
বল বীর –বল উন্নত মম শির!শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!
কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার এই অগ্নিঝরা উচ্চারণ যেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এক অনির্বাণ আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। শৈশব থেকে বইয়ের পাতায় কিংবা মঞ্চে দাঁড়িয়ে বুক সোজা করে এই পঙ্ক্তি উচ্চারণের স্মৃতি আমাদের সবারই মনে গেঁথে আছে। সত্যিই, শব্দগুলো উচ্চারিত হলেই দেহ-মনে জেগে ওঠে এক দুর্নিবার বিদ্রোহী শক্তি। ১৯২২ সালে বিজলী পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত এই কবিতা কেবল একটি সাহিত্যকীর্তি নয়, বরং বাংলার যুবসমাজকে স্বাধীনতার সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করার এক অমর আহ্বান। আত্মমর্যাদা, অদম্য সাহস আর শক্তির জাগরণের সেই ডাক আজও সমানভাবে অনুপ্রেরণা জোগায়। এই `বিদ্রোহী` কবিতারই একটি লাইন“চির উন্নত মম শীর”। এই উচ্চারণের মধ্যে আছে মানুষের অন্তরের মহত্ত্ব, জীবনের সত্যিকার সার্থকতা। নজরুল যখন এই আহ্বান জানিয়েছিলেন, তিনি কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির কথা বলেননি, বলেছেন এক সমষ্টিগত জাগরণের কথা। তিনি চেয়েছিলেন মানুষের মাথা উঁচু হোক, কেবল ভৌত উন্নতিতে নয়, নৈতিকতায়, সাহসে, আত্মবিশ্বাসে এবং মানবিকতায়। তাঁর সেই আহ্বান ছিল সমাজের দীনহীন, পরাধীন মানুষের প্রতি; তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন, মাথা নত করে নয়, বরং গৌরবের সঙ্গে চলতে হবে। কিন্তু সেই গৌরব হবে মানবিকতার গৌরব, সত্যের গৌরব, ন্যায়ের গৌরব। এই পটভূমি থেকেই বুঝতে পারা যায়, শিক্ষা কেবল পাঠ্যবই পড়া বা ডিগ্রি অর্জনের নাম নয়। শিক্ষা আসলে মানুষকে এমনভাবে গড়ে তোলে যাতে সে নিজের ভেতরের সম্ভাবনাকে চিনতে পারে এবং সমাজের জন্য আলো হয়ে উঠতে পারে। রবীন্দ্রনাথ তাই বলেছিলেন, শিক্ষার লক্ষ্য কেবল কর্মসংস্থান নয়, শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো মনুষ্যত্বের বিকাশ। মানুষ যখন শিক্ষার মাধ্যমে দায়িত্ববোধ, সহিষ্ণুতা, শ্রদ্ধা ও বিনম্রতা অর্জন করে, তখন সে সত্যিকার অর্থে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
আমাদের গ্রামের স্কুলের শতবর্ষ উদযাপন কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘায়ু নয়; এটি আসলে এক শতাব্দীর স্মৃতি, ত্যাগ, সংগ্রাম আর আলোকিত অনুপ্রেরণার অমর দলিল। হয়তো এই বিদ্যালয়ে নগরীর আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ছিল না, তবুও এর প্রতিটি শিক্ষক ছিলেন একেকজন দীপশিখা, যারা নিভৃতে আমাদের জীবনকে আলোকিত করেছেন। তাঁদের চোখে শিক্ষার মানে ছিল কেবল পাঠ্যসূচি শেষ করা নয়, বরং মানুষের ভেতরের মানুষটিকে জাগিয়ে তোলা। তাঁরা শিখিয়েছিলেন, জীবনের