টেমসের তীরের নগর কাব্য -বিলেতে সিলেটিরা-বাঙালীর আত্মপরিচয়ের তিলক

বাংলাদেশিরা যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম অভিবাসী সম্প্রদায়ের একটি। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের বাইরে এতো সংখ্যক বাঙালীর বসবাস পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। আর তাইতো লন্ডনকে তৃতীয় বাংলাদেশ হিসেবেই অনেকের কাছে পরিচিত। বর্তমানে সঠিক সংখ্যাটা জানা না গেলেও ২০২১ সালের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে আনুমানিক ৮ লক্ষাধিক বাংলাদেশী বিলেতে বসবাস করছে যাদের ৫০ শতাংশের বেশী থাকে লন্ডনে। এই জনসংখ্যর ৫২ শতাংশের জন্ম বিলেতের মাটিতে আর বাকীরা বাংলাদেশ সহ অন্যান্য দেশে জন্ম গ্রহন করেন। তবে এই বাংলাদেশী অভিবাসীদের মধ্যে সিলেটি সম্প্রদায়ের লোকজন সবচেয়ে বেশী, অনুমান করা হয় প্রায় ৯৫ শতাংশ বাংলাদেশীরাই সিলেট অঞ্চল থেকে এসেছে। শুধু তাই নয়  বিলেতে এ সিলেটি জনগোষ্ঠীর রয়েছে একটি দীর্ঘ এবং বলিষ্ঠ ইতিহাস। অন্যদিকে সিলেটকেও দ্বিতীয় লন্ডন বলা হয়। সিলেট বিভাগের এমন কোন জেলা, উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন, মৌজা কিংবা গ্রাম নেই যেখান থেকে কেউ না কেউ বিলেতে আসেন নি। বিলেতে সিলেটিদের ইতিহাস প্রায় ৩৫০ বছরের। প্রথম প্রজন্মের বিলেত প্রবাসীদের জীবন ছিলো একেবারেই অন্যরকম। আজকের এই সময়ের আধুনিক বৃটেনের গনতান্ত্রিক, তথ্য-প্রযুক্তির অসাধারন উন্নতি আর বিশ্বায়নের হাওয়ায় বেড়ে উঠা মুক্ত চিন্তা আর বাক-স্বাধীনতার তুমুল শিখরে বসে থাকা মানুষদের মতো নয়। সেই সময়টা ছিলো ভয়ানক পংকিল এবং অভিবাসীদের জন্য ছিলো অস্বাভাবিক। তাই তাদের উপর দিয়ে বয়ে গেছে নানা দুঃখ-কষ্ট, বিষাদ-যন্ত্রনার অসহ্য মরুভূমির তাপদাহের উল্কা, পদে পদে সহ্য করতে হয়েছে বর্নবাদীদের চরম অত্যাচার। কিন্তু তারপরেও থমকে যায়নি তাদের জীবন। সব বাঁধা-বিপত্তিকে আষ্টে-পিষ্ঠে বেঁধেই এগিয়ে চলেছিলো সামনের দিকে। হয়তো কখনো মনে হতো পথ হারা পথিকের মতো কিন্তু চোখে মুখে ছিলো প্রত্যয়ের ছাপ। অনেক লাঞ্চনা -বঞ্চনা আর মৃত্যুর পথ পাড়ি দিয়ে তারা তৈরী করে দিয়েছিলো উত্তরসূরীদের জন্য এক প্রাঞ্জল আবাসস্থল, প্রবাসের মাটিতে বেঁচে থাকার এক সুস্থ নির্ভরতা। তাদের আত্মত্যাগে আমরা এই প্রজন্মের বিলেত প্রবাসী বাংলাদেশীরা পেরেছি শিড়দাড়া উঁচু করে এই বিদেশের মাটিতে সোঁজা হয়ে দাঁড়াতে। এই বিলেতের মাটিতে এতো বিপদ আর অসুস্থতা পান্ডুর সময়ের শানিত চাবুকে ক্ষত-বিক্ষত হয়েও এক দন্ডের জন্যও ভাবেননি থেমে যাবেন। বরং টেমসের তীরের এই অচেনা-অজানা শহরে এক অনিশ্চিত ভবিতব্যকে মাথায় নিয়েই লন্ডনের অলি-গলিতে দ্বীপ্ততার সাথে হেঁটে বেড়িয়েছেন এই সিলেটি বাঙালীরা। সময়ের সাথে সাথে তৈরী করেছেন এক অমলীন সুন্দর, সমৃদ্ধ আর প্রত্যয়ের ইতিহাস। তারাই এ প্রজন্মের বাংলাদেশীদের প্রেরনা। আজ এই বিলেতের মাটিতে সিলেটিদের সামনে এগিয়ে চলার দ্রোহ-ভালোবাসা এবং স্বপ্নে বিভোর জীবনের নান্দনিক যাত্রাকে থরে থরে সাঁজাবো।

