দীপু: রাষ্ট্র, সমাজ ও নৈতিক পতন


সভ্যতা কি সত্যিই সত্যিই অসভ্যতা,বর্বরতা আর বন্যতায় গ্রাস করছে ধীরে ধীরে। একবিংশ শতাব্দীর কোন দ্বারপ্রান্তে এসে আমরা উপস্থিত হয়েছি। এই কি স্বাধীনতার সুফল? আমরা কি ধীরে ধীরে এমন এক গভীর এবং শ্বাসরুদ্ধকর অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে মানবতা অসহায়, সহাবস্থান কেবল সংবিধানের পাতায় লেখা একটি নিষ্প্রাণ শব্দে পরিণত হয়, আর ন্যায় বোধ নিঃশব্দে কবর রচনা করে? আজ এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বর্বরতা আর বিচ্যুতি নয়। এটি যেন স্বাভাবিক অভ্যাস। হিংস্রতা, রাজনৈতিক ভণ্ডামি, ক্ষমতার লোভ, মব জাস্টিস এবং সংখ্যালঘুদের উপর একের পর এক নৃশংস আক্রমণ এমনভাবে রাষ্ট্রের শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে যে ভয়, রক্ত আর আতঙ্কই হয়ে উঠেছে নতুন সামাজিক ভাষা। মানুষ এখন আর বিবেক দিয়ে কথা বলে না। কথা বলে গুজব, ঘৃণা আর উন্মত্ততার চাপে। সভ্যতার মুখোশ পরে যে পাশবিকতা দিনের পর দিন সমাজের গভীরে লুকিয়ে ছিল, দীপুকে নির্মমভাবে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সেই মুখোশ এক ঝটকায় খুলে যায়। এ যে আদিম পৈশাচিক বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। আগুনে পোড়া একটি দেহ শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়,  তা একটি রাষ্ট্রের আত্মার দগ্ধ হয়ে যাওয়ার প্রতিচ্ছবি।

 

এই হত্যাকাণ্ড কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, কোনো “ভুল বোঝাবুঝি” বা “উত্তেজিত পরিস্থিতির” ফলও নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা সামাজিক পচন, নৈতিক অবক্ষয় এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ। এখানে মানুষ আর মানুষ হিসেবে মূল্য পায় না। তার নাম, তার জীবন, তার স্বপ্ন সবকিছু মুছে গিয়ে সে পরিণত হয় একটি পরিচয়ে, একটি সংখ্যায়, একটি লক্ষ্যবস্তুতে। আজ যে দীপু, কাল সে অন্য কেউ। আজ যে সংখ্যালঘু, কাল হয়তো ভিন্ন মতাবলম্বী, সাংবাদিক, শিক্ষক, গৃহবধূ অথবা অন্যরকম কেউ। এই অন্ধকারের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। মানুষ দেখে, জানে, কিন্তু চুপ থাকে। রাষ্ট্র জানে, কিন্তু কোন দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকে। আর এই নীরবতাই হিংস্রতার সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র হয়ে ওঠে। এই প্রশ্ন তাই শুধু দীপুর মৃত্যু নিয়ে নয়। এই প্রশ্ন বাংলাদেশের অস্তিত্ব নিয়ে। একটি রাষ্ট্র কতদূর গেলে মানুষ খুন হয়ে যায় জনতার উল্লাসে, আর বিবেক নির্বিকার দর্শকে পরিণত হয়? এই অন্ধকার যদি থামানো না যায়, তবে তা কেবল সংখ্যালঘুদের গ্রাস করবে না, একদিন তা পুরো সমাজটাকেই ধ্বংস করে দেবে। নিভিয়ে দেবে ভবিষ্যতের প্রতিটি সম্ভাবনার আলো। পুরো দেশটি পরিণত হবে দূর্বৃত্ত্যায়নের অভয়ারণ্যে।

 

