বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার প্রাসঙ্গিকতা

গবেষকরা সত্য অনুসন্ধানী। তারা যে কোন ঘটনা বা পরিস্থিতিকে তদন্ত, বিশ্লেষণ এবং ব্যাখ্যা করতে চায়। তারা প্রমাণ এবং পরীক্ষা নির্ভর। তারা অনুমানের ভিত্তিতে কাজ করেনা এবং প্রকৃত গবেষকদের কাছে অনুমানের কোন অবকাশ নেই। প্রমাণের সন্ধান গবেষকদের জন্য চিরন্তন। যদিও কিছু কিছু গবেষক কখনো সখনো জল্পনা -কল্পনায় নিজেদের হারিয়ে ফেলেন, কিন্তু যারা সত্যিকারের গবেষক তারা সব সময়ই অনুসন্ধানের জন্য এবং প্রমাণ পরীক্ষা করার লক্ষ্যে দৃঢ়  প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং সেই ভাবেই এগিয়ে চলেন। যে কোনো সম্ভাব্য প্রমাণের পরীক্ষা, নথিপত্র, যাচাই এবং যেখানে সম্ভব নিশ্চিত করাই সত্যিকারের গবেষকদের ধর্ম। যেকোনো শিক্ষাবিদ গবেষকের উচিত নিয়মতান্ত্রিক গবেষণার মাধ্যমে সত্য বের করে আনার জন্য একাডেমিক সততা নিষ্টার পথ অবলম্বন করা। বৈজ্ঞানিক/গবেষণা সম্পৃক্ত প্রতাষ্ঠানগুলোর সবচেয়ে বড় দায়িত্বগুলোর মধ্যে একটি হলো গবেষকদের সততা এবং তাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় যথাযথ মানসিক প্রস্তুতি রয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করা এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গবেষকদের নৈতিক দায়িত্ব যে, তারা অন্য উৎস থেকে যখন কোন তথ্য গ্রহণ করে এবং তা ব্যাবহার করে তার সম্পূর্ণ স্বীকৃত দেওয়া এবং যে কোন ধরনের একাডেমিক অসততা এবং চৌর্যবৃর্তি থেকে নিবৃত থাকা। বর্তমান সময়ে একাডেমিয়া এবং গবেষণার ক্ষেত্রের জন্য সর্বাধিক সাধারণ হুমকিগুলির মধ্যে একটি হল চুরিবিদ্যা। সাধারণভাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদ এবং গবেষকরা তাদের উচ্চ সততা এবং সামাজিক প্রতিশ্রুতির কারণে অন্যদের দ্বারা সর্বদা সম্মানিত এবং বিশ্বাসযোগ্য হয়ে থাকে, কিন্তু দুংখজনকভাবে সত্যি যে, কেউ কেউ সবসময় সঠিক পথ অনুসরণ করে না, বরং তারা শর্টকাট পদ্ধতিকে বেছে নেয় এবং প্রতারণার আশ্রয় নেয়। চৌর্যবৃর্তি সহ নানা ধরনের অসততার আশ্রয় নেন অনেকেই