প্রকৃত সাফল্য শুধু পেশাগত সোপানে আরোহণ নয়, আসল সাফল্য নিহিত থাকে নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধে দৃঢ় থাকার মধ্যে। সততা ও নৈতিক দৃঢ়তা ছাড়া কোনো মানুষ পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। এ সত্য তাঁদের শিক্ষা থেকেই আমরা প্রথম শিখেছি। এই স্কুলেই প্রথম আমি পড়েছিলাম লিও টলস্টয়ের অমর রচনা “Three Questions”। আনোয়ার স্যারের কণ্ঠে সেই গল্প শোনার দিনটি আজও আমার মনে জীবন্ত। তিনি আমাদের বোঝালেন, মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো বর্তমান মুহূর্ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হলো যার সঙ্গে আমরা এখন আছি, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সেই মুহূর্তে যে কাজটি করছি। তখন হয়তো মনে হয়েছিল এটি কেবল একটি গল্প, কিন্তু আজ বুঝি, সেই তিনটি উত্তর আসলে জীবন পরিচালনার এক মহামন্ত্র। কখনো ভাবিনি, সেই সরল পাঠের বীজ এত গভীরে প্রোথিত হবে আমার অন্তরে, যে একদিন তা আমার প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি কাজে দিশারী হয়ে উঠবে। জীবনের বাঁকে বাঁকে, যখনই বিভ্রান্তি বা দ্বিধায় পড়েছি, আনোয়ার স্যারের পড়ানো সেই শিক্ষা নিঃশব্দে আমাকে পথ দেখিয়েছে। আজ পিছনে তাকিয়ে মনে হয়, সেদিন শ্রেণিকক্ষে বসে শোনা সেই গল্পই আমার চরিত্র গঠনের এক অমূল্য ভিত্তি হয়ে উঠেছিল, আর তারই আলো আমাকে আজকের অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে। আজও লিও টলস্টয়ের অমর নৈতিক শিক্ষামূলক গল্প ‘তিনটি প্রশ্ন’ আমি প্রতিটি ক্লাসে শেয়ার করি, যেন শান্তি ও সমৃদ্ধির চিরন্তন মূলমন্ত্র ছাত্রদের হৃদয়ে বীজ হয়ে অঙ্কুরিত হয়।
আজ এই মুহূর্তে চোখ বুজলেই ভেসে ওঠে সেই স্কুলটির ছবি। বিস্তীর্ণ মাঠকে বুকে জড়িয়ে, মাথা উঁচু করে আজও গর্বভরে দাঁড়িয়ে আছে, আমাদের “কাদবা তলাগ্রাম তারিণীচরণ লাহা উচ্চ বিদ্যালয়।” শতবর্ষের ইতিহাস বুকে ধারণ করা এই বিদ্যালয় কেবল ইট-পাথরের দালান নয়, এটি আমাদের শৈশবের হাসি-কান্না, স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা আর সংগ্রামের জীবন্ত সাক্ষী। সেই মাঠেই আমরা মুক্ত পাখির মতো দৌড়েছি, ভরিয়ে তুলেছি আকাশ-বাতাস আমাদের হাসির সুরে। প্রতিটি ধূলিকণা যেন এখনও ধরে রেখেছে আমাদের পায়ের ছাপ, আমাদের হৃদয়ের উচ্ছ্বাস। সেই পুকুরের জল, যেখানে আমরা আনন্দে ভেসেছি, আর কদমগাছের ছায়া, যেখানে বসে অগণিত গল্প বুনেছি—সবই ছিল আমাদের শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রকৃতি আমাদের শিখিয়েছে সৌন্দর্যের পাঠ, মাটি শিখিয়েছে বিনম্রতা, আর গ্রাম শিখিয়েছে সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ। আজও মনে হয়, কদমগাছের ফুলের গন্ধ যেন নস্টালজিয়ার মতো বাতাসে ভেসে আসে। আরও ভেসে আসে