চিকিৎসক থেকে সাংসদ এবং আমাদের প্রত্যাশা

আমরা সকলেই আজ বাস করছি বিস্বায়নের যুগে এক অন্য রকম পৃথিবীতে যা দ্রূত পরিবর্তিত হচ্ছে। আধুনিক প্রকৌশলবাদ আর নতুন নতুন প্রযুক্তির আশির্বাদে বেড়ে উঠছি আমরা যেখানে চলতে গেলে বলতে গেলে নিতে হয় প্রযুক্তির সহায়তা। মরুভূমি, মহাসাগর বা এমনকি আমাদের রুপশী গ্রামগুলি কিংবা শহরগুলি ঘুরে ঘুরে দেখার জন্যে, আমাদের নির্বাচিত গন্তব্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনাকে বাড়ানোর জন্য নিতে হয় ন্যাভিগেশানের সহায়তার। জ্ঞান, বুদ্বি এবং বিবেকের সমন্বয়হীন জীবন পথ চলায় কঠিন হয়ে পড়ে। ক্রমবর্ধমান জটিল বিশ্বে, যারা নিজেকে সঠিক ভাবে খুঁজে পেতে চান বা নেতৃত্বের ভূমিকায় নিজকে দাড় করানোর আকাঙ্ক্ষা পোষন করেন তাদের অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ উপায়গুলিকে খুঁজে বের করতে হবে যার মাধ্যমে যে কোন চ্যালেঞ্জ এবং বিপদের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাব্য বিপদ এড়াতে পারে। আমরা সকলেই বিশ্বাস করি, সত্যিকারের নেতৃত্ব ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতার পরিবর্তে দায়িত্বের দিকে মনোনিবেশ করতে পরিচালিত করে। জনগনকে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করার মাধ্যমেই এবং দেশের সার্বিক কল্যান সাধনেই সত্যিকারের নেতৃত্বের সফলতা। তবে সত্যিকারের শিক্ষিত নেতৃত্ব যে কোন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে যা সকলের জন্যেই মংগলময়।

নেতৃত্ব, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জাতীয় প্রেক্ষাপটে, খুবই বিতর্কিত একটি বিষয়।  তার বিশেষ কারনও আছে। প্রথমতঃ আমাদের সমাজের নেতৃত্বের অসংখ্য নেতিবাচক প্রভাবের প্রতিফলনের দূষ্টান্ত রয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরবর্তী পর্যায়ে জাতীর আত্নাকে খুন করার মাধ্যমে আমরা যে ৭৫ ঊত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সংস্কৃতি পেয়েছি তার অনেকাংশই ছিলো অগনতান্ত্রীক কিংবা ডামাডোলের রাজনীতি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলির মধ্যে আরেকটি হলো যে নেতা এবং আইনসভার গননির্বাচিত সাংসদগনকে অনেক ক্ষেত্রেই গণতন্ত্রের সুচতুর অভিনেতা হিসাবে দেখা হয়, কারন তারা দেশের মংগলের চেয়ে বরং নিজেদের সার্বিক মংগলের কথাই সবসময় ভাবেন এবং প্রতিশ্রুতি দেয়া  কার্যকরের মধ্যে বিরাট গরমিল সবসময়ই দৃশ্যতঃ। অথচ দেশের রানৈতিকরই পারেন একটি দেশকে নিয়ে ভাবতে, মানুষের পাশা পাশি থাকতে,জনগনের দুঃখে সামিল হতে এবং সাফল্যের দিকে দেশকে পরিচালিত করতে। আরেকটি যুক্তি হলো যে, দেশের গননির্বাচিত প্রতিনিধিরাই সাফল্যের কাজটি করতে পারেন বা করতে সক্ষম কারণ তাদের ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব দুই রয়েছে কিন্তু দুঃখের