মৃত্যুর অপরাধ: ভবেশচন্দ্র রায়ের হত্যা


আমি ভেবেছিলাম পারভেজের হাসি মুছে যাওয়ার পর আর কোনো মৃত্যুর গল্প লিখতে হবে না। ভেবেছিলাম, একবার হৃদয় ভাঙলে, মানুষ হয়তো ধীরে ধীরে সেই যন্ত্রণায় অবিচল হয়ে পড়ে—যেন আর কিছুই ব্যথা দিতে পারে না। কিন্তু বাস্তব বড় নির্মম। ১৮ই এপ্রিলের সেই রক্তভেজা বিকেল আবারও প্রমাণ করে দিল—এই ভূখণ্ডে বেঁচে থাকা যেন এখন একটা অপরাধ, বিশেষত যাদের বিশ্বাস ও পরিচয় একটু ভিন্ন। মনে হলো, একজন মানুষকে শুধু তাঁর পরিচয়ের জন্য, তাঁর বিশ্বাসের জন্য, এত সহজে নিঃশেষ করে দেওয়া যায়—এতটা নিষ্ঠুরতা কীভাবে জন্ম নেয় সমাজে? আমি অবাক হয়ে ভাবি, মৃত্যুর খবর এত সাধারণ হয়ে উঠেছে কেন? কেন একেকটি মুখ হারিয়ে যাচ্ছে, আর আমরা শুধুই সংখ্যা গুনি? পারভেজের পর ভেবেছিলাম, হয়তো আর এমন ঘটবে না, হয়তো সমাজ শিখবে, কিছুটা হলেও পাল্টাবে। কিন্তু এই মৃত্যু বুঝিয়ে দিল—আমরা আসলে শিখিনি কিছুই। বরং প্রতিবার নতুন করে ভুলছি, প্রতিবার আরও নিস্পৃহ হচ্ছি। এই নিস্পৃহতাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, কারণ তা শুধু অন্যায়ের প্রতি নয়, মানবতার প্রতি আমাদের দায়িত্বকেও অস্বীকার করে। বিশ্বাসে অবিচল থাকা, ন্যায়বোধে দৃঢ় থাকা—এই দুটি গুণ আজকের এই সমাজে যেন এক মৃত্যুদণ্ডের নাম। ভবেশচন্দ্র রায়ের হত্যাকাণ্ড আমাদের কেবল দুঃখিত করে না, আমাদের গভীরভাবে লজ্জিত করে। কারণ, আমরা তাঁকে বাঁচাতে পারিনি, ঠিক যেভাবে পারভেজকেও পারিনি।

 

ভবেশচন্দ্র রায়—শুধু একটি নাম নয়, একটি আশ্রয়ের ঠিকানা। দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলার বাসুদেবপুর গ্রামের এই শান্ত, সদালাপী মানুষটি ছিলেন হিন্দু সমাজের অভিভাবকস্বরূপ। শুধু একটি গোষ্ঠীর নয়, পুরো সমাজের জন্য তিনি ছিলেন নির্ভরতার প্রতীক। তার হৃদয় ছিল মিতভাষী, কিন্তু প্রতিটি কথায় ছিল গভীরতা, সাহস, এবং মানবিকতা। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের বিরল ইউনিটের সহ-সভাপতি, একটি এমন পদে থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনো নিজেকে বড় কিছু মনে করতেন না। সমাজে যখন অন্যায়, বৈষম্য, নিপীড়ন, আর বৈষম্যের বলি হত সাধারণ মানুষ, তখন তিনি যেন সেই অসহায়দের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছিলেন। নিঃশব্দে, বিনা স্বার্থে তিনি পাশে দাঁড়াতেন সকল দুর্বল, নির্যাতিত মানুষের। এমন এক মানুষ, যিনি নিজেকে কখনো প্রচারের আলোয় দেখতে চাননি, কিন্তু তার কাজ, তার ন্যায়পরায়ণতা, তার মানবিকতা তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল এক আদর্শ ব্যক্তিত্ব হিসেবে। অথচ সেই মানুষটিকে কেড়ে নেওয়া হলো, দিনের আলোয়, জনপদের মাঝখানে—নিষ্ঠুরতার এমন এক উদাহরণ রেখে, যা বিবেককে স্তব্ধ করে দেয়। এমন একটি সমাজে যেখানে তিনি নিজেকে তুলে ধরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেন, সেই সমাজই তাকে এত নির্মমভাবে কেড়ে নিলো, যেন তার জীবন ছিল অচিরেই নিষ্কলঙ্ক বিনাশের দিকে পরিচালিত। এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি মানুষকে হত্যা করা নয়, এটি একটি সভ্যতার মৃত্যু—যেখানে এক সুস্থ, সক্রিয় সমাজে এমন মানুষের অভাব ঘটে, তখন সে সমাজের ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। ভবেশচন্দ্র রায়ের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তির প্রাণহানি নয়, এটি একটি পরিহাস, একটি অন্ধকার দৃষ্টান্ত যা আমাদের সকলের আত্মা রক্তাক্ত করে দেয়।

