
আর মাত্র এক দিন বাকি নতুন বছর শুরু হওয়ার। আজ ৩০শে ডিসেম্বর ২০২৪। লন্ডনে এখনো হাঁড় কাঁপানো শীতের প্রকোপ নেই। তবে আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাসে আগামী সপ্তাহে বরফ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হিমাংকের নীচে তাপমাত্রা থাকবে প্রায় রাত্রেই। প্রকৃতিতে যখন এমন অবস্থা, তখন পশ্চিমা বাজার অর্থনীতিতে নেমে এসেছে সাহারার তপ্ত আগুনের হলকা। বাজার একেবারে গরম। আর সেই গরমে বেসামাল পশ্চিমের মানুষরা। হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে সাধারণ মানুষজন। অথচ পশ্চিমের রাজনীতিবিদ, উদার অর্থনীতিবিদ, যুদ্ধবাজ সামরিক বিশেষজ্ঞগণসহ মার্কা মারা পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিনিয়ত ঢাক-ঢোল পিটিয়ে মিথ্যাচার করে যাচ্ছে, যেন এখনো কিছুই হয়নি। যা কিছু হচ্ছে, সবই ভালোর জন্য, গণতন্ত্রের রক্ষার জন্য, ইউক্রেইনকে জয়ের আসনে আসীন করার জন্য। মিথ্যাচার চলছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। দিনকে রাত বানানোর আর সত্যকে মিথ্যা বানানোর গল্পে থাকতে থাকতে একদিন যখন মহা বিপদের দামামা বেজে উঠবে, সে দিন যে আর বাঁচার উপায় থাকবে না, সেটা এখনো পশ্চিমাদের মগজে ঢুকেনি। এই বছর শেষ হতে চললো। ৩১শে ডিসেম্বর ইউক্রেইনে রাশিয়ার স্পেশাল মিলিটারি অপারেশনের ১০৪২ দিন পূর্ণ হবে। সংকট শুরু হয়েছিল ২৩শে ফেব্রুয়ারী ২০২২। সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে কত কিছু ঘটে গেলো, তা আমাদের সকলেরই জানা। তবে যেটা কেউ জানতে পারেনি, বা বুঝতে পারেনি কিংবা বুঝতে চায়নি, সেটা হলো এই সংকটে পশ্চিমাদের ভরাডুবি হবে, ইউক্রেইনের পতন হবে এবং রাশিয়া জয়ের মুকুটে সজ্জিত হবে। পুতিন হয়ে উঠবেন এক পরাক্রমশালী, বুদ্ধিদ্বীপ্ত রণকৌশলী বিশ্ব নেতা।
সংকট শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে এক অভূতপূর্ব মনোযোগ আকর্ষণ লক্ষণীয়, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক অংশগ্রহণের কারণে। এদের সাথে যুক্ত হয়েছে তাদের সাঙ্গো-পাঙ্গোরা। অর্থাৎ ন্যাটোভুক্ত আরো কিছু দেশ। মূলতঃ ইউ, যুক্তরাস্ট্র এবং ন্যাটোভুক্ত দেশগুলিই সংকটে ইউক্রেইনের পক্ষ নেয় এবং ইউক্রেইক রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতে বাধ্য করে। প্রায় ৫০টিরও অধিক পশ্চিমা দেশ রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে। সামরিক সাহায্য আর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢেলে দিচ্ছে ইউক্রেইনকে। লক্ষ্য একটাই—রাশিয়াকে যে কোনোভাবে পরাস্ত করতে হবে। রাশিয়ার পরাজয় মানে পশ্চিমাদের একচ্ছত্র আধিপত্য আর বিশ্বব্যপী লম্ফ-ঝম্প। আট-ঘাট বেঁধে লেগেছে পশ্চিমা দেশগুলি। প্রয়োজনে ইউক্রেইনের সবাই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ুক, মরতে হয় মরবে, তবুও রাশিয়াকে দমাতে হবে, পুতিনকে ধ্বংস করতে হবে, এতে করে যদি পশ্চিমের মানুষদের নাভিশ্বাসও শুরু হয় অসুবিধে নেই। রাশিয়াকে দমাতেই হবে। তাই কোমরে গামছা বেঁধে নেমেছিল পশ্চিমারা। গত কয়েক বছরে, এই পশ্চিমা দেশগুলো বিশাল অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছে, কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং ইউক্রেনকে ব্যাপক সামরিক সহায়তা দিয়েছে। ইউক্রেইন হয়ে উঠেছে পশ্চিমাদের ভিক্ষার ঝুলি, আর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি হয়ে উঠেছেন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ভিক্ষুক। একের পর এক অনুরোধ করেছেন এবং পশ্চিমারা সব কিছু ঢেলে দিয়েছেন। এসব প্রচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়াকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল করা, তাকে পিছু হটাতে বাধ্য করা। তবে বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে—যেখানে রাশিয়া এবং তার নেতা ভ্লাদিমির পুতিন আগের চেয়ে আরও দৃঢ় এবং অনেক ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন। একেই বলে শাপে বর।