
রবিবার অর্থাৎ ২০শে এপ্রিল সকালটা শুরু হলো একটা ফেসবুক পোস্ট দিয়ে, যেটা আমার হৃদয়টাকে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে দিল। “হত্যা এত সহজ ব্যাপার হয়ে গেল”-শিরোনামের ছবি সহ পোষ্টটি শেয়ার করেছেন আমার এক বন্ধু তার ফেইসবুকে। পারভেজ নামের এক তরুণ আর নেই—শুধু "হাসি"র জন্য তাকে জীবন দিতে হলো। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, এমন কিছু এত সহজে, এত নৃশংসভাবে ঘটে যেতে পারে। আমি বাকরুদ্ধ, হতবাক, আর ভীষণ রকম ক্ষুব্ধ। ভাবি, আমরা কি এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে হাসাও এখন অপরাধ? যেখানে বন্ধুদের সাধারণ আড্ডা, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কিছু খাওয়া, একটু হাসাহাসি—এইটুকু স্বাভাবিক আনন্দই কারও ভুল বোঝাবুঝিতে পরিণত হতে পারে ভয়ঙ্কর পরিণতিতে? পারভেজের মৃত্যু আমাদের কেবল একজন তরুণকে হারানো নয়, এটি আমাদের মানবিকতার মৃত্যু, আমাদের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার নগ্ন ব্যর্থতা। আমি পারভেজকে চিনতাম না, কিন্তু আজ তার জন্য মনে হচ্ছে—এই তো আমাদের কেউ। হয়তো আমার বন্ধু হতে পারত, হয়তো আমি নিজেই হতে পারতাম ওর জায়গায়। আমার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করে ওঠে এটা ভাবলেই। আমরা যারা এখনো বেঁচে আছি, তাদের কি কোনো দায় নেই এই মৃত্যুর সামনে? আমরা আর কবে মুখ খুলব? কবে বলব—এ আর না? পারভেজের জন্য, তার পরিবারের জন্য, আমাদের সবার ভবিষ্যতের জন্য—এবার নীরব থাকলে চলবে না।
জাহিদুল ইসলাম পারভেজ এখন আর নেই। আর কখনও সে তার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেবে না, আর কোনো ক্লাসে যাবে না, আর কোনো স্ট্যাটাস দেবে না ফেসবুকে। অথচ সে বেঁচে থাকার কথা ছিল, স্বপ্ন দেখার কথা ছিল। শুধু একটি তুচ্ছ ভুল বোঝাবুঝির কারণে এক নির্মল তরুণকে হারাতে হলো আমাদের—এ কেবল একটি খুন নয়, এটি সমাজের এক নীরব, গভীর ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকার প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। পারভেজ তাঁর দুই বন্ধুকে নিয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে শিঙাড়া খাচ্ছিলেন, গল্প করছিলেন, হাসছিলেন। এটি একেবারেই স্বাভাবিক একটি দৃশ্য—যেকোনো তরুণের জীবনের প্রতিদিনের অংশ। কিন্তু আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই নারী শিক্ষার্থী মনে করলেন, তারা বুঝি তাদের নিয়েই হাসছেন। কিছু না বুঝেই তারা কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অনুমান করা হয়, তারা তাদের পরিচিত কোনো ‘বয়ফ্রেন্ড’ বা ঘনিষ্ঠ পুরুষ বন্ধুদের ফোন করে বিষয়টি জানান।
একটি সত্যিকারের সভ্য সমাজে এমন ঘটনা কখনোই ঘটত না। যে সমাজে যুক্তিবোধ, সহনশীলতা, মানবিকতা ও ন্যায়বিচার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত, সেখানে কেউ কেবল একটি হাসির ভুল ব্যাখ্যায় ছুরি হাতে তুলে নেয় না। সেখানে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয় মুক্তির জায়গা, আলোয় ভরা প্রাঙ্গণ—যেখানে তরুণেরা স্বপ্ন দেখে, আড্ডা দেয়, গান গায়, হাসে। অথচ আমরা এমন এক অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে সেই হাসিই মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যখন ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই পক্ষকে শান্ত করলেন, তখন সবাই ভেবেছিল—ঘটনা শেষ। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভয়ঙ্কর; কারণ এই সমাজে সমস্যার সমাধান হয় না কথায়, হয় প্রতিহিংসায়। কিছুক্ষণ পরেই প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে উঠল তিনজন যুবক, সঙ্গে নিলো আরও কিছু "সাথী", আর পরিণতিতে—পারভেজের বুক চিরে গেল এক ইঞ্চির একটি ছুরির কোপে। একটি জীবন নিভে গেল মুহূর্তেই। এ কি কেবল একটি খুন? না, এটি আমাদের যুগের ঘন অন্ধকার অধ্যায়, যেন মধ্যযুগীয় বর্বরতার ফিরে আসা—যেখানে মানুষিক উন্নতি নেই, আছে কেবল গায়ের জোর, ইগো আর রক্তপাত।