 

১৮ এপ্রিল ২০২৫ সাল, এক শোকাবহ বিকেল। সেদিন বিকেল সাড়ে চারটায় একটি অজানা নম্বর থেকে ফোন আসে—“ভবেশবাবু বাড়িতে আছেন কি?” আধ ঘণ্টা পর চারজন অজ্ঞাত যুবক এসে হাজির হয় ভবেশবাবুর বাড়িতে। তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, তারপর ন্যাড়াবাড়ি এলাকায় তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। চেতনা হারানো অবস্থায় তাকে একটি ভ্যানে করে ফেলে রেখে যাওয়া হয় বাড়ির কাছাকাছি। পরিবার দ্রুত তাকে বিরল উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেয়, সেখান থেকে পাঠানো হয় দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে—কিন্তু চিকিৎসকদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ভবেশচন্দ্র রায় আর ফিরে আসেন না।

 

তার মৃত্যুর ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। তার স্ত্রী শান্তনা জানান, তিনি দুজন সন্দেহভাজনকে চিনতে পেরেছেন, কিন্তু তবুও এখন পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তার পুত্র স্বপন চন্দ্র রায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন, তবে তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। পুলিশ বলছে, তদন্ত চলছে, কিন্তু সেই তদন্তের গতি যেন অনেকটা সমাজের উদাসীনতা আর রাষ্ট্রের নিস্পৃহতার প্রতিচ্ছবি। ভবেশচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পর বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সংগঠন এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং দোষীদের শাস্তি দাবি করেছে। কিন্তু এখনও সমাজে নীরবতা, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এবং গণমাধ্যমে প্রয়োজনীয় গুরুত্বের অভাব এই হত্যাকাণ্ডকে আরেকটি পরিসংখ্যানে পরিণত করে তুলছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ইতিহাস দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ১৪৭টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। ৪০০টির বেশি বাড়ি, শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, প্রায় ৯০টির মতো মন্দির ধ্বংস হয়েছে। এ এক পৈশাচিক পরিসংখ্যান, যা একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্নকে প্রতিনিয়ত ভেঙে চুরমার করে। ভবেশচন্দ্র রায়ের এই মৃত্যু একটি নিছক ঘটনা নয়। এটি একটি বার্তা—সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেওয়া এক ভয়ানক সতর্কবাণী। তার এই নির্মম বিদায় আমাদের প্রশ্ন করে, "আর কত জীবন গেলে আমরা জাগবো? আর কত নির্যাতন হলে মানবতা কথা বলবে?" এই মৃত্যু যেন সমাজের বিবেকের এক নিরব, অথচ ভয়ানক ধ্বংস। ভবেশচন্দ্র রায় ছিলেন আলোয় ভরা এক বাতিঘর, যিনি অন্ধকার সময়েও আশার দীপ্তি ছড়িয়ে গেছেন। তাঁর মৃত্যু আমাদের দোষী করে—কারণ আমরা যথেষ্ট আওয়াজ তুলিনি, যথেষ্ট প্রতিরোধ গড়িনি।

 

রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।” ভবেশচন্দ্র রায় সেই একজন, যিনি একা চলেছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে। কিন্তু এখন সময় এসেছে, আমরা যেন একা তাকে দাঁড়াতে না দিই। আমরা যেন তার মৃত্যুকে ইতিহাসের পাতায় একটি সংখ্যা হিসেবে না রেখে তা থেকে শিক্ষা নিই, সোচ্চার হই, এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে গণপ্রতিরোধ গড়ি। কারণ, ভবেশচন্দ্র রায়ের মৃত্যু আমাদের বলে দেয়—এই দেশ এখনো নিরাপদ নয়, যদি তাতে প্রতিটি মানুষের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত না হয়। যদি আমরা চুপ থাকি, তবে আগামীকাল হয়তো আরেক ভবেশচন্দ্র রায় হারিয়ে যাবে—আর আমরা কেবল ফিরে তাকিয়ে কাঁদবো, কিন্তু কিছুই বদলাবো না। এই মৃত্যু, এই ব্যথা—তাকে কেবল স্মরণ নয়, রূপ দিতে হবে সংগ্রামের শক্তিতে। তা-ই হলে ভবেশচন্দ্র রায় বেঁচে থাকবেন—আমাদের প্রতিবাদে, আমাদের সংহতিতে, আমাদের বিবেকে।

 