স্মৃতি। আমার প্রাথমিক শিক্ষার প্রথম দুই বছর কেটেছিল সত্যিই গাছতলায়। ইটের উপর খাতা রেখে, সবুজ ঘাসে বসে স্লেট আর চক দিয়ে অক্ষরের রেখা টানা, সেই দিনগুলো আজও মনে হলে মন ভরে যায় অদ্ভুত প্রশান্তিতে। তখন আমাদের ছায়াঘেরা ক্লাসরুম ছিল প্রকৃতির বুকের উপর, পাখির ডাক, বাতাসের শীতলতা, কদমফুলের গন্ধ মিশে যেত শিক্ষার প্রথম অক্ষরে। সেই সরল দিনগুলো মনে পড়লে আজও বুক ভরে ওঠে এক অদ্ভুত আনন্দে, আবার চোখও ভিজে ওঠে।
কিভাবে ভুলব সেই অমূল্য মানুষদের? রহমান স্যার, রাজ্জাক স্যার আর মজিদ স্যার—প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেই তিনজন মহৎ শিক্ষক, যাঁরা কেবল শিক্ষকরূপে ছিলেন না, ছিলেন পিতৃতুল্য অভিভাবক। তাঁরা হাত ধরে আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন শিক্ষার আলোর পথে, হাঁটি হাঁটি পা বাড়াতে শিখিয়েছিলেন জীবনের প্রথম যাত্রায়। রহমান স্যার আমাকে প্রথমবার অ আ ক খ লিখতে শিখিয়েছিলেন। স্লেটের উপর চক কাঁপতে কাঁপতে অক্ষর আঁকতাম, আর তিনি মমতার হাসি দিয়ে বলতেন, “ভালো হচ্ছে, চেষ্টা চালিয়ে যাও।” রাজ্জাক স্যার ছিলেন দৃঢ়, কিন্তু তাঁর চোখে ছিল অফুরন্ত মায়া। ভুল করলে শাসন করতেন, আবার সেই শাসনের ভেতরেই লুকিয়ে থাকত ভালোবাসার স্পর্শ। প্রায়ই তিনি আমাদের বাড়িতে চলে আসতেন, খোঁজ নিতেন আমার এবং আমার দাদার পড়াশোনার। স্কুলের পাশেই ছিল আমাদের বাড়ি, তাই তাঁর আসা-যাওয়া ছিল খুবই স্বাভাবিক। আজ ভাবলে অবাক লাগে। এ যুগে কি কল্পনা করা যায়, শিক্ষকরা এভাবে নিঃস্বার্থ যত্নে ছাত্রদের মানুষ করে তুলতেন? সেই ভালোবাসা, সেই দায়িত্ববোধ আজও স্মৃতিকে ভিজিয়ে রাখে অনন্ত কৃতজ্ঞতায়। মজিদ স্যার ছিলেন যেন মৃদু স্রোতের মতো। কখনো রাগ দেখাতেন না, ধৈর্যের সঙ্গে আমাদের শেখাতেন যোগ-বিয়োগের জাদু। তাদের মমতা, স্নেহ আর শাসনের মধ্যে ছিল এক অদৃশ্য জাদু। আমরা ছোট্ট বেলায় হয়তো বুঝতে পারিনি, কিন্তু আজ উপলব্ধি করি, তাঁরা আমাদের চরিত্রের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের কণ্ঠস্বর, তাঁদের চোখের দৃষ্টি, তাঁদের হাতের ছোঁয়া আজও মনে পড়ে অমলিন হয়ে। সেই স্যারেরা না থাকলে হয়তো আমরা এভাবে পৃথিবীর সামনে দাঁড়াতে পারতাম না। গাছতলার সেই স্লেটের দিনগুলো, সেই শিক্ষাগুরুদের স্নেহময় উপস্থিতি আজও আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষা মানে শুধু বইয়ের অক্ষর নয়, শিক্ষা মানে জীবনের প্রথম পদক্ষেপে সঠিক পথে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি। আর সেই শক্তিই আমাকে জীবনের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি চ্যালেঞ্জে পথ দেখিয়েছে।
