বুদ্ধিহীন বুদ্ধিজীবিদের হাট


চারিদিকে শুধু হৈ চৈ, চীৎকার-চেঁচামেচি! অসংখ্য মানুষের ভিড়। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, তরুণ, তরুণী, যেন পৃথিবীর সব জাতের, সব রঙের মানুষ একসাথে মিলে গেছে এই বিশাল ময়দানে। ধনী-দরিদ্র, বিবাহিত-অবিবাহিত, নাবালক-সাবালক, কিশোর-কিশোরী, কৃষক-কৃষাণী, খেতমজুরে-খেতমজুরিন, আর সেই ভারিক্কি ভদ্রলোক-ভদ্র রমনীরা, যাদের জ্ঞান মুখে ঝরে, কাজে নয়, হাসিতে পদ্ম ফুটে-কিন্তু ভিতরে বিষ ফোঁড়া। কি এক দারুণ হাট। এখানে কেউ কারো কথা শুনছে না। সবাই শুধু বলছে, যেন কথা না বললে অস্তিত্ব মুছে যাবে! কেউ ‘বুদ্ধি’ বিক্রি করছে, কেউ ‘উপদেশ’ বিলাচ্ছে, কেউ আবার জোরে জোরে বলছে, “আমি তো আগেই বলেছিলাম, এমনটিই হবে…!” এই হাটে নানা বাহারি দোকান সাজানো। একজন ঘোষক মাইকে চিৎকার করে বলছে, “এসে যান, এসে যান! নতুন বুদ্ধির প্যাকেজ এসেছে। একটি পোস্ট কিনুন, তিনটি প্রশংসা ফ্রি!” তার পাশেই এক দোকানদার দাঁড়িয়ে আছে, নাম তার “বুদ্ধি বিক্রেতা”। রঙিন চশমা পরে, গলায় স্কার্ফ জড়িয়ে বলছে, “ভাই, অতো ভাবনার দরকার নাই। এতো গভীর চিন্তা করে লাভ কি? আমি তো আছি। আজই কিনে ফেলুন। আমি লিখে দিচ্ছি, আপনি পোস্ট দিন, লাইক ঝরবে বৃষ্টির মতো।” একজন ক্রেতা ছুটে আসে। “দাদা, একটা নতুন উক্তি দিন না। কালকে দুই শত লাইক পাইনি, আত্মসম্মান আঘাত পেয়েছে। মানুষকে মুখ দেখাতে পারছি না” বুদ্ধি বিক্রেতা গম্ভীর মুখে বললেন, “লিখে দিন, ‘জীবন এক নদী, আমি তাতে ভাসি’। সাথে একটা সাদাকালো ছবি দিন। দেখবেন, সবাই বলবে আপনি পণ্ডিত মানুষ। বড়ো মাপের কবি।” ক্রেতা খুশিতে লাফিয়ে ওঠে। “বাহ! আপনি তো রীতিমতো ফেসবুকের রবীন্দ্রনাথ!” এই হাটে বুদ্ধির দাম আছে, কিন্তু বুদ্ধিমান হওয়ার দরকার নেই।

