশীলন চাপিয়ে দেয়, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অভিভাবকদেরও সহায়তা ও সচেতনতা প্রয়োজন, যাতে তারা বুঝতে পারেন, প্রাথমিক শৈশব শিক্ষা মানে দৌড়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা নয়, বরং নিরাপদভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার। যখন একটি শিশু ব্যর্থতার মুখোমুখি হয় এবং তার প্রতিক্রিয়ায় শৃঙ্খলার নামে ভয় আর চাপ চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেটি আর শিক্ষা থাকে না, তা হয়ে ওঠে শিক্ষার ছদ্মবেশে মানসিক নিয়ন্ত্রণের এক নিষ্ঠুর রূপ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক দায়িত্ব হওয়া উচিত, শিশুকে এমন এক পরিসর দেওয়া, যেখানে সে আনন্দের সঙ্গে শিখবে, আবিষ্কারের সাহস পাবে এবং খেলাধুলার মধ্য দিয়ে মানুষ হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে। প্রশ্ন একটাই: আমরা কি সেই দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত?

 

যদি সমগ্র ইউরোপ জুড়ে বারবার প্রমাণিত হয়ে থাকে যে খেলাধুলাভিত্তিক, আনন্দ নির্ভর ও সম্পর্ক কেন্দ্রিক শিক্ষাই আবেগগতভাবে সুস্থ এবং জ্ঞানগতভাবে সক্ষম মানুষ গড়ে তোলার সবচেয়ে কার্যকর পথ, তবে বাংলাদেশ কেন সেই পথের বিপরীতে হাঁটবে। এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তা জন্ম নেয় নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও কৌতূহলের পরিসরে। চাপ, ভয় কিংবা ব্যর্থতার আতঙ্কে নয়। তাই শৈশবকালীন শিক্ষা সংস্কারকে বিলম্বিত কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে নয়, বরং একটি জরুরি নৈতিক দায়িত্ব হিসেবেই দেখতে হবে। ইউরোপীয় খেলাধুলাভিত্তিক শিক্ষা মডেল অন্ধভাবে অনুকরণ করাই সমাধান নয়, বরং আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংবেদনশীল ভাবে একীভূত করে একটি মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ  শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলাই হতে পারে সামনে এগোনোর পথ, যেখানে শৈশবকে জীবনের এক অনন্য, অপরিবর্তনীয় ও সম্মানযোগ্য অধ্যায় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্ন কোনো একক নীতিনির্ধারক, প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাবিদের একার নয়। এটি আমাদের সবার। আমরা কি আমাদের শিশুদের কাঁধে অকালেই সাফল্যের ভার চাপিয়ে দেব, নাকি তাদের সেই শৈশব ফিরিয়ে দেব, যা একবার হারিয়ে গেলে আর কখনো ফিরে আসে না?

Leave your review