
“বল বীর –বল উন্নত মম শির! শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!” কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার এই অগ্নিঝরা উচ্চারণ যেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এক অনির্বাণ আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। শৈশব থেকে বইয়ের পাতায় কিংবা মঞ্চে দাঁড়িয়ে বুক সোজা করে এই পঙক্তি উচ্চারণের স্মৃতি আমাদের সবারই মনে গেঁথে আছে। সত্যিই, শব্দগুলো উচ্চারিত হলেই দেহ-মনে জেগে ওঠে এক দুর্নিবার বিদ্রোহী শক্তি। ১৯২২ সালে বিজলী পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত এই কবিতা কেবল একটি সাহিত্য কীর্তি নয়, বরং বাংলার যুব সমাজকে স্বাধীনতার সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করার এক অমর আহ্বান। আত্মমর্যাদা, অদম্য সাহস আর শক্তির জাগরণের সেই ডাক আজও সমানভাবে অনুপ্রেরণা যোগায়। এই `বিদ্রোহী` কবিতারই একটি লাইন“চির উন্নত মম শীর”। এই উচ্চারণের মধ্যে আছে মানুষের অন্তরের মহত্ত্ব, জীবনের সত্যিকার সার্থকতা। নজরুল যখন এই আহ্বান জানিয়েছিলেন, তিনি কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির কথা বলেননি, বলেছেন এক সমষ্টিগত জাগরণের কথা। তিনি চেয়েছিলেন মানুষের মাথা উঁচু হোক, কেবল ভৌত উন্নতিতে নয়, নৈতিকতায়, সাহসে, আত্মবিশ্বাসে এবং মানবিকতায়। তাঁর সেই আহ্বান ছিল সমাজের দীনহীন, পরাধীন মানুষের প্রতি। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন, মাথা নত করে নয়, বরং গৌরবের সঙ্গে চলতে হবে। কিন্তু সেই গৌরব হবে মানবিকতার গৌরব, সত্যের গৌরব, ন্যায়ের গৌরব। এই পটভূমি থেকেই বুঝতে পারা যায়, শিক্ষা কেবল পাঠ্যবই পড়া বা ডিগ্রি অর্জনের নাম নয়। শিক্ষা আসলে মানুষকে এমনভাবে গড়ে তোলে যাতে সে নিজের ভেতরের সম্ভাবনাকে চিনতে পারে এবং সমাজের জন্য আলো হয়ে উঠতে পারে। রবীন্দ্রনাথ তাই বলেছিলেন, শিক্ষার লক্ষ্য কেবল কর্মসংস্থান নয়, শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো মনুষ্যত্বের বিকাশ। মানুষ যখন শিক্ষার মাধ্যমে দায়িত্ববোধ, সহিষ্ণুতা, শ্রদ্ধা ও বিনম্রতা অর্জন করে, তখন সে সত্যিকার অর্থে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
গত ২৫শে ডিসেম্বর ২০২৫ টি ছিলো একটি অবিস্মরণীয় দিন। আমাদের গ্রামের স্কুলের শতবর্ষ উদযাপন পালিত হয়। এটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘায়ু নয়, এটি আসলে এক শতাব্দীর স্মৃতি, ত্যাগ, সংগ্রাম আর আলোকিত অনুপ্রেরণার অমর দলিল। হয়তো এই বিদ্যালয়ে নগরীর আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ছিল না, তবুও এর প্রতিটি শিক্ষক ছিলেন একেকজন দীপশিখা, যারা নিভৃতে আমাদের জীবনকে আলোকিত করেছেন। তাঁদের চোখে শিক্ষার মানে ছিল কেবল পাঠ্যসূচি শেষ করা নয়, বরং মানুষের ভেতরের মানুষটিকে