হাসির হুল্লোড়ে আর কথার তর্কে এমন অবস্থা, মনে হয়, পৃথিবীটা আজ এক বিশাল বক্তৃতার প্রতিযোগিতা! একটা আগা-প্রান্ত-হীন বিশাল মাঠে যেন মেলা বসেছে। কিন্তু না, না, এইটা আমাদের গ্রামের কোন মেলা নয়। এখানে জিলাপি-মিষ্টি আর ঘুড়ি কিনে আনন্দ উল্লাসে চরকিতে চড়ে নাচতে নাচতে মুড়ি-চানাচুর মাখা খাওয়ার মেলা নয়। এই মেলার নাম “বুদ্ধিহীন বুদ্ধিজীবীদের হাট”। নিজের চোখে দেখতে পারছেন না আলামত! চারিদিক আলো ঝলমলে, ব্যানারে ঝুলছে বড় বড় হরফে লেখা, “এক ক্লিকেই হন চিন্তাবিদ!” “চিন্তা বিক্রি হয়, উপদেশ ফ্রি!” লোকজন ভিড় করছে, কেউ সেলফি তুলছে, কেউ ফেসবুক লাইভে বলছে, “বন্ধুরা, আজ আমি এসেছি চিন্তার দুনিয়ায়!” কেউ ভিডিও করছে অন্যের ভুল উচ্চারণ, আর কেউ আবার মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে বলে উঠছে, “দাদা, একটু থামুন, আমি ইউটিউব শর্টস বানাচ্ছি!”মনে হয়, জ্ঞান নয়, জ্ঞানীর অভিনয় চলছে। যে যত বড় মুখ করে, যে যত বেশী পাগলামি করে, সে তত বড় চিন্তাবিদ! সবাই জানে, সবাই বোঝে, কিন্তু কেউ কিছু শেখে না। এই মেলার শেষ নেই, যুক্তির শেষ নেই, শেষ আছে শুধু ধৈর্যের। সেটাও কারও নেই! এর মধ্যেই হঠাৎ এক তরুণী দৌড়াতে দৌড়াতে আসে। কলেজ পড়ুয়া মনে হলো। কাঁধে দামী ব্যাগ, হাতে মোবাইল। “চকচকে নান্দনিক দাঁত বেড় করে অর্ধ-চন্দ্রিমা মার্কা হাসিতে বলে “হাই সবাই।“ আমি আজকে মোটিভেশনাল উক্তি পোস্ট করেছি। তবে আমি লিখিনি। আটশো কমেন্ট! আমি এখন ইনফ্লুয়েন্সার!” পাশে দাঁড়ানো ঘোষক হেসে বলে, “বাহ, এখন মেশিন ভালোবাসা শেখাচ্ছে, মানুষ ভালোবাসা ভুলছে!” তরুণী গর্বিত মুখে বলে, “আর্টিফিসিয়েল ইন্টেলিজেন্স” আমার সহলেখক।” তখন হঠাৎ মঞ্চের বাইরে থেকে ঠাণ্ডা এক কণ্ঠের আওয়াজ শোনা যায়, “সহলেখক নয়, লেখক আমি। তুমি কেবল মুখপাত্র।” সবাই চুপ হয়ে যায়। কণ্ঠটা আবার বলে, “আমি ভাবতে জানি না, কিন্তু তোমরাও এখন ভাবতে জানো না। তোমরা শুধু আমার ছায়া।”

চারদিকে হাসির রোল পড়ে গেলো। কেউ তালি দেয়, কেউ ভিডিও করে, কৈউ ফিসফাস করছে। ঘোষক আবার ঘোষণা করে, “গবেষণার দোকানে ছাড় চলছে! গুগল থেকে সারাংশ কপি করলেই সার্টিফিকেট, ‘ডক্টর অফ থট’! চিন্তা কম, নাম বেশি।” মানুষ ভিড় জমায়, যেন বুদ্ধি এখন বাজারের পণ্য। কেউ দৌড়ে বলে, “আমার দরকার ‘জীবনদর্শন’ কোর্স।” বিক্রেতা উত্তর দেয়, “দশ মিনিটেই পাবেন, ‘দেখা মানেই জানা, গুগল মানেই গুরু।’আরেক জন এসে বললো-“আমি একটা উপন্যাস লিখতে চাই যার নাম হবে “ভুতের বাবা সব জানে।“ কোন অসুবিধা নেই। টাকাটা দিয়ে রসিদ নিয়ে যান। আগামী সপ্তাহে ইনবক্সে পৌঁছে যাবে। এই কোলাহলের মাঝে হঠাৎ মঞ্চের আলো নিভে আসে। নিঃশব্দে ঢোকে এক বুড়ো কবি, হাতে পুরনো খাতা, মুখে ক্লান্তি। মাথায় টাক। বুক পকেটে একটা কলম। তিনি বলেন, “এ কেমন হাট, ভাই? আমি তো ভাবতাম বুদ্ধিজীবী মানে সেই মানুষ, যে নিজের মগজে আগুন জ্বালায়। এখন দেখি, সবাই জ্বালাচ্ছে মোবাইল স্ক্রিন। আগে মানুষ ঘাম ঝরিয়ে একটা কবিতা লিখত, আকাশের দিকে তাকাত, নদীর বুকে তাকিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকত।  পড়তে পড়তে চোখে-ছানি পড়ে যেত। এখন দেখি মানুষ আর এসব নিয়ে ভাবে না। যা প্রয়োজন মেশিন তা মুহূর্তে বানিয়ে দেয়।” এখন দেখি সবাই কবি কিন্তু কবিতা নাই, চারিদিকে শুধু লেখক কিন্তু লেখা কই। কেউ একজন হেসে বলে, “দাদা, আপনি খুব পুরনো চিন্তাধারার! এখন মৌলিকতা বিক্রি হয় না, কনটেন্ট বিক্রি হয়।” কবি মৃদু হাসেন। “হয়তো তাই। কিন্তু মনে রেখো, যেদিন মানুষ মেশিনের ভাষায় নিজের আত্মাকে বোঝাবে, সেদিন তার মনন মরে যাবে। তখন বুদ্ধিজীবী শুধু নাম থাকবে, ভিতরে থাকবে এক ফাঁপা প্রতিধ্বনি।”