কিন্তু এই স্মৃতির ভেতরে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে মানুষগুলো। মনে পড়ে, সহপাঠী জাহাঙ্গীরের কথা।যে আজ একজন উঁচু পর্যায়ের ব্যাংকার। বছর পনের আগে একবার দেখা হয়েছিলো চট্রগ্রামে। খুব ভালো লেগেছিলো। কত যে স্বপ্ন দেখত সে সেই ব্রীজটির উপরে বসে। প্রায় সময়ই আমরা মিলিত হতাম ওদের আর আমাদের গ্রামের মধ্য দিয়ে এঁকে বেকে যাওয়া খালটির উপরে এই ব্রীজটির উপর। কথা হতো নানা বিষয়ে। মনে পড়ে সেলিমকে। সে আজ কানাডায়। দূরদেশে থেকেও যেন সে এখনও আমাদের হাসিখুশি ক্লাসমেটই। সব সময় যোগাযোগ করে। এভাবে সবার সাফল্য আমাদের স্কুলের নামকে উজ্জ্বল করে তুলছে দূরদেশে, দূরসমুদ্রে। দেশে গেলে রহিমের সঙ্গে প্রায়ই দেখা হয়। গ্রামে আমার যাওয়া খবর পেলেই সে দৌড়ে চলে আসে আমাদের বাড়িতে। কখনো ওয়াদুদকে সঙ্গে নিয়ে। কয়েকবার আবার আমাকে ওদের বাড়িতেও নিয়ে গেছে। সেই দিনগুলোর সরলতা আর আন্তরিকতা আজও মনে পড়লে এক অদ্ভুত উষ্ণতায় ভরে ওঠে মন। রহিম এখন একজন শিক্ষক। তার নৈতিকতা, ছাত্রদের প্রতি তার আন্তরিক যত্ন আর দায়িত্ববোধ দেখে আমি বারবার মুগ্ধ হয়েছি। সত্যিই, এমন আদর্শ শিক্ষকের আজ বড়ই অভাব। অথচ সমাজের প্রকৃত অগ্রগতি কেবল তখনই সম্ভব, যখন এই ধরনের নিবেদিতপ্রাণ ও আদর্শবান শিক্ষকরা নতুন প্রজন্মকে মানুষ করে তুলবে। শিক্ষক শুধু জ্ঞান দেন না, তিনি গড়ে তোলেন জাতির ভবিষ্যৎ।
স্কুল জীবনের সেই মহান শিক্ষকদের কথা ভোলা সত্যিই অসম্ভব। বিশেষ করে পণ্ডিত স্যার। যাঁকে আমি আজও মনে করি বিদ্বান ঋষিতুল্য এক আলোকবর্তিকা হিসেবে। তাঁর নীরব অথচ গভীর জ্ঞানের ভাণ্ডার আমাদের চলার পথে দিকনির্দেশ দিত দৃঢ়ভাবে, অচঞ্চলভাবে। মনে পড়ে, পায়ে খড়ম পড়ে খটখট আওয়াজ তুলে তিনি ক্লাসে প্রবেশ করতেন, আর তাঁর মুখে শোনা সেই চিরন্তন সংস্কৃত লাইনটি—‘বিদ্বত্বং চ নৃপত্বং চ নৈব তুল্যং কদাচন।স্বদেশে পূজ্যতে রাজা বিদ্বান্ সর্বত্র পূজ্যতে।’ অর্থাৎ—রাজা কেবল নিজের দেশে সম্মানিত হন, কিন্তু বিদ্বান বা জ্ঞানী সর্বত্র সম্মান পান। এই অমর বাণী আমাদের মনে গেঁথে দিয়েছিল যে জ্ঞান ও নৈতিকতার আলোই হলো প্রকৃত শক্তি। আজকের বিশ্বেও, যেখানে প্রযুক্তি আর ভোগবাদের দাপট ক্রমেই বাড়ছে, সেখানে সমাজকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন এমনই আদর্শ শিক্ষক, যাঁরা শুধু পাঠ্যবই নয়, জীবনের শিক্ষা দিয়ে নতুন প্রজন্মকে মানুষ করে তুলবেন।
মতিন স্যারকেও বেশ মনে পড়ে। তাঁর ছোট মেয়ে ইয়াসমিন আমাদের সাথেই পড়ত। শান্ত, ছিমছাম স্বভাবের মেয়েটি পড়াশোনায় ছিল ভীষণ ভালো। স্কুলের কোয়ার্টারে বাবা আর বড় বোনের সঙ্গে থাকত সে। কত সুন্দরভাবে মিশে গিয়েছিল আমাদের সবার সাথে! কিন্তু একসময় স্যারের বদলির কারণে তাঁদের চলে যেতে হলো। সেই দিনটি যেন এখনো চোখের সামনে ভাসে—সহপাঠীকে হারানোর ব্যথায় আমরা সবাই নিঃশব্দে কষ্ট পেয়েছিলাম। সময় যতই পেরিয়ে যাক, সেই শূন্যতার অনুভূতি আজও হৃদয়ে রয়ে গেছে।”