 

ঐতিহাসিকভাবে, সিলেটি জনগোষ্ঠী সুযোগের সন্ধানে এবং নতুন জীবন গড়তে ইংল্যান্ডে এসেছে। ১৬৫০ সাল থেকেই সিলেটিরা কোম্পানির জাহাজে সারেংয়ের অধীনে লস্কর হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। মূলতঃ বৃটিশরা ভারত থেকে ১৯৪৭ সালে চলে আসার পর পরই এই অঞ্চলের মানুষেরা বিলেতে পাড়ি জমাতে শুরু করে। ১৯৫০ দশকের পর থেকে পরবর্তী দু`দশক অধিক সংখ্যক সিলেটি বিলেতে এসে বসবাস শুরু করে। চোখে-মুখে এক নতুন স্বপ্ন উন্নত মানের ভবিষ্যত গড়ার।  বংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সত্তরের দশকে ব্রিটেনে একটি বড় অভিবাসন হয়েছিল, যার ফলে আশির দশকের গোড়ার দিকেই একটি শক্তিশালী বাংলাদেশী সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত হয় বিলেতের মাটিতে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, দারিদ্র্য থেকে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা এবং উন্নত জীবনযাপনের আশায় বাংলাদেশিরা ব্রিটেনে যেতে উৎসাহিত হয়েছিল। নবাগত হিসাবে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে পদে পদে। নতুন জায়গা নতুন সব নিয়ম-কানুন, অচেনা সব সামাজিক রীতি-নীতি, নতুন ভাষা, পরিস্থিতির সাথে নতুন করে মেলবন্ধের নানা চ্যালেঞ্জ। শুধুই কি তাই? অন্যদিকের ব্যাপারটা ছিলো আরো কঠিন, কর্দমাক্ত এবং কন্টকময়। বর্নবাদের উন্মাদনা সর্বত্র। অভিবাসীরা বিশেষ করে এশিয়া এবং আফ্রিকা থেকে আগত, যাদের গায়ের চামড়া সাদা নয় প্রায়শই ব্রিটিশদের দ্বারা সম্পূর্ণরূপে গৃহীত হয়নি। সমাজের কাছে যেন অপাংক্তেয়। সত্তর এবং আশির দশকে বিলেতে বসবাসকারী অভিবাসিরা ন্যাশনাল ফ্রন্ট এবং ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টির মতো সংগঠিত উগ্র-ডানপন্থী দলগুলির দ্বারা প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ এবং জাতিগত আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছিলো। অসহ্য যন্ত্রনা দুংখ কষ্ট আর বর্নবাদের রক্তক্ষরা অপরিসীম অত্যাচার -নিপীড়নকে বুকে বেঁধে নিয়েই বিলেতের মাটিতে ধীরে ধীরে সাঁজাতে চেয়েছিলেন সুজলা-সুফলা-শস্য শ্যামলা বাংলার নদী-পাহাড় আর প্রকৃতির নিসর্গে বিধৌত সিলেট অঞ্চলের সহজ সরল মানুষেরা। সত্যিই তাই। ভিতর আর বাহিরের মানুষ বলে কিছুই নেই। যে মাটিতে গভীর মমতায় শুয়ে আছেন হাসন রাজা, শাহ আব্দুল করিম, কবি দিলওয়ার, সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো মহান মানবেরা। যে ভূখন্ডের আকাশ বাতাস আর মানুষের চেতনায় শান্তি আর মনুষত্ব্যের অমৃতসুধা ঢেলে দিয়েছেন সুফি সাধক শাহ জালাল, যিনি ঐতিহ্যগত ভাবে সিলেটের মুসলিম বিজয়ের পাশাপাশি এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের জন্য সর্বজন স্বীকৃত এবং নন্দিত। সে অঞ্চলের মানুষের মন ভালোবাসায় প্রাঞ্জল আর মানুষের বেদনায় সিক্ত। তাই আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়েছে কিন্তু বেঁচে থাকার আগামীর পথকে রুদ্ধ করেনি। সময়ের বিবর্তনে তারাই পড়েছে বিলেতের মাটিতে বাঙালী আত্মপরিচয়ের তিলক। তাই তারা আমদের সকলের গর্ব।