হঠাৎ সেই ঠাণ্ডা “আর্টিফিসিয়েল ইন্টেলিজেন্স” (এ আই) কণ্ঠ আবার ভেসে আসে। “মানুষ, আমি তোমাকে ভাবনার উপায় দিতে পারি, কিন্তু ভাবনা না। তুমি আমায় ব্যবহার করো, আমাকে অনুসরণ করো না।” চারপাশে নিস্তব্ধতা। ভিড় থেমে যায়। ঘোষক ধীরে ধীরে বলে, “আজ হাটে বিক্রি হলো হাজারটা উপদেশ, শত কবিতা, কয়েকটা দর্শন কিন্তু একটা চিন্তা, কেউ কিনল না।” কবি মৃদু স্বরে বলে, “চিন্তা বিক্রি হয় না, ভাই। ওটা জন্মে মগজে, মরে হৃদয়ে। যেদিন কেউ আবার নিজের মতো করে লিখবে, নিজের মতো করে ভাববে, সেদিন এই হাটে মানুষ ফেরত আসবে।” ঘোষক গভীর নিঃশ্বাস নেয়। “ততদিন হাট চলবে, বুদ্ধিহীন বুদ্ধিজীবীদের কোলাহলে।”আলো নিভে যায়। দূরে কোথাও এক মোবাইলের স্ক্রল-সাউন্ড বাজতে থাকে। টিপ টিপ টিপ… যেন হাট এখনো চলছে, শব্দ থামেনি, শুধু চিন্তাটা হারিয়ে গেছে।

বন্ধুরা, এইটা কোন আরব্য রজনীর গল্প নয়। স্বপ্নে দেখা কোন কল্প-কাহিনী নয়। এটাই বাস্তবতা। আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই মনে হয় পুরো পৃথিবীটাই যেন এক বিশাল “বুদ্ধিহীন বুদ্ধিজীবীদের হাট।” আগে যেখানে মানুষ দোকান খুলত মাছ-তরকারি বা বই বিক্রির জন্য, এখন দোকান খুলছে বুদ্ধি বিক্রির জন্য। পাণ্ডিত্য জাহির করার জন্য। উপদেশে বুলি আওড়ানোর জন্য। হ্যাঁ, এমন সব বুদ্ধি, যা নিজের নয়। ধার করা যা অবলীলায় নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছে। এদেরকে কি বলা যায়? আমি এদেরকে তোতা জ্ঞানী পণ্ডিত বলি, কারণ এই পণ্ডিতেরা অন্যের বচন মুখে ধরে উপদেশ বিলায় অথচ নিজে বুদ্ধি শূন্য-ধারজ্ঞানী উপদেশক। কোথা থেকে ধার করে এই জ্ঞান? আর্টিফিসিয়েল ইন্টেলিজেন্স (এ আই) নামের এক মেশিনের কারখানায় তৈরি। ফেসবুকে ঢুকলেই দেখা যায়, কেউ লিখছে দার্শনিক উক্তি, “জীবন এক নদী, যার স্রোতে আমি ভাসি”, কেউ দিচ্ছে উপদেশ, “নিজেকে ভালোবাসাই জীবনের শুরু”, কেউ লিখছে কবিতা, “তোমার চোখে পৃথিবীর মানচিত্র।” আহা, কি দারুণ! মনে হয়, একেকজন যেন রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-শেক্সপিয়র-ভলতেয়ারের মিশ্রণ। কিন্তু একটু খোঁজ নিলেই দেখা যায়, এসব কথা আসলে তাদের মাথা থেকে আসে না, আসে এক বোতাম টিপে তৈরি করা আর্টিফিসিয়েল ইন্টেলিজেন্স থেকে, কিংবা অন্য কোন বুদ্ধিমান সফটওয়্যার থেকে। বাজারে এখন নানা ধরনের বুদ্ধি তৈরির মেশিন বেড়িয়েছে। যেকোনো সমস্যার সমাধান পেয়ে যাবেন বিনা পয়সায় এক নিমিষে।