বিষয় যে আমাদের সমাজের অনেক নেতাই এমন দৃষ্টিভঙ্গি পোষন করেন যেখানে সমতাবাদ, জাতীয় ঊন্নতী, দূর্নিতীহীন সমাজব্যাবস্থা কিংবা সত্যিকারের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যেন কিছু অপ্রয়োজনীয় শব্দ ছাড়া কিছুই নয়। তখনই আমাদের ভাবার অবকাশ হয় বা তখনই আমরা স্বজ্ঞাতভাবে অনুমান করতে পারি যে কেন আমাদের "সত্য  দূরদর্শী নেতাদের" অভাব যারা সমাজের জন্য কাজ করবে এবং সামাজিক সম্প্রীতি  ঐক্য আনবে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে, জাতি অসাধারণ কিছু ঘটতে দেখেছে, যখন একজন সফল এবং সম্মানিত চিকিৎসক প্রফেসর (ডা.) প্রানগোপাল দত্ত তার নির্বাচনী এলাকা কুমিল্লা  আসন থেকে বিনা প্রতিদন্দিতায় নির্বাচিত হন এবং জাতির সেবা করার জন্য একজন আইনসভার সাংসদ হিসাবে নিজকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অংগনে সংশ্লিষ্ট করতে সক্ষম হন। এটা কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ন অধ্যায় নয়? আমি এবং দেশবাসি বাংলাদেশ আওয়ামি লীগের এই প্রজ্ঞার সাধুবাদ জানাই সুশিক্ষিত এবং পেশাদার ব্যাক্তির রাজনীতিতে সক্র্রিয় সংপৃক্ততার পরিবেশটি তৈরী করার জন্যে। এটি অনেকের জন্যে হয়তো আনন্দের সংবাদ নাও হতে পারে, কিন্তু অন্যদের জন্য, এটি একটি আশার রশ্মি, নতুন আকাঙ্ক্ষা, নতুন আন্দোলন, এবং অগ্রগতি  সমৃদ্ধির পথ। রাজনীতির সমালোচকরা তাদের ভ্রু উঁচু কিংবা কুঁচকাবেন এতে সন্দেহ নেই কিংবা গভীরভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন।তাদের অনেকেই হয়তো  নীতিবাচক দূষ্টিকোন থেকে ভাবছেন কিভাবে কার্যকারিতা এবং বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে যেখানে রাজনৈতিক নেতাদের রয়েছে সীমিত জাতীয় সম্পদের। আমাদের ভুললে চলবে না যে এই সীমিত সম্পদের সমস্যা শুধু বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্যই প্রযোজ্য নয় বরং রাজনৈতিক  গণতান্ত্রিক ভাবে উৎকৃষ্ট দেশগুলোর জন্যও প্রযোজ্য। তাই সমাজের সকল অংশকে একত্রিত করার জন্য এটি একটি মহৎ কাজ হতে পারে  নেতৃত্বই রাজনৈতিক এবং সামাজিক  ক্ষেত্রে সবচেয়ে অপ্রতুল সীমিত সম্পদ।

 

আজকের এই লেখাটি কোন রাজনৈতিক বিতর্ক নির্ভর নয়, এবং কোন বিশেষ দর্শন বা উদ্দেশ্য প্রচারের কোন ইচ্ছা আমার নেই। বরং, এই নিবন্ধটি জাতীয় রাজনীতির একটি ভালো  দিককে আলোকপাত করার কিছুটা প্রয়াস মাত্র, যা একজন শিক্ষিত, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, নৈতিক এবং পেশাদার ব্যাক্তিত্বের বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রবেশ করা নিয়ে। একটি গুরুত্বপূর্ন প্রশ্নের আলোকপাত করার চেষ্টা করবো  এবং তা হলো: জ্ঞানী, নৈতিক ব্যক্তি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কি কোন সংযোগ আছে যা আমাদের সকলের রক্ষা করা প্রয়োজন?