 

প্রথম দিকে সিলেটিদের অধিকাংশই পূর্ব লন্ডনের ডকল্যান্ডের মধ্যে বা ব্রিটেনের প্রাক্তন উপনিবেশ জুড়ে বিভিন্ন বাগানে শ্রমিক হিসাবে কর্মসংস্থানে নিয়োজিত ছিল। ১৭ শ থেকে ২০ শতকের গোড়ার দিকে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্রিটিশ ভারত থেকে হাজার হাজার লস্কর এবং শ্রমিককে নিয়োগ করেছিল, ব্রিটিশ জাহাজে কাজ করার জন্য যাদের বেশিরভাগই ছিল বাঙালি মুসলমান এবং পাঞ্জাবি শিখ। আগের এক লেখায় উল্লেখ করেছিলাম যে, ইতিসাম-উদ-দীন ছিলেন ঔপনিবেশিক ভারত থেকে ইউরোপে ভ্রমণ এবং ব্রিটেনে বসবাসের জন্য প্রথম শিক্ষিত বাঙালী। তিনি ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের একজন কুটনীতিক, ছিলেন একজন বাঙালি মুসলিম ধর্মগুরু, মুন্সি, যিনি ১৭৬৫ সালে রাজা জর্জের শাসনামলে তার ভৃত্য মুহাম্মদ মুকিমের সাথে বিলেতে এসেছিলেন। তবে রবার্ট লিন্ডসে-এর আত্মজীবনীতে বিলেতে  বাংলাদেশের সিলেট থেকে অভিবাসী হওয়ার আরেকটি প্রাথমিক রেকর্ড পাওয়া যায় যার নাম সাইদ উল্লাহ। উনিই প্রথম সিলেটি পাড়ি জমান বিলেতে। যদিও তার আসার সুনির্দিষ্ট দিন তারিখটি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় নি। তবে নানা সূত্রমতে এটা অনুমান করা হয় যে তিনি ইংল্যান্ডে এসেছিলেন কোন চাকুরী সন্ধান বা নিছক ভ্রমনের উদ্দেশ্যে নয়। বরং ১৭৮২ সালের ডিসেম্বরে সংঘঠিত শ্রীহট্টে মহরম বিদ্রোহের জন্য লিন্ডসেকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে দেশান্তরিত হয়েছিলেন বলে কথিত আছে। সেই বিদ্রোহে সৈয়দ পীরজাদা সহ তার দুই ভাই সৈয়দ মহম্মদ মাহদী ও সৈয়দ হাদীর মতো নেতাসহ ৪ জন শহীদ হন। বিদ্রোহীরা ব্রিটিশদের অনুগত দেওয়ান মানিকচাঁদকে হত্যা করে। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সুপারভাইজার রবার্ট লিন্ডসের সামনেই বিদ্রোহীদের নেতা পীরজাদা ইংরেজ রাজত্বের অবসান ঘোষণা করেন।

 