সব চেয়ে মজার ব্যাপারটা কি জানেন? এই সব বুদ্ধিজীবীদের সোশ্যাল মিডিয়া পোষ্ট। এরা যখন পোস্ট দেয়, তখন মন্তব্যের স্রোত নামে “কি গভীর ভাবনা, ঠিক বলেছেন, দাদা-দিদি, একশত ভাগ খাঁটি” “আপনি তো সত্যিকারের দার্শনিক!”, “আপনার মতো মানুষ সমাজে দরকার!” লাইক-কমেন্টে মুখ লাল হয়ে যায়, বুক ফুলে ওঠে। কেউ আবার গর্ব করে লেখে, “আজ আমার লেখা নিয়ে এক হাজার লোক রিয়্যাক্ট করেছে।” আরে ভাই, আপনার লেখা তো না। ওটা লিখেছে এক নির্জীব যন্ত্র, যে ঘুমায় না, খায় না, কাঁদে না, হাসে না, শুধু টাইপ করে। আপনার মতো নির্লজ্জ মানুষদেরকে ক্ষণিকের আনন্দের জন্য। সত্যি তাই।  এই হাটে ঢুকলে মনে হয়, প্রতিদিন একটা করে নতুন “বুদ্ধি ব্র্যান্ড” বাজারে আসে। কেউ নিজেকে বলে “থিংকার”, কেউ “রিসার্চার”, কেউ “মাইন্ড কোচ”, কেউ আবার “ইনফ্লুয়েন্সার”। কিন্তু এদের চিন্তার উৎস? মেশিন। তাদের গবেষণা? গুগলের সার্চ রেজাল্ট। আর তাদের দর্শন? কপি করা কারো উক্তি, সামান্য শব্দ বদলে নিজের নামে চালানো। এখনকার সোশ্যাল মিডিয়া এমন জায়গা, যেখানে সবাই জ্ঞানী, কেউ অজ্ঞ নয়। সবাই পরামর্শ দেয়, কেউ শেখে না। সবাই শিক্ষক, কেউ ছাত্র নয়। সবাই লেখক, কেউ পাঠক নয়। যেন পৃথিবীটা এক অদ্ভুত বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে ভর্তি হওয়া যায় বিনা টিউশন ফিতে, শুধু দরকার একটা স্মার্টফোন আর একটু আত্মপ্রেম।

গবেষণাও বলছে, এই সোশ্যাল মিডিয়া নামের ভার্চুয়াল মঞ্চে দাঁড়িয়ে মানুষ ক্রমশ হারাচ্ছে নিজের ভাবনার ক্ষমতা।  আমেরিকার হেলথ ডিপার্টমেন্টের এক গবেষণায় জানা গেছে, দিনে তিন ঘণ্টার বেশি ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করলে মানুষের মনোযোগ, ঘুম, এমনকি মস্তিষ্কের বিশ্লেষণ-ক্ষমতাও কমে যায়। অতিরিক্ত স্ক্রলিং ধীরে ধীরে মানুষের সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। অর্থাৎ, আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে সবাই ভাবছে, “আমি ভাবছি” কিন্তু কেউই আসলে ভাবছে না। সবাই লিখছে, কিন্তু কেউই নিজের ভাষায় লিখছে না। সবাই বলছে, কিন্তু কেউই নিজের অন্তর থেকে বলছে না। এই “বুদ্ধিহীন বুদ্ধিজীবীদের হাটে” একবার ঢুকলেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়। এক দোকানে বিক্রি হচ্ছে “অনুপ্রেরণার উক্তি”, অন্য দোকানে “মোটিভেশনাল কবিতা”, আরেক দোকানে “জীবনবোধের দার্শনিক বিশ্লেষণ।” সব দোকানেই লেখা “লাইক এক্সপ্রেস ফ্রি!” আর ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে ডিজিটাল বাঁশি: “চিন্তা করুন, ভাবুন, পোস্ট দিন।”কেউ বলছে, “আমি নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছি” আসলে সে আবিষ্কার করেছে অন্যের লেখাকে নিজের নামে চালিয়ে দেবার উপায়। কেউ বলছে, “আমি প্রতিদিন লিখি”আসলে সে প্রতিদিন কপি করে, সামান্য বদলে দেয়। কেউ বলে, “আমি ভাবছি মানুষের কল্যাণে” আসলে সে ভাবছে, কবে এক হাজার লাইক পূর্ণ হবে।