মতিন স্যার ইংরেজি শিখিয়েছিলেন হৃদয় দিয়ে; তাঁর ক্লাসে বসে মনে হতো শব্দগুলো যেন ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে। আর মধুসূদন স্যার, খুব কম হাসতেন, কিন্তু তিনি ছিলেন অংকের এক জীবন্ত যাদুঘর। কঠিন অংকও তাঁর হাতে যেন সহজে গলে যেত। আজ যখন কোনো সমস্যার সামনে দাঁড়াই, তখন মনে হয় অংকের মতোই এরও সমাধান আছে—এই শিক্ষাই তো তিনি দিয়ে গেছেন। আনোয়ার স্যারই যেন আমাদের ভবিষ্যৎ সাফল্যের সিঁড়িটা সামনে এনে দিয়েছিলেন। যতবার দেশে গিয়েছি, ততবারই তিনি ছুটে এসেছেন। তাঁর দুদণ্ড আশীর্বাদের করস্পর্শে আমি আলোকিত হয়েছি অগণিতবার। আর অরুণ স্যার? আজও মনে পড়ে, মেট্রিক পাস করে যেদিন কলেজে ভর্তি হতে ঢাকা যাচ্ছিলাম, স্কুলের গেটেই তিনি মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন— ‘যেখানেই যাস, তোর কোনো ভয় নেই। তুই অনেক দূর এগিয়ে যাবি।’ স্যারের সেই দৃঢ় বিশ্বাস আমার পথচলার সবচেয়ে বড় প্রেরণা হয়ে আছে আজও। তাঁকে জানাই আমার গভীর প্রণাম। স্কুলের প্রতিটি শিক্ষকের প্রতিই রইল আমার অগাধ শ্রদ্ধা। আর দপ্তরী কাকার কথা কীভাবে ভুলব? কতদিন কাছে এসে স্নেহভরে বাদামের ছোট্ট প্যাকেট হাতে তুলে দিয়েছেন তিনি। সেই সরল ভালোবাসা আর আত্মত্যাগে ভরা দিনগুলোই তো আমাদের মানুষ করে তুলেছিল। আজ যখন ফিরে তাকাই, মনে হয়, আমার জীবনের সেরা সম্পদ হলো সেই মানুষগুলো, যাঁরা নিঃস্বার্থভাবে আলো ছড়িয়ে গেছেন আমার পথে। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতার এই ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না।
এই সব মানুষ, এই সব অগণিত স্মৃতি মিলেমিশে যেন গড়ে তুলেছে আমাদের জীবনের শেকড়ে এক অমূল্য ধনভাণ্ডার। আজ যখন বিদ্যালয়ের শতবর্ষের পুণ্যক্ষণ উদযাপিত হচ্ছে, তখন মনে হয় আমরা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস স্মরণ করছি না—আমরা ফিরে যাচ্ছি আমাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশবের সোনালি আঙিনায়, সেই নির্ভেজাল হাসির দিনগুলোয়। মনে গভীরে আজ এক অদ্ভুত টান জাগে, এক ব্যথা—যেতে পারছি না, থাকতে পারছি না, অথচ হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন আজও ছুটে যায় সেই চেনা প্রাঙ্গণে। এই স্কুল, এই মানুষগুলোই আমাদের শিখিয়েছে কেমন করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়, কেমন করে সততা আর নৈতিকতার মশাল বুকে জ্বালিয়ে রাখতে হয়, আর কেমন করে মানুষের অন্তরের মহত্ত্বকে লালন করতে হয়। তাই আজ দূরে থেকেও চোখ ভিজে আসে কৃতজ্ঞতার অশ্রুজলে—কারণ এই বিদ্যালয় শুধু আমাদের জীবনের ভিত্তি নয়, এ আমাদের অন্তরের দীপশিখা, পথ চলার প্রকৃত আলোকবর্তিকা।
পশ্চিমের মহাদার্শনিক প্লেটো বলেছিলেন—“শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো আত্মাকে আলোর দিকে ফেরানো।” অর্থাৎ শিক্ষা মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোয় নিয়ে যায়, তাকে প্রকৃত অর্থে মানুষ করে তোলে। মহাত্মা গান্ধীও বলেছিলেন, “শিক্ষা তখনই পূর্ণ হয় যখন তা মানুষের অন্তরে নৈতিক শক্তি জাগ্রত করে।” আবার ধর্মীয় নেতারাও একই সত্য উচ্চারণ করেছেন—বুদ্ধ করুণার গুরুত্ব দিয়েছেন, খ্রিস্ট ভালোবাসার, আর হজরত মুহাম্মদ (স.) চরিত্রের শ্রেষ্ঠত্বকে মানব জীবনের মূল শিক্ষার আসনে বসিয়েছেন। আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হয়তো বড় বড় দার্শনিক ছিলেন না, কিন্তু তাঁদের প্রতিটি শিক্ষা, প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি পরিশ্রম আমাদের অন্তরে সেই আলোই জ্বালিয়েছিল। তাঁরা আমাদের দেখিয়েছিলেন যে শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল ভালো চাকরি বা সাফল্য নয়, বরং সৎ মানুষ হওয়া, সাহসী মানুষ হওয়া, নৈতিক মানুষ হওয়া। আজ শতবর্ষ পরেও তাঁদের সেই অক্লান্ত পরিশ্রম আমাদের জীবনে পথপ্রদীপের মতো জ্বলে আছে। শিক্ষা মানুষকে শুধু জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে না, বরং তাকে স্থিতিস্থাপক করে তোলে। জীবনের ঝড়-ঝাপটা সামলাতে যে ধৈর্য, যে সাহস দরকার, তা আসে শিক্ষার মধ্য দিয়েই। এই শিক্ষা আমাদের শেখায় ব্যর্থতাকে ভয় না পেতে, একাকীত্বকে দুর্বলতা নয় বরং শক্তির উৎস হিসেবে দেখতে। যেমন রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছিলেন—“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।” এটি শুধু একক যাত্রার গান নয়, বরং শিক্ষার প্রকৃত রূপ—যে শিক্ষা মানুষকে স্বনির্ভর করে, সাহসী করে, এবং নৈতিকভাবে দৃঢ় করে।
তাই আজ, এই শতবর্ষপূর্তির মহোৎসবে আমরা শুধু বিদ্যালয়ের অতীতকে স্মরণ করছি না, বরং শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যের
আজ যখন আমার প্রিয় বিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্ণ হলো, তখন মনে হয় এই শত বছরের যাত্রা আসলে এক অনন্য সমষ্টিগত আলোকযাত্রা। শিক্ষকেরা তাঁদের জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়ে আমাদের আলোকিত করেছেন, সহপাঠীরা সেই আলো ভাগাভাগি করে নিয়েছে, আর গ্রামের মানুষ সেই আলোকে হৃদয়ে ধারণ করে সমাজকে আলোকময় করেছে। আমাদের শৈশব, আমাদের স্মৃতি, আমাদের শিক্ষাগ্রহণ—সব মিলে গড়ে তুলেছে সেই শক্ত ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়েই আমরা আজ গর্বভরে উচ্চারণ করতে পারি—“চির উন্নত মম শীর।” কিন্তু এই আলোকযাত্রা থেমে থাকার নয়। আমরা যদি এই শিক্ষা, এই আলোর ধারা নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে পারি, তবে আমাদের সমাজ হবে আরও সুন্দর, আরও মানবিক, আরও সমৃদ্ধ। কারণ প্রকৃত শিক্ষা শুধু জ্ঞান দেয় না—এটি দেয় নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, এবং মানুষের অন্তরের মহত্ত্বকে লালন করার শক্তি। আদর্শ শিক্ষক, সৎ শিক্ষা ও নৈতিক উন্নয়নই পারে একটি জাতিকে সত্যিকার অর্থে মহৎ করে তুলতে। আর তখনই কাজী নজরুল ইসলামের সেই আহ্বান—“বিদ্রোহী”—শুধু কবিতার ছন্দে নয়, আমাদের প্রতিদিনের জীবনেও প্রতিফলিত হবে।