ভারত বিভাজনের আগে ১৯৪১ সালের আদমশুমারি অনুসারে পূর্ব বাংলার হিন্দু জনসংখ্যা ছিলো ২৮ শতাংশ। এই সংখ্যাটা ছিলো ১৯০১ সালে ৩৩ শতাংশ। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় এই সংখ্যাটা এসে দাঁড়ায় প্রায় ২২–২৩ শতাংশে। এটা কোনো অনুমান নয়, বরং ধারাবাহিক আদনশুমারি ভিত্তিক বাস্তবতারই অংশ। কিন্তু আজ সেই অংশীদারিত্ব নেমে এসেছে এক অঙ্কে। ২০২২ সালের আদমশুমারির প্রাথমিক ফলাফলে হিন্দুদের অনুপাত দেখানো হয়েছে ৭.৯৫%। এই পতনকে যদি শুধু “স্বাভাবিক জনসংখ্যাগত পরিবর্তন” বলে পাশ কাটানো হয়, তবে সত্যটাকে অস্বীকার করা হয়। কারণ সরকারি আদমশুমারির রিপোর্ট নিজেই “আউট-মাইগ্রেশন” বা দেশ ছাড়াকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এখানে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক সত্যটি হলো শতকরা হার কমলেও সংখ্যার ভেতরে একটি “হারিয়ে যাওয়া জনপদ” লুকিয়ে আছে। দৈনিক প্রথম আলো ৫০ বছরের আদমশুমারির তুলনা দেখিয়ে লিখেছে, ১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আদমশুমারিতে হিন্দুরা ছিল ১৩.৫%. ২০১১ সালে তা নেমে হয় ৮.৫৪%।  ওই বিশ্লেষণে বলা হয়, গত ৫০ বছরে একটি জনগোষ্ঠীর বিশাল একটি অংশ কার্যত দৃশ্যপট থেকে সরে গেছে। এই পরিসংখ্যানের পেছনে কেবল জন্মহার বা প্রাকৃতিক বৃদ্ধি নয়। একটি দীর্ঘ, ক্ষতবিক্ষত ইতিহাস কাজ করেছে। ভয়, নির্যাতন, দাঙ্গা-পরবর্তী অনিশ্চয়তা, সম্পত্তির নিরাপত্তা হীনতা, রাজনৈতিক আশ্রয়ে অপরাধ, এবং সবচেয়ে বিপজ্জনকভাবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি।  প্রথম আলোর রিপোর্টে উল্লেখ আছে, ১৯৪৭-এর দেশভাগ, ১৯৬৫-এর যুদ্ধ, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, এসব বড় রাজনৈতিক ধাক্কায় অভিবাসন বেড়েছে।

 

পাশাপাশি “শত্রু সম্পত্তি আইন”-এর মতো আইন কাঠামোগত ভাবে বহু পরিবারকে ভূমিহীন-নিঃস্ব করে দেশ ছাড়ার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ কথাও সেখানে গবেষকদের বক্তব্যে এসেছে। ফলে সংখ্যাটা শুধু কমেনি। একটি সম্প্রদায়ের টিকে থাকার আত্মবিশ্বাসটাই ধীরে ধীরে ভেঙে দেওয়া হয়েছে । যারা থেকে গেছেন, তাদের অনেকেই আজও বাঁচেন অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর নীরব সহনশীলতার ভেতর, কারণ এই বাস্তবতায় “আজ নিরাপদ” মানে “আগামীকালও নিরাপদ”এ নিশ্চয়তা আর সহজে মেলে না। দীপুকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা কেবল একটি প্রাণহানি নয়। এটি ছিল দিনের আলোয়, জনসমক্ষে, সমাজের চোখের সামনে সংঘটিত এক নির্মম পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড। একজন মানুষকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে, গাছে ঝুলিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে মারার সময় চারপাশে মানুষ ছিল, কেউ দাঁড়িয়ে দেখেছে, কেউ মোবাইলে ভিডিও করেছে, কেউ ভয়ে বা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, কেউ নারকীয় উল্লাসে মত্ত থেকেছে। পুলিশের হাত থকে কি করে এই মানুষরূপী হিংস্র জানোয়াররা দীপুকে কেড়ে নেয়? দেশে আইন শৃঙ্খলার কি এতো ভয়াবহ পরিণতি? পুলিশ প্রসাশন সহ আম জনতা কেউ এগিয়ে আসেনি এই অনাচারকে থামাতে। এই নিষ্ক্রিয় ভিড়, এই নীরব দর্শক সমাজ, তারাই কি এই হত্যার নীরব অংশীদার নয়? দীপুর শরীর যখন আগুনে পুড়ছিল, তখন কি সমাজের বিবেকও পুড়ে ছাই হয়ে যায়নি? এই হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে একটি কঠিন ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, আমরা কি এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে একজন মানুষকে প্রকাশ্যে পুড়িয়ে মারাও “দেখে নেওয়া যায়”? যদি আজ দীপুর জন্য কেউ দাঁড়াতে না পারে, তবে আগামীকাল কার জন্য দাঁড়াবে এই সমাজ? নাকি আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছি, যেখানে মানুষ খুন হয়ে যাওয়া আর সমাজকে নাড়িয়ে দেয় না, বিবেককে জাগায় না, প্রশ্ন তোলে না, শুধু পরের সংবাদের অপেক্ষা তৈরি করে?