আরেকটি প্রসঙ্গ অবশ্যই এই আলোচনায় আনছি তা হলো খুব সহজ একটি প্রশ্ন যা এই প্রজাতন্ত্রের সকলেরই বিশেষ করে শিক্ষীত সমাজের। বাংলাদেশের একটিও বিশ্ববিদ্যালয় কেন আন্তর্জাতিক রেঙ্কিং প্রথম ৫০০ এমনকি ৮০০ এর মধ্যেও স্থান করে নিতে পারে নি। এই দায়ভার কার? আমাদের সন্তানরা যারা একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার স্বপ্ন দেখে, যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অকস্ফোর্ড হিসেবে জানে তাদের কাছে এই বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ন কারন তাদের ভবিষ্যত নির্ভর করছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং প্রজ্ঞা আহরন, ধারন এবং লালন করছে তার উপর। সম্প্রতি সিনিয়র সাংবাদিকদের সাথে বসা এক বৈঠকে একজন সাংবাদিক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এই সহজ প্রশ্নটিই করেছিলেন: প্রথম ৫০০ এর মধ্যে বাংলাদেশৃর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই কেন যেখানে প্রধানমন্ত্রী সবসময়ে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নতীর কথা বলেন, সাটেলাইট সহ ডিজিটাল বাংলাদেশের মতো অনেক মেগা প্রজেক্টের কথা বলেন। তার উত্তরে প্রধানমন্ত্রী তার সহজ সূলভ এবং আন্তরিক ভাবে যা বলেছিলেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। যে সব কারনগুলো উনি উল্লেখ করেছিলেন তার কয়েকটি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষনায় আগ্রহের এবং আন্তরিকতার অভাব, শিক্ষকরা অর্থ উপার্জনের প্রতি বেশী মনোযোগী তাই গবেষনায় মনোনিবেশ না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকতার পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা প্রতিষ্ঠানের সাথেও সংপৃক্ত; বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিগত গবেষনায় বিশেষ অনীহা এবং শিক্ষার মানোন্নয়ে বেশীরভাগ শিক্ষক নতুন এবং সময়োপযোগী জ্ঞান আহরনে যথেষ্ট আগ্রহী নন। তিনি দৃঢ়তার সাথে এও বলেছেন শিক্ষাখাতে বিনিয়োগে আমরা যথেষ্ট আন্তরিক এবং প্রয়োজনে আরো নানা ধরনের গবেষনায় বিনিয়োগ বাড়াবো। কথাগুলো শুনে আমার খুব ভালো লেগেছে। প্রধানমন্ত্রীর উত্তরের কোন গুরুগম্ভীর ব্যখ্যায় না গিয়েও অন্তত এটা বলতে পারি প্রধানমন্ত্রী এবং তার সরকার শিক্ষার উন্নয়নে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং যথেষ্ট আন্তরিক। তবে প্রায়োগিক পরিকল্পনাটা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সকল সংপৃক্ত প্রতিষ্ঠানগুলিকেই নিতে হবে। মূল সমস্যাগুলিকে চিহ্নিত করে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং তার সঠিক বাস্তবায়নই হতে পারে তার সমাধান