সিলেটি অভিবাসীদের অধিকাংশই লস্কর নাবিক হওয়ার কারণে, প্রথম দিকের অভিবাসীদেরকে বিলেতের বন্দর শহরগুলিতে মূলত পাওয়া যেত। অনেকে এসেছিলেন নৌ বাবুর্চি ওয়েটার হয়েও। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্যাপ্টেন সেক ডিন মাহোমেট ছিলেন ব্রিটেনে প্রথম দিকের বাঙালি মুসলিম অভিবাসীদের মধ্যে অত্যন্ত পরিচিত। সেই সময় অনেক সিলেটি রেঁস্তরাতেও বাবুর্চির কাজ করতো। অন্তত ১৮৭৫ সাল থেকেই লন্ডনের রেস্তোরাঁয় সিলেটি-বাঙালিদের কাজ করার রেকর্ড রয়েছে। অনেক মধ্যবিত্ত সিলেটিরা বিশ্বাস করত যে সমুদ্র যাত্রা একটি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, কারণ তাদের সম্প্রদায়ের একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য মধ্য এশিয়া থেকে আসা বিদেশী ব্যবসায়ী, লস্কর এবং ব্যবসায়ীদের থেকে এসেছে যারা  সিলেট বিজয়ের আগে এবং পরে স্থানান্তরিত হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে পূর্বলন্ডনের টাওয়ার হেমলেটস বারোতেই অধিকাংশ সিলেটিরা বসবাস করতে শুরু করে কিন্তু তারা বৃটেনের অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পরে যেমন বার্মিংহাম, লুটন, বেডফোর্ড, ওল্ডহ্যাম, রচডেল, ম্যানচেস্টার, লিডস, লিভারপুল, সান্ডারল্যান্ড এবং লন্ডনের ক্যামডেন, ওয়েস্টমিনস্টার, হ্যাকনি এবং নিউহ্যাম। তবে টাওয়ার হেমলেটস হলো বাংলাদেশীদের তৃতীয় বাংলা যেখানে অধিকাংশ সিলেটিদের বসবাস।  বিশেষ করে স্পিটালফিল্ড এবং ব্রিক লেনের আশেপাশের এলাকায়। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত সিলেট অঞ্চলের সুরমা এবং বরাক উপত্যকা থেকে যুক্তরাজ্যের বেশিরভাগ বাংলাদেশি অভিবাসী হয়েছেন।

 

একসময় কাজের লোকের অভাব মেটানোর প্রয়োজনেই সিলেটিদের বৃটেনে আসার অনুমতি মেলে। কিন্তু ১৯৭২ সালে কার্যকর হওয়া অভিবাসন আইনটি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে অভিবাসন প্রবাহের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। এই নতুন আইনে শুধুমাত্র স্ত্রী এবং ষোল বছরের কম বয়সী সন্তানদের স্বামী এবং পিতার সাথে যোগদান করার অনুমতি মেলে। এতে করে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসনের সংখ্যা কমতে থাকে। অন্যদিকে, সত্তরের দশকে সারা বৃটেন জুড়ে বিরাজ করে অর্থনৈতিক মন্দা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। শুরু হয় ভারী শিল্পের বেসরকারী করণ। বিপর্যস্থ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং অসংখ্য ফ্যাক্টরি কল কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারনে সিলেটিদের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক হারে হ্রাস পেতে থাকে। অনেকে বেকার হয়ে পরে। কথায় বলে চাহিদাই উদ্ভাবনের কারণ। শুরু হলো সিলেটিদের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের। একের পর পর এক সারা বৃটেন জুড়ে নিজস্ব রেস্তোরাঁ টেকওয়ে খোলা শুরু হলো। সেই মুহূর্ত থেকে, ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁ হিসাবে পরিচিত কারি হাউসগুলি দেশের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ে এবং বেশ কিছু সিলেটি শেফ এবং রেস্তোরাঁর মালিক তখন থেকেই খ্যাতি এবং সম্পদ অর্জন করেছেন। টাওয়ার হ্যামলেটসের ব্রিক লেন এবং আশেপাশের এলাকাগুলো কারি হাউসের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠে। সিলেটিদের মালিকানাধীন প্রথমভারতীয় রেস্টুরেন্ট হয়ে উঠেছে লন্ডনে। ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত লন্ডনে এই ধরনের রেস্তোরাঁর সংখ্যা ছিলো ২০টি যা ১৯৬০ সলে এসে দাঁড়িয়েছিলো প্রায় ৩00টি। সত্তরের দশকে সিলেটিদের রেষ্টুরেন্ট ব্যাবসায় গভীর মনোযোগের কারনে ১৯৮০ সালের মধ্যে এই সংখ্যাটা এক ধাপে বেড়ে যায় ৩০০০-এ। বর্তমানে বাংলাদেশী রেঁস্তোরার সাথে মিশে আছে বাংলা এবং বাঙালীর উদ্যমী উচ্ছ্বাস, শৌর্য আর বির্যের ইতিহাস, এক অমলীন দ্রোহ আর প্রতিরোধের উৎস, শ্যামলিমা বাংলার আত্মপরিচেয়ের জয়টীকা। আজকের প্রজন্মের বাংলাদেশীরা যে ঐশ্বর্যের তিলক কপালে দিয়ে পরম নিশ্চিন্তে বিলেতের মাটিতে দ্বীপ্ততার সাথে হেঁটে বেড়াচ্ছে তার পেছনে লুকিয়ে আছে এক বেদনাক্ত বিষাদের কাব্যগ্রন্থ। সিলেটিদের মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেলাম এখনকার বিলেত, এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের হেসে-খেলে হেঁটে চলার পরম বিস্ময় ব্রিক লেইনের বাংলা টাউন।