আজ আমার গ্রামের স্কুলের শতবর্ষ উদযাপনের এই স্মৃতিময় মুহূর্তে সেই চিরন্তন লাইনটি যেন আরও গভীর অর্থে ধ্বনিত হয়। এক শিক্ষক সংকলনের জন্য কিছু লিখতে বললেন। শরীরীভাবে উপস্থিত থাকতে না পারলেও মন উড়ে গেল সেই শৈশবের প্রাঙ্গণে। মনে পড়ল পুকুরের শীতল জলে সাঁতার কাটার আনন্দ, কদমগাছের ছায়ায় বসে গল্প করার দিনগুলো, আর সেই মহান শিক্ষকদের শাসন ও স্নেহে ভরা অমূল্য মুহূর্তগুলো। একটি স্কুল কেবল ইট-কাঠ-পাথরের গাঁথুনি নয়; এটি মানুষের চরিত্র ও মনন গড়ার কর্মশালা। যদি শিক্ষা কেবল পাঠ্যবই মুখস্থ করার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা অপূর্ণ থেকে যায়। রবীন্দ্রনাথ একে গভীরভাবে বলেছেন—“শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো মনুষ্যত্বের বিকাশ।” সত্যিই তাই, প্রকৃত শিক্ষা মানে শুধু তথ্য বা জ্ঞান অর্জন নয়, বরং মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা। যখন আমরা শ্রদ্ধা করতে শিখি, ভুল স্বীকার করতে শিখি, বিনম্রতার মাধুর্যে অন্যের পাশে দাঁড়াতে শিখি—তখনই আমরা সত্যিকারের শিক্ষিত হয়ে উঠি। একজন আদর্শ শিক্ষক হচ্ছেন সেই আলোকবর্তিকা, যিনি অন্ধকারে আমাদের পথ দেখান। কনফুসিয়াসের ভাষায়, “শিক্ষক আপনাকে কী ভাবতে হবে তা শেখান না, শেখান কীভাবে ভাবতে হয়।” আমার গ্রামের স্কুলের শিক্ষকরা এমনই ছিলেন। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মাঝেও তাঁরা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছিলেন—শিখিয়েছিলেন সততা, শিখিয়েছিলেন কষ্টকে ভয় না পেতে, শিখিয়েছিলেন সমাজের প্রতি দায়িত্ববান হতে। আজ ফিরে দেখি, তাঁরা শুধু পরীক্ষার খাতার জন্য আমাদের প্রস্তুত করেননি; তাঁরা প্রস্তুত করেছিলেন জীবনের মহাপরিক্রমার পরীক্ষার জন্য।
নৈতিক মূল্যবোধ ছাড়া শিক্ষা যেমন শূন্য, তেমনি ধর্মীয় ও দার্শনিক দর্শনও বারবার আমাদের শিখিয়েছে নৈতিকতার গুরুত্ব। বুদ্ধ করুণা ও মৈত্রীর শিক্ষা দিয়েছেন, ঈসা খ্রিস্ট ভালোবাসাকে সর্বোচ্চ বলেছেন, আর হজরত মুহাম্মদ (স.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠ, যার চরিত্র সর্বোত্তম।” মহাত্মা গান্ধীও বলেছিলেন, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার সেরা উপায় হলো অন্যের সেবা করা। এই শিক্ষাগুলোই মানুষকে প্রকৃত অর্থে উন্নত করে, মহৎ করে। জীবনের পথে বাধা আসবে, ব্যর্থতা আসবে, কিন্তু স্থিতিস্থাপক মানুষই পারে সব ঝড় মোকাবিলা করতে। রবীন্দ্রনাথের সেই অমর ডাক—“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে”—আমাদের