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হলো যুদ্ধবাজদের সর্দার। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের জন্য প্রায় ১৮৩ বিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার মধ্যে ১৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বরাদ্দ এবং ৮৬.৭ বিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এই অর্থের মধ্যে সরাসরি সামরিক সহায়তা, বাজেটারি সহায়তা এবং মানবিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সময়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৬৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আর্থিক এবং জরুরি সহায়তা এবং অতিরিক্ত ৫০ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার মধ্যে উন্নত অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ এবং লজিস্টিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত। যুক্তরাজ্য ইউক্রেইনের জন্য ১২.৮ বিলিয়ন পাউন্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তার মধ্যে সামরিক সহায়তায় 7.8 বিলিয়ন এবং 5 বিলিয়ন অ-সামরিক সহায়তা। ২০২৪ সালের মার্চ নাগাদ, বেশিরভাগ পশ্চিমা সরকার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে 380 বিলিয়ন ডলার মূল্যের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যার মধ্যে স্বতন্ত্র দেশগুলি থেকে প্রায় 118 বিলিয়ন ছিলো সরাসরি সামরিক সহায়তা। একত্রে, পশ্চিমা দেশগুলি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা প্রচেষ্টা বজায় রাখতে এবং রাশিয়াকে দমন করতে কয়েকশো বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এই আর্থিক প্রতিশ্রুতি ছাড়াও, এই দেশগুলি রাশিয়ার অর্থনীতির প্রধান ক্ষেত্রগুলিতে—বিশেষ করে শক্তি, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই পর্যন্ত বিশ হাজারেরও বেশী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ভেবেছিলো এসব করে রাশিয়ার অর্থনীতিকে দূর্বল করে দেবে, রাশিয়াকে ধ্বংশ করে দেবে, পুতিনকে ক্ষমতা থেকে জনগন ছুড়ে ফেলে দেবে। কিন্তু পশ্চিমারা ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারেনি ভবিতব্যের দেবতা লুকিয়ে লুকিয়ে মিট মিট করে হাসছিলো পশ্চিমাদের হম্বি-তম্বি আস্ফালনে। যা হবার তাই হতে চলেছে। সব কিছুই একেবারে উলোট-পালোট। রাশিয়া আর পুতিনের জয়জয়কার। অর্থনীতিতে নেমেছে জোয়ার আর স্পেশাল মিলিটারি অপারেশনে চলছে উল্লাস। একের পর এক এলাকা দখলে নিচ্ছে রাশিয়ার বাহিনী। শত্রুপক্ষের কঠিন দেয়াল ভেদ করে দূর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে রাশিয়ার সৈন্য বাহিনী বীর দর্পে। পশ্চিমাদের দীর্ঘ দিনের ইচ্ছে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টা অর্থায়নে বাধা সৃষ্টি করা এবং বৈশ্বিক মঞ্চে তাকে একঘরে করার পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে। তবে, এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ সত্ত্বেও, রাশিয়া বিকল্প বাণিজ্য পথ কাজে লাগিয়ে এবং চীন, ভারত ও তুরস্কের মতো অ-পশ্চিমা দেশগুলির সাথে অংশীদারিত্ব শক্তিশালী করে অভিযোজিত হতে পেরেছে। একে রাশিয়ার বিশাল জয় আর পশ্চিমাদের ভরাডুবি ছাড়া আর কিইবা বলা যায়?