 

ষাটের দশকে হাজার হাজার সিলেটিরা কঠোর পরিশ্রম এবং দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে তাদের জীবনকে উন্নত করার জন্য তাদের স্বদেশীদের সাথে যোগ দিতে পাড়ি জমায় বিলেতে। এই প্রাথমিক অভিবাসনের পর বহু বছর ধরে, সিলেটি জনগোষ্ঠী ইংল্যান্ড জুড়ে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। টাওয়ার হ্যামলেটের মতো কিছু এলাকা বিশেষভাবে বাংলাদেশি-সিলেটী সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত হওয়ার কারণে এর বৃহৎ জনসংখ্যার অবস্থান পূর্ব লন্ডনের এই এলাকায় গড়ে উঠে। এই এলাকাটি এখন স্থানীয়ভাবে  'লিটল বেঙ্গল' হিসেবে পরিচিত। আজ কয়েক দশক পরে যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশী প্রবাসীরা ব্রিটিশ সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে বলিষ্ঠ পদচারনা। অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং রাজনীতিতে রাখছে উল্লেখযোগ্য অবদান। এই প্রাণবন্ত সম্প্রদায়টি কয়েক দশক ধরে ব্রিটেনের জীবনে অপরিসীম অবদান রেখেছে এবং আজও তা অব্যাহত রয়েছে।  অর্থনৈতিক অবদানের পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাদেশী অভিবাসীরা নির্মাণ খাদ্য পরিষেবা শিল্পের মতো নির্দিষ্ট কিছু খাতে শ্রমিকের ঘাটতি পূরণ করে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও সাহায্য করেছে। তাদের উপস্থিতি ব্রিটিশ শ্রমিকদের জন্য সৃষ্টি করছে চাকরি সুযোগ। বর্তমানে প্রায় লক্ষাধীক লোক কাজ করছে বাংলাদেশী রেঁস্তোরাগুলিতে। এছাড়াও, অনেক বাংলাদেশী অভিবাসী নানা ধরনের ব্যবসা শুরু করেছে যা ব্রিটেন জুড়ে স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এক নতুন সাল্যের বাতাবরনে পথ এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে অতি সাফল্যে এবং সন্মানের সাথে। কিন্তু এই সাফল্যে এতো সহজে বিলেতের অভিবাসী সিলেটরা অর্জন করেন নি।

 