দুয়েকটি সাম্প্রতিক ঘটনার উল্লেখ করেই এই প্রসঙ্গে আসছি। গত বছর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের কোন এক অনলাইন নিউজ পোর্টাল- প্রকাশিত একটি সংবাদ শিরোনাম ছিলো: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিয়া-মারজানা চুরির প্রমাণ। এতে বলা হয়েছে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ বেশ কয়েকটি একাডেমিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন এবং এগুলি পরবর্তীতে ব্যাপকভাবে চুরি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। একটি কাগজে ফরাসি দার্শনিকের রচিত শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ থেকে পাঁচ পৃষ্ঠার চুরি করা উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়। বাংলাদেশের শিক্ষাবিদদের প্রবন্ধটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত জার্নাল অব সোশ্যাল সায়েন্স রিভিউতে প্রকাশ করা হয়। এই ব্যপারে আমার একটি লেখা গত বছর একটি ইংরেজী দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছিলো 
আমরা সকলেই জানি যে গবেষকদের অবশ্যই মানবিকভাবে যতটা সম্ভব নিরপেক্ষ, সৎ এবং উদ্দেশ্যমূলক হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। এটি তাদের গবেষণার মূল মন্ত্র এবং নৈতিক দায়িত্বও বটে। তাদের গবেষণাকে বিশ্বাসযোগ্য নির্ভরযোগ্য এবং প্রকাশনার স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য বাস্তবতা তাদের প্রধান ফোকাস হওয়া উচিত এবং প্রতিটি তথ্য উপাত্তের উদ্ধৃতি সঠিকভাবে ব্যবহার করা উচিত। অন্যের লেখা বা ধারনাকে নিজস্ব ধারনা হিসাবে ব্যবহার করা মানেই প্রকাশনা নীতি ভঙ্গন করা যা গুরুতর অপরাধ। চৌর্যবৃত্তির কারনে আমেরিকা সহ পৃথিবীর অনেক দেশেই অনেকে চাকুরি চুৎত হয়েছেন এমনকি কারাদন্ডে দন্ডিতও হয়েছেন। বর্তমানে, একাডেমিক এবং পেশাদার উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিগত গবেষণালব্ধ বৈঙ্গানিক প্রবন্ধ প্রকাশের প্রত্যাশা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণত গবেষকদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির দ্বারা প্রত্যাশিত যে একাডেমিক কর্মীরা তাদের গবেষণা কাজের ফলাফল একটি নামী এবং গুনগত মানের আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ করবে। শিক্ষাবিদদের নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের গবেষণা পিয়ার-রিভিউ করা হয়েছে এবং মানসম্মত গবেষণার বিপরীতে পরিমাপ করা হচ্ছে। বর্তমান সময়ে একাডেমিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেন্জগুলির মধ্যে একটি হলো সংকীর্নতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব, যার ফলশ্রুতিতে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন যে বাংলাদেশী শিক্ষাবিদরা বেশী পরিমানে আন্তর্জাতিকভাবে যাচাই -বাছাইয়ের জন্য তাদের গবেষণালব্ধ প্রবন্ধ যেন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেন।
শিক্ষা এবং গবেষনার সাথে জড়িত আমাদের সকলকেই সচেতন হতে হবে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সব স্তরের গবেষকগন। কোন ধরনের ইচ্ছাকৃত ভুলকে যেন পশ্রয় না দেই বা চৌর্যবৃত্তির আশ্রয় না নেওয়া হয়। চৌর্যবৃত্তি বুদ্ধিবৃত্তিক চুরি, এবং একজন গবেষকের সততা, এবং নৈতিকতার মূল্যবোধ সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্ন জাগে। যদি তারা একাডেমিক প্রশংসা বা অগ্রগতির জন্য চুরি করার মানষিকতা লালন করে, তাহলে তারা অন্য কোন সন্দেহজনক বা অনৈতিক কার্যকলাপে লিপ্ত হতে পারে এটা ভাবাই স্বাভাবিক। এই প্রকৃতির একাডেমিক চুরি একটি গুরুতর বিষয় এবং অপরাধ। তাই এই জাতীয় অপরাধকে সামাল দেওয়ার জন্য চাই একটি সঠিক এবং শক্তিশালী প্রক্রিয়া  প্রয়োগ। গবেষকরা দুর্ঘটনাক্রমে অন্য কারও গবেষণার পুরো পৃষ্ঠাগুলি চুরি করে না, বরং তারা তাদের প্রতারণা থেকে উপকৃত হওয়ার লক্ষ্যে জেনে শুনেই এটি করেছে। তাই যারা এই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত তাদের সকলের ক্ষেত্রে সঠিক পদক্ষেপ নেওয় উচিত। যা করা হয়েছে তা কেবল তাদের এবং তাদের পরিবারকেই লজ্জিত করে না, এটি যে জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে তার প্রতি অসম্মান বয়ে আনে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে এই জাতীয় শিক্ষাবিদরা যুক্ত থাকেন সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং অসম্মানকর। দুখঃজনকভাবে, এই জাতীয় অসৎ শিক্ষাবিদদের কারনেই বাংলাদেশের শিক্ষাবিদদের গবেষনা প্রবন্ধের উপর  আন্তর্জাতিক জার্নালগুলি সন্দেহের চোখে দেখতে পারে।
তবে এটা খুশির বিষয় যে বিষয়গুলির তদন্ত করা হয়েছে বা হচ্ছে কিন্তু সাথে সাথে বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে সুচিন্তিত আলোচনার প্রয়োজন আছে, যেমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করছে কিংবা নিয়মিতভাবে চুরিবিদ্যা সনাক্ত করার জন্য সফ্টওয়্যার ব্যবহার করছে কিনা। এটা জরুরি যে প্রতিষ্ঠানগুলি সক্রিয়ভাবে তাদের কর্মীদের একাডেমিক জার্নালগুলিতে প্রকাশনার মাধ্যমে তাদের গবেষণাকে পাবলিক ডোমেইনে রাখতে উৎসাহিত করা, কিন্তু বর্তমানে এটি সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড ছাড়াই একটি অস্পষ্ট পদ্ধতিতে করা হচ্ছে বলেই প্রতিয়মান হচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয় জার্নালগুলির ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা নিতে হবে। প্রকাশনার নৈতিকতা কিংবা নিয়মাবলীর সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে কিনা তার সঠিক তদারকীর প্রয়োজন আছে। বেশিরভাগ মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক জার্নালগুলিতে এই ধরনের কার্যকলাপ সনাক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে জার্নাল কতৃক মনোনিত শীর্ষ পর্যালোচকরা (Reviewers) এই ধরনের একাডেমিক চুরি সনাক্ত করতে সক্ষম হন কোন বিশেষ সফ্টওয়ারের সাহায্য ছাড়াই। মানসম্পর্ন  একাডেমিক জার্নালগুলি কঠোর আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি অনুসরণ করে বিশেষ করে গুনগত মানের গবেষনাকে অগ্রাধীকার দিতে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য স্পষ্ট নির্দেশিকা এবং নিষেধাজ্ঞার সাথে চৌর্যবৃত্তির নীতি (policy on plagiarism) থাকা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত, এবং প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবশ্যই বাধ্যতামূলকভাবে বিশেষ সফটওয়ার সাবস্ক্রাইব করা উচিত  যাতে করে শিক্ষক-শিক্ষার্ত্রী সবাই ব্যবহার করার সুযোগ পায়।