শিখিয়ে দেয় সাহস ও ধৈর্য নিয়ে এগিয়ে যেতে। নৈতিক শক্তি ও মানসিক স্থিতিস্থাপকতা মানুষকে প্রকৃত অর্থে মহিমান্বিত করে। আজ যখন শতবর্ষ উদযাপন হচ্ছে। এই গ্রামের এইস্কুলে প্রতিটি শিক্ষক, প্রতিটি সহপাঠী, এমনকি গ্রামের প্রতিটি মানুষ মিলে গড়ে তুলেছিল এক মানবিক শিক্ষার ভুবন। এই ভুবনেই আমরা শিখেছি কেমন করে ছোট ছোট স্বপ্ন বড় জীবনের রূপ নিতে পারে। সেই কদমগাছের ছায়ার নিচে হয়তো আমরা বুঝতেও পারিনি যে আমরা শিখছি বিনম্রতা, আমরা শিখছি সৌন্দর্য দেখতে, আমরা শিখছি ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতা।
মানুষের প্রকৃত শিক্ষা হলো সেই শিক্ষা, যা তাকে শুধু কর্মজীবনে সাফল্যের দিকে ঠেলে দেয় না, বরং নৈতিকতায় দৃঢ় করে, বিনম্রতায় আলোকিত করে, শ্রদ্ধাশীল ও দায়িত্বশীল করে তোলে। সক্রেটিস বলেছিলেন, “শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানের সঞ্চয় নয়, চরিত্র গঠন।” আবার অ্যারিস্টটল আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, “শিক্ষার শিকড় তেতো, কিন্তু ফল চিরমধুর।” হিন্দু দর্শনের উপনিষদে বলা হয়েছে—“সত্যমেব জয়তে”—সত্যই সর্বদা বিজয়ী। স্টোইক দার্শনিক এপিকটেটাস বলেছিলেন, “আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতা জ্ঞানের মাধ্যমে অর্জিত হয়।” গীতা আমাদের শিক্ষা দেয়—“যে ব্যক্তি কর্মে নিযুক্ত হয় কিন্তু ফলের প্রতি আসক্ত নয়, তিনিই প্রকৃত জ্ঞানী।” আর ইসলামের শিক্ষায় মহানবী (স.) বারবার জোর দিয়েছেন, “একজন মুমিনের সর্বোত্তম সম্পদ হলো তার উত্তম আচরণ।” এইসব জ্ঞানধারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শিক্ষা শুধু জ্ঞানের ভাণ্ডার নয়, এটি চরিত্র ও মানবিকতার নির্মাতা। এই সব জ্ঞানের আলোকধারা একসাথে মিলে আমাদের শেখায় যে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানুষকে মহৎ করে তোলা। আজ আমার গ্রামের স্কুল শতবর্ষ পেরিয়ে নতুন শতকে পদার্পণ করছে। এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সময়চিহ্ন নয়; এটি আমাদের মানস গড়ার এক অমূল্য ইতিহাস। সেই শিক্ষার আলোই আমাদের শিখিয়েছে সততা, ধৈর্য, দায়িত্ববোধ এবং মানবতার পথে অটল থাকার শক্তি। তাই আমাদের প্রাপ্ত শিক্ষা, আমাদের ধারণ করা আলো যদি আমরা নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে পারি, তবে আগামী দিনের পৃথিবী হবে আরও উদার, আরও মানবিক, আরও নৈতিক। আমি বিশ্বাস করি—প্রকৃত শিক্ষা, আদর্শ শিক্ষক এবং নৈতিক উন্নয়নই পারে মানুষকে সত্যিকার অর্থে “চির উন্নত মম শীর” করে তুলতে। আর আমরা যদি সেই মহত্ত্বকে বুকে ধারণ করি, তবে আমাদের প্রত্যেকের জীবন সমাজের জন্য হয়ে উঠবে এক অমর আলোকবর্তিকা, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে পথ দেখানো এক চিরন্তন শিখা।