এই সিলেটিরা বিলেতের মাটিতে অনেক কষ্ট এবং দুঃখ-বেদনাকে বুকে ধারন করে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশী কমিউনিটি, উপহার দিয়েছে বাঙালীর এক অমলীন সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের তিলক এবং ভবিষ্যত প্রজন্মকে করেছে সমৃদ্ধ এবং ঋজু। এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে আমাদের পূর্বসুরীরা এই প্রবাসের মাটিতে দিনাতিপাত করেছিলো যখন স্কিন হেড আর বর্নবাদের হিংস্র থাবায় পর্যুদস্ত অভিবাসীরা। একের পর এক বর্নবাদী আক্রমনের শিকার হন সিলেটিরা। আফতাব আলীর মতো বেশ কয়েক জনের তাজা প্র।ন কেড়ে নেয় এই বর্নবাদীরা। ব্রিক লেইনের আশে পাশের দেয়ালে দেয়ালে লিখা থাকতো “আমরা ফিরে এসেছি”। রাস্তায় চলতে গিয়ে হয়েছেন লাঞ্চিত, অপমানিত এবং অত্যাচারিত। রাস্তায় চলতে গলেই বর্নবাদীরা আক্রমন চালাতো, চোখে-মুখে থুথু লেপ্টে দিতো এবং পাকি বলে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতো। অনেক সিলেটি স্কুলে গিয়ে হন শ্বেতাঙ্গদের দ্বারা গণপিটুনির শিকার। পুরো ব্রিক লেইনের চারিদিক ছিলো দেয়াল বেষ্টিত এবং এর বাইরে যাওয়াও ছিলো বিপদজ্জনক। ধীরে ধীরে শুরু হলো বাংলাদেশীদের বিক্ষোভ এবং বর্নবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই। তরুন কর্মীদের দ্বারা গঠিত হলো বাংলাদেশ ইয়ুথ মুভমেন্টের মতো কমিটি। আলতাব আলী নামটি যুক্ত হলো বর্ণবাদী হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের শিরোনামে যা এখন পর্যন্ত মানবাধিকারের সংগ্রামের সাথে যুক্ত রয়েছে এক মাইলফলক হয়ে। স্থানীয় বাংলাদেশীদের বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংগঠনের ট্রিগার ছিল আলতাব আলীর হত্যা। টাওয়ার হ্যামলেটের ব্রিটিশ বাংলাদেশীদের আজকের অভূতপূর্ব পরিচয় এবং সংযোগ এখনও এই প্রচারণার জন্য অনেক বেশি ঋণী। তাদের নিরলস পরিশ্রম এবং প্রচারনার কারনেই হোয়াইটচ্যাপেল রোডের একটি পার্কের নামকরণ করা হয়েছে আলতাব আলীর নামে। পার্কটি আজ স্থানীয় জনগণের বিক্ষোভের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এখানেই স্থাপন করা হয়েছে অমর একুশের শহীদ মিনার।।

 

প্রথম বাঙালীর বিলেত আগমনের পর থেকে ২৫০ বছরেরও বেশি সময় পাড় হয়ে গেছে। সমাজ এবং রাষ্ট্রে এসেছে আমূল পরিবর্তন। মানুষেরা চিন্তা-চেতনায় ভাবনায় এসেছে উদার মনোভাব, মনবিকতা, সভ্যতার ছোঁয়া। বিশ্বায়ন, গনতন্ত্র আর বাক-স্বাধীনতার মোড়কে ঢাকা পৃথিবীর মানুষেরা আজ এক নতুন শিল্প বিপ্লবের পথ ধরে হেঁটে চলেছে। তাই এই সমাজ এবং মানুষেরা ভাবনায় এসেছে বলিষ্ঠ শৈলীতা এবং ঋজুতা। কিন্তু তার পরেও কি এসেছে সামাজিক স্বস্থিরতা, বৈষম্যহীন সমাজ ব্যাবস্থা? এখনো চলছে অসমতা, প্রাতিষ্ঠানিক বর্নবাদ আর বৈষম্যবাদের কালো ছোবল। এখনো অশ্বেতাঙ্গ মানুষেরা ব্রিটিশ সমাজের স্বীকৃতি এবং গ্রহণযোগ্যতার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। বিশেষকরে দক্ষিন এশিয়া এবং আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসীদের উপর বেশী মাত্রায় বর্ন বৈষম্যতা লক্ষনীয়। অনেক সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের পর এই সিলেটিরা বিলেতের মাটিতে শীড়দাঁড়া শক্ত করে দাঁড়াতে পেরেছেন। অনেক নোনা জল পাড়ি দিয়ে জীবনের তাগিদে নিজের চির চেনা দেশ মাতৃকার শিকড় ছেড়ে যে মানুষগুলো একদিন ভাগ্যান্বেষণে ঘর ছেড়ে এ দেশে এসে বসতি স্থাপন করে বুকে টেনে নিয়েছিলেন বিষাক্ত কন্টক, তারাই একদিন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য উন্মোচন করেন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করার সম্ভাবনার দ্বার। আজ ব্রিটেনের মূলধারার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বর্তমান প্রজন্মের মজবুদ অবস্থান পূর্ব প্রজন্মের দীর্ঘ ত্যাগ-তিতিক্ষারই ফসল। মহান মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের বিভিন্ন দুর্যোগ দু:সময়ে ব্রিটেন প্রবাসী সিলেটিদের ভূমিকা রাষ্ট্রও গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্বীকার করে। শুধুই কি বিলেতে? সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে এই সিলেটিরা এক বৈশ্বিক পরিবার হয়ে।