তবে এখানেই শেষ নয় প্রশ্নের ঝাঁপি। সেই দুই নারী শিক্ষার্থী—তাদের ভূমিকা কি ছিল? কারা তারা? কীভাবে এমন সামান্য ভুল বোঝাবুঝি এত বড় পরিণতির দিকে ঠেলে দিল? তারা কি আজও নির্বিকার? তারা কি অনুভব করছে, একটুখানি ভুল ধারণা কি ভয়ঙ্কর পরিণতি বয়ে এনেছে? আর যেসব যুবকেরা এই খুন করল—তাদের পরিচয় সবাই জানে, ভিডিও আছে, সাক্ষী আছে, সামাজিক মিডিয়া তোলপাড়—তবুও তারা এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে কেন? এই কি সেই বাংলাদেশ, যেখানে আইন সবার জন্য সমান? আমরা কি সত্যিই বিশ্বাস করি, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত আছে? একের পর এক খুন হয়, বিচার হয় না, প্রশ্ন উঠে—আমরা কি আসলে একটি সভ্য জাতি? না কি আমরা এখনো অন্ধকার যুগেই বাস করছি, যেখানে তর্কের জবাব হয় ছুরিতে, আর প্রশ্নের উত্তর হয় রক্তে? পারভেজের রক্তের ছোপগুলো কেবল ফুটপাথে নয়, তারা লেগে আছে আমাদের নীরব মুখে, আমাদের দায়হীন চেতনায়। এই মৃত্যু আমাদের সবাইকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—যতদিন না আমরা একসাথে মুখ খুলি, রুখে দাঁড়াই, ততদিন এসব গল্প শুধু ঘটেই যাবে। পারভেজের মতো তরুণেরা হারিয়ে যাবে, আর আমরা বলব, "কি দুঃখজনক ঘটনা!", তারপর ভুলে যাব। কিন্তু মনে রাখা উচিত—পারভেজ যদি হারায়, একদিন আমরাও হারাব। কারণ অন্যায়ের মুখে নীরবতা, কখনোই নিরাপত্তা দেয় না—দেয় কেবল নতুন মৃত্যুর ডাক।
পারভেজকে যারা চিনতেন, তারা বলেন, সে ছিল দারুণ হাসিখুশি, বিনয়ী ও নম্র একজন ছেলে। এক বন্ধু জানান, “সে সালাম দিয়ে কথা শুরু করত, হাসি দিয়ে কথা শেষ করত।” কত নির্মল একটি ছেলেকে এভাবে হারিয়ে ফেললাম আমরা! তার সেই হাসিই আজ মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে—কি নিদারুণ পরিহাস! প্রশ্ন উঠছে, সমাজ এত অ-সহিষ্ণু হয়ে উঠল কেন? এমন এক সময় আমরা পার করছি যেখানে একটি হাসির ভুল ব্যাখ্যা কাউকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে। ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয় না কথাবার্তায়, বরং রক্তাক্ত হয় ছুরির কোপে। এ কেমন সমাজ? এখানে আরও একটি বাস্তবতা নিয়ে ভাবতে হবে—পারভেজ ছিলেন একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি বুয়েটের না, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের না। তাই কি এখনো হত্যাকারীরা গ্রেফতার হয়নি? বিচার-প্রক্রিয়া শুরু হতে দেরি হচ্ছে? এই প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বিচার চাই তখনই, যখন নিহত ব্যক্তি পরিচিত মুখ, বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের ছাত্র, মিডিয়ার আলোয় থাকা কেউ। অথচ প্রতিটি মানুষের জীবন সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ন্যায্যতা কারো নেই—সে যেখানেই পড়ুক, যার সঙ্গেই থাকুক না কেন।
এই নীরবতা ভয়ংকর। আমাদের সমাজে বহু হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি কেবল এই জন্য যে, আমরা সবাই চুপ থেকেছি। যতদিন না আমরা দলমত নির্বিশেষে ন্যায়বিচারের জন্য মুখ খুলব, ততদিন এসব হত্যাকাণ্ড ঘটতেই থাকবে।
পারভেজের খুনিরা প্রকাশ্যে এসেছে, ভিডিও ফুটেজ রয়েছে, অসংখ্য প্রত্যক্ষদর্শী আছেন—তবুও এখনো কেন তারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে? এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকে দিতে হবে। প্রশাসনকে দিতে হবে। ন্যায়ের প্রতীক হয়ে যারা দায়িত্বে আছেন, তারা যদি ন্যায়ের পক্ষেই না দাঁড়ান, তাহলে সমাজ ভেঙে পড়বে, আমরা ভেঙে পড়ব। পারভেজ আর নেই। কিন্তু তার হাসি, তার মৃত্যু আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—এই দেশ, এই সমাজ, এই মানুষ কি পথে হাঁটছে? আমাদের সন্তানরা যদি রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাসতেও ভয় পায়, তাহলে সে কেমন জীবন? আমরা যারা এখনো বেঁচে আছি, যারা পারভেজের জায়গায় থাকতে পারতাম, আমাদের কর্তব্য—এবার নীরব না থাকা। আমরা চাই, এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার হোক দ্রুত, সুষ্ঠু এবং দৃষ্টান্তমূলকভাবে। যেন আর কোনো পারভেজ এভাবে হারিয়ে না যায়, যেন কোনো হাসি আর মৃত্যুর কারণ না হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে বিচার-প্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের আস্থার জায়গাটি দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে। একসময় মানুষ ভাবত, অন্যায় হলে আদালত আছে, প্রশাসন আছে, রাষ্ট্র-পক্ষ থাকবে সাধারণ মানুষের পাশে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিশ্বাস ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। এখন যেন আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই; বিচার আছে, কিন্তু কেবল কাগজে-কলমে। ক্ষমতার রাজনীতি, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ এবং মিডিয়ায় আলো না পাওয়া মামলাগুলো যেন একপ্রকার নীরবে ধামাচাপা পড়ে যায়। বিচার-প্রার্থীরা বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরেও যখন একটি দিনের জন্যও ন্যায়বিচার পান না, তখন তাদের মনে জন্ম নেয় হতাশা, ক্ষোভ, এবং একসময় চিরতরে হারিয়ে যায় আস্থা। বিচার বিলম্বিত হয়, কখনোবা হয়ই না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা, তদন্তে গাফিলতি, এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মিলিয়ে অনেক মামলাই ঝুলে থাকে বছরের পর বছর। আর যে মানুষগুলো অধিকার নিয়ে কথা বলে, তারা হয় নিঃস্ব হয়, না হয় নিখোঁজ হয়, কিংবা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সাধারণ নাগরিকের চোখে ন্যায়বিচার এখন যেন অলীক এক কল্পনা—যা শুধু বক্তৃতা, সংবিধানের পাতায় কিংবা বিশেষ দিবসের ব্যানারে থাকে, বাস্তবে তার কোনো উপস্থিতি নেই।
রাষ্ট্র যখন নির্লিপ্ত, প্রশাসন যখন নিষ্ক্রিয়, তখন অপরাধীরা উৎসাহিত হয়—তারা জানে, তাদের কিছুই হবে না। তারা জানে, একটি জীবনের মূল্য এখানে কিছু নয়। ফলে পারভেজদের মতো নিষ্পাপ প্রাণ ঝরে যায় বুকচিরে রক্তের স্রোতে, আর আমরা তাকিয়ে থাকি—অসহায়, নির্বাক। এমন একটি সমাজে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, যেখানে নিরাপত্তা একটি বিলাসিতা, যেখানে ন্যায়বিচার একটি অনিশ্চয়তা। এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে আরও বহু পারভেজ হারিয়ে যাবে, আর আমরা কেবল খবরে পড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলব—কোনো পরিবর্তন হবে না। তাই এখন সময়, আমাদের জেগে ওঠার, এই ভাঙাচোরা ন্যায়ের কাঠামোকে প্রশ্ন করার, এবং সত্যিকারের বিচার চেয়ে আওয়াজ তোলার। যাতে করে ন্যায়ের নামে এই অবিচার চিরতরে থেমে যায়।
পারভেজ নেই, কিন্তু তার মৃত্যু এক নীরব প্রতিবাদ। যেন সে বলছে—"আমার হাসি ভুল বোঝো না, আমি কাউকে ঠাট্টা করিনি, আমি শুধু বাঁচতে চেয়েছিলাম।" এই মৃত্যু কেবল একটি ছেলে হারানো নয়, এটি আমাদের মানবিকতার অপমৃত্যু। আমরা যারা বেঁচে আছি, পারভেজের বন্ধুরা, স্বজনেরা, কিংবা যারা তার মতোই কোনোদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে হেসেছিলাম—এবার নীরব থাকলে অপরাধ আমাদেরও ছুঁয়ে যাবে। আমাদের উচিত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, বিচার-প্রার্থনায় এক হওয়া। যেন আর কোনো পারভেজ হারিয়ে না যায়, যেন আর কোনো মা খালি হাতে ফিরে না আসে হাসপাতালের বারান্দা থেকে। পারভেজের হাসি আজ রক্তমাখা এক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—এই দেশ, এই সমাজ, আমরা কি আদৌ মানুষের মতো মানুষ হতে পারলাম?