একটি টেকসই জাতীগঠনে এবং জাতীয় প্রগতিকে আরো বেগবান করার জন্য সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন উচ্চশিক্ষার গুনগতমানকে বৃদ্ধি করা এবং সত্যিকারের গবেষনায় মনোনিবেশ করা। বাংলাদেশে গবেষনা যে হচ্ছে না তা কিন্তু বলছি না। গবেষনায় বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্র্রেই এগিয়ে আছে বিশেষ করে কৃষি ক্ষেত্রে যার সুফল আমরা দেখছি এবং বিশ্বে একটা সন্মানজনক অবস্থানে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে। তবে সার্বিক গবেষনায় আমাদের মনযোগ দিতে হবে জরুরী ভিত্তিতে। শিক্ষাকে করতে হবে সময়োপযোগী এবং প্রায়োগীক। বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিসহ নানা ক্ষেত্র্রে গবেষনাকে আনতে হবে জাতীয় অগ্রাধীকারে। একটি সন্মিলিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনতিবিলম্বে গ্রহন করা অতীব জরুরী। যেসব দিকগুলিকে বর্তমান সরকার এবং সংশ্লীষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে দিতে হবে অগ্রাধিকার তার মধ্যে নিম্নোক্ত কয়েকটি খুব গুরুত্বপূর্ন:

() বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা গবেষণা পরিষদ (হাইয়ার এডুকেশন রিসার্স কাউন্সিল) প্রতিষ্ঠা সবচেয়ে বেশী জরুরী এবং বর্তমান সরকারকেই এই উদ্যোকটি নিতে হবে অগ্রাধীকার ভিত্তিতে। এই হাইয়ার এডুকেশন রিসার্স কাউন্সিল বাংলাদেশের সব ধরনের উচ্চশিক্ষার গবেষনাকে পরিচালনা এবং তদারকী করবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই ধরনের কাউন্সিল উচ্চ শিক্ষা সহ জাতীয় প্রগতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষনাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যে গবেষনালদ্ধ ফলাফলগুলোকে যেন গুনগতমানের আন্তর্জাতীক পিয়ার-রিভিউড একাডেমিক জার্নালে প্রকাশিত হয় যা বিশ্ববিদ্যলয় রেঙ্কিংএর ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সহায়ক হবে। রিসার্স কাউন্সিল জাতীয় এবং আন্তর্জাতীক  পিয়ার-রিভিউড একাডেমিক জার্নালের লিষ্ট তৈরী করবে এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেইভাব নির্দেশ দেবে। এই কাউন্সিলকে উচ্চ শিক্ষার গবেষনায় পর্যাপ্ত অনুদানের ব্যাবস্থা নিতে হবে।

() গবেষনায় বিশেষ বরাদ্ধ রাখতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে গবেষনায় সঠিকভাবে সংপৃক্ত করতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্দিষ্ট সংখ্যক গবেষনা এবং গুনগতমানের একাডেমিক জার্নালে প্রকাশের দায়ভার নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবধরনের গবেষনাকে পর্যবেক্ষন এবং নিরীক্ষনের দায়িত্ব নিতে হবে বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা গবেষনা কাউন্সিলকে। প্রয়োজনে অন্যান্য গবেষনা কাউন্সিল যেমন বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা কাউন্সিল এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল কাউন্সিলকেও বাংলাদেশ গবেষনা কাউন্সিলের সাথে যুক্ত করতে হবে পরিচালনার সুবিধার্থে। জবাবদিহীতার ব্যপারটি হতে হবে স্পষ্ট। সবধরনের রাজনৈতিক কার্যকলাপের বাইরে রাখতে হবে এই প্রতিষ্ঠানটিকে এবং যে কোন ধরনের স্বজনপ্রীতি কিংবা দুর্নীতিকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।

() বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষকদের এবং গবেষনার সাথে সংপৃক্ত সকলকে একটি উন্নতমানের এবং সন্মানজনক বেতনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদন্নোতির ক্ষেত্রে পিয়ার-রিভিউড একাডেমিক Indexed জার্নালে (বিশেষ করে Scopus, Web of science-সহ সমমানের Indexed জার্নালে) নির্দিষ্ট সংখ্যক গবেষনালদ্ব নিবন্ধ গৃহীত বা প্রকাশিত হওয়াকে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিতে হবে। সাথে সাথে আন্তর্জাতিক মানের একাডেমিক কনফারেন্সে অংশগ্রহন করতে এবং গুনগতমানের  কনফারেন্স প্রসেডিংএ নিবন্ধ প্রকাশে উৎসাহিত করতে হবে। বাংলাদেশ গবেষনা কাউনসিল এই ব্যপারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রনয়ন করবে। আন্তর্জাতীক কনফারেন্সে অংশগ্রহনের সুবিধার্থে অংশগ্রনকারীদের কনফারেন্সের সংশ্লিষ্ট খরচ গবেষনা পরিষদকে বহন করতে হবে।