গত কয়েক বছরে অর্থনৈতিকভাবে, রাশিয়া উল্লেখযোগ্য স্থিতিশীলতা প্রদর্শন করেছে। ২০২৩ সালে, এর জিডিপি ছিলো ৩.৬% এবং ২০২৪ সালে নভেম্বর পর্যন্ত ছিলো ৪ শতাংশ, যা অনেক উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বেশ ভালো। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর জিডিপির অবস্থা একেবারে তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে। এই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী হয়েছে শক্তি রপ্তানি, বিশেষ করে তেল এবং গ্যাস থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব দ্বারা। এছাড়াও, রাশিয়ান রুবল, যদিও অস্থিরতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে প্রতি মার্কিন ডলারে ১০০ রুবলের কাছাকাছি স্থিতিশীল হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ধরনের কর্মক্ষমতা পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশার বিপরীত, যারা রাশিয়ার ভয়ানক এবং গভীর অর্থনৈতিক পতনের প্রত্যাশা করেছিল। নিষেধাজ্ঞাগুলি অবশ্যই কিছুটা ব্যয় চাপিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে উচ্চতর মুদ্রাস্ফীতি, নির্দিষ্ট প্রযুক্তি এবং উপাদানগুলির উৎস খুঁজে পাওয়ার চ্যালেঞ্জ। তবে, রাশিয়া কৌশলগত আমদানি প্রতিস্থাপন এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই প্রভাবগুলি সফলভাবে হ্রাস করেছে। উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়ান বিলিয়নিয়াররা তাদের সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে পুনঃনির্দেশিত করেছে, যা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করেছে। এই অভিযোজন কেবল রাশিয়ার অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখেনি বরং এর স্বনির্ভরতাও বাড়িয়েছে, যা অনিচ্ছাকৃতভাবে এক ধরনের অর্থনৈতিক অপ্রতিরোধ্যতা সৃষ্টি করেছে।
পুতিন নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একজন স্থিতপ্রাজ্ঞ, বুদ্ধদ্বীপ্ত কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন এই সংকট কালীন সময়ে। নিষেধাজ্ঞাগুলি তার অবস্থানকে দুর্বল করার পরিবর্তে বরং জাতীয়তাবাদী মনোভাবকে উদ্দীপিত করেছে এবং ইউক্রেইনে পুতিনের পদক্ষেপকে যথোপযুক্ত বলেই সার্বিকভাবে পুতিনে রাশিয়ার জনগন সমর্থন দিয়েছে। আর তারই ফলশ্রুতিতে প্রসিডেন্ট পুতিন জনগনের সমর্থকে পুঁজি করে প্রশাসনকে নবউদ্যমের সাথে তার ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলি অনুসরণ করতে সক্ষম করেছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার কারনে পশ্চিমা জোটের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধ প্রচেষ্টা বজায় রাখায় আর্থিক এবং রাজনৈতিক ব্যয় বাড়তে থাকে যা সমাজিক, রাজনৈতিক ওঅর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে নাজুক পরিস্থিতিতে নিয়ে যায়। কোন কোন ইউরোপীয় দেশ তাদের দেশের মধ্যে শক্তি মূল্য এবং মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির কারণে অসন্তোষের মুখোমুখি হয়েছে, যা রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞার সাথে সংযুক্ত। যার ফলে ঐসব দেশগুলিতে সরকরের ইউক্রেইন নীতির প্রতি জনসম্থন হ্রাস পেতে থাকে। সত্যিকারের বাস্তবতা হল, বিশাল পশ্চিমা বিনিয়োগ এবং প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, এই সংঘাত রাশিয়ার জন্য কৌশলগত আঘাত এনে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং, ক্রেমলিন এই ঝড়ের মুখোমুখি হওয়া সত্বেও, আরও বেশী স্থিতিশীল এবং অভিযোজনশীল হয়ে উঠেছে। নিষেধাজ্ঞার শাসন, যদিও প্রভাবশালী, প্রত্যাশিত হিসাবে রাশিয়াকে পঙ্গু করেনি। বরং এটি দেশটিকে উদ্ভাবন করতে এবং তার অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে বাধ্য করেছে। পশ্চিমা শক্তি দ্বারা রাশিয়াকে দুর্বল করার একটি কল্পনা ক্রমশঃ বাস্তব পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন বলে মনে হচ্ছে। এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, পশ্চিমাকে তার কৌশল এবং রাশিয়ার প্রতি তার বৃহত্তর কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করতে হতে পারে। ব্যয়িত বিলিয়ন এবং আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলি দৃঢ় ফলাফল দিতে পারেনি, যা একটি দৃঢ় এবং সংস্থানশীল প্রতিপক্ষের মুখে অর্থনৈতিক এবং সামরিক চাপের সীমা নির্দেশ করে। তবে এটা স্বীকার করতে হচ্ছে যে, রাশিয়া এবং পশ্চিমের মধ্যে তথাকথিত শক্তি খেলা এখনো শেষ হয়নি, এবং এই উচ্চ ঝুঁকির প্রতিযোগিতায় পুতিন একটি উল্লেখযোগ্য খেলোয়াড় হিসাবে প্রমাণিত হয়েছেন।