একটি দেশকে সামাজিক, অর্থনৈতিক  রাজনৈতিকসহ সব দিক থেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া একটি জাতীয় আইনসভার দায়িত্ব যেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বসহ নির্বাচিত সাংসদগন সন্মিলীতভাবে কাজ করবে। অনেক দিন আগে, এরিস্টটল দৃঢ়তার সাথে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, আইন -শৃঙ্খলার পরে, একটি জাতীর অর্থনীতি অগ্রাধিকার বিবেচনায় প্রথম আসন নেয়। এর প্রভাব স্পষ্ট। সাধারণভাবে বলতে গেলে, একটি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ অনেক ক্ষেত্রেই সুবিধা লাভ করে। অতএব, আইন প্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষগুলিকে এমন নেতৃত্ব প্রদান করতে হবে যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে চালিত করে তবে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনই যেন শেষ লক্ষ্য না হয়। সেই প্রবৃদ্ধির সুষম বন্টন এবং ধারাবাহিকতা এমনভাবে প্রয়োগ করতে হবে যাতে সমাজের সকল অংশ উপকৃত হয়। এখানেই আইনসভা, গনপ্রতিনিধিগন, কিংবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে, তাদের নিজ নিজ দেশের অগ্রগতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জনগনের প্রত্যাশা পূরনে তাদের উপরে "ক্ষমতা" ন্যস্ত করা হয়েছে এই কথা ভুললে চলবেনা। আইনসভাগুলি কিংবা সাংসদরা "পরিবর্তন" এর অপরিহার্য অনুঘটক বা প্রতিনিধি, তাদের কার্যক্রমের পরিণতি অবশ্যই সামাজিকভাবে উত্পাদনশীল এবং গ্রহণযোগ্য হতে হবে।

 

আমরা অনেক দেশেই দেখেছি যখন চিকিৎসকরা রাজনীতিবিদ কিংবা আইনপ্রনয়নকারী বিধায়ক/সাংসদ হিসেবে দেশ এবং জনগনের জন্যে কাজ করছেন। কোভিড -১৯-এর সময়, যখন আয়ারল্যান্ড গভীর সংকটে পড়েছিল, তখন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লিও ভারাদকার সপ্তাহে একবার স্বাস্থ্যসেবা ব্যাবস্থার জন্য কাজ করছিলেন এবং করছেন। এটি একটি বিরল ঘটনা যখন আমরা দেখি যে একজন উচ্চপদস্থ রাজনীতিকও ফ্রন্টলাইনে মেডিকেল ডাক্তার হিসাবে কাজ করছে। তবে নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে একজন ভালো ডাক্তারের গুনাবলীর সাথে একজন রাজনীতিবিদের গুনাবলীর যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। সময়জ্ঞান এবং শৃঙ্খলা, সঠিকভাবে সময়োপযোগী চিন্তা করার ক্ষমতা, সুসংগঠিত এবং সহানুভূতিশীল, কৌতূহলী, এবং সৎ, এই সমস্থ গুণাবলী উভয় পেশার  ক্ষেত্রেই অপরিহার্য।
তবে, যখন জনসাধারণের বিশ্বাসযোগ্যতার কথা আসে, তখন ভিন্ন মাত্রায় তা দেখতে পাই  জনগণ একজন চিকিৎসকের উপর একজন রাজনীতিকের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করবে; একজন চিকিৎসক তাদের রোগীদের যা বলবে তা সহজেই বিশ্বাস করবে, কিন্তু একজন রাজনীতিবিদের প্রতি তাদের সমান আস্থা বা বিশ্বাস কখনোই একই রকম থাকবে না। প্রফেসর (ডা.) প্রানগোপাল দত্ত একজন নামকরা স্বনামধন্য চিকিৎসকের সাংসদ হওয়া বাংলাদেশে প্রথম  চিকিৎসক নন। অনেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন, কিন্তু সমাজের এবং রাষ্ট্রের সার্বিক অগ্রগতিতে তাদের ভূমিকা এবং অবদান অনেকের কাছেই সুপরিচিত। প্রায় সবক্ষেত্রেই ছিলো হতাশাজনক। আর্জেন্টিনার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এবং বিখ্যাত বিপ্লবী নেতা চে গুয়েভারা ছিলেন একজন সুপরিচিত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ। আমেরিকার অনেক চিকিৎসক রাজনীতির সাথে জড়িত সক্রিয়ভাবে। এমন কি চারজন চিকিৎসক ১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছিলেন।