 

আজকে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত সিলেটিরা এখানকার জীবনে উল্লেখযোগ্য সামাজিক সাংস্কৃতিক অবদান রাখছে। সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থানে এসেছে সমৃদ্ধি। রেঁস্তোরার সাথে সাথে নানা ধরনের ব্যাবসায় সংপৃক্ত বাংলাদেশী সিলেটিরা। আর রাজনীতিতে এই প্রজন্মের শিক্ষীত বাংলাদেশীরা একেবারে সরব। অনেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত। চারজন মহিলা বাংলাদেশী এমপি বৃটিশ পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করছে। টিউলিপ সিদ্দিক, রুশনারা আলী, রূপা হক ও আপ্সনা বেগম। বর্তমান প্রজন্মের বাংলাদেশী সিলেটিরা সমাজের সর্বত্র বিরাজ করছে অত্যন্ত দর্পের এবং সন্মানের সাথে। শিক্ষায়-দীক্ষায়, সরকারী-বেসরকারী সব ক্ষেত্রেই নিয়ে আসছে এক অভাবনীয় নতুন সম্ভাবনা। এই সম্প্রদায়ের মধ্যে যেন বিরাজ করছে আনন্দ-উল্লাস আর বিজয়ের এক আনন্দমেলা। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ সুনামগঞ্জ সহ সিলেট জেলার প্রতিটি উপজেলা, গ্রাম-গন্জ এই এই আনন্দমেলার যোগ্য সারথী। আমরা সকলেই জানি ভাষা এবং পরিচয় একে অপরের সাথে জড়িত। যদিও ভাষা মানুষের পরিচয় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কিন্তু ভাষাই একমাত্র প্রভাবক উপাদান নয় যা মানুষ ও সমাজের সার্বিক পরিচয় গঠন করে। মানুষ সাধারণত ভাষার মাধ্যমে তাদের গোষ্ঠীগত পরিচয়কে প্রকাশ করে। উল্লেখ্য যে প্রকৃত ভাষা ব্যবহার এবং দক্ষতা পরিচয়ের সাথে সম্পর্কিত নাও হতে পারে। কখনও কখনও একটি নির্দিষ্ট ভাষাকে পূর্বপুরুষের ইতিহাস, বিশ্বাস এবং পরিচয়ের পুনরুজ্জীবন হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বাংলাদেশের সিলেটিরা যে ভাষায় কথা বলে তাকে সিলেটি ভাষা বলা হয়। সেই ভাষার আদলে গড়ে উঠা শ্রীহট্টের স্নিগ্ধ নদ-নদী আর বিল-হাওড়ের জল হাওয়ায় বেড়ে উঠা এই স্বল্প বা অশিক্ষিত মানুষগুলি বিলেতে এসে নানা বাধা বিপত্তি আর বর্নবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীর জন্য তৈরী করেছেন এক নান্দনিক ঠিকানা। আমরা হয়তো আর ফিরে পাবোনা আলতাব আলী সহ আরো অনেককে যারা বর্নবাদী হামলায় প্রান দিয়েছেন নির্মমভাবে এইখানে এই টেমসের তীরের সাম্রাজ্যবাদের রাজধানী লন্ডনে। কিন্তু আমরা পরম মমতায় স্বরন করবো এই আত্মত্যাগী পূর্বসূরীদের যাদের ত্যাগ, দুঃখ-বেদনা আর অসহ্য কষ্টের বৈতরনীর শেষ অন্ত সৃষ্টি হলো এক সুন্দর অমলীন বাংলাদেশীদের আত্মপরিচয়ের ঠিকানা এই বিলেতের মাটিতে।

 

Leave your review