জাগিয়ে তোলা। তাঁরা শিখিয়েছিলেন, জীবনের প্রকৃত সাফল্য শুধু পেশাগত সোপানে আরোহণ নয়, আসল সাফল্য নিহিত থাকে নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধে দৃঢ় থাকার মধ্যে। সততা ও নৈতিক দৃঢ়তা ছাড়া কোনো মানুষ পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। এ সত্য তাঁদের শিক্ষা থেকেই আমরা প্রথম শিখেছি। এই স্কুলেই প্রথম আমি পড়েছিলাম লিও টলস্টয়ের অমর রচনা “Three Questions”। আনোয়ার স্যারের কণ্ঠে সেই গল্প শোনার দিনটি আজও আমার মনে জীবন্ত। তিনি আমাদের বোঝালেন, মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো বর্তমান মুহূর্ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হলো যার সঙ্গে আমরা এখন আছি, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সেই মুহূর্তে যে কাজটি করছি। তখন হয়তো মনে হয়েছিল এটি কেবল একটি গল্প, কিন্তু আজ বুঝি, সেই তিনটি উত্তর আসলে জীবন পরিচালনার এক মহামন্ত্র। কখনো ভাবিনি, সেই সরল পাঠের বীজ এত গভীরে প্রোথিত হবে আমার অন্তরে, যে একদিন তা আমার প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি কাজে দিশারী হয়ে উঠবে। জীবনের বাঁকে বাঁকে, যখনই বিভ্রান্তি বা দ্বিধায় পড়েছি, লিও টলষ্টয়ের সেই শিক্ষা নিঃশব্দে আমাকে পথ দেখিয়েছে। আজ পিছনে তাকিয়ে মনে হয়, সেদিন শ্রেণীকক্ষে বসে শোনা সেই গল্পই আমার চরিত্র গঠনের এক অমূল্য ভিত্তি হয়ে উঠেছিল। আজও লিও টলস্টয়ের অমর নৈতিক শিক্ষামূলক গল্প ‘তিনটি প্রশ্ন’ আমি প্রতিটি ক্লাসে শেয়ার করি, যেন শান্তি ও সমৃদ্ধির চিরন্তন মূলমন্ত্র ছাত্রদের হৃদয়ে বীজ হয়ে অঙ্কুরিত হয়।
আজ এই মুহূর্তে চোখ বুজলেই ভেসে ওঠে সেই স্কুলটির ছবি। বিস্তীর্ণ মাঠকে বুকে জড়িয়ে, মাথা উঁচু করে আজও গর্বভরে দাঁড়িয়ে আছে, আমাদের “কাদবা তলাগ্রাম তারিণীচরণ লাহা উচ্চ বিদ্যালয়।” শতবর্ষের ইতিহাস বুকে ধারণ করা এই বিদ্যালয় কেবল ইট-পাথরের দালান নয়, এটি আমাদের শৈশবের হাসি-কান্না, স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা আর সংগ্রামের জীবন্ত সাক্ষী। সেই মাঠেই আমরা মুক্ত পাখির মতো দৌড়েছি, ভরিয়ে তুলেছি আকাশ-বাতাস আমাদের হাসির সুরে। প্রতিটি ধূলিকণা যেন এখনও ধরে রেখেছে আমাদের পায়ের ছাপ, আমাদের হৃদয়ের উচ্ছ্বাস। সেই পুকুরের জল, যেখানে আমরা আনন্দে ভেসেছি, আর কদমগাছের ছায়া, যেখানে বসে অগণিত গল্প বুনেছি, সবই ছিল আমাদের শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রকৃতি আমাদের শিখিয়েছে সৌন্দর্যের পাঠ, মাটি শিখিয়েছে বিনম্রতা, আর গ্রাম শিখিয়েছে সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্ব বোধ। আজও মনে হয়, কদমগাছের ফুলের গন্ধ যেন নস্টালজিয়ার মতো বাতাসে ভেসে আসে। আরও ভেসে আসে স্মৃতি। আমার প্রাথমিক শিক্ষার প্রথম দুই বছর কেটেছিল সত্যিই গাছতলায়। ইটের উপর খাতা রেখে, সবুজ ঘাসে বসে স্লেট আর চক দিয়ে অক্ষরের রেখা টানা, সেই দিনগুলো আজও মনে হলে মন ভরে যায় অদ্ভুত প্রশান্তিতে। তখন আমাদের ছায়াঘেরা ক্লাসরুম ছিল প্রকৃতির বুকের উপর, পাখির ডাক, বাতাসের শীতলতা, কদমফুলের গন্ধ মিশে যেত শিক্ষার প্রথম অক্ষরে। সেই সরল দিনগুলো মনে পড়লে আজও বুক ভরে ওঠে এক অদ্ভুত আনন্দে, আবার চোখও ভিজে ওঠে।