একজন বিখ্যাত চিকিৎসক মুখ্যমন্ত্রীর পদে আসীন হয়েছিলেন আমাদের পার্শবর্তী দেশ ইন্ডিয়ায়। ডা. বিধান চন্দ্র রায় পশ্চিমবঙ্গে সমসাময়িক বাংলার একজন মৌলিক এবং আধুনিক স্থপতি ছিলেন। ডা. রায় তার দূরদর্শী নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা তাকে কলকাতার অন্যতম সফল মেয়র হওয়ার আসনে বসিয়েছিলো মুখ্যমন্ত্রীর  হওয়ার আগে। রাজনৈতিক ভাবে সক্রিয় থেকেও তিনি কখনই তার চিকিৎসার সেবা প্রদান এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যাবস্থার অগ্রগতিতে অবদান রাখতে ব্যর্থ হননি। তিনি সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে এসেছিলেন পচ্চিম বঙ্গসহ সমগ্র ভারতবর্ষে। তিনি স্বাস্থ খাতের আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯২৪ সালে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এবং ১৯৩৪ সালে মেডিক্যাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি জাতি এবং তার পেশার প্রতি সবসময়ই অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন। এমনকি ১৯৬১ সালের পহেলা জুলাই তিনি মারা যাওয়ার দিনও সকালে কিছু রোগীর চিকিৎসা করছিলেন। তার সেবাপ্রদানের অসাধারণ মহিমার গুনটি ভালভাবে প্রতিফলিত হয় যখন ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল তার মৃত্যুতে তাকে "ভারতের প্রথম চিকিৎসক, যিনি তার সমসাময়িকদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রসর করেছিলেন পথপ্রদর্ক হিসাবে---“ বর্ণনা করেছিলেন। আরেকটি নামও বিশেষভাবে মনে পড়ছে। ডা.রাম যাদব নেপালের রাজনীতিতে একজন সন্মানিত ব্যাক্তিত্ব যিনি দেশটির প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন (২০০৮-২০১৫) তিনিও একজন প্রথিতজষা চিকিৎসক ছিলেন। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা এবং জবাবদিহিতার সাথে তার দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং সমস্থ দেশবাসীর সন্মান অর্জন করেছিলেন। 
ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের লিখেছিলেন, "যারা দক্ষতা  মানবিকতার সাথে জনগনের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের কাজে ব্যাস্ত তারা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ" বর্তমানে আমরা যে সমাজ ব্যাবস্থায় বসবাস করছি তা দেখে আমরা সকলেই কিছুটা চিন্তিত হই এবং মাঝে মাঝে বিভ্রান্তও হই বটে। দুর্বল প্রতিষ্ঠানসমূহের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় উচ্চ শিক্ষিত, সমালোচনামূলক এবং সুসচেতন রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বের  প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, যেখানে দুর্নীতি উন্নয়নের অন্যতম প্রধান বাধা? দুর্নীতি গণতান্ত্রিক বিশ্বাস এবং আচরণের উপর প্রভাব ফেলে বলে মনে করা হয়। দুর্নীতি, আমার মতে, বাংলাদেশের দুর্বল সংগঠিত পাবলিক প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে মারাত্মক হুমকি। রাজনৈতিকভাবে পরিশীলিত, সুশিক্ষিত নাগরিক, এবং সেই ব্যাক্তিটি যখন একজন সাংসদ হন তখন দূর্নীতি এবং দূর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে কিভাবে মোকাবেলা করবেন। সেক্ষেত্রে জনগনের প্রত্যাশা অবশ্যই শিক্ষীত সাংসদদের প্রতি বেশী থাকে।
যদিও আমরা স্বীকার করি যে একটি ভালভাবে পরিচালিত গণতন্ত্র এবং দুর্নীতি একসঙ্গে থাকতে পারে না, দুর্নীতি গণতন্ত্রের কার্যকারিতা হুমকির সম্মুখীন করে। আমি জানি পৃথিবীতে এমন কোন দেশ বা গণতন্ত্র নেই যা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত বলে গর্ব করতে পারে, কিন্তু আমাদের অবস্থা অসহনীয়। আমরা কি আশা করতে পারি যে একজন উচ্চ শিক্ষিত, যোগ্য, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং সমালোচনামূলক রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব যেমন প্রফেসর (ডা.) প্রানগোপাল দত্ত সক্রিয়, গতিশীল এবং সমাজে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবেন? যেখান দুর্নীতি এবং বিষাক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে পরিচালিত হচ্চে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা? শুধু