ভবেশচন্দ্র রায় আর নেই—কিন্তু আমাদের সামনে রেখে গেছেন এক অমোচনীয় প্রশ্নচিহ্ন: আমরা কি সত্যিই একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়তে পেরেছি? এই প্রশ্ন আমাদের বিবেককে ধাক্কা দেয়, আমাদের নিরবতাকে চ্যালেঞ্জ করে।
তাঁর মৃত্যু যেন এক দীপ্ত শপথে পরিণত হোক—এই সমাজে আর যেন কোনো ভবেশচন্দ্র রায় না হারান। আমাদের প্রতিবাদ, আমাদের সক্রিয়তা, আমাদের সহমর্মিতা হোক ভবেশের জন্য এক নতুন বাঁচার জায়গা। আমরা যদি সত্যিই চাই তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানাতে—তাহলে কেবল শোক নয়, প্রতিরোধ গড়তে হবে। চারপাশে যে অন্ধকার জমে উঠছে, তার বিরুদ্ধে আলোর মিছিল শুরু করতে হবে। যেন ভবিষ্যতের কোনো শিশু, কোনো সংখ্যালঘু পরিবার, কোনো ভবেশ আর ভয়ের মধ্যে বাস না করে। ভবেশচন্দ্র রায় চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর সাহস, তাঁর নীরব লড়াই, তাঁর অঙ্গীকার আমাদের বাঁচিয়ে রাখুক—সত্য, ন্যায়, আর মানবতার পথে।

 

ভবেশচন্দ্র রায়—একটি নাম, একটি প্রজ্ঞার আলো, একটি ন্যায়ের স্পন্দন—আজ নির্দয় সমাজের হিংস্র থাবায় নিঃশেষ হয়ে গেলেন। আমরা যারা বেঁচে আছি, তারা যেন একেকজন সাক্ষী—একটি মহাপতনের, একটি সভ্যতার ক্রমাগত আত্মহননের। তাঁর রক্ত, তাঁর দগদগে ব্যথা এখনো আমাদের পায়ের নীচে ছড়িয়ে আছে; তাঁর পরিবারের কান্না এখনো বাতাস ভারী করে রেখেছে; তাঁর নির্ভীক কণ্ঠস্বর, যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছিল, এখনো যেন আকাশের গভীর নীলিমায় ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি? নাকি কানে আঙুল দিয়ে, চোখ ঢেকে, নিজেদের দায়মুক্তির মিথ্যা আশ্রয়ে বসে আছি? মনে রাখতে হবে, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। আজ যাঁদের মৃত্যু আমরা সংখ্যায় পরিণত করছি, কাল সেই সংখ্যা আমাদেরও গিলে ফেলবে। ভবেশচন্দ্র রায়ের মৃত্যু কেবল তাঁর একার মৃত্যু নয়; এটি আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতার এক নির্মম দলিল। একটি অন্ধকার যুগের সূচনা, যেখানে ন্যায়বোধ, মানবিকতা, সহমর্মিতা—এসব শব্দ কেবল বইয়ের পাতায় বন্দী হয়ে যাবে, আর বাস্তবে রাজত্ব করবে হিংসা, বৈষম্য আর নৃশংসতা। ভবেশচন্দ্রের নিঃশব্দ বিদায় আমাদের কাছে এক মহাকাব্যিক অনুরোধ রেখে যায়—নিজেদের দোষ স্বীকার করে জেগে ওঠার। তাঁর মৃত্যু আমাদের শপথ করায়: যতদিন একটি শিশুও ভয়ে কাঁপবে তার পরিচয়ের জন্য, যতদিন একটি নারীও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাবে তার বিশ্বাসের কারণে, যতদিন কোনো মানুষও বাঁচার অধিকারের জন্য লড়তে বাধ্য হবে, ততদিন আমরা নিজেদের সভ্য বলতে পারবো না। ভবেশচন্দ্রের চোখে হয়তো স্বপ্ন ছিল—একটি এমন সমাজের, যেখানে পরিচয় নয়, মানবিকতা হবে মানুষের আসল পরিচয়; যেখানে বিশ্বাসের জন্য নয়, মানবতার জন্য মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াবে। সেই স্বপ্নকে মুছে দিয়েছে নৃশংসতার হাতে। এখন দায়িত্ব আমাদের—আমাদের কণ্ঠ দিয়ে, আমাদের প্রতিবাদ দিয়ে, আমাদের প্রতিরোধ দিয়ে সেই স্বপ্নকে আবার বাঁচিয়ে তোলা।

 

ভবেশচন্দ্র রায় চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর সাহস, তাঁর ন্যায়প্রীতি, তাঁর নীরব সংগ্রাম আমাদের চেতনায় অনন্ত এক অগ্নিশিখা হয়ে জ্বলুক। তাঁর মৃত্যুকে যেন আমরা একটি পরিসংখ্যানে হারিয়ে না ফেলি, বরং তা হয়ে উঠুক আমাদের জাগরণের মশাল।আজ এই মুহূর্তে, এই শোকের গভীরে দাঁড়িয়ে আমরা যদি শপথ না করি—তবে ভবিষ্যৎ আমাদের ক্ষমা করবে না। ভবেশচন্দ্র রায়ের রক্তে ভেজা মাটির দিকে তাকিয়ে আমরা যদি আবারও নীরব থাকি, তবে এই নীরবতা একদিন আমাদের আত্মার চরম পরাজয়ে রূপ নেবে।

Leave your review