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন এই পরিস্থিতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তাঁর গত শাসন আমলে “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কৌশল এবং সংঘাতের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন রকম ছিল। ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ইউক্রেনে মার্কিন সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং দাবি করেছেন যে তাঁর প্রশাসন ক্ষমতায় থাকলে এই সংঘাত এতদূর গড়াত না। ট্রাম্পের সমাধানের দৃষ্টিভঙ্গি মূলত তাঁর কৌশলগত লক্ষ্যগুলির উপর নির্ভর করবে, যা ঐতিহাসিকভাবে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পদের ব্যবহার হ্রাসের দিকে মনোনিবেশ করে। তিনি রাশিয়ার সাথে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতা চুক্তি করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ট্রাম্প এমন একটি অবস্থান নিতে পারেন যেখানে তিনি যুক্তি দেবেন যে নিষেধাজ্ঞা এবং বিশাল আর্থিক ব্যয়ের পরিবর্তে কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি কার্যকর সমাধান অর্জন করা সম্ভব। এছাড়া, ইউক্রেনকে দেওয়া বিশাল সামরিক এবং আর্থিক সহায়তার কারণে আমেরিকান অর্থনীতির উপর যে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, সেটি কমানো তাঁর জন্য একটি অগ্রাধিকার হতে পারে। তিনি যুক্তি দিতে পারেন যে এই অর্থ দেশীয় অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, এবং কর্মসংস্থান তৈরিতে বিনিয়োগ করা যেতে পারে, যা তাঁর “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে ট্রাম্পের এই নীতি কার্যকর করতে হলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কূটনৈতিক দক্ষতা এবং ইউক্রেনের জন্য একটি সম্মানজনক সমাধান নিশ্চিত করার জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ পন্থার প্রয়োজন হবে। রাশিয়া এবং পশ্চিমের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব অর্জন করা সহজ হবে না, কারণ এটি কেবল যুদ্ধ শেষ করার নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা হ্রাস করার প্রশ্ন। একই সময়ে, ট্রাম্পের সমালোচকরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন যে তাঁর পন্থা রাশিয়ার প্রভাব বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং এটি ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব এবং পশ্চিমা জোটের ঐক্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে, তার ক্ষমতয় আসার পর, এই জটিল পরিস্থিতি কীভাবে তিনি সমাধান করবেন তা দেখার বিষয় মাত্র। তাঁর নেতৃত্বে, আমেরিকার ভূমিকা সম্ভবত আরও কম প্রতিশ্রুতিমূলক কিন্তু সমঝোতামূলক হতে পারে, যা রাশিয়া এবং পশ্চিমের মধ্যে নতুন ধরনের একটি ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।
তবে এটা স্পষ্ট যে, ইউক্রেন সংকটে পশ্চিমা দেশগুলির প্রচেষ্টা তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিপুল অর্থব্যয়, কঠোর নিষেধাজ্ঞা, এবং সামরিক সহায়তা সত্ত্বেও রাশিয়া এবং ভ্লাদিমির পুতিন এই সংঘাতের প্রকৃত বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। রাশিয়া শুধুমাত্র অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী এবং আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠেনি, বরং ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার প্রভাবও বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রাশিয়া চীন, ভারত এবং অন্যান্য ব্রিকস (BRICS) সদস্যদের সাথে তার কৌশলগত সম্পর্ক মজবুত করেছে। এই গোষ্ঠী এখন একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্লক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে, যা পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য প্রস্তুত। নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে রাশিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিকল্প বাণিজ্য পথের সফল ব্যবহার প্রমাণ করে যে, এই নতুন জোট পশ্চিমের তুলনায় আরও কার্যকরী এবং স্বনির্ভর হওয়ার ক্ষমতা রাখে। খুব শিগগিরই ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রাশিয়া এবং তার মিত্রদের পক্ষে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্রিকস-এর শক্তি বৃদ্ধি এবং এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভূমিকার প্রসার পশ্চিমা আধিপত্যকে আরও দুর্বল করবে। বিশ্বব্যাপী মুদ্রাব্যবস্থায় ডলারের প্রভাব হ্রাস পেতে পারে এবং বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার দিকে একটি প্রবণতা তৈরি হতে পারে, যা রাশিয়া এবং তার মিত্রদের জন্য ইতিবাচক।