 

দীপু হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই গুলি করে হত্যা করা হলো সাংবাদিক রানা প্রতাপকে। এর মধ্যেই সংবাদ আসে, এক হিন্দু বিধবাকে ধর্ষণ করে গাছে বেঁধে চুল কেটে দেওয়ার মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতার। ৫ই জানুয়ারি নরসিংদীর পলাশ উপজেলার এক ব্যবসায়ী শরৎ চক্রবর্তীকে বাড়ির ফটকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।  কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক হিন্দু হত্যাকাণ্ড থেকে স্পষ্টত: যে এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং একটি ধারাবাহিক সহিংস প্রবণতা, যেখানে সংখ্যালঘুরা ক্রমশ সহজ ও নিরাপদ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু এই ধারাবাহিকতার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে দীপু, কারণ তার হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে প্রকাশ্যে, দিনের আলোয়, বহু মানুষের সামনে এবং সমস্ত পৈশাচিক বর্বরতাকেও ছাপিয়ে গেছে। কেউ ভিডিও করেছে, কেউ তাকিয়ে থেকেছে, কেউ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকেছে। আর এই নীরব দর্শক সমাজই এই বর্বরতার সবচেয়ে ভয়ংকর সহচর। দীপুকে মারতে মারতে গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরানো হয়েছে, এটি কোনো আকস্মিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়। এটি ছিল ধীরে, ঠাণ্ডা মাথায় করা এক প্রকাশ্য হত্যাযজ্ঞ, যেখানে হত্যাকারীরা জানত, তাদের থামানোর মতো কেউ নেই।

 

এই প্রশ্ন তাই অবধারিতভাবে উঠে আসে: রাষ্ট্র কোথায় ছিল? সরকার কি করছিল? পুলিশ, প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা, এদের কারও কি আগাম তথ্য ছিল না? নাকি তথ্য থাকলেও “পরিস্থিতি বিবেচনায়” নীরব থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল? দিনের আলোয়, জনসমক্ষে একজন মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা যদি একটি রাষ্ট্র থামাতে না পারে, তবে সে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা কার্যত কি অর্থ বহন করে? প্রতিবার ঘটনার পর চেনা বিবৃতি আসে, তদন্ত হবে, দোষীদের ধরা হবে। কিন্তু বাস্তবে বিচার হয় না, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়, আরও নিশ্চিত হয় যে সংখ্যালঘুদের জীবন সস্তা, আর রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ক্ষণস্থায়ী। আরেকটি আরও অস্বস্তিকর প্রশ্ন: বাংলাদেশের তথাকথিত সুশীল সমাজ কোথায়? কেন তাদের কণ্ঠ এত ক্ষীণ, এত দ্বিধাগ্রস্ত? যখন সংখ্যালঘু নির্যাতিত হয়, তখন কি মানবাধিকারও ধর্ম দেখে কথা বলে? এই নীরবতা কি ভয়ের ফল, নাকি সুবিধাবাদের? নাকি একটি বিপজ্জনক বাস্তবতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে গেছে, যেখানে সংখ্যালঘুদের উপর সহিংসতা আর সামাজিক আলোড়ন তোলে না? এই সহিংসতাকে কি কেবল “ধর্মীয়” বলে দায় এড়ানো যায়, নাকি এখানে সংগঠিত উগ্রবাদী, ধর্মীয় চরমপন্থা এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা সহিংস মানসিকতার ছায়া স্পষ্ট? প্রশ্নটি আরও গভীর। এরা কি কেবল ধর্মান্ধ, নাকি আদর্শগত ভাবে সহিংসতাকে বৈধ মনে করা এক উগ্র মানসিকতার ধারক? যখন রাষ্ট্র নীরব থাকে, সুশীল সমাজ দ্বিধায় ভোগে, আর অপরাধীরা প্রকাশ্যে উল্লাস করে, তখন দীপুর মৃত্যু শুধু একজন মানুষের মৃত্যু থাকে না, তা হয়ে ওঠে একটি সমাজের নৈতিক পতনের প্রকাশ্য ঘোষণা।

 