() স্থায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করাকে আইন করে নিষিদ্ধ করতে হবে। যে সমস্থ সমস্ত শিক্ষক অধ্যাপকের দায়িত্ব আছেন তাদেরকে জাতীয় প্রতিষ্ঠানসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থায়িত গবেষনা প্রকল্প অর্জনে মনোনিবেশ করতে হবে। বিভিন্ন ক্ষেত্র্রে যৌথ প্রকল্পে আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা বাড়াতে হবে সরকারী এবং বেসরকারী পর্যায়ে। এটা অত্যাবশ্যক যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরো অনেক গ্রাউন্ড ব্রেকিং রিসার্চে মনোযোগ দিতে হবে এবং সেই লক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষনা এবং শিক্ষার মানয়োন্ননে সব ধরনের সার্বিক ব্যবস্থা থাকতে হবে যেমন নিয়মিত কর্মশালার ব্যাবস্থা, বিভিন্ন ধরনের সফটওয়ার, অনলাইন একাডেমিক জার্নাল এবং কনফারেন্স প্রসেডিংস সহ পূর্নাঙ্গ লাইব্রেরির পর্যাপ্ত ব্যাবস্থা থাকতে হবে  যা গবেষনা এবং শিক্ষা প্রদানে অতীব জরুরী।

পরিবর্তনই ধ্রুব সত্য এবং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এই পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই এগিয়ে যেতে হবে। তৈরী করতে হবে গুনগতমানের শিক্ষা এবং গবেষনায় সমৃদ্ধ আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আমরা এক দ্রুতপরিবর্তনশীল পৃথিবীতে বসবাস করছি  বিশেষ করে বর্তমান বিশ্বায়ন আর প্রযুক্তির যুগে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এবং ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) -এর উন্নতি মানুষের চেষ্টার প্রায় প্রতিটি সেক্টরকেই বদলে দিচ্ছে বা দেবে যে কোনো উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে পরিবর্তনকে আমন্ত্রন করার সদিচ্ছা জাতীয় উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের সমৃদ্ধির জন্য উচ্চশিক্ষা এতই গুরুত্বপূর্ণ যে এটিকে সবচেয়ে বেশী  অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। যদিও সুস্থ গবেষনায় চাই  উপযুক্ত পরিবেশ, সময় এবং সম্পদ, কিন্তু একবার শুরু করলে তাদের অর্থনীতিতে রূপান্তর করার সম্ভাবনা অপরিসীম।

তাই যারা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এবং সমৃদ্ধি নিয়ে ভাবছেন বিশেষ করে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের উচিত আর কাল বিলম্ব না করে যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া এবং তার বাস্তবায়ন করা তা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মান উর্ধমূখী নয় বরং নিচের দিকে নামতে থাকবে দিন দিন। বর্তমান সরকারকে একটি বাস্তবমূখী দীর্ঘমেয়াদী ফলপ্রসু পরিকলপনা প্রনয়ন করতে হবে যা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় আমূল পরিবর্তন আনবে এবং জাতীয় প্রগতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। একটি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে উচ্চ শিক্ষাখাতে বিনিয়োগের এখনই উপযুক্ত সময়। জাতীয় অগ্রগতিতে  তার অবদান হবে ব্যাপক এবং উচ্চ শিক্ষায় বাংলাদেশ একটি সম্মানজনক অবস্থানে নিজকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে শীঘ্রই। দীর্ঘ সময় লাগলেও বর্তমান সরকার যেমন বাংলাদেশ accreditation council এবং Quality Assurance Unit প্রতিষ্ঠা করেছেন ঠিক সেইভাবে উচ্চ শিক্ষার গবেষনাকে বেগবান করার লক্ষ্যে অনতিবিলম্বে বাংলাদেশ গবেষনা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করবেন এই আমাদের প্রত্যাশা। আর এর সার্বিক প্রয়োগের মাধ্যমেই বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষায় একটি সম্মানজনক অবস্থানে উন্নীত হতে পাড়বে। আর এটাই আমাদের সকলের কাম্য।

 

Leave your review