সময়েই তা নির্ধারণ করবে। তবে আমি বিশ্বাস করি যে শিক্ষিত গনপ্রতিনিধিদের  বিমূর্ত প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাস, রাজনৈতিক কার্যকারিতা এবং রাজনৈতিক ব্যাস্ততা সত্যিকার অর্থেই অটুট থাকবে। প্রাতিষ্ঠানিক মানকে উন্নত করতে, তারা একটি ভিন্ন কিংবা যুগপোযোগী পদ্ধতি ব্যবহার করবে এটাই কাম্য। তাছারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, উচ্চ শিক্ষিত এবং নৈতিক রাজনীতিবিদরা প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটিগুলি সনাক্ত করতে সহজেই সক্ষম হন এবং ফলস্বরূপ, গুণগত মানকে উন্নত করার দিকে বেশি মনোনিবেশ করেন।
আমরা সকলেই বুজতে পারি যে, দুর্নীতির মাত্রা যতই বাড়বে, সাথে সাথে গণতন্ত্র যেভাবে কাজ করে তাতে শীর্ষ পর্যায়ের পেশাদার আইনপ্রণেতাদের অসন্তোষও বাড়তে থাকবে। যদিও আমাদের সমাজে দুর্নীতি সর্বব্যাপী দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা সর্বদা নীতি বাস্তবায়নে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করে নিজেদের ফায়দা লোটার জন্যে, কিন্তু নৈতিক, শিক্ষিত এবং রাজনৈতিকভাবে পরিশীলিত রাজনীতিবিদ নীতি বাস্তবায়নে কিছুটা হলেও সজাগ থাকবে। প্রফেসর (ডা.) প্রানগোপাল দত্ত, যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) দুইবার উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দক্ষতার সাথে এবং বাংলাদেশের শীর্ষ চিকিৎসকদের একজন, আমার মতে অনুকূল প্রাতিষ্ঠানিক মনোভাব এবং আচরণের উচ্চ সম্ভাবনা প্রদর্শন করার প্রয়াশ জনগন আশা করতে পারে। এটাও লক্ষণীয় যে আমাদের অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাদের এবং সাংসদদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা অনুসরণ করার কিছু বিশেষ কারণ রয়েছে। কেউ কেউ আদর্শগত ভাবে রাজনীতির সাথে সংপৃক্ত হতে চান, অন্যরা আর্থিক লাভের জন্য উচ্চতর পদ পেতে চায় বা বৃহত্তর ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব প্রভাবের জন্য রাজনীতি করেন; সমাজের সেবা করা এবং সামাজিক উন্নয়ন  অগ্রগতিতে অবদান রাখা ছাড়া আবার অনেকেই আছেন কোনো ধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষন করেন না। তবে তাদের সংখ্যা হয়তো খুবই কম।
প্রফেসর দত্তের প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটিগুলি চিহ্নিত করার মানসিকতা এবং সক্ষমতা দুই রয়েছে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা ব্যাবস্থায়। রাজনৈতিক দুর্নীতির গভীর উপলব্ধি এবং গণতান্ত্রিক রীতির প্রতি তার দৃঢ় নিষ্ঠা থাকবে আশা করি যেমনটি উপাচার্য থাকা কালীন সময়ে দেখিয়েছিলেন। রাজনৈতিক  পাবলিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যার্থ হলে সমালোচনা করার জন্য তিনি আরও দৃঢ় অবস্থান নেবেন এটাই কাম্য। দেশবাসী আন্তরিকভাবে আশা করে যে রাজনৈতিক ভাবে তিনি সফল হবেন এবং কোনভাবেই জনগনকে হতাশ করবেন না। আমরা যদিও দ্রুত রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উত্থান -পতনের সময়ে বাস করছি, কিন্তু আমরা সকলেই আশাবাদী। জাতীয় সমৃদ্ধি  ঐক্যের উন্নয়নে একবিংশ শতাব্দীর মতো জটিল পরিবেশে সাংসদরা কী করতে পারেন? আমরা সবাই আশা করছি এই প্রশ্নের সত্যিকারের সমাধান পাবো। তার জন্যে প্রয়োজন অনুকুল রাজনৈতিক পরিবেশ যেখানে মেধাবী এবং সৎ গনপ্রতিনিধিদের সংপৃক্ততা আইনসভায় বেশী মাত্রায় থাকবে। ভালো, জ্ঞানী এবং সুশিক্ষীত রাজনীতিবিদরা সফল হবেন এবং সকল পরিস্থিতিতে বুদ্ধিমানের সাথে কাজ করে যাবেন এটা সকলের প্রত্যাশা। আমরা সবাই চাই তারা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র এবং আইন প্রণালী মেনে চলবেন, জনগনের প্রত্যাশা  পূরনে সফল হবেন এবং  বাংলাদেশকে আন্তর্জাতীক পর্যায়ে একটা সন্মানজনক স্থানে নিয়ে যাবেন।

Leave your review