এই সহিংসতার সবচেয়ে ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক রূপ হলো তথাকথিত “মব জাস্টিস”, যেখানে আইন বলে কিছু থাকে না, বিচার একটি উপহাসে পরিণত হয়, আর প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। এখানে উত্তেজিত জনতা নিজেই বিচারক, নিজেই সাক্ষী, নিজেই জল্লাদ। ক্ষণিকের গুজব, উস্কানি বা সাম্প্রদায়িক ঘৃণার আগুনে মানুষ হয়ে ওঠে হিংস্র পশু, যারা কারও জীবন নেওয়ার আগে একবারও ভাবে না, সে নিরপরাধ কি না, সত্য কি, কিংবা তাদের এই কাজের কোনো পরিণতি আছে কি না। মব জাস্টিস আসলে আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার সম্পূর্ণ পতনের প্রকাশ। দীপুকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা কোনো সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না। এই হত্যাকাণ্ড শুধু ঘাতকদের হিংস্রতার পরিচয় দেয় না। এটি সেই সমাজেরও প্রতিচ্ছবি, যে সমাজ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই বর্বরতা দেখেছে। এরা কেবল খুনি নয়, এরা মানুষরূপী নরপিশাচ, যাদের কাছে মানবজীবনের কোনো মূল্য নেই, বিবেকের কোনো ভাষা নেই। আর সবচেয়ে ভয়াবহ সত্য হলো, এদের সামনে আইন নীরব, প্রশাসন অসহায়, আর রাজনীতি সুবিধাবাদী হয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়। এই নীরবতাই, এই দুর্বলতাই অপরাধীদের সবচেয়ে বড় শক্তি ও সাহস যোগায়। যখন তারা দেখে দিনের আলোয় মানুষ পুড়িয়ে মারলেও দ্রুত বিচার হয় না, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আসে না, তখন সহিংসতা তাদের কাছে বৈধতা পায়। মব জাস্টিস তখন আর বিচ্ছিন্ন উন্মত্ততা থাকে না, তা পরিণত হয় এক ধরনের সামাজিক সংস্কৃতিতে, যেখানে সংখ্যালঘু, দুর্বল ও ভিন্ন পরিচয়ের মানুষদের জীবন সবচেয়ে সস্তা। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন একটাই, যে সমাজ মবের হাতে বিচার তুলে দেয়, সে সমাজ কি আদৌ নিজেকে সভ্য দাবি করার নৈতিক অধিকার রাখে?

 

পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংস ঘটনার সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছেছে, যার মধ্যে হত্যা, ধর্ষণ, মন্দির ভাঙচুর, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, জোরপূর্বক জমি দখল এবং প্রকাশ্য অপমানের মতো অপরাধ অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এই সংখ্যাগুলো কেবল ঠাণ্ডা হিসাব। এগুলো কান্নার শব্দ বহন করে না, ভয়ের রাতগুলো দেখায় না, কিংবা সেই নীরব সিদ্ধান্তের কথা বলে না, যে সিদ্ধান্তে কেউ দেশ ছাড়ে, কেউ চুপ করে যায়, কেউ শুধু বেঁচে থাকার জন্য নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখে। সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও ভয়াবহ এক বাস্তবতা। একটি সম্প্রদায়ের ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাওয়া, মানচিত্রে নয়, মানুষের মনে। এটি শুধু মানুষের মৃত্যু নয়,  এটি স্মৃতি, সংস্কৃতি, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ক্রমাগত নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার কাহিনী। একটি রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেটি আর কেবল সংখ্যালঘু সংকট থাকে না, তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার চরম পতনের দলিল। কারণ আজ যে রাষ্ট্র একজন সংখ্যালঘুকে রক্ষা করতে পারে না, আগামীকাল সে কোনো ভিন্নমতাবলম্বী, কোনো সাংবাদিক, কোনো প্রতিবাদী কণ্ঠকেও রক্ষা করতে পারবে না। এই লেখাটি কোনো একটি সম্প্রদায়ের জন্য সহানুভূতির আবেদন নয়; এটি মানবতার পক্ষ থেকে ছুড়ে দেওয়া এক কঠিন, অস্বস্তিকর প্রশ্ন। আজ যদি দীপু, রানা প্রতাপ বা শরৎ চক্রবর্তীর জন্য ন্যায়বিচার না হয়, তবে আগামীকাল সেই অন্ধকার যে কার দরজায় কড়া নাড়বে, তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না। ইতিহাস বলে, অন্ধকার কখনো একা থাকে না, তা ধীরে ধীরে সবাইকে গ্রাস করে। বাংলাদেশ যদি সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানবিকতা ও সহাবস্থানের রাষ্ট্র হতে চায়, তবে এই হিন্দু নিধনের যজ্ঞ থামাতেই হবে, এখনই, দ্বিধা-হীনভাবে। শুধু শোকবার্তা, শুধু তদন্তের আশ্বাস, শুধু নীরবতা দিয়ে আর চলবে না। প্রয়োজন আইনের শাসনের বাস্তব প্রয়োগ, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার, এবং সবচেয়ে জরুরি, সাহসী রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কারণ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ শুধু অর্থনীতি বা উন্নয়নের গ্রাফে লেখা হয় না। তা লেখা হয় এই প্রশ্নের উত্তরে: এই রাষ্ট্র কি তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের পাশে দাঁড়াতে পেরেছে?

Leave your review