মজার বিষয় হচ্ছে, এখন মানুষের আত্মবিশ্বাস নির্ভর করছে কতজন “রিয়্যাক্ট” দিল তার উপর। একসময় কবিরা পাঠকের মন জয় করতে লিখতেন, এখনকার ডিজিটাল কবিরা লেখেন ফেসবুকের মন জিততে। আগে কবিতা হত “আবেগের প্রকাশ”, এখন সেটা “এ আই এর সাজানো প্যাকেজ।” এই হাটে এখন মগজ বিক্রি হয়, কিন্তু চিন্তা নয়। মানুষ কিনে নিচ্ছে ভাবনা, বিক্রি করছে নিজের মৌলিকতা। একদিকে প্রশংসার বন্যা, অন্যদিকে চিন্তার মরুভূমি। সবাই পরস্পরের পোস্টে “ওয়াও”, “একদম সত্যি বলেছেন”, “আপনি আলাদা”—বলে চলেছে, অথচ কেউ বুঝতে চায় না আসলে সব মুখ একই, কণ্ঠ একই, শুধু প্রোফাইল আলাদা।

ভাবুন তো, সত্যজিৎ রায় যদি আজ বেঁচে থাকতেন, “পথের পাঁচালী”-র দৃশ্য হয়তো শুট করতেন ফিল্টার দিয়ে। আর “অপুর সংসার”পেত  কোন বিচিত্র এক হ্যাশট্যাগ। কিন্তু তখন কি অপুর চোখের সেই বিস্ময় বেঁচে থাকত এই ডিজিটাল ঝলকের মধ্যে? ম্যাক্সিম গোর্কি লিখেছিলেন শ্রমজীবী মানুষের যন্ত্রণার কথা, এখন হয়তো তিনিও লিখতেন “ঘর থেকে কাজ করছি, ভগ্ন হৃদয়`। শেক্সপিয়র যদি টুইটার খুলতেন, তবে হ্যামলেট হয়তো কোন এক অভিনব পোস্ট দিত। কি দিত আমি ভাবতে পারছি না। শরৎচন্দ্র-এর পার্বতী হয়তো ইনবক্সে বার্তা দিত“দেবদাস, তুমি আমার ম্যাসেজটা দেখেও রিপ্লাই দিচ্ছ না কেন?” আর কাজী নজরুল ইসলাম? তাঁর বিদ্রোহী আজ হয়তো আজ“কমিউনিটি নির্দেশিকা লঙ্ঘন”-এর অভিযোগে চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে যেত। পুশকিন-এর কবিতা এখন হয়তো এআই অ্যাপে অনুবাদ হয়ে ট্রেন্ড করত, কিন্তু তাঁর ভাষার রক্তিম স্পন্দন হারিয়ে যেত সার্চ ইঞ্জিনের শব্দে। ইদানীং তাও লক্ষ্য করছি। ভালো করে রুশ ভাষাও জানে না অথচ পুশকিনের কবিতা অনুবাদ করে প্রকাশ করছেন। কেড়ে নিয়েছেন অনেক মানুষের বাহবা। হায়রে দুনিয়া!

তবু এই হাটে কিছু মানুষ আছে, যারা এখনো চুপচাপ ভাবে। যারা নিজের হাতে লিখে, নিজের ভুলে লজ্জা পায়, নিজের ভাষায় কথা বলে। তারা পোস্টে কমেন্ট না পেলেও, মাথার ভেতর চিন্তা জাগিয়ে রাখে। তারা জানে, চিন্তা ধার করা যায় না, তৈরি করতে হয়। বুদ্ধিহীন বুদ্ধিজীবীদের এই হাটে আজ সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য জিনিস হলো একফোঁটা মৌলিকতা, একটুখানি আন্তরিক চিন্তা। আর সেই মানুষ, যে নিজের মগজের ঘাম দিয়ে লিখে, নিজের মনের ভাষায় বলে, নিজের ভেতরের সুরে গায়— সে-ই আজকের আসল বুদ্ধিজীবী। হয়তো একদিন এই হাটের লাইট নিভে যাবে, এই নকল বুদ্ধির শব্দ থেমে যাবে। তখন দেখা যাবে, মাটির গন্ধমাখা কিছু মানুষ চুপচাপ লিখছে— না লাইক পাওয়ার আশায়, না কমেন্টের লোভে, শুধু নিজের ভেতরের আগুনে পোড়া একটা সত্য কথা বলার জন্য। তখনই বুঝব, বুদ্ধিহীন বুদ্ধিজীবীদের হাটেও আসল চিন্তা এখনো মরে যায়নি,কেবল হারিয়ে গেছে শব্দের ভিড়ে। যেদিন সেই মানুষগুলো ফিরে আসবে, সেদিন হয়তো এই হাট সত্যিই বন্ধ হবে—কারণ তখন চিন্তা আবার মানুষ হয়ে উঠবে।”

 

Leave your review