কিভাবে ভুলব সেই অমূল্য মানুষদের? যারা হাত ধরে আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন শিক্ষার আলোর পথে, হাঁটি হাঁটি পা বাড়াতে শিখিয়েছিলেন জীবনের প্রথম যাত্রায়। রহমান স্যার আমাকে প্রথমবার অ আ ক খ লিখতে শিখিয়েছিলেন। স্লেটের উপর চক কাঁপতে কাঁপতে অক্ষর আঁকতাম, আর তিনি মমতার হাসি দিয়ে বলতেন, “ভালো হচ্ছে, চেষ্টা চালিয়ে যাও।” মজিদ স্যার ছিলেন যেন মৃদু স্রোতের মতো। কখনো রাগ দেখাতেন না, ধৈর্যের সঙ্গে আমাদের শেখাতেন যোগ-বিয়োগের জাদু। তাদের মমতা, স্নেহ আর শাসনের মধ্যে ছিল এক অদৃশ্য জাদু। আমরা ছোট্ট বেলায় হয়তো বুঝতে পারিনি, কিন্তু আজ উপলব্ধি করি, তাঁরা আমাদের চরিত্রের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের কণ্ঠস্বর, তাঁদের চোখের দৃষ্টি, তাঁদের হাতের ছোঁয়া আজও মনে পড়ে অমলিন হয়ে। সেই স্যারেরা না থাকলে হয়তো আমরা এভাবে পৃথিবীর সামনে দাঁড়াতে পারতাম না। গাছতলার সেই স্লেটের দিনগুলো, সেই শিক্ষাগুরুদের স্নেহময় উপস্থিতি আজও আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা মানে শুধু বইয়ের অক্ষর নয়, শিক্ষা মানে জীবনের প্রথম পদক্ষেপে সঠিক পথে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি। আর সেই শক্তিই আমাকে জীবনের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি চ্যালেঞ্জে পথ দেখিয়েছে। সেই দিনগুলোর সরলতা আর আন্তরিকতা আজও মনে পড়লে এক অদ্ভুত উষ্ণতায় ভরে ওঠে মন। সত্যিই, এমন আদর্শ শিক্ষকের আজ বড়ই অভাব। অথচ সমাজের প্রকৃত অগ্রগতি কেবল তখনই সম্ভব, যখন এই ধরনের নিবেদিতপ্রাণ ও আদর্শবান শিক্ষকরা নতুন প্রজন্মকে মানুষ করে তুলবে। শিক্ষক শুধু জ্ঞান দেন না, তিনি গড়ে তোলেন জাতির ভবিষ্যৎ।
স্কুল জীবনের সেই মহান শিক্ষকদের কথা ভোলা সত্যিই অসম্ভব। পণ্ডিত স্যারের কথা আজ বিশেষভাবে মনে পড়ছে। যাকে আমি আজও মনে করি বিদ্বান ঋষিতুল্য এক আলোকবর্তিকা হিসেবে। তাঁর নীরব অথচ গভীর জ্ঞানের ভাণ্ডার আমাদের চলার পথে দিকনির্দেশ দিত দৃঢ়ভাবে, অচঞ্চলভাবে। মনে পড়ে, পায়ে খড়ম পড়ে খটখট আওয়াজ তুলে তিনি ক্লাসে প্রবেশ করতেন, আর তাঁর মুখে শোনা সেই চিরন্তন সংস্কৃত লাইনটি—‘বিদ্বত্বং চ নৃপত্বং চ নৈব তুল্যং কদাচন।স্বদেশে পূজ্যতে রাজা বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে।’ অর্থাৎ, রাজা কেবল নিজের দেশে সম্মানিত হন, কিন্তু বিদ্বান বা জ্ঞানী সর্বত্র সম্মান পান। এই অমর বাণী আমাদের মনে গেঁথে দিয়েছিল যে জ্ঞান ও নৈতিকতার আলোই হলো প্রকৃত শক্তি। আজকের বিশ্বেও, যেখানে প্রযুক্তি আর ভোগবাদের দাপট ক্রমেই বাড়ছে, সেখানে সমাজকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন এমনই আদর্শ শিক্ষক, যারা শুধু পাঠ্যবই নয়, জীবনের শিক্ষা দিয়ে নতুন প্রজন্মকে মানুষ করে তুলবেন।
পশ্চিমের মহা দার্শনিক প্লেটোর মতে শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো আত্মাকে আলোর দিকে ফেরানো।” অর্থাৎ শিক্ষা মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোয় নিয়ে যায়, তাকে প্রকৃত অর্থে মানুষ করে তোলে। মহাত্মা গান্ধীও বলেছিলেন, “শিক্ষা তখনই পূর্ণ হয় যখন তা মানুষের অন্তরে নৈতিক শক্তি জাগ্রত করে।” আবার ধর্মীয় নেতারাও একই সত্য উচ্চারণ করেছেন: বুদ্ধ করুণার গুরুত্ব দিয়েছেন, খ্রিস্ট ভালোবাসার, আর হজরত মুহাম্মদ (স.) চরিত্রের শ্রেষ্ঠত্বকে মানব জীবনের মূল শিক্ষার আসনে বসিয়েছেন। আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হয়তো বড় বড় দার্শনিক ছিলেন না, কিন্তু তাঁদের প্রতিটি শিক্ষা, প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি পরিশ্রম আমাদের অন্তরে সেই আলোই জ্বালিয়েছিল। তাঁরা আমাদের দেখিয়েছিলেন যে শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল ভালো চাকরি বা সাফল্য নয়, বরং সৎ মানুষ হওয়া, সাহসী মানুষ হওয়া, নৈতিক মানুষ হওয়া। শিক্ষা মানুষকে শুধু জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে না, বরং তাকে স্থিতিস্থাপক করে তোলে। জীবনের ঝড়-ঝাপটা সামলাতে যে ধৈর্য, যে সাহস দরকার, তা আসে শিক্ষার মধ্য দিয়েই। এই শিক্ষা আমাদের শেখায় ব্যর্থতাকে ভয় না পেতে, একাকীত্বকে দুর্বলতা নয় বরং শক্তির উৎস হিসেবে দেখতে। যেমন রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছিলেন, “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।” এটি শুধু একক যাত্রার গান নয়, বরং শিক্ষার প্রকৃত রূপ, যে শিক্ষা মানুষকে স্বনির্ভর করে, সাহসী করে, এবং নৈতিকভাবে দৃঢ় করে।
আজ যখন আমার প্রিয় বিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্ণ হলো, তখন মনে হয় এই শত বছরের যাত্রা আসলে এক অনন্য সমষ্টিগত আলোকযাত্রা। শিক্ষকেরা তাঁদের জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়ে আমাদের আলোকিত করেছেন, সহপাঠীরা সেই আলো ভাগাভাগি করে নিয়েছে, আর গ্রামের মানুষ সেই আলোকে হৃদয়ে ধারণ করে সমাজকে আলোকময় করেছে। আমাদের শৈশব, আমাদের স্মৃতি, আমাদের শিক্ষা গ্রহণ। সব মিলে গড়ে তুলেছে সেই শক্ত ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়েই আমরা আজ গর্বভরে উচ্চারণ করতে পারি, “চির উন্নত মম শীর।” কিন্তু এই আলোকযাত্রা থেমে থাকার নয়। আমরা যদি এই শিক্ষা, এই আলোর ধারা নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে পারি, তবে আমাদের সমাজ হবে আরও সুন্দর, আরও মানবিক, আরও সমৃদ্ধ। কারণ প্রকৃত শিক্ষা শুধু জ্ঞান দেয় না, এটি দেয় নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, এবং মানুষের অন্তরের মহত্ত্বকে লালন করার শক্তি। আদর্শ শিক্ষক, সৎ শিক্ষা ও নৈতিক উন্নয়নই পারে একটি জাতিকে সত্যিকার অর্থে মহৎ করে তুলতে। আর তখনই কাজী নজরুল ইসলামের সেই আহ্বান “বিদ্রোহী” শুধু কবিতার ছন্দে নয়, আমাদের প্রতিদিনের জীবনেও প্রতিফলিত হবে। একটি স্কুল কেবল ইট-কাঠ-পাথরের গাঁথুনি নয়; এটি মানুষের চরিত্র ও মনন গড়ার কর্মশালা। শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো মনুষ্যত্বের বিকাশ। প্রকৃত শিক্ষা মানে শুধু তথ্য বা জ্ঞান অর্জন নয়, বরং মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা। যখন আমরা শ্রদ্ধা করতে শিখি, ভুল স্বীকার করতে শিখি, বিনম্রতার মাধুর্যে অন্যের পাশে দাঁড়াতে শিখি, তখনই আমরা সত্যিকারের শিক্ষিত হয়ে উঠি। একজন আদর্শ শিক্ষক হচ্ছেন সেই আলোকবর্তিকা, যিনি অন্ধকারে আমাদের পথ দেখান। আমার গ্রামের স্কুলের শিক্ষকরা এমনই ছিলেন। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মাঝেও তাঁরা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছিলেন, শিখিয়েছিলেন সততা, শিখিয়েছিলেন কষ্টকে ভয় না পেতে, শিখিয়েছিলেন সমাজের প্রতি দায়িত্ববান হতে। আজ ফিরে দেখি, তাঁরা শুধু পরীক্ষার খাতার জন্য আমাদের প্রস্তুত করেননি; তাঁরা প্রস্তুত করেছিলেন জীবনের মহাপরিক্রমার পরীক্ষার জন্য।
নৈতিক মূল্যবোধ ছাড়া শিক্ষা যেমন শূন্য, তেমনি ধর্মীয় ও দার্শনিক দর্শনও বারবার আমাদের শিখিয়েছে নৈতিকতার গুরুত্ব।
মানুষের প্রকৃত শিক্ষা হলো সেই শিক্ষা, যা তাকে শুধু কর্মজীবনে সাফল্যের দিকে ঠেলে দেয় না, বরং নৈতিকতায় দৃঢ় করে, বিনম্রতায় আলোকিত করে, শ্রদ্ধাশীল ও দায়িত্বশীল করে তোলে। শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানের সঞ্চয় নয়, চরিত্র গঠন। আর আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতা জ্ঞানের মাধ্যমে অর্জিত হয়। তাই আমাদের প্রাপ্ত শিক্ষা, আমাদের ধারণ করা আলো যদি আমরা নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে পারি, তবে আগামী দিনের পৃথিবী হবে আরও উদার, আরও মানবিক, আরও নৈতিক। আমি বিশ্বাস করি, প্রকৃত শিক্ষা, আদর্শ শিক্ষক এবং নৈতিক উন্নয়নই পারে মানুষকে সত্যিকার অর্থে “চির উন্নত মম শীর” করে তুলতে। আর আমরা যদি সেই মহত্ত্বকে বুকে ধারণ করি, তবে আমাদের প্রত্যেকের জীবন সমাজের জন্য হয়ে উঠবে এক অমর আলোকবর্তিকা, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে পথ দেখানো এক চিরন্তন শিখা। যে শিক্ষা মানুষকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখায়, সেই শিক্ষাই সভ্যতার প্রকৃত মেরুদণ্ড।